আছো আপন মহিমা লয়ে

রামকিঙ্কর বেইজ। এই নামটি চিত্রপ্রেমীদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। কিন্তু বারেবারে স্মরণ করলে নতুন কোনও দিক চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রামকিঙ্করকে আবার নতুনভাবে উদ্ভাসিত করছেন নাসির আহমেদ

 

রামকিঙ্কর বেইজ ভারতরত্ন পাননি, পাওয়ার যোগ্য ছিলেন কিনা এটা এদেশে বিতর্কের বিষয়। ভারত সরকার এখন মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করছেন বলে, অবহেলা অনাদরে Book Coverমরণপ্রাপ্ত কীর্তিমান ভারতীয়দের কেউ কেউ ভারতরত্নের জন্য স্মরণযোগ্য হয়ে উঠছেন। এই প্রসঙ্গ তোলার তাগিদের কারণ, আমাদের এই অনেক প্রাচীন দেশের অফুরন্ত শিল্প ভাস্কর্যের ভাণ্ডার — যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ঈর্ষনীয় হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও শিল্পীর ভাগ্যে জোটাতে পারেনি ভারতরত্নের শিরোপা। পরিহাসটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন অধিকাংশ বিদেশী পর্যটকের ভারত ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও কারণ খোঁজা হয়। আমাদের দেশে কোনও ভেনিস বা সিঙ্গাপুর নেই যে বিদেশিরা শুধু শহর দর্শনেই আসতে পারেন। তাঁদের আসার অন্যতম তাগিদ থাকে আমাদের দেশের চিত্র, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যশিল্পের ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা স্মারক নিদর্শনের তথ্য সন্ধান ও তাদের সান্নিধ্যলাভ। অজন্তা, ইলোরার গুহাচিত্র, কোনারকের ভাস্কর্য, তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী পর্যটকেরা ঘুরে ফিরে দেখতে যান, শিল্প সংস্কৃতির তকমা আঁটা আমাদের দেশে এসে, একুশ শতকের আধুনিক দিল্লী শহরে কোন পথ চলতি বিদেশি, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ভবনের ইমারত দেখে থমকে দাঁড়ান না, তাঁদের অপলক দৃষ্টি যায় পঁচিশ ফুটের অতিকায় যক্ষ ও যক্ষীর ভারতীয় অর্থ উপাসক দেবদেবী — মূর্তিযুগলের দিকে যার রূপকার ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ।

আসলে রামকিঙ্কর বিশেষভাবে বেছে নিয়েছিলেন এমন এক শিল্প যে দ্রষ্টার নজর কেড়ে নিতে এর জুড়ি নেই এবং যার আবেদন সম্ভবত সবচেয়ে গণতান্ত্রিক। খোলা আকাশের নীচে, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আপামর মানুষের চোখে ভাস্কর্যে ফুটে ওঠা সাধারণ মানুষ রামকিঙ্করের সাধারণ্যে মেলে ধরা জীবনের জন্য ছিল উপযুক্ত শৈলী।

সম্প্রতি শিল্প সমালোচক প্রশান্ত দাঁ সম্পাদিত রামকিঙ্করের জীবন ও শিল্প প্রতিভা নিয়ে বিভিন্ন লেখকের ইংরেজিতে লিখিত প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়ে একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রকাশিত হয়েছে : Ram Kinkar – Pioneer of Modern Indian Sculpture। মাত্র ৮২ পৃষ্ঠার কলেবরে সংকলিত আছে চিন্তামণি কর, পরিতোষ সেন, গণেশ পাইন, কে জি সুব্রমানিয়াম, বিপিন গোস্বামী ও আরো অনেক প্রখ্যাত শিল্পী ও সমালোচকের রচনা। এমন ঠাসবুনোট, গভীর বিশ্লেষণী প্রবন্ধগুলি রামকিঙ্করের জীবন ও শিল্পপ্রতিভার প্রায় প্রতিটি দিক উন্মোচিত করেছে পরতে পরতে।

গণেশ পাইনের প্রবন্ধ শুরু হয়েছে বিতর্ক তৈরী করে। তাঁর বক্তব্য রামকিঙ্কর তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভার স্বীকৃতি পেলেও ‘আচার্য’ অভিধার আয়ত্বের সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বিশেষত, চিত্রশিল্পের ইতিহাসে আত্মবিশ্লেষণের ধারা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমাদের দেশ সমাজে শিল্পীকে জাতিচ্যুত রাখার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। শ্রী পাইন আরও অনুধাবন করেছেন চিত্রশিল্পী রামকিঙ্কর তাঁর ভাস্কর্য শিল্পীসত্ত্বার অনিবার্য প্রতিফলন। তাই শ্রী পাইন আলঙ্কারিক প্রশ্ন রেখে যান যে রামকিঙ্করের আঁকা ছবিগুলিতেও কি ভাস্কর্যের উচ্চাঙ্গতার আভাষ পাওয়া যায় না? এমন ভাবনা চকিতে আমাদের ভাবনার দৃষ্টিকে ধারালো করে। সাঁওতাল যুবকের সুঠাম গড়ন, তাদের নারী-পুরুষের অপরাজেয় যৌবন, সাঁওতাল বালকের প্রাণবন্ততার মধ্যে প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত সাঁওতাল জনগোষ্ঠী, লালমাটির জেলা রাঢ় বাঁকুড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ — এই সবই রামকিঙ্করের প্রেরণার আদি উৎস ও স্থিরবিন্দু। শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গণে সেই প্রেরণার প্রাথমিক শিল্পদীক্ষার প্রকাশ সাঁওতাল দম্পতির ভাস্কর্যে, এবং বিবর্তনের পরাকাষ্ঠা দেখি স্তনদায়িনী সাঁওতাল মার বুকে লেপ্টে থাকা শিশুর কাব্যিক সুষমায়।

রামকিঙ্করের শিল্পে পাশ্চাত্য প্রভাব প্রসঙ্গে সমালোচকেরা দুটি আন্দোলনের অবদান স্বীকার করেছেন — কিউবিজম এবং এক্সপ্রেশনিজম। কিউবিজমের জ্যামিতিক রীতি-প্রকরণ ও এক্সপ্রেশনিজমের চিত্তে পর্যবসিত সত্যের প্রতিফলন — রামকিঙ্করের শিল্পকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করলেও তাঁর নির্মাণ ও স্থিতি অবশ্যই নিজস্ব দেশ সমাজ থেকে ছেঁকে নেওয়া সংশ্লেষিত রূপ, যেখানে মৌলিক য়ুরোপীয় আঙ্গিক ও প্রকরণের বিচ্যুতি ঘটিয়েছেন গতি ও আবেগের সমন্বয়ে। তাই তাঁর শিল্পে সাধারণ মানুষ, প্রকৃতি এত প্রাণবন্ত।

চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেন স্বীকার করেছেন যে ভাস্কর্যশৈলী তাঁর অধিকার ও আয়ত্বের জগৎ নয়, কিন্তু রামকিঙ্করের ভাস্কর্যের প্রতি তিনি বিস্মিত আকর্ষণের টান অনুভব করেন। ‘Harvesting’-এ রামকিঙ্কর ধ্রুপদী কিউবিজমের বিশুদ্ধতায় ভারতীয় ভাস্কর্যের — যেমন মুন্ডহীন কণিষ্ক — মিশ্রণে তাকে অন্য মাত্রা দিয়েছেন। মুন্ডুহীন নারীর ধান পেটানোর ভঙ্গিতে তাঁর শ্রম ক্ষমতা, জীবিকার তাগিদ ও নৈর্ব্যক্তিকতা ফুটে উঠেছে সেটা সর্বজনীনতাকে ছুঁয়েছে। পরিতোষ সেন রামকিঙ্করের সুজাতাকে (১৯৩৫) ভাস্কর্যের কাব্যিক রূপ বলেছেন। ‘Harvesting’-এর গোত্র কিউবিস্ট। শ্রী সেন আরো খুঁজে পেয়েছেন, রামকিঙ্করের ভাস্কর্যে সমসাময়িক শিল্পীদের মতো গল্পের খোঁজ পাওয়া যায় না। মনোযোগ তাঁর নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতি। এমনটি তিনি লক্ষ্য করেছিলেন রামকিঙ্করের আঁকা সুধীর খাস্তগীরের পোর্ট্রেটে। বিছানার চাদরে রং ও আঠা দিয়ে ধরে রাখা আরাম কেদারায় এলায়িত পুরুষ, মাথায় অবিন্যস্ত ঘন চুল, ঠোঁটে ঝুলে থাকা চুরুট — এক বিষ্ময়কর সৌন্দর্যে রূপ পেয়েছিল।Sujata of Ramkinkar

রামকিঙ্কর বেইজ ছিলেন লুপ্তপ্রায় সেইসব শিল্পীর দলে, যিনি আধুনিক বস্তু সভ্য পৃথিবীর অনুচিত অধিবাসী। ‘ক্ষ্যাপা বাউলের’ মগ্নময় জগতের কথা লিখেছেন রামকিঙ্করের ছাত্র শিল্পী কে. জি. সুব্রমানিয়াম। অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী লেখা। রামকিঙ্করের সহজ অনাড়ম্বর মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পৃক্ত জীবন। গ্রামের মানুষের মত তাঁর অনুভূতিতে ছিল নিসর্গচেতনায় সূক্ষ্ম টান ও এক কল্পময় লোক। তাদের মতো বন্ধনহীন আনন্দে উচ্ছ্বাসে গেয়ে উঠতেন গান। সংলাপেও শহুরে মানুষ চিনে নিত এক ব্যতিক্রমী পুরুষকে। আর তেমনি প্রাণের আবেগে তুলি কিংবা ছেনি হাতুড়ি নিয়ে মজুরের শ্রমের আনন্দে মগ্ন থাকতেন। তাঁর অসংখ্য স্কেচ, জলরং ও তেলরঙের কাজ সাক্ষ্য হয়ে আছে — অজস্র মেটাফরে, প্রতীকে। নারী তাই কখনো বন্য যৌনতা অথবা মাতৃরূপে আরাধ্য। বৃক্ষ পেয়েছে শিবলিঙ্গের প্রতীক, আর পশুরা যন্ত্রণা কাতর হাড় বেরোনো ফসিল কিংবা হিংস্র স্বাপদ। এমন প্রকৃতি-লগ্ন জীবন চেতনা যেন সর্বেশ্বরের সঙ্গে পৌঁছে গেছে রামকিঙ্করের শিল্পে। রামকিঙ্করের উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্যের মধ্যে আছে সুজাতা (১৯৩৫), সাঁওতাল পরিবার (১৯৩৮), মিলের ডাক (১৯৫৬)। প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ ‘কচ ও দেবযানী’ (১৯২৯), মিথুন (১৯৩১)। আর আছে কিউবিজমের কাঠামোয় কিছু প্রায় বিমূর্ত ‘কবির মস্তক’ — Poet’s Head — যা বহু আলোচিত এবং বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এক সময়।

রামকিঙ্কর বেইজ এমন একজন শিল্পী, যিনি অনায়াসে হতে পারেন একটি উপন্যাসের নায়ক। Santhal Familyতাঁকে নিয়ে লেখা হতে পারে মহাকাব্যিক জীবনী কিংবা তৈরি হতে পারে জীবনীমূলক চলচ্চিত্র বা biopic। আমাদের দেশের শিল্পী ও লেখকের জীবনী লিখতে গেলে জীবনীকারকে একটি সামাজিক সুনীতি রক্ষা করতে হয়, সে লেখা অনুমতি নিরপেক্ষ হলেও। রামকিঙ্করের জীবনও ছিল তাঁর সৃষ্টির মতোই সজীব ও প্রাণ-প্রাচুর্যময়। তিনি সামাজিক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। তবু একজন নারীকে ভালবেসে তাঁকে সারা জীবনের সঙ্গী করেছেন। আদ্যন্ত ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রবাদী মানুষটি কথাবার্তায়, সংলাপে সাক্ষাৎকারীদের ছিলেন প্রথম পছন্দ। জীবনতো তাঁর কাছে বয়ে যাওয়া সময়ের সমাহার নয়, সৃষ্টির নির্ঝরে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকার ক্ষণ।

প্রশান্ত দাঁ-র সম্পাদনায় মোট দশজন লেখকের রচনা রামকিঙ্করকে জানার, এমনকি তাঁকে নিয়ে গবেষণা করার অনেক দিগন্ত খুলে দেবে। ভাস্কর্যের মতো বিপুল শ্রম ও সময়সাধ্য কাজ যে সমাহিত মন ও আত্মোৎসর্গ দাবী করে রামকিঙ্করের সেই প্রতিভা ছিল সহজাত। শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ ভেঙে যে বিপুল বৈচিত্র্যময় সৃষ্টির দিশা তিনি দিয়ে গেছেন সেই যাত্রাপথে এখন আর তেমন ঘোড়সওয়ার নেই। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের জন্যই আমাদের বিশেষণগুলি বিভূষিত হয়ে আছে।

 

চিত্র পরিচিতি : ১। রামকিঙ্করকে নিয়ে প্রশান্ত দাঁ-র সম্পাদিত বই এর প্রচ্ছদ। ২। রামকিঙ্করের ‘সুজাতা’। ৩। রামকিঙ্করের ‘সাঁওতাল পরিবার’।

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.