কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ৪ : জীবন-শিল্প

জীবনের সঙ্গে শিল্পের যোগ না থাকলে সব আয়োজন ব‍্যর্থ হয়, একদা একথাটা বইয়ে পড়েছিলাম। বড়ো হয়ে উঠে আমার অভিজ্ঞতাও ইদানীং সেই কথাটাই বলতে চায়। এখন দেখি আমার চারপাশে কেউই আর নিজের দেশ, পরিবেশ, ইতিহাস, সংস্কৃতিকে ভালোবাসে না। প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় ‘কিভাবে হবে, সময়ই তো পাই না।’ দেখেশুনে মনে হয় এমনই অবস্থা যে কেউ একফোঁটা অবসর পায় না। সারাক্ষণ উপার্জনের চিন্তাতেই মত্ত। মনে হয় সকলেই এত কম রোজগার করে যে অন্নের চিন্তায় আর অন্য কোনো কিছুতে মন দিতে পারে না। কিন্তু এত ব‍্যস্ততা সত্ত্বেও সংস্কৃতি কিন্তু অন‍্যপথে দিব‍্যি বিকশিত হয়ে চলেছে, হয়েই চলেছে। পরিবারগুলোতে কতকাল ভালো কোনো গান বাজে না, সুন্দর ফিল্ম দেখা হয় না সবাই মিলে। শেষ কবে চমৎকার একটা বই পড়ে আমোদিত হয়ে সংসারের কর্তা কর্ত্রীকে তার কথা বলেছেন কেউ জানে না। ভ্রমণ আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু নেই কোনো হাতে তৈরি অ‍্যালবাম। ফলে মাঝেমাঝেই ‘ফরম‍্যাট’ করতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় সতত সুখের স্মৃতি। কী অদ্ভুত জীবন এসে পড়ল আমাদের মাঝখানে! ছেলেমেয়েরা বাংলায় পড়াশোনা করতে পারে না, ইংরেজিতেও পারে কিনা জানি না। আসলে পড়াশোনা তো চাকরি খোঁজার জন্য। পুলিশ যেমন চাকরি পেলেই নিজের শরীরের সুগঠনের কথা ভুলে গিয়ে মহানন্দে মধ‍্য-প্রদেশ বাড়িয়ে ফেলে, তেমনিই মানুষের সমস্ত পড়াশোনার শেষ হয় চাকরির অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেলেই। সমস্ত শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য মাসান্তে বেতন গোনা। বয়স্কদের বিলাপ, প্রৌঢ়দের আক্ষেপ আর মধ‍্যবয়স্কদের পাকামির দৌলতে যৌবন এখন বেপরোয়া। সে বিশ্বাস করে না কোনো শেকড়ে। তাই সে পকেটে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড নিয়ে বেনোজলে কচুরিপানার মতো মহানন্দে ভেসে বেড়ায়। রাস্তার কলে জল পড়ে নষ্ট হয়ে গেলে বন্ধ করতে আসে না কেউ, পাড়ার পুকুর নোংরা জমে ভরাট হয়ে উঠলে কারো মাথাব‍্যথা করে না। যেকোনো উৎসবে গাঁকগাঁক করে গান বেজে উঠলে সমবেত মানুষ অখুশি হয়েও সেই প‍্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে যায়। ছেলে-মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে হোয়াটসঅ্যাপে একুশে ফেব্রুয়ারির দিন কত সুখে ভাষাপ্রেমের স্ট‍্যাটাস দেয়।

কি জানি, মানুষ হয়ত আসলে এইরকমই। দু’চারটে বিদ‍্যাসাগর,রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ-এর মতো মহাপ্রাণের কথা জেনে আমিই বোধহয় ভুল ভেবেছিলাম। অবিরাম স্ববিরোধ বুকে পুষে কোথায় চলেছে আমাদের পরিপার্শ্ব, আমি নিজেই বা চলেছি কোথায়?

তাই মনে হয় জীবনের সঙ্গে জীবনেরই আর কোনো যোগ নেই এখন।

তবুও সকালবেলার শান্ত সৌন্দর্য এখনও সুন্দর। পাখির পালকের নরম লাবণ‍্য, নদীর জলের অবিরাম বয়ে চলা, অথবা মায়ের হাত ধরে টলমলে পায়ে হেঁটে চলা শিশুটিকে দেখতে পেলে আজও আনন্দ হয়। সুখ হয় প্রিয় শিল্পীর ছবির কথা ভাবতে, ক‍্যানভাসজুড়ে তুলির আশ্চর্য চলাচল, এইসবই তো আসল সৌন্দর্য। ভালো লাগে ভোরের মাঠে প্রবীণ-প্রাণের হেঁটে যাওয়া দেখতে। কোথাও আশা আছে কি নেই, সেকথা আর মনে পড়ে না। চায়ের ভাঁড়ের উষ্ণতায় যে মাধুর্য, সেইটুকু নিয়েই চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে। ছোট্ট একটা জীবন, মহাকালের বিচারে কতটুকুই বা সময়! তাকে অতিক্রম করে যাওয়া কি খুব কঠিন কিছু?

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.