আর্টিমিসিয়া

আর্টিমিসিয়াকে নিয়ে নারায়ণ সান্যালের বিখ্যাত বই।  সেই বই পড়ার পর আর্টিমিসিয়াকে নতুন করে দেখলেন পৌষালী ঘোষ

লোকারণ্য বিচারশালা।  সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা চার্চের বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তি।  সবাই জানে তিনি চার্চের কাছে মাথা নত করবেন না।  কিন্তু এ কী হল!  সবাই শুনল তিনি বলছেন তাঁর এতদিনের যা কিছু বক্তব্য, আবিষ্কার সব মিথ্যা; চার্চের কথাই তিনি সর্বান্তকরণে স্বীকার করেন।  ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেন বিপ্লবী।  ক্লান্ত, নুব্জ বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে আসে এক তরুণ।  ব্যঙ্গের সুরে বলে; ‘কী দুর্ভাগা সেই দেশ, যেখানে একজনও বীর নেই’।  বৃদ্ধ বিজ্ঞানী গ্যালিলিও-র উত্তর — না কি স্বগোতোক্তি ‘কী দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে কেবল বীরেরই প্রয়োজন হয়’।Cover Artimisia

এই দেশ — ইতালি — প্রতিভা আর প্রতিবাদের ইতালি — ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র।  ১৪শ থেকে ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে ইতালিতে মূলত মধ্য ফ্লোরেন্সের তাসকানী থেকেই এই পুনর্জাগরণের সূচনা।  রোমের ২৭৭ কিলোমিটার উত্তরে মাত্র ১০২ বর্গ কিলোমিটারের এই শহর ঐতিহাসিক গুরুত্বে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে মধ্যযুগের এথেন্স।  ফ্লোরেন্স লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-র শহর; ফ্লোরেন্স মিকেলাঞ্জেলোর শহর; ফ্লোরেন্স গ্যালিলিও গ্যালিলাই-এর শহর।  এখানে আছে বত্তিচেল্লির ভেনাস, আছে দ্য ভিঞ্চির অনানসিয়েশন (Annunciation), আছে ‘আকাদেমিয়া দি আর্টিদেল দিসেগনো’ (Academia di Arte del disegno) — ইউরোপের সর্বপ্রধান শিল্পকেন্দ্র।  আছে কাসা বুয়েনারত্তি (Casa Buonarotii) — মিকেলাঞ্জেলোর ভদ্রাসন যেখানে তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র গড়ে তুলেছেন এক সংগ্রহশালা।  সেই সংগ্রহশালায় মিকেলেঞ্জেলো এবং সমসাময়িক ইতালিয় শিল্পীদের ছবির মাঝবরাবর কাঠের প্যানেলে আছে একটি তৈলচিত্র।  এক নগ্ন নারী — নাম ইনক্লিনাজিওন (Inclinazione)।  স্রষ্টা — আর্টিমিসিয়া জেন্টিলেসচি (Artemisia Gentileschi)।

এ নাম যে তেমন পরিচিত নয়।  বত্তিচেল্লি, ম্যাকিয়াভিলি, লিওনার্দো, মিকেলাঞ্জেলো, তিনতোরেত্তো, পারমাঞ্জালো, কারাভাজ্জিও প্রমুখ খ্যাতনামা শিল্পীদের সঙ্গে একত্রে এ নাম উচ্চারিত হয়নি দিনের পর দিন তার কারণ প্রতিভার ফারাক নয় বরং লিঙ্গ রাজনীতি।  আর্টিমিসিয়া নারী।  সমকাল তাকে গ্রহণ করতে চায়নি, কিন্তু স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে।  ফ্লোরেন্স আকাদেমির প্রথম মহিলা সদস্যা তিনি।  ফ্লোরেন্সের উফিজি সংগ্রহশালায় কেবলমাত্র নারী অঙ্কিত একটি চিত্রই স্থান পেয়েছিল তা আর্টিমিসিয়ারই।

সিমোন দ্য বোভোয়ার দ্য সেকেন্ড সেক্স  প্রকাশিত হতে তখনও বাকি সাড়ে তিনশ বছর, সামগ্রিক পুরুষ প্রাধান্যের বিরুদ্ধে সশব্দ প্রতিবাদচারিনী নোরার আবির্ভাবের দেরি পৌনে তিনশ বছর।  তুলি হাতে প্রতিবাদী আর্টিমিসিয়া।  বোভোয়া বলেছিলেন ‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ কেউ নারী হয়ে ওঠে।’  নারী হয়ে উঠতে বাধ্য হয় কেউ কেউ।  কেমন করে নারী হয়ে ওঠা?  পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারে, অপমানে, উদাসীনতায়।  নারী মানে নারী শরীর যেন, আর তাই নারীকে অধিকার করতে গেলে নারীকে অবদমিত করতে হলে উপায় তার শরীরে আঘাত হানা।  ব্যতিক্রম খুঁজে খুঁজে হয়রান ইতিহাস।  নারীকে ধর্ষণ করো, তারপর বলে দাও নষ্ট চরিত্রা, বেশ্যা।  কোনো নারীর মধ্যে কোনো প্রতিবাদী স্বরূপ দেখতে পেলেই বলে দাও বহু পুরুষের অঙ্কশায়িনী এই রমনী, নিম্ফোম্যানিয়াক।  এমন কী তেমন বিপদ বুঝলে ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারাই বিধেয় — জোয়ান অফ আর্কের মতো।artimisia1

আর্টিমিসিয়া ‘বেচারি’-র কপালে জুটেছিল প্রায় সবক’টি অভিযোগ।  বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বারংবার ধর্ষণ করে পিতৃবন্ধু।  বয়স তখন ১৮।  অন্যায়ের প্রতিকার হবে ভেবে আদালতের দ্বারস্থ হলে জনসমক্ষে প্রমাণিত হয়ে যায় অর্থের বিনিময়ে বহু পুরুষের সঙ্গকারী এই মেয়ে।  শহরে সাধারণ জীবনযাপন করতে পারবে না সে।  হয় শহর ছেড়ে যাক, না হলে নাম লেখাক গিয়ে বেশ্যাপল্লীতে।  লাঞ্ছনা কেবল মনে নয় — শরীরেও।  সত্য স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য আছে সিবিলের ব্যবহার।  ধাতবযন্ত্র।  হাতে পরিয়ে দিয়ে চাপ দিলে রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত হয় আঙুল।  সিসটিন চ্যাপেলের দেওয়ালে আঁকা আছে গ্রিক দেবী ডেলফিন সিবিল আর লিবিয়ান সিবিলের ছবি।  তাঁরা ‘স্ত্রীলোক’-কে সত্য কথা বলতে বাধ্য করেন।  পুরুষদের জন্য কোনো সিবিল নেই।

সিবিলের রক্তে রাঙানো হাতে তুলি তুলে নেয় মেয়ে।  নিজের রক্তে তা ডুবিয়ে নেয় শিল্পী আর্টিমিসিয়া।  বাবা ওরাজিও জেন্টিলেসচি ছিলেন চিত্রকর।  খানিক জন্মগত আর খানিক দেখে শেখার অভিজ্ঞতায় শুরু করল মেয়ে নতুন করে।  বাইবেলের আখ্যানগুলোর মধ্যে খুঁজে বেড়ালো প্রতিবাদ।  আগেই আঁকা হয়েছিল সুসান্না আর মোড়লেরা  নামের ছবিটি।  পূর্ববর্তীরা যেখানে স্নানরত সুসান্নার নগ্ন সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যগ্র সেখানে আর্টিমিসিয়ার তুলিতে এল মোড়লদের কামাতুর চাহনি আর সুসান্নার প্রত্যাখ্যান।  তবু এই প্রত্যাখ্যানে যেন তেমন তীব্রতা নেই।  রক্তাক্ত হৃদয় রক্তাক্ত প্রতিবাদে মুখর হতে চায় রক্তাক্ত হাত ক্যানভাসে ঝরাতে চায় রক্ত।

জুডা নগরীকে আসীরিয় সেনাপতি হলোফার্নেসের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে জুডিথ গেলেন হলোফার্নেসের শিবিরে।  জুডিথ জুডার নগরপালের কন্যা তরুনী কুমারী অথবা বালবিধবা হলোফার্নেসকে প্রভূত মদ্যপানে অচেতন করে সহকারিনীর সাহায্যে হত্যা করলেন।  কাটা মুণ্ডু নিয়ে রণভূমিতে নৃত্য করলেন।  জুডিথের রণনৃত্যের মতোই ভয়াবহ রক্তাক্ত ছবি আঁকলেন আর্টিমিসিয়া।  ভারমিলিয়ান রেড-এ ক্যানভাস রক্তাক্ত হল।  আলো-আঁধারিতে জুডা সুন্দরীর রূপ নয়, স্পষ্ট হল হিংস্র প্রতিবাদ।  হত্যাকালীন মুহূর্তটিকে ক্যানভাসে তুলে আনার পর আর্টিমিসিয়াকে তৎকালীন সমাজ ভয় পেল, যেমন জুডিথকে পেয়েছিল।  আচ্ছা, যুদ্ধ শেষে জুডিথ কি নিজের ঘরে ফিরে এসেছিল?  তাকে নগরবাসী কেমন করে গ্রহণ করেছিল?  বীরের সম্মান দিয়েছিল না কি প্রশ্ন করেছিল মুণ্ডপাতের আগে হলোফার্নেস জুডিথের শরীর সম্ভোগ করেছিল কি না?  জুডিথের কোনো প্রেমিক কি পরবর্তীকালে জুডিথকে গ্রহণ করেছিল প্রেমে-স্নেহে-আদরে?  বাইবেল নীরব।  যেমন নীরব ইতিহাস আর্টিমিসিয়ার ক্ষেত্রে, মঙ্গলকাব্য নীরব বেহুলার ক্ষেত্রে।  সে কথা পরে!Self portrait

আর্টিমিসিয়ার সময়ে ইতালিয় চিত্রশিল্পে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা যায় — আর্ট হিস্ট্রির ভাষায় তা বারোক (Baroque) স্টাইল।  গতিময় এ চিত্রে বিলাসময় জাঁকজমক উত্তেজনা তথা নাটকীয়তা তৈরি করা হত।  মূলত আলো আঁধারির খেলায় এই নতুন ধারার সৃজন; যা চিত্রাবলীকে করত এতটাই বাস্তবসম্মত যে মনে হত বোধহয় চরিত্রগুলি ক্যানভাস ছেড়ে এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে।  যেমন, মিকেলাঞ্জেলোর পিয়েতা দেখলে মনে হয় এক্ষুনি মায়ের কোলে নড়ে উঠবেন যিশু।  নাটকীয়তায় ভরা জীবন আর্টিমিসিয়ার — এই নাটকীয় চিত্রাঙ্কণ পদ্ধতি বলা বাহুল্য তার পছন্দ হবে।  এতদিনে সে শিখে নিয়েছে পারস্পেক্টিভের অঙ্ক — ত্রিমাত্রিক বিষয়বস্তুকে দ্বিমাত্রিক ক্যানভাসে তুলে আনার পদ্ধতি।  বিভিন্ন বিষয়বস্তুকে সঠিক কৌণিকে, দর্শক থেকে দূরত্ব অনুযায়ী সঠিক অনুপাতে ধারণ করতে চিত্রানুপাতের ভূমিকা সহজেই উপলব্ধ।

নারীর এই রক্তাক্ত আবেগ তথা শিল্পদক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই তৎকালের পুরুষ সমাজ মানতে পারেনি।  নারীর প্রতিভাকে দমন করতে তার বিরুদ্ধে উদাসীন থেকেছে।  কিন্তু কতদিন!  সাংসারিক তথা সন্তানের বন্ধন স্বীকার করেও আর্টিমিসিয়া একের পর এক ‘কমিশনড’ কাজ করেছেন।  নারী অঙ্কিত প্রথম ন্যূড স্টাডি তাঁরই।  আঁকলেন ইনক্লিনাজিওন (Inclinazione)।  মেঘদলে বসে থাকা এক সুন্দরী — অপূর্ব মুখাবয়ব — তাকিয়ে আছেন কোন সুদূরে — মর্ত্যভূমে — মাথার কাছে একটিমাত্র তারা — স্টার অফ বেথেলহেম না কি ভেনাস?  দুই হাতে লীলায়িত ভঙ্গিতে ধরা আছে একটি পাত্র — কিঞ্চিৎ কাত করা — তারই মধ্যে কি আছে শিল্পীর প্রেরণা!  নগ্না কিন্তু আলতো করে জড়িয়ে থাকা বস্ত্রখণ্ডটিতে কোনো যৌন আবেদন প্রকটিত নয় বরং সৌন্দর্য এবং সারল্যের মেলবন্ধনে এ এক আশ্চর্য সৃষ্টি।  এই তো সেই সুন্দরী — যার দিকে তাকিয়ে বারে বারে শিল্পীদের প্রশ্ন — ‘আর কতদূরে, নিয়ে যাবে মোরে, হে সুন্দরি!’

আর্টিমিসিয়ার সমকালে নারীরা যে একেবারেই ছবি আঁকতেন না তা তো নয়।  তাঁরা মূলত করতেন অলংকরণ তথা ইলুমিনেশনের কাজ।  ফুল-লতা-পাতা দিয়ে বাইবেল সজ্জিতকরণ কিংবা পোর্ট্রেট আঁকাতেই তাদের দক্ষতা সীমিত ছিল।  সোফোনিসবা আঙ্গুইসোলা (Soffonisba Augnissola), লাভিনিয়া ফন্টানা (Lavinia Fontana), লুসিয়া আঙ্গুইসোলা (Lucia Auguissola) প্রমুখ শিল্পীদের প্রতিভা আর্টিমিসিয়ার ধারেকাছে পৌঁছায়নি।  ছিলেন ক্যাথরিন অফ বোলোগনা (Catherine of Bologna), গিয়োভান্না জারজোনি (Giovanna Garzoni) — প্রথমজন চার্চের নান, দ্বিতীয়া টেম্পেরা এবং ওয়াটার কালারে স্টিল লাইফ অঙ্কণে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।  অতিশয়োক্তি মনে হলেও মেনে নেওয়া ভালো লংহি-র (Longhi) মন্তব্য — ‘The only woman in Italy who ever knew about painting.’।Self-Portrait-as-the-Allegory-of-Painting-Artemisia-Gentileschi-c.-1638

আর্টিমিসিয়ার সবকটি ছবি নাটকীয় অ্যাকশানে পরিপূর্ণ।  আত্মপ্রতিকৃতি কিংবা মেরী ম্যাগদালেনের মতো শান্ত ছবিতেও তিনি আলো-অন্ধকারের মাধ্যমে গতিময়তা আনতে ত্রুটি করেননি।  প্রতিটি ছবিতেই কিছু ঘটছে।  এই ঘটমানতা তথা চলমানতাই যে জীবন তা বোধহয় চল্লিশোত্তীর্ণা রমণী বুঝেছিলেন মর্মে মর্মে।  রুবেন্স, রেমব্রান্ট, কিংবা ভেরমিয়ারের আগেই আর্টিমিসিয়া কারাভাজ্জিও-র আলো-আঁধারি তথা ছায়াময়তা, ম্যানারিজম এবং ন্যাচারালিজম-এর একলব্য শিষ্য হয়েছিলেন।

প্রতিভা বা প্রতিবাদ — বিশেষত তা যদি হয় কোনো নারীর — কোন সময়ই বা তা মান্যতা পেয়েছে?  তাই অসম্মান এবং বিস্মৃতির মধ্যে নিমজ্জিত আর্টিমিসিয়ার শেষ জীবন।  এমনকি মৃত্যুর সঠিক সময়ও জানা যায় না।  ঐতিহাসিক চার্লস মোফাত (Charles Moffat) বলেছেন আর্টিমিসিয়া আত্মহননের মাধ্যমে বিড়ম্বিত জীবনের ইতি টেনেছেন।  সময়টা ১৬৫৬, মতান্তরে ১৬৫৩।  যেমন মরতে হয়েছিল বেহুলাকে।  স্বামী, ছয় ভাসুরের প্রাণ, শ্বশুরের সম্পত্তি ফিরিয়ে আনার পর যখন প্রশ্ন ওঠে কিসের বিনিময়ে এ পুনর্প্রাপ্তি তখন স্বর্ণবলয় দিয়ে নিজের কপালে আঘাত করে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রতিভাময়ী নর্তকী!

গ্যালিলিও-র সঙ্গে পরিচয় এবং পত্রবিনিময় হয়েছিল আর্টিমিসিয়া জেন্টিলেসচি-র।  বিজ্ঞানী কি তাঁকেও বলেছিলেন — ‘কী দুর্ভাগা এ দেশ …’?

ঋণ : নারায়ণ সান্যাল — আর্টিমিসিয়া; www.wikipedia.org; www.google.co.in; এবং এ্যাগনিস এ্যালেন — ইউরোপের চিত্রকলা।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s