শিল্পের আদর্শ

আমাদের কাছে তাঁর পরিচয় ইতিহাসবিদ হিসাবে।  মুর্শিদাবাদের সন্তান রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বিখ্যাত মহেঞ্জোদারো সভ্যতার আবিষ্কারক হিসাবে।  কিন্তু তাঁর এই পরিচয়ের বাইরেও আরও একটি পরিচয় আছে যার খবর আমরা অনেকেই রাখিনা।  শিল্পকলা নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তার প্রকাশ ঘটেছে বেশকিছু লেখার মধ্যে দিয়ে।  তারই একটি এবারে উদ্ভাসের পাঠকদের জন্য।  এই প্রবন্ধটির জন্য আমরা শ্রীপ্রকাশ দাস বিশ্বাসের কাছে ঋণী।

শিল্প জিনিসটা আমাদের দেশে অনেকদিনই আছে কিন্তু কথাটা এখন যেভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে সেভাবে ভারতবর্ষ যখন স্বাধীন ছিল তখন ব্যবহার করা হত না।  তখনকার কালের অর্থ অনুসারে শিল্প মানে Craft।  শিল্পী ছিল Craftsman, অথচ এখন আমরা শিল্প বলতে Art বুঝি, Craft বুঝি না।  এই দুটায় যে তফাৎ আছে সমালোচনা করবার সময়ে সেটা ভুলে যাই।Rakhaldas Bondopadhyay  বর্তমান যুগে শিল্প কথাটা যেভাবে ব্যবহার হয়ে এসেছে তাতে তাকে পরিবর্তন করে তার বদলে কলাবিদ্যা কথাটা ব্যবহার করলে হয়তো আধুনিক রসিকের কর্ণপীড়া জন্মাবে এই ভয়ে প্রাচীন শব্দটা পরিত্যাগ করে আধুনিকটাই ব্যবহার করা গেল।  ইংরাজিতে Art বলতে যা বোঝায় আমাদের দেশে তার নাম ছিল চতুঃষষ্ঠি কলা।  আলেখ্য আর তক্ষণ তার মধ্যে দুটি।  আলেখ্য মানে ছবি আঁকা, আর তক্ষণ মানে খোদাইয়ের কাজ, ভাস্করের কাজ তার মধ্যে আসে।  ভাস্কর যখন একটা আদর্শ নিয়ে সেই ছাঁচে বেচবার জন্য হাজার হাজার মূর্তি গড়ে তখন তার কলাবিদ্যাটা শিল্প হয়ে দাঁড়ায়।  তেমনি চিত্রকর যখন একটা আদর্শে একটা ভালো ছবি আঁকেন এবং তার পরে একই ছবির দশখানা নকল করে বিক্রয় করেন তখন তাও কতকটা শিল্প হয়ে দাঁড়ায় অর্থাৎ সে Artist, Craftsman নন।  মোটের উপরে কলায় আর শিল্পে এই তফাৎ।

আমাদের দেশে সুকুমার কলার মধ্যে অনেক ভাগ ছিল।  বাৎস্যায়নের কামসূত্রে কলাবিদ্যার এই চৌষট্টিভাগের অর্থ করতে গিয়ে ইন্দ্রপাত উপাধিকারী যশোধর যা লিখেছেন তা অনেক সময় ঠিক নয় কারণ যশোধর যখন জয়মঙ্গলা টীকা লিখেছিলেন তখন অনেক অর্থ-বিকৃতি হইয়াছিল।  কিন্তু তখনও ভারতবর্ষ স্বাধীন ছিল, চিত্র, আলেখ্য, মূর্তি ও প্রতিমা গড়া হত সুতরাং Art-ও ছিল, Craft-ও ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক বিভাগের একটা আদর্শ ছিল।  আমাদের দেশে এবং সকল দেশে জাতির জাতীয় জীবনের বিকাশের বা অবসাদের সঙ্গে সঙ্গে এই আদর্শের বিকৃতি হয় সেজন্যই যাঁরা প্রাচীন শিল্প নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা একখানি ছবি বা একটা মূর্তি দেখলেই বুঝতে পারেন সেটা কোন দেশের এবং কোন সময়ের জিনিস।  আমাদের দেশে আবনীন্দ্রিক School-এর প্রতিষ্ঠা অতি অল্পদিন হয়েছে, তার পূর্বে আমরা ইংরাজি ছবির বা মূর্তির যথা এবং অযথা অনুকরণ করতুম।The_Last_Journey_1913_Abanindranath  আবনীন্দ্রিক School একটা নূতন জিনিস নয়, প্রাচীন ভারতে চিত্রবিদ্যার যে প্রথাটা সংকীর্ণ হয়ে রাজপুতানায় বা মোগল বাদশাহদের রাজসভায় অতি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বেঁচেছিল এটা তারই পুনঃপ্রতিষ্ঠা।  শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠানের গুণও আছে দোষও আছে, সে বিচার হয়তো একদিন করতে হবে।  সেটা ছেড়ে দিলে দেখতে পাওয়া যায় যে আমাদের দেশে শিল্প প্রাণহীন, নকলেও বাহাদুরি নেই এবং চুরি পদে পদে ধরা পড়ে যায়।  তার কারণ যাঁরা শিল্প চর্চা করেন তাঁরা মুক্তকণ্ঠে বলেন, আদর্শের অভাব।  এখনকার বাঙ্গালা ভাষার নমুনা অনুসারে শিল্প কথাটাকে যেমন Art এর প্রতিশব্দরূপে ব্যবহার করছি, আদর্শ কথাটা তেমনি Ruskin যে অর্থে ব্যবহার করে গেছেন সেই অর্থে ব্যবহার করছি।  আদর্শ মানে Ideal, তা যেন কেউ Model অর্থে না নেন।  আমাদের আদর্শ আর ইংরাজের Ideal মানে কী।  যে জিনিসটা বাস্তব জগতে অসম্ভব, আমরা মনে মনে আদর্শটাকে সেই ভাবে গড়ে তুলি যেমন সুন্দরী নারী।  নারী যতই বড়োই সুন্দরী হোন না কেন, একটা না একটা খুঁত তাঁর দেহে বেরুবেই।  কিন্তু চিত্রকরের আদর্শ নারী কী?  সকল সৌন্দর্যের লক্ষণযুক্তা যে মানসিক চিত্রপটের মূর্তিটিকে আমরা বাস্তব চিত্রপটে বাস্তব জগতের নারীর মতো একটা দুটা খুঁত থেকে যায়, তিনিই আদর্শ।  উপস্থিত আমরা বাস্তব জীবনে অনেকগুলো আদর্শ হারিয়ে অন্ধকারে অন্ধের দলের মতো মাথা ঠোকাঠুকি করে মরছি।  শিল্পবিদ্যার আদর্শ, চিত্রেই হোক আর ভাস্কর শিল্পেই হোক তার মধ্যে একটা।

কলাবিদ্যার আদর্শ কী?  সর্বাঙ্গসুন্দর ছবি।  তা সে ছবিটা কাঠ বা পাথর থেকে তোলা হোক, কাঁচা গড়া হোক বা চিত্রপটে আঁকা হোক।  আদর্শ জিনিসটা একটা জাতির Mentality-র ওপর নির্ভর করে, একটা জাতির মনের যখন যতদূর শক্তি, তার ধারণা করবার অথবা অদৃষ্ট বস্তুকে বাস্তব আকার দেবার যতটুকু শক্তি তার উপরে তার আদর্শরূপী মানসী প্রতিমা গড়বার ক্ষমতা নির্ভর করে।  সে জাতির ভাস্কর, সে জাতির কুম্ভকার, সে জাতির চিত্রকর জাতীয় মানসিক শক্তি বিকাশের উপরে তার সৌন্দর্য গড়বার শক্তির জন্য নির্ভর করে থাকে।  এই জন্যই প্রতি যুগে আদর্শের বিকাশের তারতম্য হয় এবং সেই জন্যই যাঁরা Connoiseur তাঁরা জিনিসটা দেখেই কোন্ দেশের কোন্ যুগের তা বলে দিতে পারেন।  আদর্শ তাহলে মানসী মূর্তি, মানুষ মনে মনে অপরূপ সৌন্দর্যের যে কল্পনা করতে পারে তাই আদর্শ এবং ভাস্কর বা চিত্রকর সেটাই প্রতিমাতে বা মূর্তিতে ফুটিয়ে তুলতে চান।  মানসী মূর্তিটা কোনো একটা বিশেষ যুগে একটা জাতির চিন্তাশক্তির ক্ষমতা ও পরিমাণের উপর নির্ভর করে, একই জাতি চিরদিন আদর্শটাকে একভাবে রাখতে পারে না;  একই দেশে একই জাতির ভাস্কর মূর্তিতে একভাবের অপরূপ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারে না।  যে দেশের Venus de milo খুদে তোলা হয়েছিল সে দেশে তিনশো বছর পরে Roman ভাস্কর প্রাচীন গ্রিসের শিল্পের আদর্শ দেখতে আসত বটে কিন্তু সে দেশের ভাস্কর তখন আর সে মূর্তির আদর্শের ছায়াও মাড়াতে ভরসা করত না।

শিল্পের আদর্শ কী?  একটা জাতির মানসী মূর্তি কী?  সবাই বলে যা সবচেয়ে সুন্দর সেইটাই শিল্পের আদর্শ।  এইখানে আদর্শের পথে প্রতি পদে একটা বড়ো বাধা এসে উপস্থিত হয় — সেটা রুচি!  ভিন্ন রুচির্হি লোকাঃ!  হিন্দুর পক্ষে যেটা সর্বাপেক্ষা মুখরোচক খাদ্য, চীনার মতে তাহা অখাদ্য।  ক্ষীর, দুগ্ধ, নবনীত, ঘৃত প্রভৃতি গব্য আমাদের দেশে মুসলমানের কাছেও সুখাদ্য কিন্তু চীনা বিলাতে গিয়া তবে গব্য ব্যবহার করতে শিখেছে।  চীন সভ্যতার সীমাভুক্ত তিব্বত মাখন না পচাইয়া খেতে পারে না।  বাঙ্গালা দেশে হাঁসের ডিম একটু পচিলে আমরা খেতে পারি না কিন্তু আমার এক চীনদেশীয় বন্ধু এই কলিকাতা শহরে আমাকে নিমন্ত্রণ করিয়া একশো বৎসরের পুরাতন পক্ষীর ডিম খেতে দিয়েছিলেন!  ভিতরটা একেবারে কালো হয়ে গিয়েছিল বলে চীনা বন্ধু এবং বন্ধুনী অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছিলেন, কারণ তাঁরা আমার জন্য খাস চীনদেশের ক্যান্টন নগর থেকে এই জিনিসটা আমদানি করেছিলেন।  সমস্ত মঙ্গোলীয় জাতি এরূপ হিন্দুর নিকট যা একেবারে অখাদ্য তা পরম সুখাদ্য বলে খায়।  যেমন বর্মার মাছ পচানি ঙাপ্পি, জাপানের মাছ মাংস পচানির কলতানি, চীনার একশো বছরের ডিম ব্যাঙের মাংস।  সুতরাং রুচিভেদে আদর্শ ভেদ হওয়া কিছু আশ্চর্য নয়।  অথচ সকল দেশে সকল জাতীয় আদর্শই অপরূপ সৌন্দর্যের মানসিক চিত্র।

এখন দেশে দেশে বিদেশ যাত্রীর অনেক রকম সুবিধা হয়ে গিয়ে জাতীয় ভাবের আদানপ্রদানের বড়োই সুবিধা হয়ে গিয়েছে।  সাতশো বছর আগে আমরা যখন মানুষ ছিলাম অর্থাৎ স্বাধীন ছিলাম তখনকার জাতীয় আদর্শের যে আবছায়াটা এখন আমাদের মনে আছে সেইটাকেই আমরা সবচেয়ে বড়ো বলে মনে করি কারণ সেটা আমার নিজস্ব, আমার জাতীয় জীবনের অস্তিত্বের চিহ্ন, অন্য কারও তাতে কিছু অধিকার নেই।  যিশুখ্রিস্ট মরবার বারোশো বছর পরে আমাদের যে অবস্থা ছিল চীন বা জাপানের সেই অবস্থা ছিল কিন্তু জাপান কখনও মরেনি এবং চীন মরেও আবার বেঁচে উঠেছে কিন্তু আমাদের সে আশা অতি অল্প।  সুতরাং আমাদের জাতীয় জীবনের শেষ দশার মানসী মূর্তির যে আবছায়াটা আমাদের মনে লেগে আছে অথবা নেপাল থেকে খুঁজে আনা শিল্পশাস্ত্রের ভেতর লুকিয়ে আছে সেইটেই আমাদের কাছে বেশি বড়ো বলে বোধ হয়, কারণ সেটা Patriotism।

মরে মরেও যখন আমাদের নাড়ি এখনও ছাড়েনি, কণ্ঠের শ্বাস রুদ্ধ হলেও যখন চোখ মেলে মাঝে মাঝে দেখি তখন দুনিয়ার খবরটা আমাদের পেতেও হয়, নিতেও হয়।  আমাদের এখনকার রাজারা দেশ বিদেশের বর্তমান ও অতীতের আদর্শের পরিবর্তনের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছেন সুতরাং আমাদের অতীতের এই শেষ ভাগটায় তারকব্রহ্ম নাম নিতে নিতেও দু-একটা কথা শিখে ফেলেছি, কিন্তু Liver abscess হওয়ার দরুন হজমটা করতে পারিনি।  সেই জন্যেই এখনও আদর্শ খুঁজি আর অন্ধকারে মাথা ঠোকাঠুকি করে মরি।Egyptian_harvest

শিল্পের আদর্শ সৌন্দর্য।  সৌন্দর্যের পরিকল্পনা একটা জাতির মানসিক শক্তির উপরে নির্ভর করে।  ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশে মানসী প্রতিমা ভিন্ন ভিন্ন আকার ধারণ করেছিল।  এখন যাতায়াতের সুবিধা হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন যুগের আদর্শের তুলনা সম্ভব হয়েছে, সুতরাং মানসী প্রতিমা পরিকল্পনার তুলনা শিল্পের ইতিহাস আখ্যা লাভ করে ঐতিহাসিক সাহিত্যের একটা অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  সমস্ত প্রাচীন কলার আলোচনাই প্রত্নতত্ত্ব, আর জীবন্ত কলাবিদ্যার আলোচনার অধিকার মানুষ মাত্রেরই আছে।  এই অধিকার নিয়ে প্রাচীন ও আধু্নিক শিল্পের বিশ্লেষণে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

প্রাচীন শিল্প কী?  মানুষ যখন ঘর বাড়ি তৈরি করতে জানত না, যখন পর্বতের গুহায় বা বৃক্ষের কোটরে বাস করত তখনও মানুষের শিল্প চর্চার চেষ্টা ছিল।  তার পরিচয় আমাদের দেশে এবং বিদেশে অনেক জায়গায় পাওয়া যায়।  আদিম যুগের মানুষ অনেকটা শিশুর মতো ছিল।  আমরা পাঠশালে পড়বার সময় কঞ্চি দিয়ে ধুলার উপরে অথবা শ্লেটের উপরে পেনসিল দিয়ে যেমন পণ্ডিতমশায়ের ছবি আঁকতুম, আদিম মানবও অনেকটা সেই রকমে প্রথম ছবি আঁকতে শিখেছিল।  আমরা যেমন স্কুলের বেঞ্চিতে ছুরি দিয়ে দাগ কেটে মানুষের মূর্তি খুঁদে তুলতুম, আদিম মানবও সেই রকম করে হাড়ে অথবা পাথরে দাগ কেটে ভাস্কর শিল্পের আরম্ভ করেছিল।  মানুষের আদর্শ বাস্তব থেকে নেওয়া।  আমরা স্বর্গের কল্পনা করি এই জগৎ থেকেই।  এই জগতে যেখানে যা কিছু সুন্দর যা কিছু উপভোগ্য আছে, জগতে প্রত্যেক জাতি যে জিনিস অভাব অনুভব করে সেই জিনিসের ভাব দিয়েই তারা তাদের স্বর্গ গড়ে তোলে।  তেমনি আদিম মানুষ গাছপালা হরিণ ও মানুষ প্রথমে যতটা সুন্দর করে পারত ততটা সুন্দর করেই আঁকতে চেষ্টা করত।  ক্রমে অনেক দিনের অভ্যাসে সে চিত্রটা কতকটা বাস্তব জীবনের মতো হয়ে উঠত।  এই হল চিত্রবিদ্যার আরম্ভ।

কোন্ দেশের মানুষ এই রকম করে আরম্ভ করে কতটা কৃতকার্য হয়েছিল এবং কোন্ যুগে হয়েছিল তার তুলনা নিয়েই শিল্পের ইতিহাস।  অতি প্রাচীনকালে প্রাচীন মিশর দেশের লোকেরা ছবি আঁকতে শিখেছিল।  তারা তাদের নিজের মনের মতো আদর্শ গড়ে নিয়ে সেই আদর্শ চিত্রে অথবা মূর্তিতে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল এবং মিশর দেশের জলবায়ুর গুণে সে নমুনাগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি বলে আমরা এখনও পাঁচ হাজার বৎসর আগেকার শিল্পের নমুনা দেখতে পাই এবং আলোচনা করতে পাই।  এই এখন মিশর দেশের রাজা তুত-অঙ্খ-আমেনের যে কবর খোঁড়া হচ্ছে এবং তাতে যে-সমস্ত জিনিস পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো মিশরের শিল্পের ইতিহাসের একটা পাতা মাত্র।  মিশরের শিল্পের শিষ্যত্ব স্বীকার করে প্রাচীন গ্রিস একদিন নিজের শিল্পের আদর্শ গড়েছিল, পাশ্চাত্য জগতের কাছে সেই গ্রিসের শিল্পের আদর্শই সবচেয়ে সুন্দর কারণ তা সবচেয়ে বাস্তব।  গ্রিসের আদর্শ অতীতে ও বর্তমানে সমস্ত পাশ্চাত্য জাতির শিল্প ও সাহিত্যের আদর্শ।  অতীত যা অনুকরণ করেও করতে পারেনি বর্তমান তা করেছে কিন্তু পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে পাশ্চাত্যের অতীত আদর্শ সুন্দর না বর্তমান সুন্দর তাই বিচার্য।venus-de-milo

গ্রিক ভাস্কর নগ্ন নর ও নারী মূর্তি গঠন করে প্রাচীন ও অর্বাচীন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যজগতে যে সুখ্যাতি কিনে গেছে আর কোনো দেশের ভাস্কর আর কোনো যুগে তা পারেনি কেন?  তার কারণ গ্রিক ভাস্কর প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝে সর্বাঙ্গসুন্দরের সম্পূর্ণ আদর্শ মনে এঁকে নিয়ে তারপর ছবি আঁকত অথবা মূর্তি গড়তে আরম্ভ করেছিল।  তখন Christian Convention জন্মায়নি, নগ্ন-মূর্তি সম্ভ্রমের চক্ষে দেখা যায়, রিরংসার উদ্যোতন না করে যে কাল্পনিক সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা উপভোগ করা যায় তা প্রাচীন গ্রিক বুঝত।  যতদিন গ্রিক তা বুঝেছিল, যতদিন সে সৌন্দর্য দেখেও আত্মসংযমের ক্ষমতা তার ছিল ততদিন সে পাশ্চাত্য জগতের শিক্ষাগুরু ছিল।  সৌন্দর্য উপভোগ করবার ক্ষমতা সকলের থাকে না, যে সংযমী, যে ভোগশক্তির অপব্যয় করে না, উপভোগের ক্ষমতা তারই থাকে।  রোমক জগতের শেষদিকে ভীষণ বিলাস ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক যে সংযমের ভাণ করত তা সংযম নয়।  সৌন্দর্যের পরিকল্পনা নানাবিধ বাধাবিপত্তি ও গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে সর্বাঙ্গসুন্দরী হতে পারেনি সেই জন্যই রোমক শিল্পের আদর্শ খ্রিস্টধর্মের প্রভাবে শিল্পের সাহিত্যে উচ্চস্থান লাভ করেনি কিন্তু ধর্মযাজকের মনগড়া গণ্ডি যখন ভেঙে গেল, ইতালির ভাস্কর আর ইতালির চিত্রকর যখন এই কৃত্রিম বন্ধনমুক্ত হল, যা প্রকৃত সুন্দর, যার আদর্শ সত্য সুন্দর এবং নিত্য সুন্দর তা যখন মন খুলে বলবার ক্ষমতা ইতালিতে ফিরে এল, তখন শিল্প আবার স্বস্থানে ফিরে গেল।  ইতালির সে গৌরবের যুগ Pegan Renaisance নামে খ্যাত  এবং শিল্পের ইতিহাসে সে যুগের আদর্শের স্থান অতি উচ্চ।  প্রকৃত সৌন্দর্যকে দমন করে রাখবার চেষ্টা শিল্পের প্রকৃত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা, শিল্পের প্রকৃত বিকাশের পথে বাধা দেওয়া এবং জাতীয় উন্নতির পথ কণ্টকাকীর্ণ করা।  এই কথা যে দেশে যে জাতি যখন বুঝেছে তখনই স্বভাবদত্ত ক্ষমতায় সে জাতির মানসী প্রতিমা পূর্ণাবয়বা সর্বাঙ্গসুন্দরী হয়ে উঠেছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় চিন্তাশক্তি পূর্ণ বিকাশের অবসর পেয়ে অবসাদের পরে স্ফূর্ত হয়ে উঠেছে।

শিল্পশাস্ত্র শিক্ষার জন্য।  শিল্পী যখন ছাত্রকে শিক্ষা দেয় তখন বর্ণপরিচয়ের মতো শিল্প-শাস্ত্র পড়ায় কিন্তু সেই শিষ্য ছাত্র জীবনের শেষে যখন শিল্পী হয়ে ওঠে তখন সে শিল্পশাস্ত্রের গণ্ডি সমাজের Convention মানুষের গড়া ধর্মমতের গণ্ডি অতিক্রম করে নিজের মানসী প্রতিমা নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলতে চায় এবং যখন সে তা পারে তখনই শিল্প সেই দেশে চরম উৎকর্ষ লাভ করে।  শিল্পশাস্ত্র দেহের তুলনায় মুখের পরিমাণ বলে দিতে পারে কিন্তু মুখখানা গড়া হলে কীভাবে দেখাবে সেটা শিল্পীর আত্মবোধের আর কল্পনাশক্তির ওপরে নির্ভর করে।  জগতে কোনো শিক্ষক বা কোনো শাস্ত্র সে সম্বন্ধে তাকে উপদেশ দিতে পারে না।

চিত্র পরিচিতি : ১। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্লভ চিত্র;  ২। অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ‘দা লাস্ট জার্নি’ (১৯১৩) ;  ৩। ঈজিপ্টের চাষবাসের ছবি;  ৪। প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্য ভেনাস : শিল্পী আলেকজান্দ্রাস্।

 পুনপ্রকাশ: সচিত্র শিশির, (মাঘ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ)  সংখ্যা থেকে।  শব্দ গঠন ও বাক্য রচনায় আধুনিক রীতি অনুসরণ করলেও  লেখাটিতে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বানান মেনে চলা হয়েছে।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s