মানুষের লড়াই শিল্পীর ছবি

চিত্তপ্রসাদের জন্মশতবর্ষে লিখছেন শুভেন্দু দাশগুপ্ত

 

পাশের কার্টুনটি এঁকেছেন চিত্তপ্রসাদ। ১৯৪১ সালে আঁকা কার্টুনটি আমরা সংগ্রহ করেছি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ললিতকলা আকাদেমির ‘চিত্তপ্রসাদ’ বইটি থেকে।01

কার্টুনটিতে ১৯৪১ সালের রাজনীতি, অর্থনীতি। কৃষকের খালি গা, দারিদ্র। হাতে শিকল, গলায় দড়ির ফাঁস, শোষণের চিহ্ন। শোষকদেরও আঁকা হয়েছে : বিদেশী শাসক, দেশিয় রাজন্য বর্গ, সরকারি সশস্ত্র বাহিনী, জমিদার। কৃষক আক্রান্ত, সশস্ত্র আক্রান্ত। চিত্তপ্রসাদের আঁকায় বিদ্রোহী কৃষক হাতের শিকল ভেঙ্গে, কাস্তে পাশে রেখে অস্ত্রের দিকে হাত বাড়িয়েছে। মুখে বিপ্লবের সংকল্প।

এই কার্টুন ১৯৪১-এর। এই কার্টুন এখনকার। এখন আদিবাসী কৃষক আক্রান্ত। আক্রমণকারী বড় পুঁজি, বিদেশী দেশী সরকার, কেন্দ্র রাজ্য, সশস্ত্র বাহিনী, যৌথবাহিনী, সালোয়া জুড়ুম, হার্মাদ, কোবরা, গ্রে-হাউণ্ড, ই.এফ.আর, সি. আর. পি. এফ, অপারেশন গ্রীন হান্ট।

চিত্তপ্রসাদ আজকের সিপিএম, সিপিআই, যারা আজকের আদিবাসীদের উপর শোষকদের আক্রমণের অংশীদার, তাদের পূর্বসূরী অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির তখনকার সদস্য। চিত্তপ্রসাদ সেদিনের কমিউনিস্ট। চিত্তপ্রসাদ তিনের দশকে চট্টগ্রামে ছাত্র আন্দোলনে পোস্টার আঁকার সূত্রে স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি পি. সি. যোশী তাকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। কলাবাগানে ছাত্র ফেডারেশনের আস্তানায় তার ঠাঁই। পার্টির জন্য পোস্টার আঁকা। যোশী তাকে নিয়ে যান বোম্বাইতে পার্টির সদর দপ্তরে।

চিত্তপ্রসাদ পার্টির কাগজ জনযুদ্ধ, পিপলস ওয়ারের জন্য কার্টুন এঁকেছেন, ছবি এঁকেছেন। আমরা জনযুদ্ধ পত্রিকায় ১৯৪৩ সালে ছাপা চিত্তপ্রসাদের তিনটি কার্টুন সংগ্রহ করেছি। এখানে প্রকাশ করলাম।

প্রথম কার্টুনটির ক্যাপশান : আমন ধানের লোভে চোরা কারবারি। কৃষকের ফসলের উপর 02আড়তদারের দখলদারি। কৃষকের কালো রুগ্ন চেহারা, আড়ৎদারের মোটা ভুরি দেখানো চেহারা, পকেটে টাকার বাণ্ডিল। দু’জনের অবস্থার বৈষম্য। এ ছবি এখনকারও।

দ্বিতীয় কার্টুনটির ক্যাপশান : কাপড়ের অভাব। দরিদ্রদের কাপড় না পাওয়া। সরকারের কাপড়ের কন্ট্রোলের গল্প। ছবির তলায় লেখা : মৃতদেহ পরিবার কাপড় না পাওয়ায় আমাদের শিল্পী খবরের কাগজের টুকরা দিয়া ঢাকিয়াছেন।03

তৃতীয় কার্টুন : এই দুটি কার্টুনের অবস্থানের পরবর্তী পর্যায়। এখানে অবস্থা মেনে নেওয়া নয়। রুখে দাঁড়ানো, প্রতিরোধে নামা। ছবির বিষয় : সরকারি প্রকল্প — বাঁধাদর চাল আটার দোকান। দেশবাসীর চাহিদা — খালি থালা ধরা অনেক হাত। রেশন দোকান মালিকদের ফাঁকি — থালায় দিতে চাওয়া একচামচ আটা, বাকি আটা চলে যাচ্ছে চোরা বাজারে — হাতে মুঠো করে ধরা চোরা বাজার থেকে পাওয়া টাকার বাণ্ডিল। পুলিশ, যা প্রশাসনের প্রতীক চোখ বুঁজে। আর এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গণউদ্যোগ জনরক্ষা সমিতি — শক্ত হাতে আটকে দেওয়া চোরাকারবারিকে। এ ছবি তখনকার। এ কার্টুন এখনকার। এখন জিনিসের দামে বেড়ে চলা। সরকারের গণবন্টন ব্যবস্থার গল্প। রেশন দোকান মালিকদের চুরি। সরকারি দলের মদত। এবং বিরুদ্ধতায় গণপ্রতিরোধ। সাম্প্রতিক রেশন বিদ্রোহ।04

চিত্তপ্রসাদের কার্টুন নিয়ে সমসাময়িক ব্যক্তিদের কয়েকটি মন্তব্য রাখছি তাকে, তার আঁকাকে বুঝতে।

শিল্পী প্রভাস সেন : কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার জোরালো হাতের সাদা কালো ড্রইং, লিনোকাট কার্টুন। অত্যাচারিত মানুষের প্রতি ড্রইং, লিনোকাটের লাইনে ভালবাসার অভিব্যক্তিতে তার শিল্পকর্ম তখন। ভূমিহীন চাষির জীবনের সংগ্রাম তিনি তার শিল্প মাধ্যমে মমতায় ও ক্রোধে প্রকাশ করেছেন।

সহযোগী শিল্পী সোমনাথ হোর : জনযুদ্ধ পত্রিকায় ছাপা চিত্তপ্রসাদের ছবি ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলকে সচকিত করে তুলেছিল। তার ছবিগুলি শিল্পীদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্কবানী হিসাবে কাজ করেছিল।

কমিউনিস্ট নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় : বিপ্লবের সহায়ক সব রকম কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদগ্রীব চিত্তপ্রসাদের মেজাজ।

একসময়ের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় : চিত্তপ্রসাদকে জড়িয়ে আছে কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটা যুগ।

চিত্তপ্রসাদের কার্টুন কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিগত দিনের ছবি, আগামী দিনের ছবি। বিরুদ্ধতার ছবি। কৃষকের, আদিবাসী কৃষকের।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.