মনের কথা, ছবির কথা

ছবির সাথে কিভাবে গড়ে ওঠে মানুষের মনের সম্পর্ক তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিম বয়াল-এর নিজের কলমে।

ছবির সাথে সম্পর্কটা আমার এমনি এমনি।  ভালোলাগার থেকে ভালোবাসা।  ড্রয়িং করতে আর রং করতে ভালো লাগত।  একটা টান জন্মায়, বিশেষত প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত ছবির উপর।  আর পাঁচটা বাচ্চার মতো আমিও আঁকার স্কুলে গিয়েছি।  আঁকার স্কুলেই প্রথম প্রেম।  হয়তো ছবি আঁকাটা কমন পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট ছিল বলে।mandir

উচ্চমাধ্যমিকের পর নিজেকে আর্টিস্ট হিসাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম।  কিন্তু অতি নিম্নবিত্ত পরিবারের চিন্তা থেকে আয়ের পথ সুগম করতে আর ও পথে যেতে পারিনি।  ছবির সঙ্গে ভালবাসা থাকলেও ঘর করা হয়নি।  তাই আমার কোনো বন্ধু বা পরিচিত চিত্রকর হিসাবে জীবনযাপন করছে বা ছবি আঁকাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছে শুনলে দারুণ আনন্দ হয়, আর একই সাথে হয় খুব ঈর্ষা।  দু’একদিন আগে একটি ছেলের সাথে পরিচয় হল, যে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনো করলেও পরে ডিজাইনের পেশায় এসেছে।  ঘরের সাজসজ্জা, পুজোর প্যাণ্ডেল ইত্যাদি করছে দারুন সফলভাবে।

ছবি আঁকার ইচ্ছেটা তাড়িয়ে বেড়ায়, কষ্ট হয়।  চল্লিশ পেরোনোর পরেও ভাবি নতুন করে দুর্দান্ত একটা ছবি আঁকা, আনেক ছবি।

কিশোর বয়সে আমাকে মুগ্ধ করেছিল পরেশ মাইতি, প্রকাশ কর্মকার, শক্তি বর্মণ, শাহাবুদ্দিন আর কিংবদন্তি শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।  পরেশ মাইতির ছবির রং দিয়ে তৈরি জমি, গভীরতা, আলোছায়া আর প্রকাশ কর্মকারের ছবির অত্যাশ্চর্য রূপ আমাকে টেনে আনে জলরঙের দিকে।  পরে টার্নারের ছবি নেশা ধরিয়ে দেয়।  একজন রুশ শিল্পীর জলরঙে আঁকা বাঘ আজও মনের মধ্যে গেঁথে আছে।  নাম মনে নেই, কিন্তু ছবিটা মনে আছে।  বহু ইংরেজ চিত্রকরের করা জলরংও আমাকে প্রশিক্ষিত করেছে।

আমি বাস্তবধর্মী ছবি আঁকি।  পরেশ মাইতির জলরঙের একটা প্রভাব আমার উপর ছিল।  তালসারি, দীঘা বা আমাদের স্থানীয় ফতুল্লাহপুরের ঘন বাঁশবাগান — এইসবের ছবি মনে একটা অপরূপ আনন্দ দেয়।  মনে হয় যেন এইখানে বাস করে প্রকৃতির রূপারূপ।  অজয় নদীর ধারে, বোলপুরের ঠিক আগের রেল স্টেশনের গা ঘেঁষে একটি গ্রামের যে রূপ মাধুর্য্য দেখেছি তা প্রকাশ করার শক্তি ও দক্ষতা যদি এ জীবনে ঠিকমতো অর্জন করতে পারি — ধন্য হব।  ছোট্ট গ্রাম, সব কিছু এলোমেলো, নিতান্ত দরিদ্র কিন্তু মনকে রাঙিয়ে দেওয়ার মতো রং আর খুশি করে দেওয়ার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য।

ড্রয়িং আর জলরঙের এক অনবদ্য সমাহার দেখি নাই ফিরে উপন্যাসে বিকাশ ভট্টাচার্য্যের আঁকা ছবি।  শিল্পীর আশ্চর্য্য রকমের মুন্সিয়ানা পাগল করে দেয়।  এই ছবিগুলো তুলি চালনার এক অসামান্য ও বিরল দক্ষতার পরিচয় বলে মনে করি।  বিশেষ করে ছবিতে অল্প তুলির টান যে ত্রিমাত্রিকতা ও আলোছায়া ফুটিয়ে তোলে তা খুব কমই দেখেছি।  এই ছবিগুলোই চিত্রচর্চা করার নতুন করে উদ্দীপনা দেয়।Animal

বিদেশী চিত্রশিল্পীদের মধ্যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অবদান সমগ্র চিত্রকলা ও সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রথম সারিতে।  ওনার ছবির থেকেও বেশি আশ্চর্য্যের ওনার ‘স্টাডি’।  অনেকের মতো আমাকেও প্রভাবিত করে ওনার রেখা, ছবি আর ছবি তৈরি।  মাতৃগর্ভে শিশু বিস্ময়কর।  এইসব ছবিগুলো দেখার মধ্যে দক্ষতা ও নান্দনিকতার যে দারুন অভিজ্ঞতা হয় তার পাশাপাশি এক নিদারুণ কষ্ট হয় এই ভেবে যে পৃথিবীতে শিল্পকলা এত উঁচুমানের তৈরি হয়ে গেছে যে আর বুঝি কিছ্ছুটি করার নেই।  শুধু দেখতে হবে — দুচোখ ভরে, সারা জীবন ধরে।  জানতে হবে পল গগ্যাঁর জীবন — ছবি আঁকার জন্য হঠাৎ করে সব ছেড়ে দিয়ে দ্বীপ-যাপন।  ভ্যান গঘের মতো একটা ধূমকেতুকে — যা পৃথিবীতে আর কখনো উদয় হবে না।  প্যারিসে ওনার আঁকা সূর্যমুখী ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে সারা গায়ে একটা বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল ওই রং আর রূপের ছটায়।  অতীতে সৃষ্ট দুর্দান্ত শিল্পকলাগুলো দেখতে দেখতেই জীবন অতিবাহিত হয়ে যাবে।

তবুও নিজের আনন্দের জন্যই ছবি আঁকা।  মনের তৃপ্তির জন্য আঁকা।  ঘরের দেওয়ালে থাকুক আঁকা ছবি, মানুষের নান্দনিকতাকে প্রাণ দিক দুর্দান্ত সুন্দর ছবি, আর দিক আমাদের প্রেরণা।

চিত্র পরিচয় : লেখকের নিজেরআঁকা বেশকিছু ছবি।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s