ছবির বইয়ের খবর

সেখ মহম্মদ হাসানুজ্জামান দিচ্ছেন এক আশ্চর্য ছবির বইয়ের খবর।

এমন একটি বই যা দিয়ে অনায়াসে কোনো ডাকাত কে ঘায়েল করা যায়। এমনই বিশালবপু আয়তন সে বইয়ের।
সে তো নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু কি আছে সেই বিপুলায়তন বইয়ের ভেতরে? অঙ্কের বোঝা নাকি ইতিহাসের ঝুলি? হ্যাঁ, ইতিহাসই তো। এক অমলিন ইতিহাস। লেখা আর হাতে আঁকা ছবি দিয়ে তৈরি সোনার-সিন্দুকে মোড়া।
কেমন ছিল উনিশ শতকের ভারতবর্ষ, পাঠ্যবই পড়ে কতখানি জেনেছি আর কতটুকুই বা দেখেছি? ইতিহাস আমরা পড়ি বটে কিন্তু পড়ার সঙ্গে ছবি থাকলে ব্যাপারটা অনেক স্পষ্ট হয়ে যায়, সেইসঙ্গে ভেঙে যায় অনেক ভুল ধারণাও।
এই বইয়ের পাতা উল্টে পুরোনো কলকাতার ছবি দেখতে-দেখতে মনে হয় টাইম মেশিনের মাধ্যমে কোন সুদূর অতীতে চলে গেছি। যেখানে ময়ুরপঙ্খি, পানসি কিম্বা ডিঙ্গায় করে ভেসে বেড়াত মানুষ। বাঙালি সমাজের বিচিত্র আচার ব্যবহার, পুজোআচ্চা, পাল-পার্বণ, কাঁচামিঠে পথঘাট, বাড়িঘর, এককথায় মানব জীবন যাপনের সবকিছুই উপস্থিত সেইসব ছবিতে। আজকের প্রাসাদনগরী কলকাতা তখন আধাগ্রাম- আধাশহর। সেখানে দেখা যায় কেউ ধুতি পাগড়ি পরে জলতরঙ্গ বাজাচ্ছে, তো কেউবা কাঁসি নয়ত রামসিঙ্গা। এমনকি দেখা যায় সতীদাহ প্রথার মতো ভয়াবহ ঘটনার জীবন্ত ছবিও।
সেদিনের গ্রামীণ কলকাতাকে এমনি করেই ভালোবেসেছিলেন একজন সাহেব-শিল্পী। বালথাজার সলভিন্স (1760-1824) তাঁর নাম। তিনি ছিলেন আসলে বেলজিয়ামের মানুষ। মেরিন-পেইন্টার হিসেবে তিনি তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। কলকাতাতে এসেছিলেন 1791 সালে। প্রিন্ট মেকিং-এর অন্যতম পথ প্রদর্শকও ছিলেন তিনি। আমাদের দেশ থেকে ফিরে গিয়ে তিনি থাকতেন প্যারিসে। সেখানে তাঁর সমস্ত ছবির মধ‍্যে থেকে 288টি বেছে নিয়ে চার খণ্ডে একটি বই বের করেন। প্যারিস থেকে প্রকাশিত (1808-1812) সেই বইয়ের নাম ছিল দ‍্য হিন্দুজ। অনেক পরে বইটি পড়ে তার টিকাটিপ্পনী সহ পুনর্মুদ্রণ করেন আর এক সাহেব, রবার্ট এল হার্ডগ্রেভ। তখন সেই বইটির নতুন নাম হয় এ পোর্ট্রেট অফ দ্য হিন্দুজ। যা ছুঁড়ে মারলে নিঃসন্দেহে ঘায়েল হয়ে যাবে দশাসই ডাকাতও।

Advertisements
Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৩ : নদী

নদীমাতৃক এই বাংলাদেশের জলপথে আবহমানকাল ধরে কতরকমের জলযান যে চলেছে তার হিসেব আমরা রাখিনি। কিন্তু আজ থেকে বহুবছর আগে এক ফ্লেমিশ-চিত্রশিল্পী বালথাজার সলভিন্স ভারতে এসে তাঁর সুনিবিড় পর্যবেক্ষণে এদেশের মানুষের জীবনযাপন সহ অসংখ্য জিনিসের চিত্রনথি তৈরি করে গেছেন। তারই মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাংলার বিভিন্নরকমের নৌকোর ছবি ও তাদের বিবরণ। তিনি কলকাতায় ছিলেন তেরোবছর (১৭৯১-১৮০৩), এই সময়কালে সলভিন্সের আঁকা ছত্রিশটি নৌকোর ছবি (সবগুলোই ধাতব প্লেটে খোদাই করে এঁকে তারপর কাগজের ওপর ছাপ তোলা, যাকে বলে এচিং) সেযুগের বাংলার নদীনির্ভর জীবনের এক অনন্য দলিল। একসঙ্গে এতগুলি নৌকোর ছবি এঁকে ও তাদের প্রত্যেকের পরিচয় লিপিবদ্ধ করে শিল্পী একটি অসামান্য কাজ করে গেছেন। Boats of Bengal নামে একটি বইয়ে বালথাজার সলভিন্সের এই নৌকো-সিরিজটির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়। এই বইটির প্রকাশক Manohar Publishers । উৎসাহীরা দেখতে পারেন। আমি শুধু কয়েকটা ছবি ও প্রচ্ছদের ছবি দেখাচ্ছি কৌতূহল উসকে দেবার জন্য।

নৌকো নিয়ে আরেকটি চমৎকার বই। তবে এ বই বাংলায় লেখা, লেখকও বাঙালি। তিনি বালথাজার সলভিন্সের মতো নানারকম নৌকোর ছবি আঁকেননি বটে, তবে তিনি নৌকোর ওপর প্রচুর তথ্য ও ইতিহাস উদ্ধার করেছেন।
আজ থেকে অন্তত বারোহাজার বছর আগে মানুষ প্রথম জলে ভেলা ভাসিয়েছিল। কালক্রমে কতরকমের জলযান তৈরি হয়েছে দেশে-দেশে। মানুষ নৌকো চেপে মাছ ধরেছে, বাণিজ্য করতে ভিনরাজ‍্যে গেছে, এমনকি যুদ্ধ ও লুটতরাজও করেছে কত। নৌকোর ব্যবহার তাই বিচিত্রপথে। প্রয়োজন ভেদে নৌকোর আকৃতি ও প্রকৃতিও কতরকমের। সেইসব নিয়ে হাজার কথা গেঁথে যিনি এই বইটি লিখেছেন তিনি স্বয়ং একজন জাহাজ নির্মাতা, ভারত সরকারের গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্সের প্রযুক্তিবিদ। তাঁরই কলমে জানা গেল নৌকোর পাল, হাল, পাটাতন, নোঙর, মাঝিমাল্লাদের নানা আখ‍্যান। তারই সঙ্গে উৎসবে, মেলায়, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে, লোকাচারে নৌকো নিয়েও কত কথা। বালথাজার সলভিন্সের Boats Of Bengal-এর সঙ্গে দেবব্রত মল্লিকের নৌকা (পারুল প্রকাশনী) একযোগে পড়লে নিজেকে বেশ একটা নৌকোবিদ বলে মনে হয়।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ২ : শিল্প-দর্শক

আমাদের এই বাংলায় প্রচুর চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস দীর্ঘ একহাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। স্বভাবতই এইবিষয়ে আলোচনা ও লেখালিখিও কম হয়নি। ছবি-ভাস্কর্য নিয়ে এইসব লেখাপত্রের ইতিহাস বিষয়ে একটু খোঁজখবর করতে গিয়ে বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল। বাংলায় শিল্পের প্রথম বই লিখেছিলেন শ‍্যামাচরণ শ্রীমানী, তাঁর লেখা বইটির নাম ছিল আর্যজাতির শিল্পচাতুরী। সে হল উনিশ শতকের কথা। তারপর এদেশে যে কত শত বই প্রকাশিত হয়েছে তা গুণে বলা খুব শক্ত। আমার অসম্পূর্ণ হিসেবে এই সংখ্যা অন্তত দু’শো-আশি। কিন্তু বইয়ের বাইরে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সন্ধান যদি করি, তাহলে দেখা যাবে তার সংখ্যা দেড়হাজারেরও বেশি। ভাবা যায়! ১৯১৩ থেকে ২০০৮-এর মধ‍্যে প্রকাশিত শিল্পকলা বিষয়ক উল্লেখযোগ‍্য প্রবন্ধের সংখ্যা ১৩৬৮ । পত্রিকাগুলির মধ‍্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছবিভাস্কর্য নিয়ে লেখা ছেপেছে দেশ (৩০৫টি )। এছাড়াও প্রবাসী, বিশ্বভারতী, এক্ষণ, সুন্দরম ইত‍্যাদি পত্রিকার অবদানও কম নয়। এছাড়া রয়েছে রোদে ধান ছায়ায় পান, চিত্রকল্পকথা-র মতো লিটল ম্যাগাজিন, যাদের ভিত্তিই হল ছবিভাস্কর্য।

এখন কথা হল, এত যে প্রয়াস, এত যে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সাক্ষাৎকারের তুমুল আয়োজন তবুও এ পোড়া দেশে শিল্পের দর্শক নেই কেন? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীদের দেশে দর্শকদের এই দুর্দশা দেখে গা জ্বলে যায়। আমরা কি নিয়ে গর্ব করবো সেটাই তো জানি না।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ১ : কলকাতার ছবি

শহর কলকাতার প্রথম ছবি এঁকেছিলেন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে পরবর্তীকালে কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অসংখ্য শিল্পী। কলকাতা ছাড়া ভারতের আর কোনো শহর এতবেশি ছবিতে নন্দিত হয়নি। পৃথিবীতেও কি হয়েছে? আমার জানা নেই। তা সে যাই হোক, শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি সালতারিখ মিলিয়ে পরপর সাজিয়ে দেখলে পাওয়া যায় এক অনবদ্য দৃশ‍্য-ইতিহাস। সে ইতিহাস অবশ্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না। তা না হোক, কিন্তু শহর কলকাতার দৃশ্যপট ও তার বাসিন্দার চালচলনের বিবর্তনের ধারা বুঝতে গেলে এইসব ছবিগুলি হল একবারে মোক্ষম উপাদান। আমি তাই মাঝেমাঝেই শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি বিষয়ে প্রবল উৎসাহী হয়ে পড়ি। আমার সংগ্রহে কলকাতাকে নিয়ে আঁকা কয়েকশো ছবির প্রিন্ট আছে। সেগুলো দেখতে বসে তাক লেগে যায়। এ যেন এক অলৌকিক চলচ্চিত্র!

আধুনিকযুগে কলকাতা বিষয়ক ছবির শ্রেষ্ঠশিল্পী হলেন সমীর বিশ্বাস। তিনি যে কত হাজার কলকাতার স্কেচ করেছেন তার হিসেব পাওয়া শক্ত। জলরঙেও তিনি কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অনেক। তাঁর ছবিতে কলকাতার ঘরবাড়ি ও পথঘাটের সঙ্গে থাকত কর্মরত মানুষের সমাগম। সমীর বিশ্বাস ছবি আঁকতেন খুব সাবলীল রেখায়। তাঁর তুলি ও পেনসিলে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গতি। তাই কলকাতার প্রাণবন্ত রূপ অসামান্যভাবে ধরা পড়ত তাঁর চিত্রপটে। কলকাতার বিখ্যাত স্থাপত্য আঁকার জন‍্য রথীন মিত্রেরও তুমুল খ‍্যাতি আছে। কিন্তু আমি তাঁর ছবিতে কোনো প্রাণ পাই না। যদিও খুবই যত্ন নিয়ে ও একাগ্রচিত্তে আঁকতেন তিনি। কিন্তু তাঁর ছবির রেখার আড়ষ্টতার জন্য, ভুল পরিপ্রেক্ষিতজ্ঞানের জন্য কিরকম একটা ‘ইয়ে’ লাগে। সমীর বিশ্বাসের ছবিতে এই ‘ইয়ে’-র দোষ একেবারেই নেই। ইংরেজ চিত্রশিল্পীদের ছবির রঙের জেল্লা ও আড়ম্বর তিনি আনতে না পারলেও কলকাতার আধুনিক রূপ-কে তিনি যথার্থভাবে কাগজবন্দি করেছেন। তাঁর ছবি দেখলে এইসময়ের মানুষের কর্মব‍্যস্ততা, তার অবসরযাপন যেমন বোঝা যায়, ঠিক তেমনই বোঝা যায় ‘পাতালরেলের খাল/ ভাঙাচোরা দিনকাল/পদেপদে ঠোক্কর/বকর-বকর’-এর দিনলিপি। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ যখন কলকাতাকে দেখতে চাইবে তখন সমীর বিশ্বাসের আত্মবিশ্বাসী ছবিগুলি দলিলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে এ বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, শিয়ালদা স্টেশন, নিউমার্কেট, গড়িয়াহাট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বাবুঘাটের মতো কলকাতার প্রতীকতুল‍্য জায়গাগুলি তাঁর ছবিতে যে বিশ্বস্ত অনুপুঙ্খতায় ও চরিত্রে ফুটে উঠেছে তার কোনো তুলনা নেই। আমার তো খুবই ইচ্ছে করে সবাইকে ডেকে ডেকে তাঁর ছবিগুলি দেখাই। কলকাতায় তো কত মানুষেরই বাস, কত লোকেরই আনাগোনা, কিন্তু শিল্পীর মতো করে এই শহরকে ভালোবাসতে পারেন ক’জন?

প্রয়াত শিল্পী সমীর বিশ্বাস-এর স্ত্রী এখনও তাঁর আঁকা কলকাতা-সিরিজের ছবিগুলির প্রিন্ট অত‍্যন্ত যত্ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ ও সরবরাহ করে চলেছেন অল্পদামে, বাস্তবিকই এ এক বিরল নজির।

Posted in Cultural journey | Tagged , , , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কার্টুনিস্টের চোখে দেখা কিনতে হলে …

উদ্ভাসের সদ‍্য প্রকাশিত বই অনলাইনে কিনতে হলে নিচের লিঙ্ক ব‍্যবহার করতে পারেন :

https://www.boichoi.com/index.php?route=product/product&product_id=17890

Posted in Cultural journey | Tagged , , , | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান