কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৬ : সংগীত-চিত্র

আমার নিজের বিশ্বাস মতে এদেশের চিত্রশিল্পীরা সংগীতকে ভালোবেসে যত সৃষ্টি করেছেন, তার তুলনায় সংগীতশিল্পীরা চিত্রকলাকে অবলম্বন করে প্রায় কিছুই করেননি। কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতে চিত্রকলা ব্রাত্য হয়েই থেকে গেছে। অথচ ইওরোপে সংগীত ও ছবির কী অনর্গল ভাব বিনিময়। সেখানে চিত্রশিল্প ও সংগীতশিল্প উভয়েই একে অপরের কাছ থেকে উপাদান ও প্রেরণা গ্রহণ করে চলেছে অবিরাম। উনিশ শতকের বিখ্যাত সুরস্রষ্টা ফ্রানৎজ্ লিজ্টের II Pen Serso ও Sposalizio মিকেলাঞ্জেলো ও রাফায়েলের ছবির অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি। আর এক বরণীয় সুরকার ডেবুসিও বত্তিচল্লির ‘প্রিমেভেরা’ প্রেরণায় সুর সৃষ্টি করেছিলেন। তাছাড়াও ভ‍্যান গঘ, পিকাসোর ছবি থেকেও সুর সৃষ্টি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে ইমপ্রেসনিস্ট শিল্পীদের ছবি থেকেও। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর সকলেই ছবির বিষয়ে অসম্ভব রকমের উদাসীন। আর এযুগে কবীর সুমনের গানে মাঝেমাঝে শোনা যায় গণেশ পাইন কিংবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ। অথচ এর বিপরীতে সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে রাগমালা ছবি এঁকে-এঁকে শিল্পীরা হয়রান হয়ে গেছেন, তবুও সংগীতশিল্পীদের এতটুকু ভালোবাসা পাননি। জানি এ বড়ো বিতর্কের বিষয়। তবুও ব‍্যাপারটা আলোচনাযোগ‍্য ও জরুরি বলে মনে হয়।

শতবর্ষ অতিক্রান্ত চিত্রশিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় আমার বড়ো প্রিয় ও শ্রদ্ধেয়। তিনি নিজে গান করতে না পারলেও সংগীতকে ভালোবাসতেন। তাঁর সেই অনুরাগের অজস্র নমুনাও ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। বেশ কিছুদিন ধরেই আমি তাঁর সংগীতপ্রেমের চিত্রিত নিদর্শন সংগ্রহ করে চলেছি। আমাদের সমাজে ছবি তো সেভাবে কেউ গুছিয়ে রাখে না, ফলে পুরোনো ছবি খোঁজার কাজটা প্রায়সময়েই খুব শক্ত হয়ে ওঠে। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে স্বামী প্রজ্ঞানানন্দর অসামান্য গ্রন্থ সঙ্গীত ও সংস্কৃতি-র জন্য দেবব্রত মুখোপাধ্যায় এক অবিশ্বাস্য কীর্তি করেছিলেন। তিনি ভারত ও বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের যেখানে যত প্রাচীন দেওয়াল চিত্র আছে সেখান থেকে খুঁজে-খুঁজে বাদ‍্যযন্ত্র ও যন্ত্রীদের ছবি এঁকেছিলেন। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে তিনি বাদ‍্যযন্ত্রগুলিকেও আলাদা করে স্কেচ করে রেখেছিলেন। এমনকি একই যন্ত্র অন‍্য অঞ্চলে কেমন ভিন্ন চেহারায় প্রচলিত সে-ছবিও তিনি এঁকে রেখেছিলেন। তাঁর আঁকা এইরকম অগুণতি স্কেচের মধ‍্যে শতাধিক ছবি সংগীত ও সংস্কৃতি  বইতে ছাপা হয়। দেবব্রতর আক্ষেপ ছিল যে তিনি এইরকম একটি মৌলিক ও পরিশ্রমসাধ্য কাজের প্রাপ‍্য মর্যাদা পাননি (আর অর্থ যে কত পেয়েছিলেন সে-কথা উল্লেখ না করাই ভালো)। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দের আরো একটি বই রাগ ও রূপ-এর জন‍্যও দেবব্রত প্রাচীন রাগমালা চিত্রের অনুসরণে অনেকগুলি রেখাচিত্র এঁকেছিলেন, যেগুলিতে তাঁর রেখাশৈলী সেইসব পুরোনো ছবিগুলিকে নতুন আঙ্গিকে উদ্ভাসিত করেছিল।

সংগীত নিয়ে একজন বরণীয় চিত্রশিল্পীর এমন প্রগাঢ় প্রেম কেমন উপেক্ষিতই রয়ে গেল। কেউ এসবের খোঁজও করে না। আর সংগীতশিল্পীদের তো কথাই নেই। বিশেষত শাস্ত্রীয়-সংগীতশিল্পীরা। তাঁরা আমাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতকে এতটাই উঁচুতে তুলে নিয়ে গেছেন যে সেখান থেকে সমকালীন অন‍্যান‍্য শিল্পধারার কোনো সম্পর্কই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁদের সৌজন্যে সংগীত এখন এই পৃথিবীতে এককমাত্রায় অধিষ্ঠিত হয়ে আশ্চর্য সুখে দিন কাটায়। আমরা যাকে বলি কূপমণ্ডুকের সুখ।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.