কৃষ্ণজিৎ-এর কলাম ১ : কলকাতার ছবি

শহর কলকাতার প্রথম ছবি এঁকেছিলেন ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস। তাঁরই দেখানো পথে হেঁটে পরবর্তীকালে কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অসংখ্য শিল্পী। কলকাতা ছাড়া ভারতের আর কোনো শহর এতবেশি ছবিতে নন্দিত হয়নি। পৃথিবীতেও কি হয়েছে? আমার জানা নেই। তা সে যাই হোক, শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি সালতারিখ মিলিয়ে পরপর সাজিয়ে দেখলে পাওয়া যায় এক অনবদ্য দৃশ‍্য-ইতিহাস। সে ইতিহাস অবশ্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় না। তা না হোক, কিন্তু শহর কলকাতার দৃশ্যপট ও তার বাসিন্দার চালচলনের বিবর্তনের ধারা বুঝতে গেলে এইসব ছবিগুলি হল একবারে মোক্ষম উপাদান। আমি তাই মাঝেমাঝেই শিল্পীদের আঁকা কলকাতার ছবি বিষয়ে প্রবল উৎসাহী হয়ে পড়ি। আমার সংগ্রহে কলকাতাকে নিয়ে আঁকা কয়েকশো ছবির প্রিন্ট আছে। সেগুলো দেখতে বসে তাক লেগে যায়। এ যেন এক অলৌকিক চলচ্চিত্র!

আধুনিকযুগে কলকাতা বিষয়ক ছবির শ্রেষ্ঠশিল্পী হলেন সমীর বিশ্বাস। তিনি যে কত হাজার কলকাতার স্কেচ করেছেন তার হিসেব পাওয়া শক্ত। জলরঙেও তিনি কলকাতার দৃশ্য এঁকেছেন অনেক। তাঁর ছবিতে কলকাতার ঘরবাড়ি ও পথঘাটের সঙ্গে থাকত কর্মরত মানুষের সমাগম। সমীর বিশ্বাস ছবি আঁকতেন খুব সাবলীল রেখায়। তাঁর তুলি ও পেনসিলে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গতি। তাই কলকাতার প্রাণবন্ত রূপ অসামান্যভাবে ধরা পড়ত তাঁর চিত্রপটে। কলকাতার বিখ্যাত স্থাপত্য আঁকার জন‍্য রথীন মিত্রেরও তুমুল খ‍্যাতি আছে। কিন্তু আমি তাঁর ছবিতে কোনো প্রাণ পাই না। যদিও খুবই যত্ন নিয়ে ও একাগ্রচিত্তে আঁকতেন তিনি। কিন্তু তাঁর ছবির রেখার আড়ষ্টতার জন্য, ভুল পরিপ্রেক্ষিতজ্ঞানের জন্য কিরকম একটা ‘ইয়ে’ লাগে। সমীর বিশ্বাসের ছবিতে এই ‘ইয়ে’-র দোষ একেবারেই নেই। ইংরেজ চিত্রশিল্পীদের ছবির রঙের জেল্লা ও আড়ম্বর তিনি আনতে না পারলেও কলকাতার আধুনিক রূপ-কে তিনি যথার্থভাবে কাগজবন্দি করেছেন। তাঁর ছবি দেখলে এইসময়ের মানুষের কর্মব‍্যস্ততা, তার অবসরযাপন যেমন বোঝা যায়, ঠিক তেমনই বোঝা যায় ‘পাতালরেলের খাল/ ভাঙাচোরা দিনকাল/পদেপদে ঠোক্কর/বকর-বকর’-এর দিনলিপি। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পরে মানুষ যখন কলকাতাকে দেখতে চাইবে তখন সমীর বিশ্বাসের আত্মবিশ্বাসী ছবিগুলি দলিলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে এ বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া, শিয়ালদা স্টেশন, নিউমার্কেট, গড়িয়াহাট, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বাবুঘাটের মতো কলকাতার প্রতীকতুল‍্য জায়গাগুলি তাঁর ছবিতে যে বিশ্বস্ত অনুপুঙ্খতায় ও চরিত্রে ফুটে উঠেছে তার কোনো তুলনা নেই। আমার তো খুবই ইচ্ছে করে সবাইকে ডেকে ডেকে তাঁর ছবিগুলি দেখাই। কলকাতায় তো কত মানুষেরই বাস, কত লোকেরই আনাগোনা, কিন্তু শিল্পীর মতো করে এই শহরকে ভালোবাসতে পারেন ক’জন?

প্রয়াত শিল্পী সমীর বিশ্বাস-এর স্ত্রী এখনও তাঁর আঁকা কলকাতা-সিরিজের ছবিগুলির প্রিন্ট অত‍্যন্ত যত্ন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ ও সরবরাহ করে চলেছেন অল্পদামে, বাস্তবিকই এ এক বিরল নজির।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s