রং বেরং

রঙের ইতিকথা  পড়লেন।  ভাবলেন।  এবার কলম তুলে নিলেন পৌষালী ঘোষ

চিত্রশিল্প নিয়ে মানুষের অজ্ঞতা না কি উদাসীনতা বলব জানি না, তার কারণ নিয়ে একটা বিতর্কের অবতারণা করা যায়।  একপক্ষ নিশ্চয় এজন্য শিল্পীদের দায়ী করবেন।  বলবেন এত কঠিন ছবি তাঁরা আঁকেন যে বোঝাই যায় না।  বোঝাবুঝি তো পরের কথা, ছবি ছাড়া — কেবলমাত্র ছবি ছাড়া তাঁরা তো সবই বোঝেন, তাই না ?

আসলে সমস্যাটা অন্যত্র।  যে কাজটা ছেলেবেলায় সবচেয়ে আনন্দের থাকে, রং-পেনসিল নিয়ে ছবি আঁকা, সেটাই বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায়।  হারিয়ে যায় কাজের চাপে।  আর সবই কাজ, শুধু এইটে নয়।  ছবি আঁকা, ছবি নিয়ে কথা বলা, ছবি নিয়ে পড়াশোনা করা তাই যথেষ্ট সংস্কৃতিমনস্ক মানুষেরও করা হয়ে ওঠে না।  আবারও বিতর্ক।  কেন?  কেন এমনটা হয়?  মূলস্রোতের চেয়ে আলাদা বলে।  কেন আলাদা?  চর্চা হয় না বলে।  কেন চর্চা হয় না?  শক্ত বলে।  কেন শক্ত?Cover for Advt

অনিঃশেষ এক চক্রের মধ্যে ঢুকে পড়া।  এবং স্বীকার করে নেওয়া চিত্রশিল্প একটি সুপ্রাচীন মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও যথেষ্ট গণ্ডীবদ্ধ এবং স্বল্পচর্চিত রয়ে গেছে এখনও।  চাইলেই মাতৃভাষায় চিত্রশিল্প বা চিত্রশিল্পের ঐতিহ্য-ইতিহাস সংক্রান্ত বইপত্তরও মেলে না।

এই আকালেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখার কাজটি করে চলেন অনিঃশেষভাবে।  স্বপ্ন দেখা এবং স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা — দুটোই।  এই স্বপ্নচারণের ফলেই একটি বইয়ের জন্ম।  এমন একটি বই যা প্রয়োজনীয়, কিন্তু নেই।  রং নিয়ে আমাদের যতটা আদিখ্যেতা, আগ্রহ ততটা নেই।  সব মানুষেরই প্রিয় রং থাকে, কিন্তু কেন প্রিয়, প্রিয়তার ক্রিয়া মনের ওপর কেমন, সর্বোপরি রং যে মন-মস্তিষ্কের ওপর কতটা ক্রিয়াশীল এগুলো আমরা ভাবি না, খেয়াল করি না।  রঙের ইতিহাসও আমাদের না জানা।  মানুষভেদে যেমন, তেমনি রাষ্ট্রভেদে রঙের গুরুত্বও তেমন পাল্টে যায়।

এসব ভাবনা তথা তথ্য দুই মলাটের মধ্যে হাজির করার জন্য রঙের ইতিকথা-র লেখক মৃণাল নন্দী ধন্যবাদার্হ।  পড়তে পড়তে মন চলে যায় সেই আলতামিরার গুহায়, যেখানে আঁকা হচ্ছিল বাইসন।  বাইসনের গায়ের রঙে ইতিহাসের ঘাম-শ্রম-রক্ত জমাট বেঁধে আছে।  দুনিয়া পাল্টে দেওয়া ছবি যাঁরা এঁকেছেন তাদের হাতে বিচিত্র রংগুলি কিভাবে পরিবর্তনের পথে পৌঁছাল সবটা লিখেছেন লেখক।  খুঁজে এনেছেন ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ভৌতবিজ্ঞানের তথ্যাবলী।  হয়তো অনেকটা জানা, অনেকটাই না-জানা।  কিন্তু সবচেয়ে মজার কথা হল এটা কোনো তথ্যের বই হয়ে রয়ে গেল না শেষ পর্যন্ত।  তথ্যাবলী পরিবেশনের মধ্যে লেখকের চিত্রশিল্প বিষয়ে এত আবেগ ও ভালোবাসা রয়ে গেল যে শেষ পর্যন্ত এ বই রঙের ইতিকথা না কি একটা শিল্পের ইতিহাস হয়ে উঠল, তা কে বলবে?

ছোটো ছোটো চোদ্দটি নিবন্ধ, চারটি সংযোজন আর ষোলটি রঙিন ছবিতে ভরা এ বই।  সুদৃশ্য মলাটটি এঁকে দিয়েছেন কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত।  রং নিয়ে অনেকদিন ঘর করার সুবাদে ভূমিকাটিও তাঁর লেখা।  সুপ্রযুক্ত।  প্রাগৈতিহাসিক সময়পর্ব থেকে রঙের ব্যবহারের ইতিহাস বিষয়ে এসেছে জলরং-তেলরং-প্যাস্টেল-অ্যাক্রিলিকের সূচনা-বিবর্তন-বর্তমান অবস্থা।  রং যে কিভাবে আমাদের কর্মে ও মর্মে জড়িয়ে থাকে তা উপলব্ধ হয় পাঠে।  এত সরল ভাষাভঙ্গিতে যে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করা যায় তা না পড়লে বিশ্বাস হয় না।  ভালো লাগে মৃণাল অস্বীকার করেননি বাস্তবকে।  রঙের দুনিয়ায় পৌঁছে ভুলে যাননি আসলে আমরা বাস করি একরঙা তথা বেরঙা দুনিয়ায়।  যেখানে রং দিয়ে কেবল আনন্দ নয়, প্রকাশিত হয় বিরোধ-ঝগড়া।  বিষাক্ত রঙে রাঙানো হয় খাদ্যসম্ভার।  আসলে মানুষের মনের ভিতরে ঈর্ষার যে নীলরং ঢুকে গেছে তা তো কোবাল্ট ব্লু-র মতোই বিষাক্ত।  ত্বকের সংস্পর্শে এলে জ্বালা ধরায়।  লালরং দেখে তাই আর বাসর জাগানিয়া স্মৃতি মনে পড়ে না।  মনে হয় রক্তের হোলিখেলা।  প্রকৃতি নিধনে প্রকৃতিও রংহারা।  সবই ধূসর — বিষণ্ণ।  তবু তার মধ্যে জেগে থাক এ স্বপ্নালু প্রয়াস — আবার রঙিন করে তোলার, রঙিন হয়ে ওঠার স্বপ্নে।

বই : রঙের ইতিকথা;  লেখক : মৃণাল নন্দী;  প্রকাশক : কবিতা পাক্ষিক;  প্রকাশকাল : ডিসেম্বর, ২০১৫;  মূল্য : ১৫০ টাকা

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , , , , , , , . Bookmark the permalink.

1 Response to রং বেরং

  1. শ্রীমন্তী ঘোষাল বলেছেন:

    দারুন
    বইটা পড়তে চাই।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.