আমার আঁকার জগৎ

আমার ছবিকথা সিরিজে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী বলছে তার আঁকা-শেখার কাহিনী। ছবি আঁকা শিখতে গিয়ে কিভাবে মনন তৈরি হতে পারে তারই সম্ভাবনাময় ইতিকথা শোনাচ্ছেন স্বস্তিকা সরকার

তখন আমি বেশ ছোটো। সম্ভবত স্কুলে ভর্তি হব। আমি আমার মা-বাবার কাছে আঁকা শেখার ইচ্ছেটা প্রথম ব্যক্ত করি। তার আগে আমার আঁকার জগৎ কেবলমাত্র কিছু পাহাড়, একটি নদী ও তার ওপর ভেসে বেড়ানো নৌকা এবং একটি ঘর ও কিছু গাছপালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।20160207_151155-1 কিন্তু যখন আমি প্রথম আঁকার স্যারের কাছে ভর্তি হই তখন তিনি আমাকে নানা ধরণের আঁকা শেখান এবং আমি শিখতেও খুব আগ্রহী হয়ে উঠি। এভাবে ধীরে ধীরে বেশ কয়েকটা বছর কেটে যায়। নানা জায়গায় আমি আঁকার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সাফল্যও অর্জন করি। হঠাৎই একদিন শুনি যে আমার সেই স্যার এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আমি বেশ ভেঙে পড়ি। তারপর প্রায় একবছর কেটে যায়, আমি কোনো স্যারের কাছে আঁকা শিখতে ভর্তি হইনি। একদিন হঠাৎ আমার মামা আমার বর্তমান আঁকার স্যারের কথা বলেন এবং বাবা সেই মতো আমাকে ভর্তিও করিয়ে দেন।

এই স্যারের কাছে ভর্তি হওয়ার পর আমার আঁকার পরিধি অনেক বেড়ে যায়। প্রথমে আঁকা বলতে আমার কাছে ছিল কেবলমাত্র বাড়ি-ঘর, গাছপালা, রাস্তা, মানুষ এইসব। কিন্তু আমি তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে আসি। আঁকার মধ্যেও যে কত ধরণ আছে তা উপলব্ধি করতে শুরু করি। আমার বর্তমান স্যার আমাদের এই বিষয়ে আরও উৎসাহী করে তুলেছেন। স্যার বলেন যে আঁকা বলতে কেবলমাত্র বই দেখে নকল করা নয়, নিজের মনে যে ভাবনা-চিন্তা-কল্পনা রয়েছে তা খাতায় ফুটিয়ে তোলা। আমিও এই কথার সঙ্গে একমত। কেন না, আঁকার বই-এর বাইরেও পরিবেশে আরো অনেক কিছু রয়েছে যা অতি সুন্দর। আমি আরও বিভিন্ন আঁকা সম্বন্ধে স্যারের মাধ্যমে জানতে পারি যা আগে জানতাম না। আমিতো আগে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, ভাস্কর্যশিল্পী বা প্রচ্ছদশিল্পী সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। চিত্রশিল্পী নামটা যাও বা শুনেছি, ভাস্কর্যশিল্পী ও প্রচ্ছদশিল্পী20160207_143224-1 বলেও যে কিছু হয় তা অজানা ছিল।প্রচ্ছদশিল্পী বলতে বোঝায় যে যাঁরা বইয়ের প্রথম পাতায় অর্থাৎ একেবারে সামনের পাতায় যে ছবি থাকে সেই ছবি আঁকেন। কিন্তু আগে বইয়ের এই প্রথমপাতা বা মলাটকে যে প্রচ্ছদ বলে তা আমার জানা ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সমস্ত অজানাগুলো একটু একটু করে আমার জানা হয়ে উঠতে থাকে, জ্ঞান বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রচ্ছদশিল্পীদের নাম জানতে পারি, যেমন — সত্যজিৎ রায়, খালেদ চৌধুরী, পূর্ণেন্দু পত্রী যাঁরা ভারতের অন্যতম সেরা তিনজন প্রচ্ছদশিল্পী। স্যার আমাদের নানা শিল্পীদের ছবি দেখান। যেমন — ভ্যানগঘ, নিওনার্দো দা ভিঞ্চি, সত্যজিৎ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী প্রমুখ। স্যার আমাদের কাছে তাঁদের আঁকা সম্বন্ধে আরও আগ্রহী করে তোলেন। তাঁদের রঙের ব্যবহার, তুলির টান, আঁকার ধরণ প্রভৃতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং তা নিজেদের আঁকায় সামান্য হলেও ব্যবহার করতে সাহায্য করেন। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার বইতে আঁকা বিভিন্ন ছবি দেখান। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের যে রেখার বিভিন্ন ধরণ এবং আলো-ছায়া দেখানোর ক্ষেত্রে রেখার যে ব্যবহার তা-ও শিখতে পারি এবং চেষ্টা করি নিজের আঁকায় যতটা সম্ভব ফুটিয়ে তুলতে। আমি নিজে চেষ্টা করি সত্যজিৎ রায়ের এই ছবিগুলি আঁকতে।

এছাড়াও স্যার আমাদের একটি বই দেখিয়েছিলেন — ‘কমিক্স ও গ্রাফিক্স’। সেখানে নানা বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবি, প্রচ্ছদ, কমিক্সে আঁকা বিভিন্ন ছবি রয়েছে। মাঝে মাঝেই স্যার আমাদের সামনে বিভিন্ন লোকশিল্পের উদাহরণ এনে দেখান, যেমন — ওয়ারলি পেন্টিং, রঘুরাজপুরের লোকশিল্প, চিনের চিত্রকলা এইসব। লোকশিল্পীদের সম্বন্ধে অনেক কথা তিনি আমাদের বলেন। লোকশিল্পীদের শ্রম, ছবির প্রতি তাঁদের ভালবাসা, তাঁদের চিন্তা-ভাবনা এই সবই তাদের শিল্পের মধ্যে ফুটে ওঠে সেটাও আঁকতে এসেই আমার জানা হয়।20160207_143241-1-1

স্যার সব সময় বলেন যে পরিবেশে যে সমস্ত সুন্দর সুন্দর জিনিসগুলি আছে সেগুলিকে আঁকার চেষ্টা করতে। কারণ বইয়ে যে সমস্ত আঁকাগুলি আছে সেগুলি অন্য কারো আঁকা ছবি, আমরা শুধু নকল করে যাই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে আমাদের কেবলমাত্র পরোক্ষভাবে আঁকা হয়। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতির মাঝে বসে আঁকার চেষ্টা করি তাহলে প্রত্যক্ষভাবে আঁকতে পারব। আঁকতে গিয়ে আমরা অনেক কিছু শিখতেও পারব। কোন্ গাছের পাতা কেমন হয়, ফুলের কত রকম রং হয়, বিভিন্ন বাড়ির ধরণ, মানুষের হাঁটা-চলা, দাঁড়ানোর-বসার ভঙ্গি — এসবও শেখার। আমরা তো গাছের শাখা-প্রশাখা বলতে কেবলমাত্র ইংরাজি অক্ষর ‘Y’ বুঝি। কিন্তু এই ডালপালাও যে কতরকম আকৃতিবিশিষ্ট হয় তা-ও উপলব্ধি করতে পারি। এই তো, এই কয়েকদিন আগেই আমি ও আঁকার ক্লাসের আরও কয়েকজন মিলে স্যারের সঙ্গে গিয়েছিলাম কাছাকাছি একটা গ্রামীন পরিবেশে আউটডোর স্টাডি করতে। সেখানে গিয়ে স্যার প্রথমে দেখিয়ে দিলেন কিভাবে আউডডোর স্টাডি করতে হয়। সেই অনুযায়ী যখন আঁকতে বসলাম তখন বুঝতে পারলাম যে এইভাবে আঁকা কত উপকারী যা আমাদের আঁকাকে আরও উন্নত ও সুন্দর করে তুলতে সাহায্য করেছে। তা থেকে উপলব্ধি করতে পারলাম যে প্রকৃতি নিজেই কত বড়ো শিল্পী যে শিল্পের ডালি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির এই আসরে এসে আমার আঁকা সম্বন্ধে ধারণার অনেকখানি পরিবর্তন ঘটে। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ তা বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করি। নিজের আঁকার মধ্যে মৌলিক ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। শুধুমাত্র আঁকাই নয়, এর পাশাপাশি গান-বাজনা, কবিতা, গল্পের বই সবক্ষেত্রেই একটা বিচারবোধ তৈরি হয়। তৈরি হয় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। কোনো বস্তু সম্পর্কে বোধের জায়গা তৈরি হয়। সেভাবেই নানা জায়গায় শিল্পগুলিকে খুঁজে পাই, খুঁজে যাই। আঁকা শেখার ক্লাসে না এলে এই জায়গাগুলোতে একটা অসম্পূর্ণতা হয়ত আমার থেকে যেত যেটা একটু একটু করে সম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে।

সমস্ত ছবিগুলিই লেখিকার নিজের, সঙ্গের ফোটোগ্রাফটিও তার।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

1 Response to আমার আঁকার জগৎ

  1. Tuhin Subhra বলেছেন:

    বাহ খুব ভালো লাগল । ছবির পাশাপাশি লেখার হাতটাও তৈরি হচ্ছে । থেমে যেও না ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.