কিছু কথা

আমার ছবিকথা বিভাগে এবারে কলম ধরেছেন  অয়ন চৌধুরী। তাঁর শিল্পীসত্ত্বার সাথে জীবনসত্ত্বাকে জড়িয়ে নেওয়ার গল্প এবার উদ্ভাসে।

 

ছবি নিয়ে কিছু লিখতে বসলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, রেমব্রান্ট, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সেডান, র‍্যাফাইল, সালভাদোর দালি, নন্দলাল বসু, শাহাবুদ্দিন বা মোঃ কিবরিয়ার মতো মহান স্রষ্টাদের কীর্তিকলাপ।  সম্প্রতি আবার এই পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র সনাতন দিন্দা ওয়ার্ল্ড বডি পেইন্টিং কমপিটিশান ২০১৬-এ সারা বিশ্বে প্রথম হয়ে এলেন।  অর্থাৎ, এত কিছু লেখার মতো আছে যে কী লিখব, কতখানি লিখব সেইসব ঠিক করতে করতেই বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে ওঠে আর পেনটা নামিয়ে রাখতে হয়।  বহুদিন মনে জমে থাকা এই কথাগুলো, যেগুলো এইসব কারণে আমার বলা হয়ে ওঠেনি।  আজ চেষ্টা করছি সেইসব কথাগুলো যতটা বলা যায়।  যেহেতু কোনো প্রথাগত ক্রিটিসিজমে ছবির ভেতর –ism  খুঁজতে খুঁজতে ছোট ছোট অনেক আবেগ ঢাকা পড়ে যায় তাই এখানে কোনও প্রথাগত আলোচনা করছি না।  বরং অভিজ্ঞতা ও ভাবনা মিশিয়ে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করছি।  আসলে এই কথাগুলো ভাগ করে নিতে খুব ইচ্ছে করে।

কত আবেগ মিশে থাকে না যখন আমরা একটি ছবি আঁকছি।  যা হয়তো ছবির উপর থেকে খুব একটা দেখা যায় না।  দেখা যায় না কত বজ্র-বিদ্যুৎ ভেঙে পড়ে বুকের উপর।  এক একটি ছবি তো এক একটি মুহুর্তের সাক্ষ্য বুকে নিয়ে জেগে থাকে শিলালিপির মতো যা থেকে আমরা খুঁজে নিতে পারি পূর্ব-ইতিহাস, পূর্ব-আবেগ, পূর্ব-অনুরাগ, জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত সংকট।  এভাবেই তো এক একটি ছবি হয়ে ওঠে শিল্পীজীবনের বিরাট ক্রোনোলজি।  তবে একথা স্বীকার করে নিতেই হবে যে, যে আবেগ নিয়ে শিল্পী একটি ছবি আঁকছেন দর্শকের কাছে তা একই অনুভূতি নিয়ে ধরা নাও দিতে পারে।  দেয় না।  বরং কখনও কখনও পৌঁছে যায় আরও গভীর কোনো ভাবনায়, যা সেই ছবিটির জন্য একটি নতুন সিংহদুয়ার উন্মুক্ত করে দেয় যেখান দিয়ে আমরাও ঢুকে ঘুরে আসতে পারি তার অন্দরমহল।  তবে খুব বেশি পরিপাটি ছবিতে বোধহয় সেই অবকাশ থাকে না।  সেখানে আমাদের দৃষ্টি আটকে যায় স্কিলের কাছে।  এখানে বলা প্রয়োজন, স্কিলফুল রিয়ালিস্টিক ছবি গুরুত্বহীন এটা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়।  ছবিতে স্কিল তো দরকার হয়ই, না হলে আবেগগুলোও তো রূপ পাবে না।  যারা ছবি নিয়ে থাকেন, ছবি নিয়ে পড়াশুনা বা চর্চা করেন তাঁরা নিশ্চয়ই এই দুই ক্ষেত্রের পার্থক্য বুঝবেন।  তাই আবেগজারিত ছবি যা কিনা আবেগের মতোই একটু অগোছালো, সেখানেই বোধহয় আমাদের ভাবনারা প্রসারিত হবার সুযোগ পায়।  আর সংবেদনশীল দর্শককে তা তো ভাবাবেই।  এক্ষেত্রে আমার এক কবিবন্ধুর কথা পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

সালটা ২০১১-১২।  তখন জীবনের কাছে প্রতি মুহুর্তে হেরে যাচ্ছিলাম।  জীবনের যুদ্ধে একা সৈনিক হয়ে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলাম প্রতিপক্ষের দ্বারা।  আর বুঝতে পারছিলাম প্রতিপক্ষ কীভাবে লেডি ম্যাকবেথের মতো সারা মুখে সেঁটে রেখেছে ইনোসেন্সের মুখোশ।  প্রতিপদে খসে পড়ছিল সেই মুখোশ আর আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল সেই লুকিয়ে রাখা হিংস্রতা।  আর তা থেকেই জীবন আন্দোলিত হয়ে ২০১২-তে জন্ম দিয়েছিল আমার মাস্ক ২ ছবিটির ভ্রুণ।img-20160722-wa0003   যে ছবিটি ছিল সম্পূর্ণভাবে আমার পার্সোনাল জয়-পরাজয়ের ইতিবৃত্ত তা আমার সেই কবিবন্ধুর কাছে অদ্ভুতভাবে ইউনিভার্সাল হয়ে ধরা দিল।  এই ছবিতে তিনটি মুখোশের একটি চেন দেখা যায় যেটি তার কাছে এক গভীর তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত হল।  তার কাছে এই চেন হয়ে উঠল অসীম, যার কোনো শেষ নেই।  এমনকি ভাসতে ভাসতে সে পৌঁছে গেল সৃষ্টির আদি লগ্নে যখন আদম ও ইভও প্রতারিত হয়েছিল এই মুখোশের দ্বারাই।  আরও একটি গভীর দিক সে উদ্ঘাটন করল — প্রত্যেকটি মুখোশ এক একটি মানুষকে বিষিয়ে দেবার জন্য রাখা হয়েছে।  যেখানে যেমন প্রয়োজন সেখানে তেমন মুখোশের ব্যবহার হবে।  অর্থাৎ মুখোশ পাল্টে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু হিংস্রতাটি ধ্রুবক।  স্বয়ং স্রষ্টাকেও নীরবে দাঁড়াতেই হয় কিছুক্ষণ।  যে ভাবনার ধারেকাছেই যায়নি স্রষ্টা, দর্শকরা তাদের নিজস্ব এক ভাবনায় এভাবেই তো সমৃদ্ধ করে নিজেদের।  নিজেদের আবেগ মিশিয়ে তাদের ক্ষতস্থানগুলোর জন্য সামান্য শুশ্রুষা তুলে নেয় ক্যানভাসের এক একটি আঁচড় থেকে।

এবার আর একটি ছবির কথা বলি।  আমার আর একটি ছবি ডিসট্যান্স আন্ডার ফেসেস-এ দেখা যাচ্ছে দুটি মুখের আদল।  তার মধ্যে নারীমুখের আদলে মগ্নতা নেই।  কারণ তা বিশ্বপ্রকৃতির কাছে উন্মুক্ত।  হয়তো বা অন্য ঠিকানার খোঁজে ব্যস্ত।  অন্যদিকে পুরুষ মুখটি এত বেশি মগ্ন সেই নারীকে নিয়ে যে তা ছবিটি দেখলেই বোঝা যায়।  আমি পুরুষ মুখের আদলে কোনও চোখ আঁকিনি।  হয়তো বা ছবির প্রয়োজনেই আঁকিনি অথবা এই মগ্নতা বোঝাতে।  কেন আঁকিনি এখন তা আর স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।  কিন্তু যে ব্যাখ্যা আমার সেই বন্ধু করল তা আমাকে সম্পূর্ণ চমকে দিয়ে ছবিটিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিল।  তার একটি শব্দের ব্যবহার আমাকে অনেকক্ষণ ভাবতে বাধ্য করেছিল।  শব্দটি হল ‘অভিযোজন’।img-20160722-wa0002  সে বলল মগ্নতার কারণে চোখদুটো বন্ধ থাকতে থাকতে অভিযোজনের ফলে লুপ্ত হয়ে গেছে।  যেন যুগ যুগান্তরের সঙ্গী সঙ্গিনী এই দুই আদল।  আবার যে ফুলটি পুরুষ আদলের দিকে ঝুঁকে গেছে তারও গভীরতর কারণ সে খুঁজল।  তাহলে এই যে ভাবনায় পৌঁছে যাওয়া তা তো গভীর আবেগ, অনুভূতির স্ফুলিঙ্গ থেকেই আসে।  একটি ছবি সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করে দিলেন যেভাবে বিধাতা সৃষ্টি করেছেন এই বিশ্বপ্রকৃতি।  আর তা থেকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছি নিজেদের মতো করে।  ঠিক সেভাবেই যদি কোনো ছবি আমাদের মননে এমনই এক প্রয়োজনীয় বস্তু হয়ে উঠতে পারে যে আমাদের আনন্দ, বিষাদ বা শূন্যতায় কিছুমাত্র সান্তনা বয়ে আনবে তাহলেই বোধহয় তাকে সার্থক সৃষ্টি বলা যায়।  যে ছবি শুধুমাত্র দেওয়াল সাজানোর উপাদান, আমাদের মনের গভীরে কোনও রেখাপাত করে না তা কি সত্যিই সার্থক সৃষ্টি কর্ম?  এভাবে যখন কোনও ছবিকে দর্শক অনুভব করতে পারে আর পৌঁছে যায় নিজস্ব ভাবনার খুব কাছে তখনই সার্থক হয়ে ওঠে শিল্পীজীবন, তাতে তার খ্যাতি যতই কম থাকুক না কেন।

চিত্র পরিচিতি :  ১। মাস্ক ২ ;  ২। ডিসট্যান্স আন্ডার ফেসেস

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.