আমার ছবিকথা

আমার ছবিকথা বিভাগে এবারে কলম ধরেছেন  বনশ্রী ভট্টাচার্য্য। তাঁর বেড়ে ওঠার প্রতি পদক্ষেপে ছবি কিভাবে হাত ধরেছে তার সেই গল্প এবার আমাদের জন্য।

 

ছবি সম্পর্কে খুব যে বুঝি তা কখনোই বলতে পারি না।  ছোটো থেকে গান-বাজনার পরিবেশে বড়ো হলেও খুব একটা ছবি দেখার সুযোগ হয়নি।  তারই মাঝে, ছড়ার বই-এর পাতায় ছবি দেখে আঁকার নিষ্ফল চেষ্টা করতাম।  আমার প্রথম ছবি দেখার বই ছিল ছোটদের মহাভারত ও রামায়ণ।  অদ্ভুত সুন্দর লাগত সাদা ও হালকা কমলা রঙের ছবিগুলোর ভঙ্গিমা।  এরই সঙ্গে চাঁদমামায় আঁকা রঙিন ছবিগুলো ভীষণ মন টানত।  এই চাঁদমামাতে প্রথম জানতে পারি শিল্পী রবি বর্মা সম্পর্কে।  তাঁর আঁকা সীতাহরণের ছবি দেখে মনে মনে আকৃষ্ট হয়েছি।

তবে ছবির প্রতি আমার দৃষ্টি সব থেকে আকর্ষণ করেছিল বিকাশ ভট্টাচার্যের রামকিঙ্কর বেইজকে নিয়ে আঁকা ছবিগুলি।  প্রথম রামকিঙ্করকে জানি ক্লাস থ্রিতে।  বাবার জমানো অসংখ্য দেশ পত্রিকার পাতায় তাঁকে চিনে নিই দেখি নাই ফিরে পড়ে।dekhi nai phire  সেই বয়সে খুব যে কিছু বুঝতাম তা না, কিন্তু একটা আপন-ভোলা লোক আর তাঁর উন্মাদ আচরণ বড়ো ভালো লাগতো।  বড়ো হয়ে আবার পড়েছি, আপনজন মনে হয়েছে।  একটা আফশোস খুব কাজ করে মনে — যদি একটিবারের জন্য মানুষটাকে চাক্ষুষ করতে পারতাম!  পরবর্তীকালে এই মানুষটিকে আরো শ্রদ্ধাবনত হয়ে নতুন করে চিনলাম শান্তিনিকেতনের ভাস্কর্যগুলি দেখে।  সুজাতা, কলের বাঁশি, সাঁওতাল পরিবার — কী সুন্দর!  মাটির গন্ধ পাই যেন।

তবে আমার চোখে চিত্রশিল্পের সব থেকে অভিনব সৃষ্টিটি হলো রবিঠাকুরের কবিতার মাঝে মাঝে নিজস্ব শৈলীতে আঁকা অবয়বগুলি।  বাতিল শব্দের কাটাকুটিকে এত সুন্দর করে আঁকার ফর্মে ঢালা যায় তা আমার কাছে একটা মস্তবড়ো আশ্চর্য।  এখন আমি ছবি সম্পর্কে একটু-আধটু জানি।  লাইন ড্রয়িং, স্কেচ্, প্যাস্টেল, তেলরঙ, জলরঙের পার্থক্য বুঝি।  চিত্তপ্রসাদ, বিনোদবিহারী, হরেণ দাস, সোমনাথ হোর, যোগেন চৌধুরী — এঁদের নাম ও সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি।

ছবি তো কেবল ছবি নয়।  রঙের সঙ্গে কল্পনা মিশেই তো ছবি তৈরি হয়।  এভাবেই সেই ছোটবেলাতে গান শুনতে শুনতে আর ছড়া পড়তে পড়তে কল্পনার রাজ্যে পৌঁছে যেতাম।  কল্পনায় ভর করে মনের মধ্যে জন্ম হত ছবি।  সে ছবি সবসময় যে রঙিন হতো এমন নয়।02 Pathar Bahnga Haren Das  চোখের সামনে সাদা-কালো ছবিও ভেসে উঠত।  ছোটবেলায় বাবার এনে দেওয়া দেশবিদেশের রূপকথা পড়তে পড়তে এবং বই-এর পাতায় সাদা-কালো ছবিগুলি দেখতে দেখতে মনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যেত আস্ত একখানা রূপকথার রাজ্য।  রাশিয়ার রূপকথা কিংবা চিনদেশের রূপকথার পাতায় পাতায় আঁকা ছবিগুলি ওইসব দেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেছিলো।  মনে পড়ে, বুরাতিনোর গল্পতে প্রথম এক ধরণের ছবির সাথে পরিচয় হয়েছিলো।  কী অপূর্ব ছিল সে সব ছবি!  কিছুটা কার্টুনের ধাঁচে আঁকা।  যদিও কার্টুন কাকে বলে তখন জানা ছিল না, পরে বুঝতে শিখেছি।  ছোটবেলায় আরও একটা বিষয় ছিলো যা কল্পনাকে উসকে দিত, তা হলো — গান।  বাবার গান শোনার শখ।  নতুন জামাকাপড়ের সাথে বাড়িতে আসত নতুন ক্যাসেট।  টেপরেকর্ডারে যেদিন প্রথম শুনেছিলাম পালকির গান, চোখের সামনে ছয় বেহারাকে পালকি কাঁধে নিয়ে ছুটতে দেখেছিলাম।  এভাবেই কখনো ছড়া, কখনো গান, কখনো গল্প থেকে ছবির অবয়ব খুঁজে পেতাম।  আবার ছবির মধ্যেও কখনো ফুটে উঠত অন্য আর এক ছবির দেশ।  আফশোস, আজ আর সে সব ছবি তেমন করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে না।  বড়ো হওয়ার এটাই বোধ হয় সব চেয়ে খারাপ দিক।

চিত্র পরিচিতি :  ১। দেখি নাই ফিরে-র প্রচ্ছদ;  ২। হরেণ দাসের ছাপচিত্র।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.