আগুন তুলি উদ্বোধনী ভাষণ

গত ২৭ জুলাই, ২০১৭ কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস সংলগ্ন বই-চিত্রর সি গুহ মেমোরিয়াল সভাগৃহে উদ্বোধন হল দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবনী-গ্রন্থ আগুন তুলি ।  প্রখ্যাত শিল্প-সমালোচক মৃণাল ঘোষ-এর উদ্বোধনী ভাষণটি উদ্ভাসের পাঠকদের জন্য।

 

শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে (১৯১৮-১৯৯১) নিয়ে কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের আগুন-তুলি নামে যে বইটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আজ, সেটি খুবই প্রয়োজনীয় একটি প্রকাশনা।  ১৯৪০ এর দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের মধ্যে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  কিন্তু তাঁকে নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয়নি।  অশোক ভট্টাচার্যের কালচেতনার শিল্পী বইতে তাঁর উপরে একটি অধ্যায় রয়েছে।  ওই বইতে আর যে তিনজন শিল্পী আলোচিত হয়েছেন — তাঁরা হলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ ও সোমনাথ হোর।  আর একটি বই হয়তো চারুকলা পর্ষদ থেকে বেরিয়েছিল।  এর বাইরে শিল্পীর জীবন ও শিল্পকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার নজির আর বিশেষ নেই।  এমনকি কমল সরকারের ভারতের ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী গ্রন্থেও দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের উল্লেখ নেই।  সেদিক থেকে কৃষ্ণজিতের লেখা এই বইটি আধুনিক শিল্প আলোচনার ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

সামাজিক দায়বোধ চল্লিশের শিল্পকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।  এর পূর্ববর্তী যে আধুনিকতার চিত্রধারা — তাকে মোটামুটি তিনটি প্রবণতায় ভাগ করা যায়।  প্রথমটি ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিক, যার প্রধান প্রকাশ আমরা দেখতে পাই রাজা রবি বর্মা, অন্নদাপ্রসাদ বাগচি, বামাপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পীর ছবিতে।  দ্বিতীয়টি এরই প্রতিবাদে গড়ে ওঠা নব্য-বঙ্গীয় বা নব্য-ভারতীয় ঘরানা, যার প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর শিষ্য পরম্পরা — নন্দলাল বসু,অসিতকুমার হালদার, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার প্রমুখ শিল্পী।  গগনেন্দ্রনাথ নব্য-ভারতীয় ঘরানার সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকলেও তাঁর চিত্রচেতনা ছিল অনেক অগ্রবর্তী।  বলা যেতে পারে চল্লিশের মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী চেতনার তিনি ছিলেন প্রধান এক পূর্বসূরী।  আধুনিকতার তৃতীয় ধারা বা স্বদেশচেতনা-আশ্রিত আধুনিকতার দ্বিতীয় ধারাটি বিকশিত হয়েছিল শান্তিনিকেতন থেকে।  রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ও আদর্শে উদ্ভূত এই ধারাতেও নন্দলালই ছিলেন প্রধান প্রেরণাদাতা ও তন্নিষ্ঠ শিক্ষক।  এখানে নব্য-ভারতীয় ঘরানা যে বিশ্বচেতনায় উন্মীলিত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আমরা দেখি বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় ও রামকিঙ্করের কাজে।

এই পরিপ্রেক্ষিত বা ভিত্তির উপরই চল্লিশের শিল্পকলার বিকাশ।  ছবিতে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ভুবনের যে উন্মীলন শুরু হয়েছিল ১৯২৩-২৪ সাল থেকে ১৯৪১-এ তার পরিসমাপ্তি ঘটে।  আঙ্গিকের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ এক নতুন পথের উন্মীলন ঘটালেন।  আদিমতা ও অভিব্যক্তিবাদী প্রবণতা সত্ত্বেও স্বদেশ ও বিশ্বের এক মননদীপ্ত সমন্বয় ছিল তাঁর ছবিতে।  সেখান থেকেই সূচনা হয়েছিল মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী চেতনার বিস্তারের, যার প্রথম উদ্ভাস দেখা গিয়েছিল গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে।  চল্লিশের শিল্পীরা এই উত্তরাধিকারকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন।  একদিকে সামাজিক দায়বোধ, আর একদিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতাকে আত্মস্থ করার প্রবণতা ছিল চল্লিশের শিল্পকলার।  যদিও সামাজিক দায়বোধ চল্লিশের প্রায় সব শিল্পীরই অন্তরপ্রেরণা ছিল, তবু একে ভিত্তি করেই চল্লিশের শিল্পকলাকে দুটি প্রবণতায় ভাগ করা যায়।  একটি প্রবণতায় সামাজিক দায়বোধ বা কালচেতনাই ছিল প্রধান প্রেরণা।  এই প্রবণতার প্রধান শিল্পীরা ছিলেন জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, মণি রায়, সূর্য রায় প্রমুখ আরও কয়েকজন শিল্পী।  দ্বিতীয় প্রবণতাটি ছিল সংঘবদ্ধ আন্দোলনের।  ১৯৪৩-এ প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’-এর শিল্পীরা ছিলেন এই আন্দোলনের শরিক।  এদের মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় প্রদোষ দাশগুপ্ত, গোপাল ঘোষ, নীরদ মজুমদার, পরিতোষ সেন, গোবর্ধন আশ, সুনীলমাধব সেন প্রমুখ শিল্পী।

প্রথম যে ধারা, সামাজিক দায়বোধের ধারা বলে যাকে আমরা বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে চেয়েছি, তার পিছনে দুটি ঘটনার বিশেষ গুরুত্ব ছিল।  একটি হল ১৯৪৩-এর মন্বন্তর।  আর দ্বিতীয়টি মার্কসবাদ বা কমিউনিস্ট পার্টির আন্দোলন।  মন্বন্তরের গভীর প্রতিক্রিয়া ছিল প্রায় সকলের কাজেই।  তবু জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ বা সোমনাথ হোর-এর ছবিতে মন্বন্তরের যে প্রত্যক্ষ অভিঘাত, অন্য অনেকের কাজে হয়তো ততটা ছিল না।  অন্যদিকে মার্কসবাদের দীক্ষায় চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর ও দেবব্রত মুখোপাধ্যায় যতটা উদ্বুদ্ধ ছিলেন, অন্যেরা হয়তো ততটা ছিলেন না।  দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জীবনদর্শন ও শিল্পদর্শনে মার্কসবাদের প্রভাব ছিল গভীর, যদিও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ সদস্য ছিলেন না।

প্রবাহিত জনজীবন, ঔপনিবেশিকতাবিরোধী মুক্তি-সংগ্রাম ও বিভিন্ন গণ-আন্দোলন হয়েছে তাঁর ছবির প্রধান বিষয়।  ছবির রূপ বা আঙ্গিকও নির্ধারিত হয়েছে এই আন্দোলন ও প্রতিবাদীচেতনা থেকে।  তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা ছিল না।  যদিও কলকাতার কয়েকটি শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেননি, প্রধানত পিতার অকাল প্রয়াণ ও তজ্জনিত দারিদ্রের কারণে।  তিনি রূপের দীক্ষা অর্জন করেছেন ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন শিল্পকেন্দ্রগুলি ভ্রমণ করে।  তাঁর সেই অভিজ্ঞতা ধরা আছে তাঁর লেখা দুটি বইতে বাঘ ও অজন্তা এবং ধারা থেকে মাণ্ডু ।  পাশ্চাত্য শিল্প থেকেও তিনি শিক্ষা নিয়েছেন।  তাঁকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে ভ্যান গঘ ও পিকাসো।

অর্ধেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলী তাঁর ভারতের শিল্প ও আমার কথা গ্রন্থে এই শিল্পীর উল্লেখ করেছেন।  তাঁর আঙ্গিক সম্পর্কে বলেছেন, ‘শিল্পসৃষ্টিতে তিনি উগ্র আধুনিকও নন, আবার পুরো সেকেলে পন্থায়ও চলেন না।’  এই উক্তির মধ্যে এই ইঙ্গিত থাকে যে দেবব্রত নব্য-ভারতীয় ধারা যেমন অনুসরণ করেননি, তেমনি পাশ্চাত্য-অনুসারী বিশ্লিষ্ট রূপও ব্যবহার করেননি।  তিনি সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব এক রেখারূপ।  তীক্ষ্ণ ও তীব্র গতিময় সেই রেখায় মানুষের সংগ্রাম ও জীবনস্পৃহাকে নন্দিত করে গেছেন তাঁর ছবিতে।  ১৯৮৭-র আগস্টে কলকাতায় তাঁর ছবির একটি প্রদর্শনী দেখার সুযোগ হয়েছিল।  সেই প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল গ্রাফিক্স টেল দ্য ইন্ডিয়ান পেট্রিয়টিক টেল ।  তাঁর ছবিতে দেশাত্মবোধের সেই আখ্যানে বিশেষ জোর পড়েছিল ১৯৯৮-৯৯-এর চুয়াড় বিদ্রোহ, ১৮১৯-এর সন্দ্বীপের বিদ্রোহ, ১৮২৫-২৭-এর ময়মনসিংহের প্রথম পাগলপন্থী বিদ্রোহ, ১৮২৭-এর পালকি-বেহারাদের ধর্মঘট ইত্যাদি গণজাগরণগুলি।  স্বাধীনতা প্রাপ্তির থেকেও প্রাধান্য পেয়েছে ১৯৪৭-এর ভারতভাগ।  দর্শক নামে তাঁর একটি পত্রিকা ছিল।  সেই পত্রিকার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে শিল্পের ও জীবনবোধের সংযোগস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তিনি।

১৯৭০-এর দশকে এই কফি হাউসেই উজ্জ্বল মধ্যমণির মতো আড্ডামগ্ন থাকতে দেখেছি তাঁকে।  এখানেই তাঁর উপর এই বইটি যে প্রকাশিত হচ্ছে, এই ঘটনাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।  শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের প্রতি আমার বিনত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।  অভিনন্দন জানাচ্ছি আগুন-তুলি বইটির লেখক কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তকেও।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

1 Response to আগুন তুলি উদ্বোধনী ভাষণ

  1. দেবকুমার সোম বলেছেন:

    বাহঃ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s