রঙের বই পড়ার পর

রঙের ইতিকথা  পড়ার পর তার পাঠ-প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মোনালিসা সাহা।  ভাললাগা, মন্দলাগা এই ছোট্ট লেখায়।

রং আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।  রং ছাড়া কিছু কল্পনা করাও অসম্ভব।  এ যেন জীবনেরই অপর নাম।  রং ছাড়া সব ফিকে, প্রাণহীন, স্পন্দনহীন।  কিন্তু এই রংকে গুরুত্ব দিয়ে বোঝার, বিশ্লেষণ করার ব্যপারে আমরা খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করি না।Cover for Advt

মৃণাল নন্দী তাঁর প্রথম বই রঙের ইতিকথা-তে চোদ্দোটি ছোট ছোট প্রবন্ধে রং নিয়ে আলোচনা করেছেন।  বইয়ের শেষে অবশ্য আরো চারটি সংযোজনী রয়েছে।  সব মিলিয়ে আঠারোটি অংশে আলোচনা।  তিনি আলোকপাত করেছেন মূলত চিত্রশিল্পে রঙের ব্যবহারের উপর।  তাঁর আলোচনাকে আমরা কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি।

রং কি, কোনো রং কিভাবে মানুষের চোখে ধরা দেয় — তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে একটি পর্যায়ে, রয়েছে রঙের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও।  অপর পর্যায়ে রয়েছে কিভাবে গুহাবাসী মানুষ রঙের ব্যবহার শুরু করল এবং নিজের আঁকা ছবিতে ব্যবহৃত রংকে দীর্ঘস্থায়ী করতে কী কী কৌশল অবলম্বন করল তার প্রাঞ্জল বিবরণ।  এক্ষেত্রে মানুষ প্রকৃতির নানা উপাদান থেকেই রং সংগ্রহ করত।  মানব সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নানা রাসায়নিক রঙের ব্যবহারও শুরু হল এবং প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার কমে যেতে লাগল।  তবে এখনও কিছু ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়।  যেমন ভারতের কলমকারি চিত্রশৈলীতে কেবল প্রাকৃতিক রংই ব্যবহৃত হয়।  লৌহচূর্ণ, আখের গুড়, খেজুর গুড় পচিয়ে কালো রং তৈরি হয়।  তেঁতুলের কাণ্ড ও কয়লা মিশিয়েও কালো রং পাওয়া যায়।  হলুদ রং তৈরি করা হয় মাইরোবালান ফুল ও অ্যালাম গুঁড়ো জলে ফুটিয়ে।  তুঁত থেকে নীল রং এবং চাতালাকোড়ি মূল থেকে লাল ও গোলাপি রং পাওয়া যায়।  আবার বাংলার পটচিত্রে ব্যবহৃত রংও প্রাকৃতিক।  শিউলি ফুল ও পাতা, জবা ফুলের পাপড়ি, কাঁচা হলুদ — ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে পটচিত্রের রং প্রস্তুত করা হয়।  অন্যদিকে রাসায়নিক রঙের মধ্যে প্যাস্টেল, ক্রেয়ন, অ্যাক্রিলিক ইত্যাদি বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা গুহাবাসী মানুষের দ্বারা সৃষ্ট বহু গুহাচিত্র এবং পরবর্তীকালের কিছু চিত্রশিল্পীর সৃষ্টি আলোচিত হয়েছে অপর একটি পর্যায়ে।  গুহাচিত্রগুলি তৎকালীন মানব-জীবনের ছবি তুলে ধরে।  যেমন — দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রাকেন্সবার্গ পার্কের গুহাচিত্রে উঠে আসে ধর্মীয় বিশ্বাসের ছবি।  এই চিত্রগুলি তিন হাজার বছরের পুরোনো।  সোমালিয়ার উত্তরে প্রাপ্ত কিছু গুহাচিত্রে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার শিকারির শিকার ধরার বিবরণ রয়েছে।  আবার আলজেরিয়ায় প্রাপ্ত গুহাচিত্রে ওই অঞ্চলের জীবজন্তুর স্থানান্তর, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মানুষের বসবাসের ধরণের পরিবর্তনের একটি ধারণা পাওয়া যায়।  স্পেনের আলতামারি গুহাচিত্র প্রাচীন প্রস্তর যুগের।  এই গুহাচিত্রে কাঠকয়লা ও হেমাটাইট আকরিক ব্যবহৃত হয়েছে।  ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা গুহার চিত্রে আমরা পাই মানুষের শিকারের দৃশ্য, অশ্বারোহী, নৃত্যরত মানবগোষ্ঠী ইত্যাদি।  শিকারের দৃশ্যগুলিতে তীর-ধনুক, ঢাল-তলোয়ারেরও ছবি মেলে।

ছবিতে রংকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য মানুষ বহুদিন ধরেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।  বইটির আর একটি পর্যায়ে রয়েছে রংকে দীর্ঘস্থায়ী করার বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা।  টেম্পেরা ও ফ্রেসকো — চিত্র সৃষ্টি করার এই দুই বিশেষ পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার রয়েছে।  চিত্রশিল্পে ব্যবহৃত রঙের বিবর্তন এই পর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে।  তেলরং, জলরং, প্যাস্টেল, ক্রেয়ন, অ্যাক্রিলিক ইত্যাদি নানা ধরণের রং নিয়ে বিবরণ রয়েছে এই পর্যায়ে।

বইয়ের শেষে যে চারটি সংযোজন, তাকে বইটির আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বলা যেতে পারে।  সহজ সরল ভাষায় লেখা এই বই কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহী করে তুলতে দক্ষতার সঙ্গে তার কাজ করবে।  বিস্তারিত বিবরণ এবং ধাপে ধাপে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ের অবতারণা পাঠক-পাঠিকাদের ধারণাকে করে তুলবে স্পষ্ট।  তবে বিভিন্ন স্থাপত্যশিল্প যেমন — রাজপ্রাসাদ, স্মৃতিসৌধ, মন্দির, মসজিদ গীর্জাতে অঙ্কিত চিত্র সম্পর্কে আলোকপাত করা হল না।  আর এই বইটিতে আরও কিছু গুহাচিত্র ও চিত্রশিল্পীর ছবি পেলে ভাল লাগত।

বই : রঙের ইতিকথা;  লেখক : মৃণাল নন্দী;  প্রকাশক : কবিতা পাক্ষিক;  প্রকাশকাল : ডিসেম্বর, ২০১৫;  মূল্য : ১৫০ টাকা

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , , , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s