শতবর্ষে তিন শিল্পী — ২

২০১৬ সালটি আমরা শুরু করেছিলাম তিনজন বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীদের শতবর্ষের উদযাপনের মধ্যে দিয়ে।  উদ্ভাসের ক্যালেন্ডার প্রকাশ হয়েছিল এই উপলক্ষ্যে।  বছর শেষে সেই তিন শিল্পীকে নতুনভাবে চেনা কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত-র কলমে। তিন শিল্পী নীরদ মজুমদার, মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শঙ্খ চৌধুরীকে আর একবার ফিরে দেখা।

গত সপ্তাহের পর …

এই রচনার দ্বিতীয় আলোচ্য শিল্পী মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।  শতবর্ষে উপনীত এই শিল্পীর নাম আজ প্রায় বিস্মৃতই বলা যায়।  বোধহয় তাঁর অন্তর্মুখী, প্রচারবিমুখ স্বভাবের জন্য তাঁকে ভুলে যাওয়া এত সহজ হয়েছে।  অথচ তাঁকে মনে রাখার যথেষ্ট কারণ ছিল।  মাণিকলাল নতুন এক চিত্রমাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা।  সিল্কের কাপড়ের ওপর জলরং-এর প্রয়োগে তিনি বিশেষ এক রকমে ছবি আঁকতেন অসাধারণ দক্ষতায়। 02-maniklal-bandopadhyay এই পদ্ধতি তিনি শিখিয়েছেনও অনেকজনকে।  মাণিকলাল আবিস্কৃত এই মাধ্যমে অনেক শিল্পীই এখন ছবি আঁকেন, কিন্তু তাঁর কথা আর কেউ বিশেষ বলেন না।  শিল্পী হিসেবে তিনি যেমন সার্থকতা লাভ করেছিলেন, তেমনি শিক্ষকের ভূমিকাতেও তাঁর অবদান নেহাৎ কম নয়।  গভর্ণমেন্ট আর্ট স্কুল ও কলেজে তিনি সুদীর্ঘকাল ছবি আঁকা শিখিয়েছেন।  ছাত্র-দরদী শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত সুনাম ছিল তাঁর।  মাণিকলালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র হলেন এ যুগের কিংবদন্তী শিল্পী গণেশ পাইন।  ছাত্রাবস্থায় গণেশ পাইন যখন তাঁর ড্রয়িং-এর দুর্বলতা নিয়ে হতাশাগ্রস্ত, তখন তাঁকে নানাভাবে প্রেরণা দিয়ে উৎসাহিত করেছিলেন তিনি।  এমনকি আর্ট কলেজের প্রদর্শনীতে গণেশ পাইন যখন ছবির দাম সংকোচবশত দশটাকা রেখেছিলেন, তখন মাণিকলাল সেটাকে বাড়িয়ে দিয়ে একশো টাকা লিখে দেন এবং ছবিটা অনায়াসে বিক্রিও হয়ে যায়।  অল্পবয়সিদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে মাণিকলালের কোনো জুড়ি ছিল না।  এমন শিক্ষক যে কোনো যুগেই বিরল।

মাণিকলালের জন্ম বরিশালের কেওড়াগ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশে)।  মা অমিয়বালা দেবী।  বাবা জিতেন্দ্রনাথ ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।  ঢাকার সোনারং হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে আর পড়াশোনায় মন বসেনি মাণিকলালের।  সোজা কলকাতায় গিয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি হন তিনি।  সেখানে পাঁচবছর ছবি-আঁকা শিখে ১৯৩৯-এ তিনি সেখানেই শিক্ষকতার কাজ গ্রহণ করেন।  পরবর্তীতে গভর্নমেন্ট স্কুল কলেজে রূপান্তরিত হলে মাণিকলাল সেখানে ইন্ডিয়ান পেইন্টিং বিভাগের অধ্যাপক হন।  আজীবন তিনি এখানেই অধ্যাপনা করেছেন।

মাণিকলালের চিত্ররীতি ছিল ভারতীয় ধারার।  তবে প্রথাগত পুরাণনির্ভর ছবি তিনি আঁকতেন না মোটেও।  তাঁর ছবিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নানাভাবে ফুটে উঠেছে।  কলকাতার রাস্তায় যাযাবরদের ছবিও যেমন এঁকেছেন, তেমনিই এঁকেছেন মধ্যপ্রদেশের গ্রামজীবনের ছবিও।  সে-সব ছবিতে একদিকে ধরা পড়েছে রং ও কম্পোজিশনের বিশুদ্ধ সৌন্দর্য, অন্যদিকে প্রস্ফুটিত হয়েছে জীবনের সহজ ছন্দ, দিনযাপনের খুঁটিনাটি দিকগুলি।  তিনি বেশিরভাগ ছবিই আঁকতেন জলরং ও টেম্পেরায়।  রেশমের ওপর জলরঙে ছবি আঁকার নতুন রীতিটির কথা তো আগেই বলেছি।  এই মাধ্যমটি ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়।  এই রীতিতে তিনি বেশ কিছু অসামান্য ফুলের ছবি এঁকেছিলেন।  ভারতীয় শৈলীতে ছবি আঁকলেও পাশ্চাত্য-রীতির স্বাভাবিকতা আশ্রিত ছবি আঁকাতেও মাণিকলালের দক্ষতা ছিল অপরিসীম।  বিশেষত মানবশরীরের অ্যানাটমি সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল পরিষ্কার।

জন্মশতবর্ষে মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও কাজ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজ্য চারুকলা পর্ষদ অতি সম্প্রতি একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন।  এখন প্রয়োজন তাঁর ছবির একটি উপযুক্ত সংকলন বের করা।  তাহলে মাণিকলালের কাজের স্বরূপ সম্পর্কে আজকের প্রজন্ম আগ্রহী হবে, যা কিনা খুব জরুরি।

পরের সপ্তাহে শেষ অংশ …

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.