কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৫ : শুভাপ্রসন্ন

শহর হিসেবে কলকাতা খুব একটা পুরোনো নয় মোটেই। তার চেয়ে ঢের প্রাচীন জনপদ এদেশে অনেক আছে। তবুও কলকাতার গুরুত্বের কোনো তুলনা হয় না। এতবেশি ঘটনা ও গুণীজনের ব‍্যক্তিত্বের বিকাশ খুব কম শহরকে ঘিরেই হয়। কলকাতাকে নিয়ে কত কবিতা, ছবি, গান, চলচ্ছবি গড়ে উঠেছে। অনেকেই জানেন যে আমার প্রিয় বিষয় হল চিত্রকলা। আর তাই ছবির কলকাতা ও কলকাতার ছবির প্রতি খুবই আগ্রহী আমি। কলকাতা শহর ও তার লোকজনকে নিয়ে দেশ-বিদেশের কত শিল্পীর আঁকা ছবির বই-পত্রিকা যে আমার সংগ্রহে আছে। মাঝেমাঝে সেগুলো ঘাঁটতে বসে বেশ উৎফুল্ল বোধ করি। এই তো আজই হঠাৎ করে Calcutta Black And White নামে চমৎকার একটি ছবির বই দেখছিলাম। এটি আসলে ১৯৯০-এ শিল্পী শুভাপ্রসন্নর একক প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ক‍্যাটালগ। শুভাপ্রসন্নের সঙ্গে আমার কোনো ব‍্যক্তিগত পরিচয় নেই। কিন্তু আমি তাঁর ছবির দীর্ঘদিনের গুণগ্রাহী। জানি এই শিল্পীর নাম শুনলেই অসংখ্য মানুষের ঠোঁটে ফুটে ওঠে ঘৃণা ও তাচ্ছিল‍্যের হাসি। কিন্তু আমি নিশ্চিত সেইসব মানুষেরা বেশিরভাগই শুভাপ্রসন্নের আঁকা একটিও ছবি ভালো করে দেখেননি। আসলে বেশিরভাগ লোকে চলতি হাওয়ায় ভেসে নিন্দের জন‍্যই নিন্দে করে বেড়াতে বড়ো ভালোবাসে।

যাক সে কথা, শুভাপ্রসন্নের কলকাতা-সিরিজের ছবির কথায় আসি। এই বইটিতে চোদ্দটি সাদাকালো ছবি আছে। সেইসব ছবিতে কলকাতার বিচিত্ররূপ দেখলে তাক লেগে যায়। এমনিতেই শুভাপ্রসন্নের ছবি দক্ষতানির্ভর। সম্ভবত দক্ষতার কারণেই তাঁর চিত্রকল্প খুব সহজেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে অবশ্য শিল্পীর মেধার প্রয়োগও অনবদ‍্য। যেমন একটি ছবিতে নরমুণ্ডের মালা গলায় মা কালির সামনে মুণ্ডহীন ভক্তবৃন্দের সমাবেশ বুঝিয়ে দেয় উপাস‍্য আর উপাসকের মধ্যেকার প্রকৃত সম্পর্কটিকে। একই দ‍্যোতনা দেখা যায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর ট্রামসফর উপলক্ষে চোখবাঁধা মানুষের সমাগমের দৃশ্যে।এইরকম ব‍্যঙ্গাত্মক ছবির পাশেই রয়েছে সম্মানিত সত‍্যজিৎ রায়-এর অপূর্ব এক উপস্থাপনা। অপু-দুর্গা ও কাশবনের প্রেক্ষাপটে ধাবমান রেলগাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান গ্রহণ করছেন সত‍্যজিৎ। শুভাপ্রসন্নের বিখ্যাত কাকেরাও রয়েছে শহর কলকাতার ক‍্যানভাস জুড়ে। এইসব ছবি দেখতে দেখতে কতসব অনুভূতির জন্ম হয়। এক আধুনিক শিল্পীর চোখ দিয়ে কলকাতাকে দেখার এই যে অপূর্ব আয়োজন, জানি না তার কথা ক’জন মনে রেখেছেন? তবে কি ব‍্যক্তি শুভাপ্রসন্নের কুখ‍্যাতি শিল্পী শুভাপ্রসন্নের সমস্ত প্রতিভাকে কি ঢেকে দিল শেষপর্যন্ত? হায়!

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.