ভ্যান গঘের দেশে

বারবার ঘুরেছেন পৃথিবীর নানা ছবির সংগ্রহশালায়।  উদ্ভাসের সাথে সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন  মনোজিৎ কুমার ভাস্কর

কর্মসূত্রে বেশ কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে, বিশেষত ইউরোপে।  এরকম এক সংক্ষিপ্ত সফরে পর্তুগাল গিয়েছিলাম ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে।  পর্তুগাল মানেই মনের মধ্যে উঁকি দেয় ভাস্কো-ডা-গামার নাম, দুঃসাহসিক পর্তুগিজ নৌবহর ও তাদের দুর্ধর্ষ সব নৌ-অভিযান কাহিনি, আর অবশ্যই ল্যাটিন আমেরিকা শৈলীর ছন্দোময় পর্তুগিজ ফুটবল।  ভাষার সমস্যা থাকলেও পর্তুগিজদের আন্তরিকতা ও সুমিষ্ট ব্যবহার অনেকাংশে দুস্তর ভৌগোলিক ও সামাজিক ব্যবধান দূর করতে সমর্থ হয়েছিল।  লিসবন, পোর্তো, ব্রাগা, গুইমার্স ইত্যাদি শহর বেশ সমৃদ্ধ এবং বহুলাংশে ইউরোপের শিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও সঙ্গীতের স্বাক্ষর বহনকারী।Van Gogh

আমরা থাকতাম পোর্তো শহরে।  ইউসেবিও, লুই ফিগো এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর স্মৃতিধন্য ‘Estadio do Dragao’ স্টেডিয়াম আর ইউরোপের প্রসিদ্ধ কনসার্ট হল ‘Casa da Musica’ এই শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য।

যাইহোক, পরিকল্পনামাফিক অফিসের কাজ শেষ করে নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাড়ি ফেরার পালা।  যাত্রাপথ বেশ দীর্ঘ — পোর্তো-আমস্টারডাম-আবুধাবি-মুম্বই-কলকাতা।  ডিসেম্বর মাস, গোটা ইউরোপ সেজে উঠেছে বড়দিনের আনন্দে।  চতুর্দিকেই একটা উৎসবমুখর পরিবেশ, সঙ্গে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।  আমরা নির্দিষ্ট সময়ে পোর্তো থেকে বিমানে চাপলাম।  গন্তব্য নেদারল্যাণ্ডের রাজধানী আমস্টারডাম।  ওখানে আমাদের বিমান পরিবর্তন করে পরবর্তী গন্তব্য আবু ধাবি যেতে হবে।  সঙ্গী আমারই সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু পল্লব।  হাতে সময় খুব অল্প।  মাত্র দেড় ঘন্টা।  আমরা দুজনেই বেশ উৎকন্ঠার মধ্যে ছিলাম।  আমস্টারডামের আকাশে যখন আমাদের বিমান, জানলা থেকে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম; চারিদিকে প্রচণ্ড কুয়াশা — দৃশ্যমানতা খুবই কম।  পাইলট কিছুতেই বিমান অবতরণের অনুমতি পাচ্ছে না।  ফলস্বরূপ, বিমানটি ক্রমাগত মাঝ আকাশে চক্কর কেটে চলল আর আমাদের হৃদস্পন্দন সমানুপাতিকহারে বৃদ্ধি পেতে লাগল।  আমাদের দুর্ভাগ্য!  রানওয়েতে নামার অনুমতির পরেও ব্যস্ত Schiphol বিমানবন্দরে নির্দিষ্ট স্থানে বিমানটিকে পার্কিং করতে অনেক সময় অতিক্রান্ত হল।  বিমান থেকে অবতরণ করে পরবর্তী বিমান ধরার জন্য আমাদের হাতে মাত্র কুড়ি মিনিট সময়।  দুজনেই নিশ্চিন্ত হলাম এত অল্প সময়ে পরবর্তী বিমানে চেক-ইন করা অসম্ভব।  আমরা এতিহাদ এয়ারওয়েজের সাথে যোগাযোগ করলাম ও তাদের পরামর্শে পূর্ববর্তী বিমানসংস্থা ট্যাপ এয়ারওয়েজের কাছে অভিযোগ জানাতে তারা তৎক্ষণাৎ সমস্ত ঘটনার দায় নিয়ে আমাদের সেই রাতের জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করে দিল, সঙ্গে পরের দিনের আবু ধাবি-র টিকিট — ঠিক চব্বিশ ঘন্টা পরে।

মনে মনে ভাবছি যে এ আমাদের ‘শাপে বর হল’।  আমস্টারডাম ইউরোপের শিল্প-সংস্কৃতি-ভাস্কর্য ও চিত্রকলার অন্যতম পীঠস্থান।  হাতে চব্বিশ ঘন্টা সময় — কম হলেও খারাপ নয়।  মনের ভেতর রেমব্রান্ট, ভেরমিয়ের এবং অবশ্যই ভ্যান গঘ উঁকি দিতে লাগল।  এই সমস্ত অবিস্মরণীয় শিল্পীদের কালজয়ী শিল্পকর্মের চাক্ষুষ দর্শন করতে পারব এই ভাবনায় আমি রোমাঞ্চিত হলাম।Van Gogh Museum

বিমানবন্দর থেকে নির্দিষ্ট বাস ধরে আমরা যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন রাত প্রায় এগারটা।  ডিসেম্বরের রাতের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা, সঙ্গে নতুন জায়গার একরাশ উৎকন্ঠা এবং ভ্যান গঘ দর্শনের দুর্লভ হাতছানি — এই মিশ্র অভিব্যক্তিতে সিক্ত হয়ে আমি আর পল্লব হোটেলে পৌঁছালাম।

সেই রাত্রিতে কিছুতেই আমার দুচোখের পাতা এক হচ্ছে না।  চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছে সূর্যমুখী, দ্য পটেটো ইটার্স, স্টারি নাইট ওভার দ্য রোন — এই সমস্ত পৃথিবী বিখ্যাত ছবি।  ভ্যান গঘের ছবির আনন্দসাগরে ভাসতে ভাসতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা মনে নেই।  সুখনিদ্রা যখন ভাঙল তখন পূর্ব দিগন্তে মিষ্টি রোদের সোনালী ছটায় ডাচ জনজীবনেও একটু একটু করে কর্মব্যস্ততার স্পর্শ চোখে পড়ল।  তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আমরা আমস্টারডাম বিমানবন্দরে পৌঁছালাম।  আমরা জানিনা আমাদের ব্যগপত্র কোথায় আছে।  বিমানবন্দরে পৌঁছে এক সহৃদয় ডাচ প্রৌঢ়ের বদান্যতায় আমাদের ব্যাগপত্রের সন্ধান পাওয়া গেল।  তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে ভূ-গর্ভস্থ মেট্রোরেলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশন আধঘন্টার যাত্রাতেই আমরা পৌঁছে গেলাম।  আমস্টারডামের এই চত্বরটা বেশ জমজমাট ও শহরের কেন্দ্রস্থলও বটে।  অসাধারণ গথিকরীতির স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশন।  চারিদিকে অসংখ্য সুউচ্চ অট্টালিকা।  তবে আজকালকার মতন কংক্রিটের জঙ্গল নয়।  প্রতিটা বাড়িই অসাধারণ শিল্পসুষমায় মণ্ডিত।  পরিচ্ছন্ন রুচিবোধ ও নান্দনিক শিল্পচেতনায় পরিপূর্ণ এই বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় শিল্প ও শিল্পীর মর্যাদা দিতে জানে কঠোর পরিশ্রমী ‘হান্স’-এর উত্তরসূরীরা।

সতেরশো শতকে আমস্টারডামে যখন উদ্বাস্তু সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেসময় ডাচ প্রশাসন অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে আমস্টারডাম ক্যানাল সিস্টেম গড়ে তোলেন।  এইসমস্ত ক্যানালে সুসজ্জিত হাউজ্ বোটে করে শহরের অনেকটাই দেখা যায়।Monojit in front of Van Gogh Museum

আমস্টারডাম সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে একটি সুসজ্জিত ট্রামে করে আমাদের গন্তব্য ভ্যান গঘ মিউজিয়াম-এ পৌঁছলাম।  মিউজিয়ামটি আমস্টারডামের বিখ্যাত মিউজিয়াম স্কোয়ারে অবস্থিত।  এখানকার উল্লেখযোগ্য মিউজিয়ামগুলো হল Stedelijk Museum, Raijks Museum এবং Concertgeborrow।  ঐতিহাসিক এই স্থানে পৌঁছে মনটা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল।  লন্ডনের বিখ্যাত National Art Gallery-তে পৃথিবী বিখ্যাত বহু শিল্পীর চিত্রকলা দেখেছি — লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, রাফায়েল, রেমব্রান্ট, ভেরমিয়ের, ক্লদ মনে ইত্যাদি।  প্রখ্যাত এই শিল্পমন্দিরেই আমার সাথে প্রথম পরিচয় ভ্যান গঘের সূর্যমুখীর।  এছাড়াও দেখেছিলাম তাঁর A wheatfield with Cypresses, Crab এবং আরো কয়েকটি কালজয়ী চিত্রকলা।  রঙের অপরূপ বৈচিত্র ও স্বতন্ত্র্য মৌলিক আঙ্গিক আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল।  আমি অবাক বিস্ময় অনেকক্ষণ তাকিয়েছিলাম এই সমস্ত ছবিগুলোর দিকে।  সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল যা আজও আমার উস্তাদ ফৈয়াজ খান সাহেবের টোড়ী শুনলে হয়ে থাকে।  এই সমস্ত ছবিগুলোতে যেমন ধ্রুপদের গাম্ভীর্য আছে আবার পূরব ঠুংরির মাদকতাও সমানভাবে প্রকট।  এ-ছিল আমার ভ্যান গঘ দর্শনের প্রথম সুখানুভূতি।  কিন্তু এখন আমি যে মিউজিয়ামটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি সেটা পুরোটাই ভ্যান গঘের।  তাঁর কয়েকশো ছবি আজ চাক্ষুষ করতে পারব।  এক বিরল সৌভাগ্যের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আমার হৃদয় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠল।  এ যেন উস্তাদ আলি আকবর খান সাহেবকে দর্শনের অপেক্ষা।  আমার সঙ্গীতের ঈশ্বরকে আমি কখনও সামনা-সামনি দেখিনি।  আমার স্বপনে-শয়নে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি সর্বদা টের পেয়েছি।  ভ্যান গঘ দর্শনও তো ঈশ্বর দর্শনের সমার্থক।

পল্লব আর আমি তাড়াতাড়ি টিকিট কাউন্টার থেকে দুটো টিকিট কাটলাম।  হাতে সময় খুব কম।  অন্য সমস্ত বিখ্যাত মিউজিয়ামের মতন এখানেও নিরাপত্তার প্রচণ্ড কড়াকড়ি।  জ্যাকেট ও লঙ কোট জাতীয় ঢিলেঢালা ও বড় পোষাক পরে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই।  কিন্তু সমস্ত ব্যবস্থাটি এখানে এতটাই সুচারু ও সুশৃঙ্খল যে ধৈর্য্যচ্যুতির কোনও অবকাশই নেই।

ভ্যান গঘ মিউজিয়ামটি তৈরি হয় ২রা জুন ১৯৭৩ সালে।  এই সংগ্রহশালায় ভ্যান গঘ ছাড়াও তাঁর সমসাময়িক বেশ কিছু শিল্পীর দুর্লভ সংগ্রহ আছে।  বিখ্যাত স্থপতি গ্যারিট রিকভেল্ট এবং কিশো কুরোশাওয়ার তত্ত্বাবধানে এই অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যের সৃষ্টি হয়।  এই সংগ্রহশালায় মোট দুটো বিল্ডিং আছে — রিকভেল্ট বিল্ডিং এভং কুরোশাওয়া উইং।  চারতলা রিকভেল্ট বিল্ডিং-টিই এই সংগ্রহশালার মূল গৃহ আর এখানেই সমস্ত স্থায়ী সংগ্রহ দেখতে পাওয়া যায়।  একতলায় একটা ক্যাফে শপ আর কিছু দোকান আছে মূলতঃ স্মারক বিক্রয়ের জন্য।  দোতলায় ভ্যান গঘের সমস্ত কাজ প্রদর্শিত।  তিনতলায় দেখতে পাওয়া যায় Restoration of Paintings।  আর চারতলায় ভ্যান গঘের সমসাময়িক প্রথিতযশা শিল্পীদের চিত্রকলা ও তাঁদের সৃষ্টিতে ভ্যান গঘের প্রভাব — এই ভাবনায় সাজানো হয়েছে অসাধারণ সব শিল্পকর্ম।  পাশাপাশি কুরোশাওয়া উইং-এ আছে প্রধানত অস্থায়ী প্রদর্শনী সামগ্রী।Starry Night 1

এই মিউজিয়ামে প্রদর্শিত আছে ভ্যান গঘের প্রায় দুইশতটি পেন্টিং, চারশত ড্রয়িং এবং সাতশ চিঠিপত্র।  এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল — দা পটেটো ইটার্স, দা ইয়েলো হাউস, আত্মপ্রতিকৃতি, সূর্যমুখী, Almond Blossoms, Avenue of Poplars in Autumn, সিগারেটমুখো কঙ্কাল, Agostina segatori sitting in the cafe of Tambourin, Wheat Field with a Lark, View of Paris from Vincent’s room in the Rue Lepic, The Zomave, আইলের বেডরুম, অ্যানরেপ-এর নির্বাচিত কাজ, প্যারিসের নির্বাচিত কাজ, আর্লের নির্বাচিত কাজ।  এছাড়াও এখানে ভ্যান গঘের নয়টা আত্ম-প্রতিকৃতি ও কিছু ছোটোবেলায় আঁকা ছবির প্রদর্শনী আছে।  ভ্যান গঘের শিল্পরীতিতে প্রভাবিত তৎকালীন পৃথিবীবিখ্যাত শিল্পীদের ঐতিহাসিক শিল্প-সংগ্রহও মুগ্ধ করার মতন।  ইমপ্রেশনিস্ট এবং পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট আন্দোলনের কিছু দুর্লভ ছবিও আছে এই সংগ্রহশালায়।

স্বনামধন্য Auguste Rodin ও Jules Dalou-এর স্থাপত্যকর্ম ছাড়াও নিম্নলিখিত বিশ্ববিশ্রুত শিল্পীদের চিত্রকলার অসাধারণ সম্ভার আছে এই সংগ্রহশালায়।  Emile Bernard, Maurice Denis, Rees Van Dragen, Paul Gauguin, Edouard Manet, Claude Monet, Orilon Redon, Georges Seurat, Paul Signae, Henri de Toulause Lautrec।

ভ্যান গঘের প্রথম বিখ্যাত কাজ The Potato Eaters।  এই অসামান্য শিল্পকর্মে তাঁর বিখ্যাত তীব্র রঙের প্রয়োগ দেখা না গেলেও পরবর্তীতে ফ্রান্সে অবস্থানকালে তীব্র সূর্যালোকের প্রভাবে তাঁর বেশিরভাগ ছবিতে একটা উজ্জ্বলতা আসে এবং উনি এক মৌলিক রীতির জন্ম দেন।  তাঁর সৃষ্ট এই রীতি পূর্ণতা পায় আর্লে তাঁর অবস্থানের সময়।  সেটা ১৮৮৮ সাল।

আমি চিত্রকলার technicality বুঝি না।  সেই ছোট্টবেলা থেকে আমাদের বাড়িতে আমার দাদু-বাবা-কাকাদের শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-চিত্রকলার প্রতি গভীর অনুরাগ ও শ্রদ্ধা দেখে আমার বড়ো হয়ে ওঠা।  সংস্কৃতির এই চতুরঙ্গচর্চা অজান্তেই আমার অন্তর্লোকে এক সংবেদনশীল দর্শনানুভূতি ও শ্রবণানুভূতির জন্ম দিয়েছে।  ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মাধুর্য ও গভীরতা আজও আমার অন্তঃস্থলকে যেমন আলোড়িত করে, তেমনই ভালো ছবি বা শিল্পকর্ম দেখলে আনন্দিত হই।  ভ্যান গঘের ছবির শিল্পসুষমা, রঙের চয়ন ও ব্যবহার ইউরোপে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করে।  বহুদিন তাঁকে কেন্দ্র করেই চিত্রচর্চা আবর্তিত হয়েছে।  ব্যক্তিগতভাবে আমার উপলব্ধিতে ভ্যান গঘের কিছু ছবিতে আমি কিছুটা বিষণ্নতা পেয়েছি।  বিশেষত তাঁর ডাচ ল্যান্ডস্কেপগুলোতে।  আমস্টারডাম বা সার্বিকভাবে ডাচ পরিবেশের মধ্যে একটা বিষণ্নতা আছে সেটাই যেন ওনার মহাজাগতিক তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।  তাঁর নিজের আত্ম-প্রতিকৃতিতে কতবার উনি নিজেকে দেখেছেন।  Starry Night over the Rhone যখন দেখি তখন মনে হয় উচ্চমার্গের সাধকের পক্ষেই এভাবে আকাশকে দেখা সম্ভব।  স্রষ্টার, সৃষ্টিকে ফিরে দেখার নির্মল আনন্দ যেন এই ছবির প্রতিটি তুলির টানে প্রতিভাত হয়।  প্রকৃতিকে কতভাবে উনি দেখতে পেয়েছেন ও প্রকাশ করেছেন তা আজও আমাদের বিস্ময়াবিষ্ট করে।  আমাদের মতন সাধারণ মানুষ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই নবসাজে এই প্রকৃতিকে দেখার আনন্দ পায়।

আমি আর পল্লব মন্ত্রমুগ্ধের মতন আড়াই ঘন্টা সময় এই স্বর্গালোকে কাটালাম।  কর্তৃপক্ষের উদারতায় ওখানকার প্রায় সমস্ত ছবিই ক্যামেরাবন্দি করেছি — ভবিষ্যতের স্মৃতিকে সতেজ ও সবুজ রাখার জন্য।

বিমান ছাড়ার সময় ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে।  এবার ঘরে ফেরার পালা।  মন চাইছে না তবু যেতে হবে।  যাওয়ার আগে আরো একবার ফিরে দেখতে ইচ্ছা করছিল সূর্যমুখীকে — ধর্ম, বর্ণ, স্থান, কাল, পাত্র-র ব্যবধান দূর করে আজও তার অমোঘ আকর্ষণে সারা পৃথিবীর মানুষ এখানে আসে।  এখানেই শিল্পীর সার্থকতা!

চিত্র পরিচিতি : ১। ভ্যান গঘের আত্মপ্রতিকৃতি;  ২। ভ্যান গঘ মিউজিয়াম;  ৩। ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের সামনে লেখক;  ৪। ভ্যান গঘের ‘স্টারি নাইট’।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

1 Response to ভ্যান গঘের দেশে

  1. দেবকুমার সোম বলেছেন:

    ঋদ্ধ হলাম। লেখকের লেখার জাদুতে একপ্রকার মানসভ্রমণ হল বলা যায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s