মুখরিত মুখ

হিরণ মিত্র।  বিখ্যাত এই শিল্পীর বই মুখ-মুখর হাতে আসার পর উল্টে-পাল্টে দেখলেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

ছোটোবেলা থেকেই ছবির বই আমার ভীষণ প্রিয়।  গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধের বই কিনি বটে কিন্তু ছবির বই দেখলে যেমন হামলে পড়ি তেমনটা আর কোনো কিছুতে হয় না।  বইপাড়া, বইমেলা, ফুটপাথ, এর-ওর বাড়ি সর্বত্রই ছবির বই খুঁজে বেড়াই।  এভাবে বেড়াতে বেড়াতেই একদিন কলেজস্ট্রিটে নজরে আসে বেশ মোটা লাল টুকটুকে একটি বই।  প্রচ্ছদে এক চেনা শিল্পীর মুখের আবছা আদল।  তার নীচে বইয়ের নাম লেখা মুখ-মুখর ।  শিল্পী হিরণ মিত্রের আঁকা প্রতিকৃতির এক অবাক করা সংকলন।  ইষৎ হলদে পার্চমেন্ট পেপারে ছাপা সাড়ে তিনশো পাতার বই যার মধ্যে রয়েছে দেড়শোরও বেশি রেখাচিত্রে ধরা নানান মাপের ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের মুখ।  নানান মাপ বলছি এই কারণে যে, সেখানে যেমন রয়েছে মনীষীপ্রতিম মানুষ আবার তেমনি রয়েছেন একেবারেই অখ্যাত কোনো লোক।  শিল্পীর খেয়ালে যিনি ধরা পড়েছেন রেখার টানে।

স্বভাবতই এমন একটি বই হাতে নেবার পর বেশ একটা আহ্লাদ হয়।  হাতে নিয়ে ছেলেমানুষের মতো ঘুরে ফিরে দেখি বইয়ের প্রচ্ছদ, ভেতরের অঙ্গসজ্জা, ছাপার হরফ।  হিরণ মিত্র বাংলার একজন নামকরা চিত্রশিল্পী।  জন্মেছেন ১৯৪৫ সালে, ছবি আঁকা শিখেছেন কলকাতায় গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে।  শিল্পী হিসেবে হিরণের প্রতিভার স্বাক্ষর নানাদিকে প্রসারিত।  ক্যানভাসে যেমন ছবি আঁকেন তেমনিই চলচ্চিত্রে, থিয়েটারে তাঁর শৈল্পিক নির্মাণ বহুদিন ধরেই সুবিদিত।  বইপত্রের দুনিয়াতেও তিনি অত্যন্ত কদরপ্রাপ্ত শিল্পী।  বহু পত্র-পত্রিকা ও গ্রন্থে তাঁর করা প্রচ্ছদ হামেশাই দেখতে পাওয়া যায়।  বাংলা লেটারিং বা হরফসজ্জাতেও হিরণ বেশ একটা নতুন রকমের স্বাদ এনেছেন, যা কিনা একঝলক দেখলেই চেনা যায়।  এতকাল বিক্ষিপ্তভাবে নানা জায়গায় তাঁর আঁকা পোর্ট্রেট দেখতাম, সংবাদপত্রে, বইয়ের মলাটে, লিটল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠায়।  কিন্তু সেগুলো কখনও দুইমলাটের মধ্যেখানে বন্দি হয়ে হাতের নাগালে আসবে ভাবিনি।  অথচ ভাবা উচিত ছিল।  আসলে ভাবা যে যায় না তার কারণ এদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছবির বই ছাপতে চান না কেউই।  প্রকাশকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ ছবির বই লোকে না কিনলে তাঁরাই বা গাঁটের কড়ি খরচা করে বই ছাপবেন কেন?  এইরকম দুঃসহ পরিস্থিতিতে ছাতিম বুকস্ যে হিরণ মিত্রের এই বইটি যত্ন করে প্রকাশ করেছেন এইজন্য তাঁদের উদ্দেশ্যে সাবাশ বলি।

শুরুতেই হিরণ ভূমিকায় লিখেছেন ‘এই না মুখ, হ্যাঁ মুখ, তাদের চলমান দেখেছি কথায়, গানে, হাঁটার ফাঁকে রেখাছায়া, প্রতিবিম্ব ফেলেছে সাদা কাগজে।’  ভাগ্যিস প্রতিবিম্ব ফেলেছে।  তবেই না এমন বইয়ের জন্ম।  আগেই বলেছি দেড়শতাধিক প্রতিকৃতির সংকলন এই বই।  রয়েছে হিরণের বেশ কিছু আত্মপ্রতিকৃতিও।  সে-সবে উন্মোচিত শিল্পীর অজানা অচেনা রূপ।  এতগুলি মুখের মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে লিখতে গেলে আরেকটি মহাভারতের জন্ম হবে।  সুতরাং গুটিকতকের কথাই শুধু বলবো।  যাঁরা অনুল্লেখিত থাকবেন তাঁরা কিন্তু মোটেই আমার অপছন্দের নয়।  একথাটা আগেভাগে কবুল করে রাখি।  ও হ্যাঁ, আরো একটা কথা তো বলাই হয়নি।  তা হল এ বইয়ে প্রত্যেকটা ছবির সঙ্গে হিরণের লেখনীও চলেছে সমান তালে।  কি বলব, ছবিগুলি মূল লেখা হলে অনুষঙ্গের লেখাগুলি কি ইলাস্ট্রেশন?  আমার তো সেইরকমই মনে হয়েছে।  লেখাগুলি ছবির হয়ে কত কত কথা বলেছে, যার ফলে জানতে পারছি পোর্ট্রেট আঁকার মুহুর্ত, যাঁর ছবি আঁকা হল তাঁর সম্পর্কে শিল্পীর চিন্তা-ভাবনা, ব্যক্তিগত আবেগ, আর কিছু ইতিহাস।  বিশেষত যে-সব ছবি শিল্পী সরাসরি ব্যক্তিকে সামনে থেকে দেখে এঁকেছেন সে সব ছবির ক্ষেত্রে হিরণের লেখাগুলি দলিলের মর্যাদা পাবে নিশ্চয় একদিন।  হিরণের ছবির রেখারা মূলত দ্রুতগামী।  মানুষের মুখকে তারা ধরতে চায় কিছুটা ইঙ্গিতে।  তার ফলে অনেক সময়েই রেখারা মুখের সারাংশটুকুই ধরে, দর্শকের জন্য কল্পনার অবকাশ রেখে দেয় খানিকটা।  যেমন মহাশ্বেতা দেবী (পৃ: ৫১), কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (পৃ: ৪৯), সুবিমল লাহিড়ী (পৃ: ৩১), পণ্ডিত ভীমসেন যোশী (পৃ: ২২৬), চণ্ডী লাহিড়ী (পৃ: ২১০)।  এইসব মুখগুলি দেখলেই মনে হয় কী মোক্ষম টানেই না এইসব ব্যক্তিত্বদের ধরেছেন হিরণ।  দেখে মনে হয় শিশুর কাজ বুঝি, কিন্তু শৈশবের রেখারা এত তো অভিজ্ঞ হয় না।  এমন কিছু গুণী মানুষের ছবি এঁকেছেন হিরণ যাঁদের মুখগুলি ইতিমধ্যেই অনেকের কাছে ঝাপসা।  যেমন, রামকিঙ্কর বেইজ (পৃ: ২৮৯), বংশী চন্দ্রগুপ্ত (পৃ: ২৯৫)।  ব্রাশে টানা রেখারা এসব ছবিতে ঝঞ্ঝার মতো, যদিও গন্তব্যে তারা অবিচল।  অবিচল না হলে এমন এক-একটি মুখের জন্ম হবে কীভাবে?  জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর (পৃ: ২৯৩) মুখ সম্পর্কেও সেই একই কথা।  কালি ভর্তি তুলি যেন ছিটকে উঠছে কাগজের গায়ে।  তবে এই শৈলীর শ্রেষ্ঠতম রূপায়ণ সম্ভবত ঋত্বিককুমার ঘটক।  এই বইয়ের দুটি প্রতিকৃতিতেই ঋত্বিক তাঁর নিজস্ব চরিত্রে উদ্ভাসিত।  ওই তীব্র চাউনি, এলোমেলো খ্যাপাটে চুলের বিন্যাস।  এদের ধরার জন্য এমন তুলির টানই উপযুক্ত।  সরু-মোটা-ভোঁতা-তীক্ষ্ণ নানারকম রেখাতেই স্বচ্ছন্দ হিরণ।  তবে প্রায় কোথাও তিনি ডিটেলে আগ্রহী নন।  তিনি চান মুখের সারাৎসার, হয়তো বা চরিত্রেরও।  নয়তো মৃণাল সেন কেন ধরা দেবেন হিরণের প্যাস্টেলের চওড়া আঁচড়ে?  অথবা বিয়ের অব্যবহিত পরেই হিরণ সস্ত্রীক এমনতর ফ্ল্যাটব্রাশের ম্যাজিকে?  আসলে শিল্পীরা চান খেলতে।  মানবচরিত্রের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে হাজার হাজার রেখার ঝাঁক।  শিল্পীর কাজ হল ওদের দুজনের মধ্যে সেতু গড়ে তোলা।  যাতে তাঁরা একে অপরের হাত ধরে ঠিকমতো প্রকাশিত হতে পারে।

মনে পড়ে সেই কবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর আঁকা মুখচ্ছবি দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল টোয়েন্টি ফাইভ কলোটাইপস্ অফ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ টেগোর ।  সে বই ছাপা হয়েছিল বিদেশে।  বাঙালির প্রতিকৃতিচর্চার তো বিরাম নেই কোনো।  যদিও সাড়ম্বরে তার প্রকাশের কোনো ধারাবাহিকতা নেই।  মনে পড়ে শতাধিক ছবির মালায় গেঁথে তোলা সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতি  বইটির কথাও।  হিরণ মিত্রের মুখ-মুখর সেই ব্যতিক্রমী ধারারই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হয়ে রইল।  এই বইটির জন্য বহুকাল আমরা আনন্দ পাবো, আমাদের নিভৃত সময় মুখরিত হয়ে উঠবে হিরণের রেখার বিচ্ছূরণে।  এমন সংকলন বইয়ের আলমারিতে নয়, মাথার বালিশের কাছে রাখাতেই আসল সুখ।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to মুখরিত মুখ

  1. Subhajit sarkar বলেছেন:

    হিরণ মিত্রর রেখা এবং কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের অসামান্য লেখার যুগলবন্দি এই উপহারখানি.মন ছুঁয়ে গেল.বইটা সংগ্রহের ইচ্ছে রইল.শিল্প সংক্রান্ত এহেন ওয়েবসাইটের মুহূর্তকথার সান্নিধ্য পেয়ে গর্ব বোধ করি.আমি প্রত্যয়ী এমন সৃজনশীল কাজ আমাদের মত স্বল্পশিক্ষিতদের অনেক অজানা দিকের সন্ধান দেবে.

  2. দেবকুমার সোম বলেছেন:

    বাহঃ ঋদ্ধ হলাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.