শতবর্ষে তিন শিল্পী — ১

২০১৬ সালটি আমরা শুরু করেছিলাম তিনজন বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীদের শতবর্ষের উদযাপনের মধ্যে দিয়ে।  উদ্ভাসের ক্যালেন্ডার প্রকাশ হয়েছিল এই উপলক্ষ্যে।  বছর শেষে সেই তিন শিল্পীকে নতুনভাবে চেনা কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত-র কলমে। তিন শিল্পী নীরদ মজুমদার, মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শঙ্খ চৌধুরীকে আর একবার ফিরে দেখা।

 

শতবর্ষ মানবজীবনে একটি বিশেষ মুহূর্ত।  বিশেষ করে যাঁরা কৃতী মানুষ তাঁদের পক্ষে তো বটেই।  যদিও বেশিরভাগ ব্যক্তিই জীবদ্দশায় নিজের একশোবছর পূর্তিকে দেখে যেতে পারেন না।  তবু একশো বছরে গুণীজনের কাজকে ফিরে দেখার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে পরবর্তী প্রজন্ম।  এই ফিরে দেখা আসলে এক ধরণের শুভচর্চা।  স্রষ্টার কাজ সময়ের সম্মার্জনীকে কতটা উপেক্ষা করে টিকে থাকতে সক্ষম হল তার একটা মূল্যায়ণ করার উপযুক্ত সময় হল শতবর্ষ।  যদিও আমাদের দেশে চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের নিয়ে জনসমাজে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না।  তার ফলে প্রায় সময়েই শিল্পীদের জীবন ও কাজ বিষয়ে তথ্য যোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে।  হয়তো কোনো শিল্পী স্মৃতিকথা লিখে গেছেন, তাঁর জীবদ্দশায় কিংবা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে সেটি বই হয়েও বেরিয়েছে।  কিন্তু কয়েকবছর পার হতে না হতেই সেই স্মৃতিকথার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।  লাইব্রেরিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের হতাশ করে।  তবু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন।  শতবর্ষে উপনীত শিল্পীর কাজ ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠে তখন।  এই বছর ২০১৬-তে উদ্ভাস চিত্রচর্চাকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত একটি ক্যালেন্ডারের বিষয় ছিল শতবর্ষে তিন শিল্পী ।  শিল্পীরা হলেন যথাক্রমে নীরদ মজুমদার, মাণিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শঙ্খ চৌধুরী।  প্রথম দুজন চিত্রশিল্পী, শেষের জন ভাস্কর।  উদ্ভাস-এর উদ্দেশ্য ছিল — এই তিন শিল্পীর মুখাবয়ব সারাবছর রুচিসম্পন্ন মানুষের ঘরের দেওয়ালে পৌঁছে দিয়ে নানাজনের মধ্যে শিল্পীত্রয়ী সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করা।  ক্যালেন্ডার সেই উদ্দেশ্য কতটা সফল করেছে জানিনা, তবে এই লেখাটিও কিন্তু সেই একই লক্ষ্যের প্রসারিত রূপ।

প্রথম শিল্পী নীরদ মজুমদার।  বিখ্যাত সাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদারের ভাই এবং স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী শানু লাহিড়ীর দাদা নীরদ মজুমদারের জন্ম কলকাতায়।  ঠাকুমা যোগমায়া দেবীর স্নেহের ধন ছিলেন তিনি।  তাঁর হাত ধরেই ছোটোবেলায় বাড়ির ধর্মীয় পরিবেশ নীরদকে অনেকটা প্রভাবিত করে।01-nirad-majumder  সেই প্রভাব তিনি সমগ্র জীবন বয়ে বেরিয়েছেন।  নীরদ মজুমদারের মা রেণুকা দেবীও ছিলেন বাড়ির সেই পরিমণ্ডলের আর এক নিবেদিত প্রাণ।  বাবা প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন পুলিশ অফিসার।  ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক নীরদের শৈশবকাল থেকেই ছিল।  শিল্পচর্চায় বাড়ি থেকে বাধা পাননি এতটুকু।  তিনি যখন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট-এ ভর্তি হন তখন তাঁর বয়স মাত্র তেরো।  সোসাইটিতে ছবি আঁকায় তিনি এতটাই কৃতিত্ব দেখান যে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘নরম্যান ব্লান্ট স্মৃতি পদক’ পুরস্কার দেন।  ছাত্রাবস্থায় নীরদের আদর্শ ছিলেন অননীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  অবনীন্দ্রনাথের নব্যবঙ্গীয় চিত্রশৈলীর অনুসরণে তিনি তখন ছবি আঁকতেন।  কিন্তু অচিরেই এমন একটা সময় এল যখন তিনি আর সে পথে তৃপ্তি পেলেন না।  বয়স বাড়ছে, বিকশিত হচ্ছে মেধা ও মনন।  ইতিমধ্যে চারিদিকে তাকিয়ে দেখছেন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।  স্বাধীনতা সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আকাল — সব মিলিয়ে চূড়ান্ত এক অস্থিরতা।  এই সময়ে এক ঝাঁক নবীন শিল্পী মিলে গড়ে তুললেন ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’ (১৯৪৩সাল)।  নীরদ মজুমদার ছিলেন সেই দলের অন্যতম প্রধান।  ‘ক্যালকাটা গ্রুপ’ গঠন-পর্বে নীরদ আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন তাঁর চিত্রশৈলীকে সমকালীন আন্তর্জাতিক শিল্পধারার সঙ্গে মেলাতে।  পল সেজান তখন তাঁর প্রিয় চিত্রশিল্পী।  সেজানের বর্ণবিন্যাস নীরদকে প্রভাবিত করে ফেলে।  যদিও সেজান নীরদের সমসাময়িক শিল্পী নন, তবু বিশ্বের দরবারে তাঁর অসম্ভব জনপ্রিয়তা।  ইতিমধ্যে ১৯৪৬ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি পেয়ে নীরদ প্যারিসে রওনা হন।  সেখানে তাঁর শিক্ষাকেন্দ্র ছিল আঁদ্রে লেৎ-এর অ্যাকাডেমি।  প্যারিস থেকে তিনি ভ্যানগঘের দেশ হল্যাণ্ডেও যান।  কিন্তু নানারকম মানসিক উদ্বেগে ও শারীরিক অনিয়মের কারণে নীরদ অসুস্থ হয়ে পড়েন।  এমনকি তাঁকে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়।  এইসময় তিনি মানসিক শান্তি ও সুস্থিরতা ফিরে পাবার জন্য নিয়মিত ভাগবৎ গীতা ও চণ্ডীপাঠ করতে শুরু করেন।  ক্রমে হিন্দু ধর্মের দর্শন তাঁকে যেন নতুন এক দিশা দেখায়।  তিনি খুঁজে পান নতুন এক চিত্রভাবজগৎ।  ১৯৪৯-এ নীরদ প্যারিসে প্রথম একক প্রদর্শনী করেন।  সেই প্রদর্শনী সেখানে প্রশংসা কুড়োলেও নীরদ কিন্তু মোটেও সন্তুষ্ট হননি।  কারণ তখনও তিনি কাঙ্খিত চিত্রভাষা পুরোপুরি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।  ১৯৫৮-তে নীরদ যখন ভারতে ফিরে আসেন তখন তিনি শিল্পী হিসেবে নিজের পথ খুঁজে পেয়েছেন, হয়ে উঠেছেন অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী।  বারো বছরের বিদেশবাস তাঁকে যেন অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়েছিল।

নীরদ মজুমদারের ছবির জগৎ তত্ত্বময়।  তাঁর মতে পৃথিবীর সমস্ত বিষয়বস্তুই মহাজাগতিক ক্রিয়াকলাপের অন্তর্গত।  নীরদের ছবির বিষয় ভারতীয়, কিন্তু রীতিতে কিছুটা ফরাসি।  তাঁর রেখার তীক্ষ্ণতা, কৌণিকতা, বর্ণলেপন ইত্যাদি মন দিয়ে লক্ষ্য করলে সেটা বোঝা যায়।  অনেকে বলেন তাঁর ছবিতে একটা টানাপোড়েনের সংকট লুকিয়ে আছে।  সেই টানাপোড়েনটি হল ইওরোপীয় শরীরের সঙ্গে ভারতীয় আত্মার দ্বন্দ্ব।  তবে নীরদের ছবির ড্রয়িং বরাবরই অসম্ভব জমজমাট।  সেজন্যই বোধহয় দশমহাবিদ্যা, বেহুলা-লখীন্দরের কাহিনি, কথাসরিৎসাগর, চন্দ্রকলাবিদ্যা, তন্ত্রের তত্ত্ব নিয়ে ছবি আঁকলেও তা কখনও প্রচলিত ভারতীয় চরিত্রের ছবির মতো হয়নি।  তাঁর ছবির ফিগারেরা সর্বদা ঋজু ও টানটান।  তারা কখনও সৌন্দর্যসর্বস্ব নয়, লাবণ্যের ভারে তারা লুটিয়ে পড়ে না নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির মতো।  মহাজাগতিক চিন্তা ও চেতনার জন্যই হয়তো নীরদের ছবির জ্যামিতি এত সুসংবদ্ধ।  কারণ মহাজগতের বিন্যাস তো আসলে একটি অন্তহীন নিখুঁত জ্যামিতি।  তাঁর ছবিতে অনেক প্রতীকি ব্যাপারও আছে।  আছে রং সম্পর্কে আশ্চর্য সংযম ও পৌনঃপুনিকতা।

সাহিত্যের প্রতি নীরদ মজুমদারের একটা টান ছিল।  দাদা কমলকুমার মজুমদারের পরোক্ষ প্রভাবও কাজ করতো নিশ্চয়ই।  নীরদ একসময়ে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে ভক্তকবি রামপ্রসাদের গানের ফরাসি অনুবাদ করেছিলেন।  শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যুগ্মকাব্যগ্রন্থ সুন্দর রহস্যময়-এর জন্যও নীরদ একাধিক ছবি এঁকেছিলেন।  যেগুলিকে নিছক অলঙ্করণ বলা যাবে না কোনোভাবেই।  মৃত্যুর চারবছর আগে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তিনি লিখেছিলেন আত্মজীবনীমূলক রচনা পুনশ্চ পারী ।  ১৯৮২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আনন্দ পাবলিশার্স থেকে সেটি বই আকারে প্রকাশিত হলেও বহুদিন ধরেই বইটি আর পাওয়া যায় না।  শিল্পীর শতবর্ষে এই আত্মকথার পুনঃপ্রকাশ অত্যন্ত জরুরি।

পরের সপ্তাহে বাকি অংশ …

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s