নিসর্গের নিঃসঙ্গ পথিক — গোপাল ঘোষ

গোপাল ঘোষ নামক একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন বাঙালি সেকথা কবেই ভুলে গেছে। বিস্মৃতবাঙালীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য হাতে কলম তুলে নিলেন দেবকুমার সোম

১৯৪০ দশক এই উপমহাদেশের পক্ষে সবদিক থেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও যুদ্ধের সার্বিক প্রভাব থেকে ভারতবর্ষ বিচ্ছিন্ন ছিল না। তার ওপর বিয়াল্লিশে বাংলার দুর্ভিক্ষ, ছেচল্লিশের দাঙ্গা, সাতচল্লিশে দেশভাগ আর আটচল্লিশে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত যুদ্ধ। পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনা। এর মধ্যে রাজনীতিতে গান্ধীযুগ গিয়ে নেহেরু যুগ এসেছে। সাতচল্লিশ সাল অবধি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পূর্ণচন্দ্র যোশী। মূলত তাঁর ও সোমনাথ লাহিড়ীর সমর্থনে ফ্যাসিস্টবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে একদিকে যেমন গণনাট্য সংঘ তৈরি হলো, অন্যদিকে সাহিত্য কিংবা চিত্রশিল্পে এলো নতুন এক তরঙ্গ। ১৯৩০ এর সূচনা সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথকে যেমন সাহিত্যে অস্বীকার করা হচ্ছিল, ঠিক তেমনই আবার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিত্রশিল্পের মধ্যে দিয়ে অবনীন্দ্রনাথ কিংবা ই.বি. হ্যাভেলের নব্যবঙ্গ ঘরানার বিপ্রতীপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। তখনকার চলতি হাওয়ার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের এমন সরাৎসারের পেছনে হয়তো ‘জুবিলি আর্ট অ্যাকাডেমি’র প্রতিস্পর্ধার ইতিহাস কাজ করেছিল। মোটের ওপর রবীন্দ্রনাথের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েই চিত্রশিল্পে তখনই দুটো ভিন্ন ধারার জন্ম হয়। যার একদিকে চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর, জয়নুল আবেদিন কিংবা দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো প্রগতিশীল রাজনৈতিক শিল্পী। অন্যদিকে ছিল ইউরোপীয় আঙ্গিক আর দেশীয় ঘরানার সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’। অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধ, মানুষসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, জাতিদাঙ্গা, দেশভাগ এর মধ্যে দিয়ে শিল্পীসাহিত্যিকদের মধ্যে যে বিপুল আলোড়ন ওঠে, সেই আলোড়ন আমাদের দেশীয় চিত্ররচনাকে তিনটে ভাগে ভাগ করে দেয়। নব্যবঙ্গীয় ধারার মূল শাখা থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে অপর দুটো শাখা পুষ্ট হয়েছিল সেদিন। আমাদের স্মরণে আছে চিত্তপ্রসাদ শান্তিনিকেতনে নন্দলালের কাছেই ছবি আঁকা শিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তিনি অভিমানে যোশীর সহযোদ্ধা হন। তাঁর অনুপ্রেরণাই কাজ করে সোমনাথ হোরের মধ্যে। তেমনই যারা ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তাঁদের মধ্যে অনেকেই নন্দলাল, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কিংবা দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর ছাত্র। যেমন গোপাল ঘোষ। এই গ্রুপে পরের দিকে যোগ দেন রামকিংকর। যিনি স্বয়ং শান্তিনিকেতনে ছিলেন নন্দলালের প্রথম পর্যায়ের ছাত্র। অবশ্য ১৯৪০ দশকের সব প্রতিভাই যে প্রগতিশীল কিংবা ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তা নয়। বিনোদবিহারী, হীরালাল দুগার অথবা যামিনী রায় নববঙ্গ ধারাকেই পুষ্ট করেছেন।

গোপাল ঘোষের চিত্ররচনা সম্পর্কে কথা শুরুর আগে এত দীর্ঘ একটা মুখবন্ধ দিতে হলো, শুধু এটুকুই বোঝাতে যে নিসর্গ চিত্র যেমন এঁকেছেন বিনোদবিহারী বা হীরালাল দুগার, গোপাল ঘোষও তেমনই আজীবন নিসর্গ চিত্র এঁকেই স্থিরতা পেয়েছেন। এঁরা সকলেই ভাবধারায় অবনীন্দ্রনাথনন্দলাল অনুসারী হলেও সৃজন দর্শনে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। ফলে আমরা যখন নিসর্গ শিল্পী হিসেবে একই বন্ধনীর মধ্যে এঁদের আনি, তখন স্বভাবতই ভ্রম থেকে যায়। যেমন ধ্রুপদী ব্যাটসম্যান হিসেবে রাহুল দ্রাবিড়ের স্কোয়ার কাট আর বিশ্বনাথের স্কোয়ার কাটে পার্থক্য রয়েছে। ঠিক তেমনই গোপাল ঘোষের নিসর্গ চিত্র রচনার সঙ্গে শান্তিনিকেতনের নিসর্গ চিত্র রচনার আঙ্গিকগত প্রভেদ প্রচুর। এই প্রভেদ আরও গভীরে অনুভবের জন্য আমাদের গোপাল ঘোষের জীবন বৃত্তান্ত একটু জেনে নিতে হবে।

যদিও গোপাল ঘোষের পৈতৃক আবাস উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার অঞ্চলে। অথচ, শৈশব থেকে তরুণ বয়স অবধি তিনি ছিলেন বাংলা ছাড়া। তাঁর জন্ম ১৯১৩ সালে। গোপাল ঘোষের বাবা ক্ষেত্রমোহন ঘোষ ছিলেন উঁচু পদের আর্মি অফিসার। তখন তিনি সিমলায় অবস্থান করছেন। গোপালের প্রথম শৈশব সিমলায় কেটেছে। পাহাড়জঙ্গল ঘেরা ব্রিটিশরাজের অত্যন্ত প্রিয় এই শৈলশহরে প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের অভাব ছিল না। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে শেষমেশ নীলপাহাড়মেঘে দৃষ্টি মিশে যায়। বরফ শিখরে দিনের প্রথম সূর্যের আলোর নম্র উন্মোচন কীভাবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য এক আকুতিতে ভরে যায়। সিমলায় শৈশবের চোখ ফোটার সময় সে সব তাঁর চেতনায় অনুপ্রবেশ করে। বাবার সামাজিক ক্ষমতায় তিনি স্থানীয় এক নামী ইংরাজি স্কুলে ভর্তি হন। গোপাল ঘোষ ছেলেবেলায় ‘সুবোধ গোপাল’ ছিলেন না মোটেও। বরং বেশিমাত্রায় ছিলেন ডানপিটে। স্বদেশি আন্দোলনের সময় একদিন তিনি তাঁর কয়েকজন ছাত্রবন্ধুর সঙ্গে মিলে স্কুলের ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। খবর পেয়ে পুলিশ আসে। পুলিশের বুলেট তাঁর ডান হাতে লাগে। এরপর ক্ষেত্রমোহন চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বেনারসে বাস শুরু করলে, গোপাল পুরোনো এই শহরের অলিগলি ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকা চর্চা করতে থাকেন। কলেজের পড়াশুনো বেশি এগোল না। ফলে ক্ষেত্রমোহন তাঁকে জয়পুরের ‘মহারাজা স্কুল অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’এ ভর্তি করে দেন। জয়পুরের আর্ট কলেজে তখন অধ্যক্ষ ছিলেন শৈলেন দে। তাঁর কাছেই তিনি প্রথম শিখলেন নব্যবঙ্গ ধারার শিল্প। তখনই নব্যবঙ্গ ধারার প্রতি তাঁর মধ্যে বিদ্রোহ কাজ করতে শুরু করে। কারণ, নব্যবঙ্গ ধারায় ন্যুড স্টাডির চল ছিলনা। গোপাল ঘোষ তখন পশ্চিম ইউরোপের চিত্রকলা সম্পর্কে বিভিন্ন বই দেখে অনুভব করলেন, বিদেশি শিল্পীদের মতো ছবিতে দক্ষতা আনতে হলে হিউম্যান স্টাডি কিংবা ন্যুড স্টাডির প্রয়োজন। ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকরদের মধ্যে এই প্রবণতা গভীরভাবে লক্ষ্য করেন তিনি। আর খুব শিঘ্রই নব্যবঙ্গীয় ধারার পাশাপাশি ইমপ্রেশনিস্টদের প্রতিও তিনি ঝুঁকলেন। তখন দেশে ন্যুড স্টাডির শিক্ষা দেওয়া হতো কেবল চেন্নাইয়ের গভর্মেন্ট স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফসএ। তিন বছরের অ্যাডভান্স কোর্সে গোপাল ঘোষ তাই চেন্নাই পড়তে গেলেন। আর এখানেই শিক্ষক হিসেবে তিনি পেলেন দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীকে। স্নাতক হওয়ার পরে দেবীপ্রসাদের উপদেশে রেখার ড্রয়িং গভীর অনুশীলনের জন্য দেশ দেখতে বের হলেন। ক্লাসরুমের বাইরে বের হয়ে তিনি যেমন আরও গভীরভাবে পরাধীন দেশটাকে দেখতে পেলেন, ঠিক তেমনই রেখায় তাঁর দক্ষতাকে উৎকর্ষ সীমার বাইরে নিয়ে ফেললেন। জীবনভর গোপাল ঘোষ অজস্র স্কেচ করেছেন। তার ওপর কোন রঙ চাপাননি। কোন কোন নিসর্গ চিত্রকর কেবল রঙ নিয়ে খেলা করেন। জলরঙ কিংবা প্যাস্টেল বা কালিকলম। কিন্তু গোপাল ঘোষ একজন আন্তর্জাতিক মানের নিসর্গ শিল্পী হয়েও রঙ কিংবা প্রকরণ নিয়ে নয়, রেখা নিয়ে সময় কাটিয়ে গেছেন। সামান্য কাগজ আর কলমের সাহচর্যে তিনি দুরন্ত সব রেখার সৃষ্টি করে গেছেন। আর এইভাবে স্টিল ছবি, হিউম্যান ফিগার, বা জন্তুজানোয়ার বা ফুলের ছবি আঁকতে গিয়ে সাদা কাগজে তিনি রেখার যে বিন্যাস রেখে গেছেন, তা কেবল কাব্যিক নয়। অভ্রান্ত। ফলে তাঁর এই রেখার মধ্যে ক্যালিগ্রাফির টান দর্শকের নজর এড়ায় না। এভাবে ১৯৩৮ সালে যখন তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে এলেন, তখন দক্ষতায় পূর্ণ এক নতুন প্রতিভা হিসেবেই তাঁকে চিনতে সময় নেয়নি সমকালীন শিল্পী সমাজ। যদিও তখন তাঁর মধ্যে আঙ্গিক নিয়ে ছিল তীব্র টানাপোড়েন। কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করবেন? কোন উপায়ে নিজের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠবে কাগজ কিংবা ক্যানভাসে? তাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা। এরই মধ্যে সাময়িক পত্রপত্রিকায় অলংকরণের কাজ করেছেন। সমমনস্ক শিল্পীদের সঙ্গে ছবির প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। আর শেষমেশ প্রদোষ দাশগুপ্তদের সঙ্গে ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’ তৈরি করেছিলেন। যে গ্রুপ এদেশের চিত্রআন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রচেষ্টা।

ক্যালকাটা গ্রুপ’এর সঙ্গে যারা সংপৃক্ত ছিলেন, তাঁরা যেমন সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে এসেছিলেন, তেমনই তাঁদের শিক্ষাও একই পদ্ধতিতে হয়নি। ফলে গ্রুপ সদস্য হিসেবে একে অন্যের কাজের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা করলেও কেউ কারোর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। কিন্তু নিসর্গ চিত্র রচনার যে পরম্পরা শুরু হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথনন্দলালের হাত ধরে, যে ধারা এখনও সমান ক্রিয়াশীল, সেখানে গোপাল ঘোষের অবস্থান কোথায়? আমরা কি তাঁকে একজন নিসর্গ চিত্রশিল্পী হিসেবেই আজ মান্যতা দেব? আমরা কী তাঁর অন্যান্য সফল কাজগুলোর কোন আলোচনা করবো না? শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া একজন প্রায় কিংবদন্তী বাঙালি শিল্পীকে কী চোখে দেখবে ভাবিকাল?

এই আলোচনায় আসতে গিয়ে আমরা প্রথমেই বিস্মিত হই দেখে যে, শান্তিনিকেতনের চৌহদ্দির মধ্যে না থেকেও, বিদ্রোহী ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’এর একজন সক্রিয় সদস্য হয়েও গোপাল ঘোষ আজীবন প্রায় জলরঙের কাজই করে গেলেন। কিছু প্যাস্টেল কাজ থাকলেও, তাঁর বড়ো কাজ সবই কাগজের ওপর জলরঙ। ভাবলে বেশ কৌতুহল জাগে। গোপাল ঘোষ ইমপ্রেশনিস্টদের টেকনিককে আত্মস্থ করেছেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনী ধারার মতো জলরঙেই ঘটেছে তাঁর প্রকাশ। তখন জলরঙের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ছিল সত্যি, যুদ্ধের বাজারে বিদেশ থেকে ভালো মানের তেলরঙ আসতো না। এলেও চোরবাজারে যারা রাজরাজাদের প্রতিকৃতি আঁকতে দড়, তাঁদের কাছেই বিকোত। সে সমস্যা গোবর্ধন আশ, রথীন মিত্র কিংবা মৈত্রদের ছিলনা? বিলক্ষণ ছিল। তবুও গোপাল ঘোষ কেন জলরঙেই স্থিত ছিলেন? কারণ তাঁর সিদ্ধি জলরঙে। আগেই আলোচনা হয়েছে গোপাল ঘোষ রঙ নিয়ে নয়, বরং ছবির রেখা নিয়েই মগ্ন ছিলেন। ফলে কালির ওপরই ছিল তাঁর টান। এই টান তাঁর ছবিকে অনেকাংশে ক্যালিগ্রাফিক করে তুলেছিল সন্দেহ নেই। জলরঙে অসুবিধা যেমন বিস্তর, সুবিধাও আছে। রেখার টান সে তির্যক বা সরল যাই হোক, খুব কাব্যিক হয়। তুলি কিংবা কলমের একটা মোটা বা সুক্ষ্ম টানে ছবির প্রেক্ষাপট কেমন পাল্টে যায়। ব্যাপারটা স্পষ্ট ধরা পড়ে রামকিংকরের জলরঙের ছবিতে। কিষাণকিষাণীরা জমিতে কাজ করছে। কিংবা একজন চাষা তার বলদকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এমন সব ছবিতে রামকিংকর খুব ডিটেইলিংএ যাননি। বরং একটাদুটো তুলির খোঁচায় জলরঙের প্রেক্ষাপট থেকে টেনে বের করে এনেছেন ছবির বিষয়। গোপাল ঘোষেরও রেখার প্রতি তীব্র টান বা অবশেসন তাঁর ছবিকে বারবার জলরঙের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

গোপাল ঘোষ ইমপ্রেশনিস্টদের ছবি এবং টেকনিকে প্রভাবিত ছিলেন। বিশেষত সেজান্ কিংবা মোনের ছবির। সেটা তাঁর স্টিল ছবি বা নিসর্গ চিত্র দেখলেই টের পাওয়া যায়। তাঁর ছবিগুলো রচিত দর্শকের দৃষ্টিতে। তিনি নিসর্গ আঁকছেন যেন এমনভাবে, কেউ নিরাপদ দূর থেকে পাখির দৃষ্টিতে নিসর্গ দেখছে। অনেকক্ষণ ধরে দেখছে। ফলে দর্শকের চোখের ওপর যেটা ফুটে উঠছে, সেটা ঠিক বাস্তবধর্মী নিসর্গ দৃশ্য নয়। বরং একটা অনুভূতি। একটা আবেশ বের হয়ে আসছে। তাঁর সমসাময়িক যাঁরা নিসর্গ চিত্র এঁকেছেন, তাঁদের থেকে গোপাল ঘোষের পার্থক্য এই, তিনি বস্তুর মধ্যে স্থিত না হয়ে অবতল থেকে বুঝতে চেয়েছেন প্রকৃতির ভাষা। শৈশব থেকেই তিনি বাহিরমুখো। অফুরন্ত প্রকৃতির মধ্যেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। ফলে প্রকৃতির নির্যাসকে মননে স্থাপন করতে তাঁর টেকনিক হয়ে উঠেছে ছবি নয়, ছবির অনুভূতি। এ প্রসঙ্গ আমরা তাঁরই সমকালীন আর এক বিস্ময়কর প্রতিভার কথা বলতে চাই। তিনি হলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। বিনোদবিহারী দৃষ্টিশক্তির ক্রম ক্ষয়িষ্ণুতার মধ্যে অন্তর্জগতের ভেতরে রঙের চেতনা নিয়ে, আলোর চেতনা নিয়ে খেলা করেছেন। গোপাল ঘোষের মতো তাঁরও ছবিতে ক্যালিগ্রাফিক মেজাজ দেখা যায়। কিন্তু বিনোদবিহারীর ছবিতে আলোর যে ঝলক, সেই ঝলক অনুপস্থিত গোপাল ঘোষের ছবিতে। মনে হয় ভ্রাম্যমান জীবনে গোপাল ঘোষ আলোর এত রকমফের দেখেছেন যে, আলো নিয়ে তাঁর কোন কারুকার্য ছিল না। মনে হয় আলো নয়, আলোর উদ্ভাস নিয়েই ছিল তাঁর যাবতীয় মুদ্রাদোষ।

গোপাল ঘোষের সময় থেকে আমরা নয় নয় করে আজ ৭০/৮০ বছর পার হয়ে এসেছি। এখন আর রঙের শ্রেণী বিভাজন নেই। তবুও ছাত্র কিংবা চিত্রশিল্পীরা নিসর্গ চিত্র আঁকার সময় জলরঙ তুলে নেন। কারণ জলরঙের তরলতায় খেলা করে আলোর রকমফের। দেশভাগের আগুপিছু এই শহরে নিসর্গ চিত্র রচনায় গোপাল ঘোষ সেই আলোর ঠিকানা পাননি। ফলে আজকের ফোটোগ্রাফিক নিসর্গ চিত্রের চেয়ে অনেকবেশি অবাস্তব তাঁর আঁকা ছবিগুলো। যেগুলো দর্শক আর শিল্পীর চেতনায়। মননে।

গোপাল ঘোষ আজীবন একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন। কোনো ফোটোগ্রাফার নন।

চিত্র পরিচিতি : গোপাল ঘোষ ও তাঁর সৃষ্টি।

Advertisements
Posted in Cultural journey | Tagged , , , | ১ টি মন্তব্য

আগুন তুলি উদ্বোধনী ভাষণ

গত ২৭ জুলাই, ২০১৭ কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস সংলগ্ন বই-চিত্রর সি গুহ মেমোরিয়াল সভাগৃহে উদ্বোধন হল দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবনী-গ্রন্থ আগুন তুলি ।  প্রখ্যাত শিল্প-সমালোচক মৃণাল ঘোষ-এর উদ্বোধনী ভাষণটি উদ্ভাসের পাঠকদের জন্য।

 

শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে (১৯১৮-১৯৯১) নিয়ে কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের আগুন-তুলি নামে যে বইটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আজ, সেটি খুবই প্রয়োজনীয় একটি প্রকাশনা।  ১৯৪০ এর দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের মধ্যে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  কিন্তু তাঁকে নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয়নি।  অশোক ভট্টাচার্যের কালচেতনার শিল্পী বইতে তাঁর উপরে একটি অধ্যায় রয়েছে।  ওই বইতে আর যে তিনজন শিল্পী আলোচিত হয়েছেন — তাঁরা হলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ ও সোমনাথ হোর।  আর একটি বই হয়তো চারুকলা পর্ষদ থেকে বেরিয়েছিল।  এর বাইরে শিল্পীর জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার নজির আর বিশেষ নেই।  এমনকি কমল সরকারের ভারতের ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী গ্রন্থেও দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখ নেই।  সেদিক থেকে কৃষ্ণজিতের লেখা এই বইটি আধুনিক শিল্প আলোচনার ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

সামাজিক দায়বোধ চল্লিশের শিল্পকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।  এর পূর্ববর্তী যে আধুনিকতার চিত্রধারা — তাকে মোটামুটি তিনটি প্রবণতায় ভাগ করা যায়।  প্রথমটি ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিক, যার প্রধান প্রকাশ আমরা দেখতে পাই রাজা রবি বর্মা, অন্নদাপ্রসাদ বাগচি, বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পীর ছবিতে।  দ্বিতীয়টি এরই প্রতিবাদে গড়ে ওঠা নব্য-বঙ্গীয় বা নব্য-ভারতীয় ঘরানা, যার প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর শিষ্য পরম্পরা — নন্দলাল বসু,অসিতকুমার হালদার, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার প্রমুখ শিল্পী।  গগনেন্দ্রনাথ নব্য-ভারতীয় ঘরানার সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও তাঁর চিত্রচেতনা ছিল অনেক অগ্রবর্তী।  বলা যেতে পারে চল্লিশের মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী চেতনার তিনি ছিলেন প্রধান এক পূর্বসূরী।  আধুনিকতার তৃতীয় ধারা বা স্বদেশচেতনা-আশ্রিত আধুনিকতার দ্বিতীয় ধারাটি বিকশিত হয়েছিল শান্তিনিকেতন থেকে।  রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ও আদর্শে উদ্ভূত এই ধারাতেও নন্দলালই ছিলেন প্রধান প্রেরণাদাতা ও তন্নিষ্ঠ শিক্ষক।  এখানে নব্য-ভারতীয় ঘরানা যে বিশ্বচেতনায় উন্মীলিত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আমরা দেখি বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও রামকিঙ্করের কাজে।

এই পরিপ্রেক্ষিত বা ভিত্তির উপরই চল্লিশের শিল্পকলার বিকাশ।  ছবিতে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ভুবনের যে উন্মীলন শুরু হয়েছিল ১৯২৩-২৪ সাল থেকে ১৯৪১-এ তার পরিসমাপ্তি ঘটে।  আঙ্গিকের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ এক নতুন পথের উন্মীলন ঘটালেন।  আদিমতা ও অভিব্যক্তিবাদী প্রবণতা সত্ত্বেও স্বদেশ ও বিশ্বের এক মননদীপ্ত সমন্বয় ছিল তাঁর ছবিতে।  সেখান থেকেই সূচনা হয়েছিল মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী চেতনার বিস্তারের, যার প্রথম উদ্ভাস দেখা গিয়েছিল গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে।  চল্লিশের শিল্পীরা এই উত্তরাধিকারকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন।  একদিকে সামাজিক দায়বোধ, আর একদিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে আত্মস্থ করার প্রবণতা ছিল চল্লিশের শিল্পকলার।  যদিও সামাজিক দায়বোধ চল্লিশের প্রায় সব শিল্পীরই অন্তরপ্রেরণা ছিল, তবু একে ভিত্তি করেই চল্লিশের শিল্পকলাকে দুটি প্রবণতায় ভাগ করা যায়।  একটি প্রবণতায় সামাজিক দায়বোধ বা কালচেতনাই ছিল প্রধান প্রেরণা।  এই প্রবণতার প্রধান শিল্পীরা ছিলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, মণি রায়, সূর্য রায় প্রমুখ আরও কয়েকজন শিল্পী।  দ্বিতীয় প্রবণতাটি ছিল সংঘবদ্ধ আন্দোলনের।  ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’-এর শিল্পীরা ছিলেন এই আন্দোলনের শরিক।  এদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় প্রদোষ দাশগুপ্ত, গোপাল ঘোষ, নীরদ মজুমদার, পরিতোষ সেন, গোবর্ধন আশ, সুনীলমাধব সেন প্রমুখ শিল্পী।

প্রথম যে ধারা, সামাজিক দায়বোধের ধারা বলে যাকে আমরা বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছি, তার পিছনে দুটি ঘটনার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।  একটি হল ১৯৪৩-এর মন্বন্তর।  আর দ্বিতীয়টি মার্কসবাদ বা কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন।  মন্বন্তরের গভীর প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় সকলের কাজেই।  তবু জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ বা সোমনাথ হোর-এর ছবিতে মন্বন্তরের যে প্রত্যক্ষ অভিঘাত, অন্য অনেকের কাজে হয়তো ততটা ছিল না।  অন্যদিকে মার্কসবাদের দীক্ষায় চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর ও দেবব্রত মুখোপাধ্যায় যতটা উদ্বুদ্ধ ছিলেন, অন্যেরা হয়তো ততটা ছিলেন না।  দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবনদর্শন ও শিল্পদর্শনে মার্কসবাদের প্রভাব ছিল গভীর, যদিও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ সদস্য ছিলেন না।

প্রবাহিত জনজীবন, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মুক্তি-সংগ্রাম ও বিভিন্ন গণ-আন্দোলন হয়েছে তাঁর ছবির প্রধান বিষয়।  ছবির রূপ বা আঙ্গিকও নির্ধারিত হয়েছে এই আন্দোলন ও প্রতিবাদীচেতনা থেকে।  তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা ছিল না।  যদিও কলকাতার কয়েকটি শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেননি, প্রধানত পিতার অকাল প্রয়াণ ও তজ্জনিত দারিদ্রের কারণে।  তিনি রূপের দীক্ষা অর্জন করেছেন ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন শিল্পকেন্দ্রগুলি ভ্রমণ করে।  তাঁর সেই অভিজ্ঞতা ধরা আছে তাঁর লেখা দুটি বইতে বাঘ ও অজন্তা এবং ধারা থেকে মাণ্ডু ।  পাশ্চাত্য শিল্প থেকেও তিনি শিক্ষা নিয়েছেন।  তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে ভ্যান গঘ ও পিকাসো।

অর্ধেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলী তাঁর ভারতের শিল্প ও আমার কথা গ্রন্থে এই শিল্পীর উল্লেখ করেছেন।  তাঁর আঙ্গিক সম্পর্কে বলেছেন, ‘শিল্পসৃষ্টিতে তিনি উগ্র আধুনিকও নন, আবার পুরো সেকেলে পন্থায়ও চলেন না।’  এই উক্তির মধ্যে এই ইঙ্গিত থাকে যে দেবব্রত নব্য-ভারতীয় ধারা যেমন অনুসরণ করেননি, তেমনি পাশ্চাত্য-অনুসারী বিশ্লিষ্ট রূপও ব্যবহার করেননি।  তিনি সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব এক রেখারূপ।  তীক্ষ্ণ ও তীব্র গতিময় সেই রেখায় মানুষের সংগ্রাম ও জীবনস্পৃহাকে নন্দিত করে গেছেন তাঁর ছবিতে।  ১৯৮৭-র আগস্টে কলকাতায় তাঁর ছবির একটি প্রদর্শনী দেখার সুযোগ হয়েছিল।  সেই প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল গ্রাফিক্স টেল দ্য ইন্ডিয়ান পেট্রিয়টিক টেল ।  তাঁর ছবিতে দেশাত্মবোধের সেই আখ্যানে বিশেষ জোর পড়েছিল ১৯৯৮-৯৯-এর চুয়াড় বিদ্রোহ, ১৮১৯-এর সন্দ্বীপের বিদ্রোহ, ১৮২৫-২৭-এর ময়মনসিংহের প্রথম পাগলপন্থী বিদ্রোহ, ১৮২৭-এর পালকি-বেহারাদের ধর্মঘট ইত্যাদি গণজাগরণগুলি।  স্বাধীনতা প্রাপ্তির থেকেও প্রাধান্য পেয়েছে ১৯৪৭-এর ভারতভাগ।  দর্শক নামে তাঁর একটি পত্রিকা ছিল।  সেই পত্রিকার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে শিল্পের ও জীবনবোধের সংযোগস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তিনি।

১৯৭০-এর দশকে এই কফি হাউসেই উজ্জ্বল মধ্যমণির মতো আড্ডামগ্ন থাকতে দেখেছি তাঁকে।  এখানেই তাঁর উপর এই বইটি যে প্রকাশিত হচ্ছে, এই ঘটনাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।  শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রতি আমার বিনত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।  অভিনন্দন জানাচ্ছি আগুন-তুলি বইটির লেখক কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তকেও।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , , , , , , , | ১ টি মন্তব্য

মেদিনীপুরের দিনগুলি

শতবর্ষের প্রাক্কালে গঙ্গাজলেই হোক গঙ্গাপুজো। স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় ছবি আঁকার পাশাপাশি লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি অসামান্য বই। যার প্রায় সবগুলিই বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। সেই বইগুলিরই অন্যতম কিছু বনফুল (প্রকাশক আজকাল) নির্বাচিত অংশ। নির্বাচিত অংশটির শিরোনাম আমাদের হলেও লেখাটির বানান অপরিবর্তিত রাখা হল।

গত ’৮৭ সালে আমার ইস্কুল (নারিকেলডাঙা হাই স্কুল) ১২৫তম বার্ষিকী পালন করল প্রাক্তনীদের মিলনোৎসবে। আমিও একজন আমন্ত্রিত ছিলাম সেখানে। তারপর উপহার বিতরণের দিন এল, সেদিন স্কুলের বর্তমান প্রধানশিক্ষক আমার অনুজপ্রতিম সমরেন্দ্র আমাকে আহ্বান করল মঞ্চে ওঠার জন্য। সে আহ্বানে আমি কিন্তু সত্যিই হকচকিয়ে গেছিলাম। কারণ মঞ্চে তখন স্কুলের ভূতপূর্ব সেরা সেরা ছাত্র, তাঁদের মধ্যে চিরকালের ব্যাক-বেঞ্চার আমি বর্তমানের খোঁড়া পায়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে মঞ্চে গিয়ে বসলাম। তারপর যখন পুরস্কার বিতরণ শুরু হল, সে সময়ে আমাকেও উপহার নিতে আহ্বান করা হল। তখন দেখলাম স্কুলের ১২৫ বছরের জীবনে অন্যতম সেরা ছাত্রের ট্রফিটি আমাকেই দেওয়া হল। বোকার মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আমার সমসাময়িক ছাত্ররা কেউ হাইকোর্টের জজ, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কেউ জ্যোতির্বিজ্ঞানবিদ, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ অধ্যাপক; সবাই কিন্তু আনন্দে-উল্লাসে অভিনন্দন জানাল। আমি কিছুটা অভিভূত অবস্থায়, বোকার মতো ফিরে গেলাম আমার চিরদিনের জন্য নির্দিষ্ট পেছনের চেয়ারটিতে।
মনে পড়ছিল, আমায় এই সম্মানের অধিকারী যাঁরা করলেন তাঁরা আজ কেউই জীবিত নেই। কিন্তু তাঁরা যদি প্রতিদিন আমাকে কথার চাবুক মেরে উত্তেজিত না করতেন তবে আমার জীবনের এই ভালবাসা দুষ্প্রাপ্যই হয়ে থাকত। তাঁদের নেপথ্য আশীর্বাদেই আমি অকর্মণ্য বা অযোগ্য হইনি।
তিরিশের দশক এল। দেশের রাজনীতিতে জোয়ার লাগল। বাংলার যুবশক্তি রক্তস্নাত হল বারে বারে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া আমার বিপ্লবী চেতনাও জাগ্রত হয়ে উঠল। বিদেশি শোষকের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে। তখন আমরা আমার জন্মস্থান বাদুড়বাগান ছেড়ে বেলেঘাটার বাসিন্দা হয়ে গেছি। যেহেতু বেলেঘাটায় সতীশ দাশগুপ্ত মহাশয়ের খাদি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তার ফলে গান্ধীবাদী অহিংসবাদের সঙ্গে সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ছড়ানো ক্লাবগুলি নবসঙ্ঘ, নবমিলন, ভ্রাতৃ সম্মিলনী এরা সবাই ছিল সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী। আমার জীবনের অ্যাকশনের প্রথম ভূমিকা নবসঙ্ঘের দৌলতেই ঘটেছিল। বেলেঘাটার চুনোপটির গলিতে। পোস্টম্যান ডাকাতি। তখন আমার বয়স তেরো-চোদ্দো বছর। সেই পোস্টম্যানের কাছ থেকে (ইনসিওরড খামে) পাঁচ হাজার টাকার মতো পেয়েছিলাম। এবং সেই টাকা আমরা সুরেনদার হাতে এনে তুলে দিয়েছিলাম।
দীর্ঘ অসুস্থতার কাল কাটিয়ে আমি এলাম আমার পৈতৃক দেশ মেদিনীপুরে। সেখানে পৌঁছে দেখি মেদিনীপুর টগবগ করে ফুটছে। সদ্য তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিপ্লবীদের হাতে খুন হয়েছে। পেডি, ডগলাস ও বার্জ।
মেদিনীপুরের প্রথম বাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট বিনয়রঞ্জন সেন, যিনি এসেই কাজ শুরু করলেন বৈপ্লবিক চেতনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে সাংস্কৃতিক চেতনার দিকে। শুরু করলেন মেদিনীপুর শহরে বিদ্যাসাগর স্মৃতিসদন। তার বিরাট সভাগৃহ, সামনের অংশে লাইব্রেরি ও ছোট সভাকক্ষ। সংগঠিত হল সর্বভারতীয় চিত্রপ্রদর্শনী। এ প্রদর্শনীতে চিত্রের গুণাগুণ বিচার করলেন বিখ্যাত শিল্পী অতুল বসু মহাশয়। এবং সেখানে সাদা-কালোয় আমার একটি ছবি His Eterrnal Ledger ছিল। জীবনে ওইটিই আমার প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ ছবি। বাবার মৃত্যুর পর ছবিটি বিক্রি করে দিয়েছিলাম। আজও তার জন্য আমার হা-হুতাশের অন্ত নেই। এই সা়ফল্যের ফলে আমি আমন্ত্রিত হই মেদিনীপুরে নির্মীয়মাণ বিদ্যাসাগর হলের দেওয়ালচিত্র আঁকার জন্য। বিশাল কাজ হলের। এই কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন সেদিনের তাবড় তাবড় শিল্পী। যেমন, শিল্পী গোপাল ঘোষ, বাসুদেব রায়, কালীকিঙ্কর ঘোষদস্তিদার, গৌর দাশগুপ্ত প্রমুখ কয়েকজন। তার মধ্যে একমাত্র নাবালক এবং অনামী ছিলাম আমিই।
ওই বিদ্যাসাগর হল উদ্বোধন করতে আসেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এবং তিনি অতিথি হয়েছিলেন বিনয়বাবুর বাড়িতেই। কারণ বিনয়বাবুর স্ত্রী ছিলেন তাঁর ছাত্রীদের মধ্যে অন্যতমা। রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্য তখন ভীষণভাবে ভঙ্গুর। তাই তাঁকে কয়েকদিন আগেই মেদিনীপুরে আনা হয়েছিল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ছায়াঘেরা বিরাট প্রাঙ্গণে প্রতিদিন সকালে হুইল চেয়ার ঠেলে বেড়াবার সুযোগ তখন আমিই পেয়েছিলাম।
সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কেননা, রবীন্দ্রনাথ আমার ছবির মাধ্যমে আমাকে চিনতেন, তাই মাঝে মাঝে ছোট ছোট টুকরো কথায় ছবির মর্মস্থলের খবর দিয়ে দিতেন। যাই হোক আমি যে কথা বলে এখানে থামব সেটা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া বিদ্যাসাগর হলে উদ্বোধনী ভাষণ। তার কথাগুলি ভুলে গেছি তবে তার মর্মবাণী সেদিনের শ্রোতাদের মনে অনুরণন করে আজও এবং আমারও। সেদিন তিনি বাংলার মানুষদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। এই কথা মানেন বলেই আমায় ডেকেছেন। যে ভাষাকে নির্ভর করে আমি বিশ্বকবি হয়েছি, সেই ভাষা আমার মুখে জুগিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। তাই জরাজীর্ণ শরীরে এ আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারলাম না।’ এটাই রবীন্দ্রনাথের শেষ জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ। মেদিনীপুরে আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বিদেশী সরকারের অত্যাচারে বিধ্বস্ত বিপ্লবী দলকে পুনঃসংগঠিত করা। বিশেষ করে ছাত্র ফেডারেশন। স্বভাবতই মেদিনীপুরে তখন বিদেশি একটি যুবকের চলাফেরা খুবই দুষ্কর ছিল। তাই ওখানে পৌঁছনোর কয়েক দিনের মধ্যেই আমিও হলুদ কার্ডের বন্দী হই। হলুদ বা রেড কার্ড কিন্তু ফুটবল খেলার মাঠের মতো নয়। এই রেড কার্ড হোল্ডার হওয়া মানেই স্বাভাবিক জীবন থেকে বাইরে চলে যাওয়া। হলুদ কার্ড প্রাপকদের জীবনের একাকীত্ব পরিপূর্ণভাবে ত্যাজ্য ছিল। কারণ সর্বদাই একজন বা দু’জন সঙ্গী জানিত বা অজানিতভাবে সর্বদাই সঙ্গী হত। একমাত্র বাড়ির ভেতর ছাড়া। তবে আমার একটা সুবিধা বা অসুবিধা ছিল, সেই সময় আমার বাবার এক ভূতপূর্ব চেলা এক সময় যিনি স্বদেশি করতেন, পরবর্তীকালে তিনিই পুলিসের গুপ্তচর বিভাগের অফিসার হয়ে মেদিনীপুরে ছিলেন। প্রায় প্রত্যহই তিনি বাবার কাছে আসতেন। এবং বাবাকে সাবধান করার জন্য। আমার সম্বন্ধে সেদিনের গুপ্তচর রিপোর্টটি বাবাকে শোনানোর জন্য। আমি প্রদ্যুৎদার (ডগলাস হত্যার নায়ক) বাড়িতে তার মা-দাদাদের সঙ্গে দেখা করতে বা কথা বলতে গেলেও অথবা আমাদের বার্জ-হত্যার অন্যতম নায়ক নন্দদুলাল সিংহ, নরেন দাস ও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের অরুণ দাশগুপ্ত (পরবর্তীকালে যিনি আমার ভগ্নিপতি হয়েছিলেন) এদের কারও সঙ্গে কোনও গোপন স্থানে দেখাশুনো বা গোপন মিটিং থাকলে তার প্রতিটি নিখুঁত বিবরণ বাবার কাছে পৌঁছে যেত। যাঁকে আমরা পারিবারিক সূত্রে জবাকাকা বলতাম তাঁর মাধ্যমে। এবং এই সব তথ্য বিতরণের পর জবাকাকা বাবাকে শেষ উপদেশ দিয়ে যেতেন যে দেবুকে ফলো করে আমরা অনেক গোপন তথ্য পেয়ে যাচ্ছি। কারণ দেবু বিদেশি। অতএব তুমি দেবুকে সরিয়ে দাও। ফলে রোজই রাতে বাবার কাছে আমার প্রাপ্য ছিল তীব্র তিরস্কার।
বাবা দুঃখ করে বলতেন, আমি এক নির্বোধ গাধার পিতা হয়ে দাঁড়ালাম। অবশ্য আমি বাবার নির্দেশেই পথ পরিবর্তন করে জবাকাকা ও তাঁর দলবলকেই বিপথে চালিত করতে পেরেছিলাম। বাবা বললেন, আগামী এক মাস শুধু ছবি এঁকে যা, যা শুধুই একমাত্র নিসর্গ। প্রতিদিন প্রত্যুষে বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে। যা গোপ দুর্গে। নীলকুঠিতে। যা বিলেতি চক্রে। রেলব্রিজের ধারে। সেখানে তেলরঙে নিসর্গ আঁক। যতরকমভাবে পারিস। ফলোয়ারদের পরিশ্রান্ত করে তোল। যাতে তারা বিভ্রান্ত হয়। ক্রমেই কাজে অবহেলা করে। তোকে অনুসরণ না করে মাঝপথেই থেমে যায়। যাতে তারা বোঝে তুই শুধু ছবি এঁকেই চলেছিস। এই রাস্তায় পুলিসকে বিভ্রান্ত করা মেদিনীপুরে খুবই দুষ্কর ছিল। কারণ মেদিনীপুরের কেরানিটোলায় অরবিন্দ-শিষ্য বিখ্যাত বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো (দাস) তখন পুরোপুরি সংসারী জীবনযাপন করছেন। ছেলে মানববাবুকে দিয়ে ফটোগ্রাফির স্টুডিও করে জাঁকিয়ে বসেছেন। তাই আর্টিস্টের ভাঁওতায় সেদিনের মেদিনীপুরের পুলিসের কাছে লুকোনো খুবই শক্ত ব্যাপার। বিপ্লব লুকোনো খুবই দুষ্কর ছিল, কারণ মুরারিপুকুর বোমা ট্রায়ালের মামলায় রাজসাক্ষী বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাই-এর স্বীকৃতিতে সারা দেশই জানতে পেরেছিল, হেম কানুনগোর ফ্রান্স যাওয়ার উদ্দেশ্য কলা-শিক্ষা নয়, বোমা-শিক্ষা।
তারপরে দেওঘরের দিঘিরিয়া পাহাড়ের যশিডির দিকে পরীক্ষকের হাতেই বোমাটি ফেটে একটি সফল প্রয়াস অপপ্রয়াসে পরিণত হয়। তাই মেদিনীপুরের পুলিস খুবই সজাগ ছিল এ-সব চিত্রকর, নট ইত্যাদি শিল্পীদের বিষয়ে। তবু আমাকে এই পথই বেছে নিতে হল। তাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য। অবশ্যই এ সময় যে ক’টি ছবি এঁকেছিলাম তার মধ্যে অনেকগুলিই ছবি হয়ে উঠেছিল, এবং যে ছবি আঁকতে পারিনি, সেগুলি আঁকতে পারলে আমার শিল্প-সাম্রাজ্য আরও সমৃদ্ধ হত।

চিত্র পরিচিতি : ১। শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়; ২। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের স্কেচে রবীন্দ্রনাথ; ৩। গোপ নীলকুঠি, মেদিনীপুর।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

রথীন্দ্রনাথ : বহুবর্ণিল শিল্পীসত্ত্বা

রথীন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ির এই কৃতীসন্তান হারিয়ে গেছেন তাঁর পিতার ছায়ায়। এই মানুষটিকে খোঁজার চেষ্টায় শুভজিৎ সরকার

বর্তমান কালের ফেসবুকের মতো জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কৃতীরা ‘পারিবারিক খাতা’তে লিখে রাখতেন নিজ নিজ চিন্তাভাবনা, মন্তব্য। রাম জন্মের আগে যেমন রামায়ণ রচনা, রথীন্দ্রনাথের জন্মের আগে থেকেই তাঁকে নিয়ে তেমনি জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছিল, যা দেখে বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেছিলেন — ‘আজকালকার ছেলেদের মান কত। আমাদের কালের ছেলেদের Biography মরবার পর লেখা (হ’ত এখন হয়) জন্মাবার আগে।’ রথীন্দ্রনাথের জ্যাঠতুতো দাদা হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক খাতায় রথীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন — ‘রবিকাকার একটী মাণ্যবান ও সৌভাগ্যবান পুত্র হইবে, কন্যা হইবে না। সে রবিকাকার মত তেমন হাস্যরসপ্রিয় হইবে না, রবিকাকার অপেক্ষা গম্ভীর হইবে। যে সমাজের কার্য্যে ঘুরিবার অপেক্ষা দূরে দূরে একাকী অবস্থান করিয়া ঈশ্বরের ধ্যাণে নিযুক্ত থাকিবে।’

হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবিষ্যৎবাণীর প্রথম দুটো বাক্য সত্য প্রমাণিত হলেও আমাদের সৌভাগ্য শেষের বাক্যটি মেলেনি। রথীন্দ্রনাথ সামাজিক জীব না হয়ে আরণ্যক ঋষি হলে আমরা স্থপতি, চিত্রশিল্পী, চারুশিল্পী, উদ্যানবিদ, সাহিত্যিক, সর্বোপরি ‘রবি রথের সারথি’কে পেতাম না। কৃষি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অবদানের সমন্বয় রথীন্দ্রনাথের মত খুবই কম ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায়। রথীন্দ্রনাথের শিল্পীমন গঠনের পিছনে তাঁর বাল্য ও কৈশোরের জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, নাটক ও কাব্যচর্চার জমজমাট পরিবেশের অবদান তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় স্বীকার করেছেন — ‘এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই ভারতের শিল্প ও সাহিত্য তখন নূতন জন্ম পরিগ্রহ করেছে।’ বিশ্বভারতীর কর্মীমণ্ডলীর এক সভায় নিজের কথা বলতে গিয়ে রথীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন — ‘জন্মেছি শিল্পীর বংশে, শিক্ষা পেয়েছি বিজ্ঞানের, কাজ করেছি মুচির আর ছুতোরের।’ নিজেকে আজীবন তিনি অকিঞ্চনরূপে বর্ণনা করে গেলেও আমরা জানি তাঁর ‘মুচি’ আর ‘ছুতোরের’ কাজের কি বিপুল মাহাত্ম্য।

হয়ে ওঠার সকাল

ইংরেজিতে একটা কথা আছে — Morning shows the dayএক বর্ষণমুখর দিনে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ রথীন্দ্রনাথের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন ভাবী শিল্পীর জীবনের morningরথীন্দ্রনাথ তখন নিতান্তই চার বছরের শিশু। এক প্রবল বর্ষণদিনে কবির নবাবিষ্কার : ‘… এই ঘোরতর বিপ্লবের সময়ে আমার পুত্রটি উত্তরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রেলিঙের মধ্যে তাঁর ক্ষুদ্র অপরিণত নাসিকাটি প্রবেশ করিয়ে দিয়ে নিস্তব্ধভাবে এই ঝড়ের আঘ্রাণ এবং আস্বাদ গ্রহণে নিযুক্ত আছেন। শেষে বৃষ্টি পড়তে লাগল আমি খোকাকে বললুম, ‘খোকা তোর গায়ে জলের ছাট লাগবে। এইখানে এসে চৌকিতে বোস’ — খোকা তার মাকে ডেকে বললেন, ‘মা তুমি চৌকিতে বোসো, আমি তোমার কোলে বসি’, বলে মায়ের কোল অধিকার করে নীরবে বর্ষাদৃশ্য সম্ভোগ করতে লাগল। খোকা যে চুপচাপ ঘরে বসে কী ভাবে এবং আপনমনে হাসে এবং মুখভঙ্গি করে এক এক সময়ে তার আভাস পাওয়া যায়।’ খোকা ওরফে রথীন্দ্রনাথের প্রকৃতিতে পরিতোষ প্রাপ্তির মধ্যে যে শৈল্পিক বীজ নিহিত ছিল তা যে শিল্পী রবীন্দ্রনাথের চোখ এড়ায়নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আছে আমার ছবি

আর্টের একটা দিক প্রবন্ধে ‘ফুল আঁকা’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রথীন্দ্রনাথ এক গূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছেন — ‘ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে আর্টিস্ট যতক্ষণ না অভেদাত্মা হন, ততক্ষণ তাঁর সত্যিকার দেবার মতো কিছু থাকে না, তাঁর আঁকা ছবিতে সত্য ফুটে ওঠে না। কেবল তাই নয়। যিনি আর্টিস্ট, তাঁকে বাস্তব ছাড়িয়ে অধ্যাত্মজগতে দর্শকদের পৌঁছে দিতে হয়। সেই অধ্যাত্মবোধকেই আমরা শিল্পীর দৃষ্টি বলি।’ রথীন্দ্রনাথের আঁকা ফুলের ছবির মধ্যে ‘শিল্পীর দৃষ্টি’র ছাপ অনুভব করা যায়। ছবি আঁকিয়ে হিসেবে রথীন্দ্রনাথের প্রথম ও প্রধান কৃতিত্ব ফুলের ছবি। সুশোভন অধিকারী সংকলিত রথীন্দ্রনাথের চিত্রপঞ্জির তালিকায় দেখা যায় তিনি ৫২টি ছবি এঁকেছেন। টেম্পেরা, জলরং, মোমরং, ক্রেয়ণ, পেনসিল, প্যাস্টেল, ওয়াশ ও টেম্পেরা, ভার্নিশের প্রলেপযুক্ত টেম্পেরা, অস্বচ্ছ জলরং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের মাধ্যমের আশ্রয়ে আঁকা হয়েছে এই ছবিগুলো। তাঁর আঁকা ফুলের ছবি দেখলে তা ছবি বলে মনে হয় না, মনে হয় জীবন্ত সত্ত্বা। ফুলকে তিনি দেখেছেন যত কাছ থেকে ও যত সুন্দরভাবে, তেমনি করে তিনি তাঁর তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেখে মনে হয় এমন রিয়ালিস্টিক ছবি আদৌ সম্ভব! শিল্পী পিতা রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন তাই তাঁর প্রশংসাসূচক উক্তি — ‘ওর (রথীন্দ্রনাথের) ফুলের ছবিগুলো সত্যি ভাল, এত delicate করে আঁকে। ফুলের ছবিতেই ওর বিশেষত্ব।’ রথীন্দ্রনাথ যে ফুলের অন্তরে প্রবেশ করে তার সত্যিকার রূপ ফুটিয়ে তুলতে পারে তা রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীর মংপুর বাড়িতে থাকাকালীন তাঁর আঁকা ‘জেরবেরা’ ফুলের ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন। উচ্ছ্বসিত কবি স্বীকার করে নিয়েছিলেন ‘রথীর মত এত নিপুণ করে আমি ফুলের ছবি আঁকতে পারি না।’ জীবনের প্রান্তলগ্নে দেরাদুনে ফুলের প্রতি তাঁর এই আদিঅকৃত্রিম ভালোবাসাই বুঝি উঠে এসেছিল শিল্পীমনের তুলিতে। ফুলের ছবির পাশাপাশি বিভিন্ন গাছ, ল্যাণ্ডস্কেপ, ফুলের টব, পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য, বাগান, মাঝি, তিব্বতি মেয়ের মুখোশ রথীন্দ্রনাথের অঙ্কণশিল্পকে বিচিত্রতায় ভারিয়ে তুলেছিল। ভাবতে অবাক লাগে যাঁর রেখার গুণে ছবি এতই জীবন্ত হয়ে উঠেছে তিনি শিল্পী হিসেবে কোনো বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীতে সামিল হতে চাননি, কোনো গুরুর কাছে তালিমও নেননি। তিনি শিল্পের প্রাথমিক রীতিনীতি সহজসরলভাবে অনুসরণ করেছেন।

কারুশিল্প

মেনকা ঠাকুর তাঁর স্মৃতিচারণায় শিল্পী রথীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে একটি বাক্য ব্যবহার করেছেন — ‘রথীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন চারুশিল্পীর মন নিয়ে, কিন্তু হয়ে উঠেছিলেন কারুশিল্পী।’ রথীন্দ্রনাথ নিজে একে বলেছেন ‘ছুতোরের কাজ’। তাঁর কারু দুনিয়াটা যখের ধনের গুহাভ্যন্তরের মত। ওখানে প্রবেশ না করলে গোটা রথীন্দ্র ব্যক্তিত্বকে আমরা আবিষ্কার করতে পারব না।’ বিশ শতকের প্রারম্ভে শহরের কলকারখানার বাড়বাড়ন্তে গ্রামের শিল্পী সমাজ ভেঙে পড়েছিল সেদিন রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন শিল্পীকে মজুরে পরিণত করা হচ্ছে। গ্রামকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন রবীন্দ্রনাথ দেখতেন তা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে হাতে কলমে কারুশিল্পের কাজ বিশ্বভারতীতে প্রথম শুরু হয় প্রতিমাদেবীর উদ্যোগে ১৯২২ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবন চত্ত্বরে। পরে সুনির্দিষ্ট কারণে রবীন্দ্রনাথ ১৯২৮ সালে এই চর্চাকে সরিয়ে শ্রীনিকেতন রেল কোম্পানীর এক পরিত্যক্ত বড়ো চালাঘরকে সারাই করে হল অফ ইন্ডাস্ট্রি নাম দিয়ে স্থানান্তরিত করেন এবং রথীন্দ্রনাথের উপর বিশ্বভারতীর গ্রামীণ শিল্পবিভাগটির গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। বস্তুত তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে গড়ে ওঠে শিল্পভবনের মজবুত ভিত এবং মূলত তাঁরই উদ্যোগে এদেশে সর্বপ্রথম জাতিধর্ম ভেদাভেদ উপেক্ষা করে গ্রামে গ্রামে প্রশিক্ষিত কারুশিল্পী নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন শিল্পে হাতেকলমে কাজ শেখানোর চেষ্টা শুরু হয়। রথীন্দ্রনাথ কারুশিল্পের দীক্ষা পেয়েছিলেন জাপানের কাছ থেকে। ১৯২৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি এই বিভাগটির কর্ণধার ছিলেন। মূলত রথীন্দ্রনাথের অক্লান্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমে ‘শিল্পভবন’ একটি সার্থক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং ভারতবর্ষের কারুশিল্পের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। ধীরে ধীরে শ্রীনিকেতনের পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষদের নিকট শিল্পভবন রুজিরোজগারের এক আকাঙ্খিত কর্মস্থল হয়ে ওঠে। আজকে যখন দেখি বাটিক শিল্প, সৌন্দর্যমন্ডিত চর্মশিল্প, স্থানীয় মৃত্তিকা নির্মিত গ্লেজপটারি ইত্যাদি নতুন নতুন ডিজাইনের হ্যান্ডলুম শাড়ি, বেডকভার, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, দরজাজানালার পর্দা, মোড়া, বাঁশ, বেত, গালার কাজ, সৌখিন চামড়ার ব্যাগ, বাটিকের চাদর, পোড়ামাটির কাজ তখন মানসপটে ভেসে ওঠে রথীন্দ্রনাথ। এই সমস্ত জিনিসে যেন রথীন্দ্রনাথের হাতের স্পর্শ লেগে আছে। ভারতীয় কারুশিল্পে দেশ বিদেশে খ্যাত ও চাহিদাযুক্ত ‘শান্তিনিকেতনী রীতি’ প্রবর্তন করার মূলে ছিলেন শিল্পী ডিজাইনার রথীন্দ্রনাথ।

চামড়ার কাজ

মুচিশিল্প’কে কেউ যদি ভারতবর্ষে আমদানি করার দাবি করে থাকেন তবে তিনি রথীন্দ্রনাথ। ‘আজকে চামড়ার কাজ ভারতবর্ষ জুড়ে চলেছে, কিন্তু অনেকেই জানেন না যে এই শিল্প রথীদাই প্রথম বিদেশ থেকে শিখে এসে প্রচলন করেছিলেন’ — মৈত্রেয়ী দেবীর এই বক্তব্যের সাথে সহমত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাণী চন্দ, বীরভদ্র রাওচিত্র। ১৯২৪ সালে ইউরোপ ভ্রমনই এর অনুপ্রেরণা। রাণী চন্দ তাঁর সব হতে আপন বইতে জানাচ্ছেন — ‘স্বামীস্ত্রী বিদেশে কিছুদিন থেকে এই ক্রাফট অতি যত্নের সঙ্গে শিখে এসেছিলেন। উত্তরায়ণের জাপানি ঘরের লাগা দক্ষিণের বারান্দায় বৌঠানরথীদা আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে চালু করলেন এই কাজ।’ চর্মশিল্প কাজে রথীন্দ্রনাথের অসাধারণ দক্ষতা ছিল। এই কাজে বহু পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভারতীয় শিল্পকাজের ছাপ আনতে সক্ষম হন। চামড়াকে ট্যানিং করে তার ওপর ছবি ও নকশা মিলিয়ে কত না রঙে সাজিয়ে দৈনন্দিন শিল্প গড়ে তুললেন। হাতব্যাগ, ফাইল, ফোলিয়ো ব্যাগ, লেদার কেস, বাক্স — কত রকমের জিনিস গড়ে তুললেন। চামড়া শিল্পকে ডিজাইন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করে ব্যাপকভাবে বিপনন ব্যবস্থা গড়ে উঠল। এই কাজে স্থানীয় কারুশিল্পীরা উপকৃত হল। বিক্রি থেকে ভালো রোজগার এল। স্বনির্ভরতার আশা জেগে উঠতে লাগল। শান্তিনিকেতন ডিজাইন দেশে বিদেশের বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। স্থানীয় চর্মশিল্পীদের সুবিধার্থে শিল্পসদন ও স্থানীয় চর্মশিল্পী গোষ্ঠীবৃন্দের যৌথ উদ্যোগে রথীন্দ্রনাথ উদ্ভাবিত ‘শান্তিনিকেতনী চর্মশিল্প’ গত ২০০৭২০০৮ সালে ভারত সরকারের বিশেষ স্থানাঙ্কিত সম্পদ স্বরূপ ভৌগোলিক চিত্র (Geographical Identification) ব্যবহারের স্বীকৃতি আনানো একটি যুগান্তকারী ঘটনা। চর্মশিল্প আর বাটিক শিল্পের প্রবর্তক হিসাবে তাঁর কাছে এদেশ ঋণী রইবে চিরকাল।

আসবাবপত্র ও কাঠের কাজ

রবীন্দ্রনাথ দেশীয় রাজ্যতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ‘বিলাতি আসবাবখানার নিতান্ত ইতরশ্রেণীর সামগ্রীগুলি ঘরে সাজাইয়া আমাদের দেশের বড়ো বড়ো রাজারা নিতান্তই অশিক্ষা ও অজ্ঞতাবশতই গৌরব করিয়া থাকেন।’ উপযোগিতা ও সৌন্দর্য সাধনার ফসল সুলভে মানুষের নাগালের মধ্যে এনে দিয়ে একজন সার্থক ডিজাইনারের কাজ করে রথীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রক্ষোভ প্রশমিত করলেন। রথীন্দ্রনাথই প্রথম শিল্পসম্মত, সহজসরল অন্দরসজ্জা ও আসবাবপত্রের উৎপাদন ও বিস্তৃত প্রসারণের মাধ্যমে বিশ শতকে দেশের ধনী ও উচ্চমধ্যবিত্ত থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে আসবাবপত্রের সৌন্দর্য এনে হাজির করলেন। শুধু তাই নয়, আজকে যে স্থানসংকোচনশীল আসবাবপত্র লভ্য, তা এদেশে প্রথম চালু করেন রথীন্দ্রনাথই। ১৯২৫ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যকালীন সময়ে শান্তিনিকেতনে উত্তরায়ণ চত্ত্বরে নির্মিত গৃহগুলি এবং ঐ গৃহগুলির প্রয়োজনে নির্মিত আসবাব ও অন্দরসজ্জাগুলি মূলত রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর দক্ষিণহস্ত সুরেন কর মহাশয়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। চিত্রভানুতে, কোণার্কে, উদয়নে স্নানঘর ও স্নানঘর সংলগ্ন আসবাবস্থাপত্য যখন নির্মাণ করলেন তখন ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর ফুল ও প্রকৃতিমুখী জ্যামিতিক ডিজাইন নতুন আস্বাদে ফিরে এল। আসবাবপত্রে জ্যামিতিক ছন্দের সঙ্গে ভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর মিশেলের প্রমাণ উদয়নের বসবার ঘর, খাওয়ার, শোওয়ার ঘর, পাশে বিশ্রামের জায়গা। বুদ্ধদেব বসু উদয়ন দেখে মুগ্ধ হয়ে সবপেয়েছির দেশেতে লিখেছেন ‘এই আসবাবপত্রগুলির বিশেষত্ব প্রথম দর্শনেই চোখে ঠেকে এবং এখানে তুচ্ছজ্ঞান কোনো প্রয়োজনের জিনিস দেখলাম না যা সুন্দর নয় …’

কাঠের কাজ রথীন্দ্রনাথের প্রাণের সম্পদ। আজীবনই নিজের হাতে কাঠের কাজ করে গেছেন তিনি। কাঠের জাত, কাঠের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁর খুব ভাল ধারণা ছিল। যেমন কোন কাঠে কোন জিনিস ভাল দেখাবে, কোন কাঠে কোন ডিজাইন ভাল খুলবে সে সম্বন্ধে তিনি বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন। কাঠের inlay ও কাঠের আসবাবপত্র যেমন চেয়ার, টেবিল, আলমারি ইত্যাদি তিনি খুব ভাল তৈরী করতে পারতেন।

বাড়ি নির্মাণ

রথীন্দ্রনাথ প্রথম শ্রেণীর একজন আর্কিটেক্ট ছিলেন অথচ ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা নিয়ে তিনি কখনও পড়েননি। এটা তাঁর সহজাত গুন। নানারকম বাড়ির ডিজাইন করা তাঁর অন্যতম হবি ছিল। আর্কিটেক্ট রথীন্দ্রনাথের শিল্পীমনের পরিচয় বহন করে শান্তিনিকেতনের বাড়িগুলো। রথীন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধু সুরেন্দ্রনাথ করের সাথে শান্তিনিকেতনে যে ছোটো ছোটো হস্টেল এবং বাসগৃহের পরিকল্পনা করেছিলেন তার বিশেষ একটা চরিত্র ছিল। স্থপতি রথীন্দ্রনাথের এই দিকটি সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছে এ্যান্ডুশ সাহেবের কলমে — ‘Rathi is writing poetry in bricks and mortar.’। স্থাপত্যকাজে এদেশে সর্বপ্রথম রথীন্দ্রনাথই আধুনিক ভারতীয় রীতি উদ্ভাবন করার উদোগ নেন। তাঁর ‘উদয়ন’ বাড়িটির তুলনা বোধহয় কোথাও নেই। উদয়নকে আশ্রমবাসীরা অনেকেই সুনজরে দেখেননি। ব্যঙ্গ করে তারা বলতেন রাজবাড়ি। কিন্তু তিনি ছিলেন সৌখিন স্বভাবের। তিনি গৃহ নির্মাণ শিল্পের একটি সুরম্য নিদর্শন হিসাবেই গৃহটি নির্মাণ করেছিলেন। উদয়ন গৃহ যে রথীন্দ্রনাথের ভোগলিপ্সার চেয়ে সৌন্দর্য লিপ্সার প্রকাশ তা স্যার মরিস গয়ারের চোখ এড়ায়নি। মরিস গয়ার উদয়নে খুঁজে পেয়েছেন ‘There is thought in every corner’। নন্দিনী দেবীর স্মৃতিকথায় দেখতে পাওয়া যায় রতনপল্লীতে ‘ছায়ানীড়’ বাড়িটির সমস্তকিছু পরিকল্পনা রথীন্দ্রনাথের। জাপানী কায়দায় নির্মিত উদয়নের বাগানে প্রতিমাদেবীর জন্য নির্মিত স্টুডিও চিত্রভানুর একতলায় রথীন্দ্রনাথের নিজের ওয়ার্কশপ গুহাঘরও তাঁর স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন।

১৯৫৩ সালে বিশ্বভারতীর উপাচার্যপদ ত্যাগ করে রথীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছানির্বাসন নিলেন দেরাদুনে। রাজপুরে ‘মিতালি’ গড়ে তুললেন। এই মিতালিকে দেখলেই সহজে বোঝা যায় মিতালি হল উদয়নের পুনশ্চ বা postscript। মিতালির বসার ঘরে সবখানেই উদয়নের ছোঁয়া।

উদ্যানচর্চা

বাগান করা অভিজাতদের অন্যতম শখ। কিন্তু এক্ষেত্রে রথীন্দ্রনাথের শখ ও নেশা অভিজাত বন্ধুদের থেকে ভিন্ন ছিল। রসিক ও বিজ্ঞানীর এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সঠিক মূল্যায়ণ করেছেন — ‘রথীন্দ্রনাথের মেজাজটা ছিল বিজ্ঞানীর, মনটা ছিল আর্টিস্ট বা ভাবুকের’। শিল্পী রথীন্দ্রনাথকে যেমন পাওয়া যায় উত্তরায়ণের অট্টালিকায়, তেমনি তাঁর শৈল্পিক স্পর্শ লেগে আছে তাঁর নির্মিত উদ্যানে। সৌমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ‘কোলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনএর পরে সংগ্রহ বৈচিত্র্যে দেশের যে কটি ছোটখাটো উল্লেখযোগ্য উদ্যান আছে শান্তিনিকেতন সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।’ স্বদেশবিদেশ, জংলিপাহাড়ি শৌখিন, বুনো এবং পোশাকি নিত্যনতুন ফুলগাছের পারস্পরিক সম্মিলন (hybrid) নিয়ে সারাজীবন ধরেই তিনি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন এবং সন্তানস্নেহে তাঁদের লালনপালন করেছেন। তাদের নিত্যনতুন অভিব্যক্তি তাঁকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, মাতিয়েছে। এরা তাঁর হৃদয় জুড়ে বসেছিল। এদের সাথে নিত্য চলত তাঁর ভাববিনিময়, অব্যক্ত কথার মাধ্যমে হৃদয়ের আদানপ্রদান। গাছেদের সাথে আজন্ম একটা সংবেদনশীল বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন তিনি, সেই বক্তব্য কবিকন্যা মাধুরীলতার শিলাইদহে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট — ‘রথী কি সেখানে গিয়ে কোনো Fern কী অন্য গাছপালা দিয়ে বাগান করেছে? এখন ওর দু’একটা গাছ ছাড়া সব মরে গেছে, ওকে বলো না ওর ভয়ানক কষ্ট হবে।’

শান্তিনিকেতনের কঙ্করময় জমিতে গোলাপ গাছ হতনা বললেই চলে। সেই জমিতে গোলাপবাগান করেছিলেন রথীন্দ্রনাথ। রথীন্দ্রনাথের সেই দুঃসাধ্যসাধন দেখে প্রত্যক্ষদর্শী গোলাপপ্রেমী কবির সন্তুষ্ট উচ্চারণ — ‘রথী, আমি জীবনে কখনই ভাবতে পারিনি এখানে গোলাপ ফুল দেখব। তুমি অসম্ভবকে সম্ভব করেছ।’

জীবনের উপান্তে দেরাদুনে উত্তরায়ণেরই মতো আশ্চর্যরকমের এক বাগান করেছিলেন তিনি। নানারকম ফুল ও ফলের গাছ ছিল। জুঁই, চামেলী, বেলি গন্ধরাজ ইত্যাদির সাথে সাথে তাঁর বাগানের শোভাবর্দ্ধন করেছিল বিদেশী ফুল জ্যাকাবান্ডা, বটলব্রাশ, অ্যাজেলিয়া, অ্যাকালিয়া, ম্যাগনোলিয়া। প্রত্যক্ষদর্শী ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা তার সাক্ষ্যবহন করে। ‘তাঁর বাগানে অত্যাশ্চর্য রকমের ফুলফল ধরত। বিদেশী ফুলের ইয়াত্তা নেই। তাঁর সত্যই green hand ছিল।

শুধুমাত্র কারুশিল্প, চিত্রাঙ্কণ, স্থাপত্যবিদ্যা, উদ্যানবিদ্যা, চর্মশিল্পতে রথীন্দ্রনাথ তাঁর শিল্পমনের অনুশীলন ও অভিনিবেশের পরিচয় দিয়েছেন তা নয়, তাঁর উদ্যোগে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের লালবাড়িতে ‘বিচিত্রা’ ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হয় ১২ জুলাই ১৯১৫। চিত্রকলায় বেঙ্গল স্কুলের বিকাশে এই ক্লাব বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। রন্ধনশিল্পে উৎসাহ ছিল, নানারকম আচার প্রস্তুতিতে তাঁর দক্ষতার কথা নানাজনের স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট। প্রসাধনী দ্রব্য ও গন্ধদ্রব্যও বানাতে পারতেন। শেষ দিকে Arty Perfumes বলে কিছু প্রসাধনী দ্রব্য বাজারে ছেড়েছিলেন, ফটোগ্রাফি ছিল তাঁর চর্চা ও আগ্রহের ক্ষেত্র। তাঁর তোলা আলোকচিত্রের একটা বড়ো অংশ architectural photography-র পর্যায়ভুক্ত। Boat-Architecture-কে বিশ্বমানের করে তোলাটা ছিল রথীন্দ্রনাথের কর্মপরিণতি। বাহন এবং বাহকের সম্পর্কের সুতোকে মজবুত করতেই যেন রথীন্দ্রনাথ বিংশ শতকের তিনের দশকে চালু করলেন ইঞ্জিনচালিত বোটস্থাপত্য। শিল্পের নানাদিকে ছিল তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ তবুও তিনি নিজেকে craftsman ভাবতেন, artist নয়। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন ‘নিরহং শিল্পী’। শঙ্খ ঘোষ বলেছেন — ‘শিল্পী শব্দটির তাৎপর্য বহুদুর প্রসারিত হতে পারে। চলচ্চিত্রের, সংগীতের, নাট্যের, চিত্রের, ভাস্কর্যের, সাহিত্যেরই নয়, শিল্পী কেউ হতে পারেন জীবনেরও, যাপনেরও।’ রথীন্দ্রনাথের মতো মানুষের কর্ম যেমন তাঁর শিল্পীসত্ত্বার পরিচয় বহন করে, তেমনি তাঁর জীবনযাপনও শৈল্পিক। শিল্প তাঁর কর্মে এবং মননে।

এল্ মহাস্ট লিখেছেন — ‘অভিজাতসুলভ তাঁর শান্ত মুখশ্রীর অন্তরালে ছিল শিল্পীর হৃদয়, কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করবার সময়সুযোগ তিনি কদাচিৎ পেয়েছেন। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের নানা সমস্যা, বিশ্বভারতীর নানা আর্থিক ও আইনগত প্রশ্নের আলোচনায় তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তাঁর স্টুডিও, তাঁর ছোটো কারখানা ঘর বা তাঁর উদ্যানচর্চার কাজে দেবার সময় তিনি সামান্যই পেয়েছেন।’ আসলে রথীন্দ্রনাথের জীবনে আবেদনের চেয়ে নিবেদন শিল্পই যেন বেশি। নানাসময় নানা কাজে পিতার ইচ্ছার কাছে আত্মবলি দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত বিশ্বভারতীর একজন বড়োমাপের ‘কেয়ারটেকার’ই থেকে যেতে হয় তাঁকে। নীরব কর্মেই ছিল তাঁর আশক্তি ও মাহাত্ম্য। চিরজীবন তিনি উইংসের আড়ালেই রয়ে গেছেন, স্টেজে নামবার আকাঙ্খা প্রকাশ করেননি। তিনি ‘কর্মের উচ্চ দাম’ দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর মতো ‘কর্মীর নাম নেপথ্যেই’ রয়ে গেছে। সত্যজিৎ রায় বলেছেন — ‘শিল্পীরা সবসময় এক পথে চলতে ভালোবাসে না।’ জীবনের উপান্তে রথীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী ত্যাগ করে আকস্মিকভাবে স্বেচ্ছানির্বাসন নেন দেরাদুনে। কেউ বলেছেন ভুল বোঝাবুঝি, কেউ বলেছেন সরকারি নিয়মের বাঁধন ভালো লাগেনি, কেউ বলেছেন অবকাশ যাপনের আকাঙ্খা। কিন্তু কেউ বলেননি পিতার ছায়া থেকে দূরে ‘নিজের জীবন’ কাটাবার সে ছিল প্রয়াস। চিরকাল নেপথ্যচারী মানুষটির মৃত্যুও ঘটেছে জনতার দৃষ্টির আড়ালে। পিতার জন্মশতবর্ষের বিপুল কোলাহলের আড়ালে সহজেই চাপা পড়েছে কবিপুত্রের মৃত্যু সংবাদটি। এমনভাবে নিজেকে নিশ্চিহ্ন করতে পারাও কি আর্ট নয়?

গ্রন্থঋণ স্বীকার : ১। রথীন্দ্ররচনাবলী; ২। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর : জন্মশতবর্ষপূর্তি সংখ্যা; ৩। Rathindranath Tagore : The Unsung Hero, Ed. By Tapati Mukhopadhyay and Amrit Sen; ৪। রবীন্দ্রভারতী সোসাইটি সাহিত্যপত্র : রথীন্দ্র জন্মশতবর্ষপূর্তি সংখ্যা; ৫। অন্য ঠাকুর : মাতৃশক্তি : ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা; ৬। আপনি তুমি রইলে দূরে — নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়; ৭। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর — অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়; ৮। নিরহং শিল্পী — শঙ্খ ঘোষ; ৯। সব হতে আপন — রাণী চন্দ।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | 2 টি মন্তব্য

আগুন-তুলি : এক অনন্য উপস্থাপনা

বিগত কয়েকমাস ধরে একজন আশ্চর্য মানুষের​ কথা বিজ্ঞাপিত হচ্ছিল উদ্ভাসের ওয়েবসাইটে​ ও কিছু বিশেষজনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে। মানুষটি একজন চিত্রশিল্পী। তাঁর নাম দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। যাঁর দুর্ধর্ষ জীবন হার মানাবে উপন্যাস কিংবা চলচ্চিত্রকেও। তিনি বাল‍্যকালেই প্রত‍্যক্ষ করেছিলেন বন্দুক, কৈশোরে করেছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের জন্য ডাকাতি। আর যৌবনে একক উদ‍্যমে রুখে দিয়েছিলেন জাতিদাঙ্গা। এই মানুষই প্রৌঢ়বয়সে বাংলাদেশের​ মুক্তিযুদ্ধ দেখবেন বলে লুকিয়ে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে বসে তিনি স্কেচ করেছেন যুদ্ধের দৃশ‍্য, মুক্তিযোদ্ধাদের শিখিয়েছেন বোমাছোঁড়ার কৌশল। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী যাঁর কাঁধের ব‍্যাগে একই সঙ্গে থাকতো কাগজ, তুলি ও বোমা। মানবিকতায় তিনি ছিলেন অনন‍্য, প্রতিবাদে ছিলেন অগ্নিপুরুষ এবং সংসারে ছিলেন সন্ন‍্যাসী। শিল্পকে জানার জন্য তিনি প্রায় সমগ্র ভারত ঘুরেছেন। ভারতের যেকোনো সংগ্রামের ছবি তিনি এঁকেছেন অনায়াস দৃপ্ততায়। তাঁর তুলির টান ছিল বীর ধনুর্ধরের জ‍্যা-মুক্ত তীরের মতো। তাঁর আঁকা রেখাচিত্রের কাছে হার মেনে যেত ক‍্যামেরার গতি। এত দ্রুত ছবি আঁকতেন তিনি।
আগামীবছর সেই মহান শিল্পীর জন্মশতবর্ষ। তারই প্রাক্কালে তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে আগুন-তুলি নামে একটি গ্রন্থ, যার মধ্যে সংকলিত হয়েছে শতাধিক ছবি। লেখক এযুগেরই আর এক চিত্রশিল্পী কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত। এ বইয়ের প্রকাশনাতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি​। উদ্ভাস প্রকাশিত এই বইটি কোনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে না। সরাসরি যোগাযোগের​ মাধ্যমে আগ্রহী পাঠকেরা এই বই হাতে পাবেন। এরজন্য যোগাযোগ নম্বর: 9332066285, 9732030216

Posted in Cultural journey | Tagged , , , , , , , | ১ টি মন্তব্য