শিল্প-সমালোচক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের কাছে তাঁর পরিচয় ইতিহাসবিদ হিসাবে।  মুর্শিদাবাদের সন্তান রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরো একটি পরিচয় আছে।  প্রকাশ দাস বিশ্বাস তুলে ধরছেন সেই রাখালদাসকে।

 

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে (জন্ম ১৮৮৫, ১২ এপ্রিল; মৃত্যু ১৯৩০, ২৩ মে) আমরা, আম-জনতারা চিনি মহেঞ্জোদাড়োর আবিষ্কর্তা হিসাবে।  বহু বিতর্ক সত্ত্বেও শিশুপাঠ্য ইতিহাস থেকে শুরু করে উচ্চশ্রেণীর ইতিহাস বইতেও রাখালদাসের পরিচয় এটাই।  যাঁরা আর একটু  বেশি খোঁজ-খবর রাখেন তাঁরা তাঁকে ঐতিহাসিক উপন্যাসের রচয়িতা হিসাবেও চেনেন।  তাঁর রচিত ধর্মপাল, ময়ূখ, শশাঙ্ক, করুণা, ব্যতিক্রম প্রভৃতি উপন্যাস এককালে পাঠক মহলে বেশ জনপ্রিয় ছিল।  কিন্তু এইসব পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছেন আর এক রাখালদাস — তিনি হলেন শিল্প-সমালোচক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯১০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পরীক্ষায় পাশ করে তিনি কলকাতা জাদুঘরে পুরাতত্ত্ব বিভাগে যোগ দেন।  পুরাতত্ত্ব বিভাগের সংগৃহীত অসংখ্য মূর্তি ও ভাস্কর্যের সংগ্রহ থেকে তিনি প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলা বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।  এ বিষয়ে তাঁকে প্ররোচিত করেন জাদুঘরের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যক্ষ ড. থিয়োডোর ব্লখ।  তাঁর অনুপ্রেরণায় তিনি শুধু ভারতীয় জাদুঘরই নয়, অন্য সংগ্রহশালারও মূর্তি ও ভাস্কর্যের নিদর্শন সমূহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।  তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফলই প্রতিফলিত হয়েছে শিল্পকলা বিষয়ক তাঁর বিভিন্ন লেখায়।Rakhaldas_Bandyopadhyay

রাখালদাসের শিল্পকলা বিষয়ক বেশকিছু মূল্যবান লেখা সাময়িক পত্রের পাতায় মুখ লুকিয়ে বিলুপ্তির প্রহর গুনছে।  এগুলির মধ্যে সামান্য কিছু গ্রন্থিত হলেও বেশিরভাগই এখনও অগ্রন্থিত।  শিল্পকলা বিষয়ক লেখালিখিতে রাখালদাসের প্রধান কৃতিত্ত্ব এই যে, তিনি একটি নতুন শিল্প-ঘরানাকে বিশেষজ্ঞ মহলে পরিচিত করান ও তাকে প্রতিষ্ঠা দেন।  এই শিল্প-ঘরানাটি হলো ‘গৌড়ীয় শিল্প-ঘরানা’।  প্রিয় শিল্প নিয়ে প্রবাসী পত্রিকায় একাধিক প্রবন্ধ লেখেন রাখালদাস।  গৌড়ীয় শিল্পের ইতিহাস (মাঘ ১৩৩৪), গৌড়ীয় শিল্পের আদিযুগ (বৈশাখ ১৩৩৫), দশম শতকে গৌড়ীয় শিল্প (আষাঢ় ১৩৩৫), গৌড়ীয় শিল্পের পুনরুত্থান (অগ্রহায়ণ ১৩৩৬), গৌড়ীয় শিল্পে দাক্ষিণাত্য প্রভাব (বৈশাখ ১৩৩৭) এরকমই কয়েকটি প্রবন্ধ।  বৈদগ্ধে উজ্জ্বল, বিশ্লেষণে নতুন দিশা দেখানো প্রবন্ধগুলি প্রকাশ কালেই বিশিষ্টজনেদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়।  শিল্প বিষয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত  প্রবন্ধের পাশাপাশি তাঁর মেধা, বৈদগ্ধ ও পাণ্ডিত্যের পূর্ণ প্রকাশ দেখা যায় শিল্প বিষয়ক তাঁর একমাত্র বই Eastern Indian School of Mediaeval Sculpture বইতে।  তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে এই বই প্রকাশ করে Archeological Survey of India ।

এর বাইরে রয়েছেন আরো একজন রাখালদাস।  যিনি নাট্যসমালোচনাতেও আপন প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন।  ঐতিহাসিক নাটকের চরিত্রদের বেশবাস বা মঞ্চসজ্জা নিয়েও রাখালদাস লিখেছেন জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ।  বিচ্যুতি নিয়ে কলম ধরেছেন বহু ক্ষেত্রে।  সব মিলিয়ে শিল্প-সমালোচক রাখালদাসের পরিচয় আজো অনেকের কাছেই অজানা।

 

[সম্পাদকীয় সংযোজন : শিল্প-সমালোচক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যয়কে আমরা উদ্ভাসের পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করাতে ইচ্ছুক।  আগামী সপ্তাহে উদ্ভাসের ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হবে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ : শিল্পের আদর্শ।  এই প্রবন্ধটি সংগ্রহে আমরা শ্রীপ্রকাশ দাশ বিশ্বাসের কাছে ঋণী।]

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.