শাকিলাকে নিয়ে

শিল্প আবিষ্কৃত হয়, শিল্পীও।  শাকিলাকে আবিষ্কার করেছিলেন চিত্রী বি. আর. পানেসর।  দেবকুমার সোম আবার আবিষ্কার করলেন শাকিলাকে।  এবার অন্যভাবে।

 

সময়টা আন্দাজ ১৯৯১ সাল।  কলকাতার চিত্রকূট আর্ট গ্যালারিতে একটি কোলাজ প্রদর্শনী নিয়ে সবিশেষ কৌতূহল তৈরি হয়।  সমমনস্ক সঙ্গীদের কান ঘুরে সেই প্রদর্শনীর কথা আমার কানেও উঠেছিল।  তখন আমরা পত্রিকা বের করি।  পাঁচকান হওয়া সেই কথায় জানতে পারলাম অখ্যাত নূরগ্রামে খ্যাতমান এক শিল্পীর জন্ম হয়েছে।  নাম তাঁর শাকিলা।  তাঁর ধর্মবাপ বিখ্যাত চিত্রী বি.আর. পানেসর।  শাকিলা তাঁরই আবিষ্কার।  শাকিলার প্রথম সেই প্রদর্শনী দেখা হয়নি, কিন্তু মৃণাল ঘোষ এবং মনসিজ মজুমদারের সমালোচনা পড়ে শাকিলা সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে কৌতূহল জন্মায়।  তালতলার বাজারের এক সবজি বিক্রেতাকে কীভাবে আবিষ্কার করলেন পানেসর, আর পর্যায়ক্রমে সেই সবজিবিক্রেতা মেয়েটার অভিযোজন হল কোলাজ শিল্পী শাকিলায় তা ইতিমধ্যেই চিত্রশিল্প সম্পর্কে উৎসাহীরা জানেন।  আমি সেই প্রসঙ্গসূত্র ছেড়ে বিশদে অন্য একটি দিকে মুখ ফেরাতে চাই।

কাকে বলে প্রতিভা?  প্রতিভা কি জিনগত?  না পরিবেশগত?  সত্যিই কি প্রতিভা বলে কিছু হয়?  কাকে বলে শিল্পীজীবন?  শিল্পীজীবনের সংকট?  শিল্পী কী সৃষ্টি করবেন?  কাদের জন্য করবেন?img-20150918-wa0016  কেনই বা করবেন?  শিল্প কি শিল্পের জন্য শুধু?  গ্রহীতা না থাকলে কি সৃষ্টি বেকার?  শিল্পী হয়ে ওঠার জন্য কি সত্যিই অনুপ্রেরণার প্রয়োজন?  যে-কোনো আর্টের ক্ষেত্রে, তা সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, অভিনয় যাই হোক, এই প্রশ্নগুলো চিরকালীন।  যারা আর্টের জগতে নিজেদের সাক্ষর রেখেছেন, কিংবা আগামীদিনেও রাখবেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে এই প্রশ্নগুলো মর্মস্থলের বিষয়।  শিল্পী মাত্রই এ-সব প্রশ্ন নিয়ে সংকটতাড়িত।  এ-নিয়ে পণ্ডিতেরা মোটা মোটা বই লিখেছেন।  সমালোচকেরা শিল্পীর জীবন ও কাজ নিয়ে কাটাছেঁড়া করেছেন।  কিন্তু সহমত হওয়া যায়নি।  নিউটনীয় সূত্রের মতো কোন স্থির সূত্র আবিস্কৃত হয়নি।  তবু, এই প্রসঙ্গগুলো থেকে যায়।  শিল্পকলা এবং তার স্রষ্টার জীবন বারবার আমাদের বিস্মিত করে।  আমরা হয়ত অনুপ্রাণিত হই।  তাই, এই প্রশ্নগুলোকেই সামনে রেখে আমরা বুঝে নেব শাকিলা নামের আদতে গ্রাম্য এক নারীর শিল্পীত জীবনচর্যার অভিমুখ।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বারুইপুরের প্রত্যন্ত এক গ্রাম নূরগ্রাম।  গ্রামে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী ধর্মে মুসলমান।  পড়াশুনা নয়, চাষবাস (মূলত সবজি ফলানো) তাঁদের প্রধান কাজ।  আর সেই সবজি ভোরের লোকাল ট্রেনে কলকাতার বাজারে এনে তাঁরা বিক্রি করেন।  গ্রামে ধর্মের প্রভাব রয়েছে।  রয়েছে ধর্মপ্রভু এবং রাজনীতির কারবারিদের বোলবোলা।  এইসব গ্রাম কুকর্মের জন্যই সংবাদ শিরোনামে আসে।  নয়তো প্রখর সূর্যের আলোয়ও গভীর অন্ধকার।  মুঘল আমল থেকে কোম্পানির আমল পেরিয়ে, ব্রিটিশ কলোনীর সময় পার করে গণতান্ত্রিক এক ব্যবস্থায় এসে দাঁড়ালেও বাংলার গ্রাম এখনও সেই আকবরি সময়েই পড়ে আছে।  ধর্মের কু-প্রভাব থেকে মানুষকে মুক্ত করা যায়নি।  শাসক আর শোষিতের সমীকরণ পাল্টায়নি।  আর নারীর অধিকার?  সে-তো খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয়।  এই অবস্থা সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সকলেই জ্ঞাত।  ফলে চোখ ফুটতে সংসারের হাল ধরতে মাত্র আট-নয় বছর বয়সে যখন শাকিলা তালতলার বাজারে মায়ের সঙ্গে সবজি বিক্রি করতে আসতেন, তখন তাঁর মধ্যে কোথাও কি ছিল শিল্পমনস্কতা?  এ এক কঠিন প্রশ্ন।  শাকিলার পক্ষেও ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।  শাকিলা তো পথের ধারে অনাদরে পড়ে থাকা ছোট্ট একটা পাথর নন, যাকে ঘষে-মেজে উজ্জ্বল করে তোলা যাবে?  ওয়েলিংটনের ওয়াই.এম.সি.-র হোস্টেলে থাকা চিরকুমার বি. আর. পানেসরের ছিল অদ্ভুত এক অসুখ।   দুরারোগ্য এক অসুখ।  আজকের পৃথিবীতে যে অসুখের কোনো চিকিৎসা হয় না।  ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে অবসর নিয়ে হোস্টেল জীবনে ফিরে যাওয়া।  ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে রাজ্যের পায়রাদের গম খাওয়ানো, তারপর বেলা বাড়লে শহরের বাজারে, ফুটপাতে পথশিশুদের মধ্যে মিশে যাওয়া।  তাদের খেতে দেওয়া।  পড়াশুনার ব্যবস্থা করা এবং কারোর মধ্যে এক শতাংশ শিল্পের সম্ভাবনা থাকলে তা বিকশিত করা।  না, পানেসর সাহেব এর জন্য কোনো এন. জি. ও. খোলেননি।  ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচারও করেননি।

আর এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল নবমবর্ষীয়া বালিকা শাকিলার।

প্রথম চোটে হয়ত দর্শনেই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন চিত্রী।  তাকে কাগজ আর রং পেনসিল দিলে সে নিজের মতো কিছু একটা আঁকে।  পানেসর মুগ্ধ হন।  দায়িত্ব নেন শাকিলার।  তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। img-20150918-wa0017 শাকিলার জন্মবাপ তাদের জন্ম দিয়ে কেটে পড়েছিলেন।  ফলে সংসার বাঁচাতে শাকিলাকে তার মায়ের সঙ্গে তালতলার বাজারে আসতে হত।  শাকিলার স্কুলে ভর্তি হওয়া, পানেসরের অভিভাবকত্ব মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না নূরগ্রামের কর্তাদের।  ফলে শাকিলার ভদ্রলোক হয়ে ওঠায় ইতি পড়ল।  আর মাত্র দশ বছর বয়সে দোজবর আকবর শেখের সঙ্গে বিয়ে হল তার।  সতীনের ঘরে এল শাকিলা।  পেছনে পড়ে রইল ছোট্ট একটা সম্ভাবনাময় অতীত।

শাকিলার জীবনকথা এখানেই শেষ হয়ে গেলে বিস্ময়ের কিছু থাকত না।  বরং, তা এক স্বাভাবিক ছন্দ বলেই মনে হত।  অচিরেই শাকিলা আকবর শেখের ঘরের বিনি পয়সার কাজের লোক হয়ে উঠলেন।  হাঁস-মুরগি-গরুর দেখাশোনা।  ঘর-গেরস্থালির কাজ, রান্নাবান্না, ঘরকন্না।  সতীনের সঙ্গে স্বামীকে ভাগ করে নেওয়া।  বিয়ের কিছুকাল পরে শাকিলা কলকাতায় পানেসরের হোস্টেলে স্বামীকে নিয়ে এলে অভিমানে পানেসর কিছু রুক্ষ ব্যবহার করেন।  শাকিলা ফিরে যান।  ফের আসেন তাঁর ‘বাবা’-র কাছে।  পানেসর বোঝেন শাকিলার সংসারে টানাটানি।  তাঁকে কিছু সাহায্য করার জন্য রঙিন কাগজ দেন।  উদ্দেশ্য ঠোঙা তৈরি করে যাতে কিছু আর্থিক সুরাহা হয় মেয়েটার।  সেই রঙিন কাগজ নিয়ে সংসারের কাজের অবসরে শাকিলা ঠোঙা তৈরি করতে থাকলেন।  আর রাত গভীর হলে সকলের সব দাবি মিটিয়ে কুপির কাঁপা কাঁপা আলোয় রঙিন কাগজ হাতে ছিঁড়ে বোর্ডের ওপর জুড়ে জুড়ে তৈরি করলেন কোলাজ।  এ তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত জীবনচর্যা।  এভাবে বিনা অনুপ্রেরণায়, বিনা প্ররোচনায়, হেতুহীন সৃষ্টি।  নজরুল যাকে বলেছেন, ‘সৃষ্টিসুখের উল্লাস’।  শিল্প তো তাই?  অহেতুক।  প্রকৃতির মধ্যে যে অপার সৌন্দর্য রয়েছে, তার কী কোনো হেতু আছে?  রোদ হাসে।  ফুল ফোটে।  বৃষ্টি মুখর হয়।  নদীজল বয়ে যায়।  বাতাস সুর তোলে কীসের তরে?  শাকিলার রাত জেগে করা এইসব কাজ আকবর দেখেন।  প্রশ্রয় দেন।  স্বামী-স্ত্রী চুপিচুপি কলকাতায় আসেন।  চিত্র প্রদর্শনী দেখেন।  ফিরে যান।  এইভাবে এক রোববার শাকিলা একটি কোলাজ নিয়ে উপস্থিত হন তাঁর ‘বাবা’-র কাছে।  চিত্রপট সমানভাবে চারভাগে ভাগ করা।  মুলো, বেগুন, টমাটো আর কাঁচালঙ্কা।  একেক ভাগে এক-একটি সবজি।  যেমন বাজারে মাটির ওপর চটের বস্তা পেতে সাজিয়ে রাখেন সবজি বিক্রেতা।  এই কোলাজ দেখে পানেসর মুগ্ধ হলেন।  দেখালেন তাঁর চিত্রী বন্ধুদের এবং জানালেন শাকিলার জীবন বৃত্তান্ত।  তার ফল ১৯৯১ সালে চিত্রকূটের প্রদর্শনী।

শাকিলার কাজ গৃহীত হল কলকাতার বিদগ্ধ সমাজে।  পানেসরের হাত ধরে আরও অনেকেই এগিয়ে এলেন শাকিলার শিল্পচর্চাকে এগিয়ে দিতে।  তাঁদের মধ্যে অন্যতম সিমা আর্ট গ্যালারির রাখী সরকার।  যাঁর উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে দিল্লিতে প্রদর্শনী এনে দেয় জাতীয় সম্মান।  আজ শাকিলার কাজ আন্তর্জাতিক।  আজ তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র হয়।  হয় তাঁর জীবন নিয়ে গ্রন্থ রচনা।  এ-সবই সফলতার স্বাদ।  নূরগ্রামের সাবেক মেটে ঘর ছেড়ে পাকা বাড়িতে চলে এসেছেন  শাকিলারা।  তাঁর গ্রামের সকলেই তাঁর জন্য গর্বিত।  এ-সব অজানা তথ্য নয়।  আমরা বরং মূল প্রশ্নগুলোতে আবার ফিরে যাই।

একটি গ্রাম্য, নিরক্ষর, প্রান্তিক মানুষ।  যিনি আবার ধর্মে সংখ্যালঘু এবং নারী।  তিনি কোনো প্রকৌশল না জেনে, কোন বিদ্যানিকেতন কিংবা শিল্পমন্দিরে পাঠ গ্রহণ না করেও কীভাবে এত প্রতিকূলতার মধ্যে সৃষ্টিতে মুখর থাকতে পারেন?  শাকিলা সংসারের সকলের প্রতি তাঁর দায় ও দায়িত্ব পালন করেন।img-20150918-wa0013  তিনি ধর্মের সাবেক রীতি-নীতির বিরুদ্ধে কখনও শ্লোগান দেন না।  নারীর অধিকার, নারীর সম্মান নিয়ে কোনো সেমিনারে, কোনো কাগজে কখনই বক্তৃতা দেন না।  তবুও তাঁর ছবিতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস বিষয় হয়ে ওঠে।  মুসলমান ঘরের বউ হয়ে হিন্দু দেবী কালীকে তিনি তাঁর কোলাজে বারবার বিভিন্ন প্রেক্ষিতে আবিষ্কার করেন।  গ্রামের ঘরদোর, মাটির দাওয়া, পুকুর, হাঁস-মুরগি, সবজি, গ্রামের বাজার, এ-সবই হল শাকিলার শিল্পের বিষয়বস্তু।  আমরা যারা জাঁক করে  নিজেদের মেধাজীবী হিসেবে প্রচার করি।  আমরা যারা শহরের সুবিধাবাদী মেকি জীবনের অংশীদার, আমাদের সকলের কাছে এই টমাটো, লঙ্কা, বেগুন, হাঁস, মুরগি, বাজার-দোকান অতি তুচ্ছ বিষয় যা শাকিলার ক্যানভাসে উঠে আসে।  আমরা মেধা ভিক্ষা করি রেমব্রান্ট, ভ্যানগঘ, মাতিস, পিকাসো, দালির শিল্পবস্তু থেকে।  স্বকীয়তা আবিষ্কার করতে গিয়ে কখন যে কৃত্রিমতার ফাঁসে গলায় টান পড়ে বুঝে ওঠার সময় হয় না।  আমরা কবিতা লিখি ফেসবুকে লাইক পাবার জন্য।  আমরা গল্প লিখি সুখী গৃহীদের জন্য।  ছবি আঁকি বিদেশে প্রদর্শনী কিংবা পুজোর থিম বানানোর জন্য।  গান গাই ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।  আমাদের দেশের শিল্পীদের চেয়ে কাঙাল আর কারা আছেন?  ভিখারি তো আমরাই।  যারা সরকারি পদ আর পুরস্কারের লোভে নিজেদের বিবেক বিক্রি করে দিয়েছি।  ঠিক এই জায়গায় শাকিলার মহানুভবতা।  তিনি এখন সাবেক অর্থে খ্যাতমান।  তবু নূরগ্রামের সমাজ কিংবা তাঁর পরিবারকে এখনও অবজ্ঞা করেন না।  দুই তরফের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনো এবং বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন।  পানেসরের কাছ থেকে পাওয়া উপচে পড়া ভালোবাসায় তিনি তাঁর প্রতিবেশকে স্নাত করেছেন।  এখন তাঁর সংসার বড়ো হয়েছে।  ছেলের বউয়েরা সংসার সামলান।  নিজের বাড়ির একটা ঘরকে স্টুডিও বানিয়ে কাজ করেন শাকিলা।  শাকিলা আজ অনেকের অনুপ্রেরণা।

 

চিত্র পরিচিতি : ১। নিজের স্টুডিওতে শাকিলা;  ২। পানেসর;  ৩। শাকিলার কোলাজ।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.