শতবর্ষে তিন শিল্পী — ৩

২০১৬ সালটি আমরা শুরু করেছিলাম তিনজন বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীদের শতবর্ষের উদযাপনের মধ্যে দিয়ে।  উদ্ভাসের ক্যালেন্ডার প্রকাশ হয়েছিল এই উপলক্ষ্যে।  বছর শেষে সেই তিন শিল্পীকে নতুনভাবে চেনা কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত-র কলমে। তিন শিল্পী নীরদ মজুমদার, মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শঙ্খ চৌধুরীকে আর একবার ফিরে দেখা।

গত সপ্তাহের পর …

এই আলোচনার তৃতীয় ও শেষ শিল্পী হলেন খ্যাতনামা ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরী।  মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিনিও শিল্পী ও শিক্ষক দুই পরিচয়েই সমান ভাস্বর।  শঙ্খ চৌধুরীর পোশাকি নাম ছিল নরনারায়ণ।03-sanka-chowdhury  তাঁর জন্ম দেওঘরে হলেও শৈশব ও বাল্যশিক্ষা ঢাকায়।  তিনি ছিলেন কিরণময়ী দেবী ও নরেন্দ্রনারায়ণের কণিষ্ঠ পুত্র।  ঢাকায় কৈশোরজীবন অতিবাহিত করে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী থেকে বি.এ. পাশ করেন।  তারপর সেখানেই কলাভবনে বিশ্ববরেণ্য শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের কাছে ভাস্কর্য শিক্ষার পাঠ নেন।  ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৃতী ও গুরু রামকিঙ্করের বিশেষ স্নেহভাজন।  ১৯৪৫ সালে রামকিঙ্কর শঙ্খকে নিয়ে নেপালে যান।  সেখানে গিয়ে একটি যুদ্ধ-স্মারক গড়ার সময় তিনি রামকিঙ্করকে সহযোগিতা করেন।  নেপালে থাকার সময়েই শঙ্খ সেখানকার প্রথাগত ধাতু-ঢালাই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন।

শঙ্খ চৌধুরীর শিল্পী জীবন শুরু হয় মুম্বইয়ে।  ১৯৪৯-এ সেই শহরে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী।  তারপর তিনি ইওরোপ-ভ্রমণে যান।  শিক্ষার্থীর অনুসন্ধিৎসা নিয়ে তিনি একে একে দেখেন প্যারিস, লন্ডন সহ ইতালি, সুইৎজারল্যান্ড, বেলজিয়ম ও নেদারল্যান্ডের শিল্পকেন্দ্রগুলি।  দেশে ফিরে কয়েকবছর বাদে ১৯৫৭-তে বরোদার সয়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে শঙ্খ রিডার হিসেবে যোগ দেন।  এখানেই তিনি ১৯৭০ সাল পর্যন্ত একটানা অধ্যাপনা করেছেন, তৈরি করেছেন অসংখ্য শিল্পী।  এছাড়াও তিনি নানাসময়ে যে সমস্ত উচ্চ সম্মানের পদ গ্রহণ করেছিলেন সেগুলি হল যথাক্রমে ললিতকলা অ্যাকাডেমির অনারারি সেক্রেটারি (পরবর্তীতে এখানেই চেয়ারম্যানও হন), বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রোফেসর, বিশ্বভারতীর ভিজিটিং ফেলো এবং তানজানিয়ার ডার-এস-সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।  জীবনে অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি — পদ্মশ্রী (১৯৭১), বিশ্বভারতী প্রদত্ত অবন-গগন পুরস্কার (১৯৭৯), দেশিকোত্তম (১৯৭৮), কালিদাস সম্মান (২০০২)।  এছাড়াও ফিলিপিন্স-এর সেন্টার এস্কোলার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট (১৯৭৪) ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট (১৯৯৭) প্রদান করে।

ভাস্কর হিসেবে শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন মুক্তমনের এবং আধুনিক চিন্তার মানুষ।  বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, মাধ্যম সবকিছু নিয়েই নিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মেতে থাকতেন তিনি।  নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় বিশ্বাস ছিল না তাঁর।  প্রতিটি কাজেই নিজের করা আগের কাজটিকে অতিক্রম করতে চাইতেন।  শিক্ষক রূপেও ছিলেন অতুলনীয়।  শিক্ষার্থীদের মনের ওপর কোনো ধারণা বা মতামত জোর করে চাপিয়ে দিতেন না তিনি।  শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন এমনই এক ভাস্কর যিনি বিশ্বশিল্পের গতিপ্রকৃতিকে ভালোভাবে নিরীক্ষণ করে, তাকে নিজের মননে ও চিন্তায় ধারণ করেছিলেন।  তাই তাঁর কাজকে কোনো তত্ত্বের মধ্যে ফেলে বিচার করলে ভুল করা হবে।  শঙ্খের ভাস্কর্যে একদিকে যেমন গুরু রামকিঙ্করের চেতনা লুকিয়ে আছে, তেমনিই অন্যদিকে নিহিত আছে ব্রাঁকুসির ভাস্কর্যের মসৃণ বিমূর্ততা।  বস্তুর আকৃতিকে তিনি সরলতা দান করে তার অন্তরের রূপটিকে প্রকাশিত করতে চাইতেন।  আবার কোনো ব্যক্তির মুখাবয়ব নির্মাণ করার বেলায় শঙ্খ বেছে নিতেন অমসৃণতা।  মার্বেল, পোড়ামাটি, ধাতু, কাঠ, সিমেন্ট সব মাধ্যমেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন তিনি।  এমন আন্তর্জাতিক মানের একজন ভাস্কর জন্মশতবর্ষে উপনীত হয়ে আরো বেশি চর্চিত ও আলোচিত হয়ে উঠবেন এটাই কাম্য।

সমাপ্ত

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.