শিল্পগ্রাম রঘুরাজপুর

সম্প্রতি বেড়াতে গিয়েছিলেন এই গ্রামে, যে গ্রাম নিজের পরিচয় স্থাপন করেছে শিল্পগ্রাম হিসাবে। বেড়ানোর সেই স্মৃতি থেকেই উদ্ভাসের বন্ধুদের জন্য তুলে আনছেন এক অনবদ্য শিল্পগ্রামের কথা। কলম ধরলেন পূর্বা দাস

ওড়িশার পুরী শহর থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রাম রঘুরাজপুর, যা শিল্পগ্রাম বলেই পরিচিত। এই গ্রামটি চন্দনপুর অঞ্চলে অবস্থিত। বর্তমানে এখানে ১২০ ঘর শিল্পী আছেন। শিল্পী হিসাবে জগন্নাথ মহাপাত্রই এখানে প্রথম আসেন। তিনি রান্নার কাজ করতে করতে নিজের ঔৎসুক্য এবং আগ্রহে হাতের কাছে যা পেতেন তা দিয়েই একেবারেই ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকে কিছু কিছু জিনিস তৈরী করতে শুরু করেছিলেন, যা কালক্রমে শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।20151026_165122

এই অঞ্চলের মানুষের মূল জীবিকা পান চাষ। এখানে পান চাষ আগেও হতো, এখনও হয় প্রচুর পরিমাণে। কিন্তু এখন পান চাষের পাশাপাশি এলাকার মানুষ শিল্পকর্ম তৈরীতেও প্রচুর সময় ব্যয় করেন। প্রতিটি পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এখানকার শিল্পী বালকৃষ্ণ সেনাপতির কাছে কয়েকজন শিল্পী শিক্ষানবিশ হিসাবেও যুক্ত আছেন, তাঁরা শিক্ষানবিশির সাথে সাথে শিল্পীর নানা কাজে সাহায্যও করেন।

বালকৃষ্ণ সেনাপতি, কানহা রাও বা সুশান্ত মহাপাত্রর মত শিল্পীরা NIFT-তে গিয়ে পোষাকের ওপর কাজ করেন। এছাড়াও ভারতবর্ষের বড় বড় শহরে শিল্প মেলাতে NGO-দের সাহায্যে শিল্প প্রদর্শনী করেন। সেক্ষেত্রে তাদের কিছু আয়ের ব্যবস্থাও হয় প্রদর্শনীর বিক্রি থেকে। এই শিল্পীরা নিজেরা বিক্রির জন্য শাড়ী বা অন্যান্য পোষাকের ওপর শিল্পকর্ম মজুত রাখেন না তবে বায়না পেলে তৈরী করে যোগান দেন। এঁরা ক্যানভাস তৈরী করে তাতে নানা রং দিয়ে ছবি ফুটিয়ে তোলেন। আবার ক্যানভাসে শুধু সাদা-কালো রঙেও অপূর্ব মায়া সৃষ্টি করেন।20151026_164940

এই ক্যানভাস তৈরীর পদ্ধতিটি অদ্ভুত। দুটি সুতির কাপড়কে একসাথে জোড়া দিয়ে তৈরী হচ্ছে ক্যানভাস। তেঁতুলের বীজ সেদ্ধ করে যে রস বের হয়, তার সাথে বেলের আঠা মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরী করা হয়। এই মিশ্রণ দিয়ে ঐ কাপড় দুটো জোড়া লাগানো হয়। এরপর ঐ জোড়া-কাপড়ে সাদা চকের গুঁড়ো ছিটিয়ে তৈরী হয় ক্যানভাস। এই ক্যানভাসে পেন্সিল দিয়ে স্কেচ করে ছবি আঁকার কাজ হয়।

ছবি আঁকার জন্য এখানকার শিল্পীরা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করেন। সাদা রঙের জন্য ব্যবহার করা হয় শঙ্খ গুঁড়ো। কালো রং বানাতে ব্যবহার করা হয় কাজল বা ভুসো কালি। আর অন্য বিভিন্ন রঙের জন্য নির্ভর করা হয় বিভিন্ন রঙের পাথরের ওপর। এই পাথর আসে রাজস্থান থেকে। সেই পাথর গুঁড়ো করে তৈরী করা হয় রং। একদম প্রাচীন যুগের প্রাকৃতিক রঙের মতোই।20151026_153927

রঘুরাজপুরের এই পটচিত্রে বিষয়ের অন্ত নেই। নানা বিষয়ই স্থান পায় এই পটচিত্রে। যেমন — রামায়ণ বা মহাভারত থেকে নেওয়া নানা কাহিনী, রাসলীলা, গণেশ বন্দনা, দুর্গা, জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম কাহিনী, কালীয় দমন প্রভৃতি। আবার হাতি বা নানা পাখিও স্থান পায় এই পটচিত্রে।

ক্যানভাসের ওপর অন্য ধরণের সামগ্রী ব্যবহার করে শিল্প সৃষ্টি করেন সুশান্ত মহাপাত্রর মতন শিল্পী। দেরাদুন চাল ও তেঁতুল বীজের আঠা মিশিয়ে ঘন তরল মিশ্রণ তৈরী করে তাতে প্রয়োজনমতো নানা রং মিশিয়ে ক্যানভাসের ওপর নানা নক্সা তৈরী করেন তিনি।

এছাড়া আছে তালপাতার ওপর কাজ। তালপাতার ওপর লোহার সূচ দিয়ে খোদাই করে নক্সা তৈরী করছেন স্থানীয় শিল্পীরা। তার ওপর চাপানো হচ্ছে প্রয়োজনমতো রং। তৈরী হচ্ছে অপূর্ব শিল্পকর্ম। তালপাতার কাজ ছাড়াও নারকেলের দড়ি দিয়ে রঘুরাজপুরের শিল্পীরা সৃষ্টি করছেন নানান শিল্পসামগ্রী। কানহা রাও তৈরী করছেন এ ধরণের ঘর সাজাবার নানা সামগ্রী নারকেলের দড়ি দিয়ে। বিভিন্ন রকমের পাখি, গাছ, বাবুই পাখির বাসা ইত্যাদি শিল্প সামগ্রীতে ঠাসা তার ঘর।20151105_131002-1 Pot

ছোটো ছোটো এবং সহজলভ্য নানা উপাদান যেভাবে ব্যবহার করে শিল্প সৃষ্টি হয় এখানে তা দেখবার মতন। নারকেলের খোলের ওপর নানা রঙে নানা নক্সা কেটে তৈরী হয়েছে ঘর সাজাবার নানা জিনিস। আবার কাঠ দিয়ে ছোটো ছোটো পাখি তৈরী করে নানা রঙে তাদের রাঙিয়ে দিয়ে ঝোলানো হচ্ছে দরজা বা জানালার পাশে। ভিজে কাপড়ের মণ্ড দিয়ে তৈরী করা হচ্ছে ফুলদানি বা কলমদানি। সেগুলোকে রাঙিয়ে তোলা হচ্ছে নানা রকম রঙিন নক্সা দিয়ে।

শিল্পে ভরপুর এই শিল্পগ্রাম রঘুরাজপুর। সেখানকার শিল্পীরা প্রতিনিয়ত সৃষ্টি-উৎসবে নিয়োজিত। কিন্তু শিল্প-রসিক মানুষের বড় অভাব। অভাব প্রচারেরও। এই অভাব অর্থাভাব হয়ে ধরা দেয় তাঁদের ঘরে। তাঁরা এত সুন্দর শিল্পকর্মগুলো নিয়ে অনন্ত অপেক্ষায় থাকেন, কখন একজন শিল্পপ্রেমী, শিল্প-রসিক সমাদর করবে তাঁদের সৃষ্টির।

কিভাবে যাবেন : পুরী থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার দূরে ভার্গবী নদীর তীরে অবস্থিত রঘুরাজপুর। পুরী শহর থেকে অটো চেপে আধঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে। সাধারণত কণ্ডাক্টেড ট্যুরে এই গ্রামটি দেখানো হয় না।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to শিল্পগ্রাম রঘুরাজপুর

  1. AVIJIT GHOSH বলেছেন:

    Osm!interesting…….

  2. Sandhini Rai Chaudhuri বলেছেন:

    Silpo samporkito notun tathya paoa r sujog holo tai dhanyabad.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.