স্বপ্নের কাছাকাছি : ৭

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

বুলুদা এসেছেন। আমার তো সত্যি একটু ধুকপুকুনি লাগছে। অনেকদিন হয়ে গেল, আমি আলেখ্যতে যাই না। ওনাকে বলিওনি যে ছেড়ে দিয়েছি। অথচ আঁকার ব্যাগ নিয়ে ফিরছি। বুলুদা হতাশার চোখে বলল, ‘কি রে আর আসছিস না কেন?’ কিছুই বলতে পারছিনা আমি। আবার জিজ্ঞাসা। আমি বাধ্য হয়ে বললাম, ‘অন্য জায়গায় ভর্তি হয়েছি।’ বুলুদা অবাক হয়ে গেল। হয়ত এটা উনি কল্পনাই করতে পারেননি। আসলে উনি তেমন কিছুই করেন না। বাচ্চাদের নিয়ে থাকেন। সেই বুলুদা নিজের হাতে বাচ্চাদের গড়েন ওনার সাধ্য অনুযায়ী। আর সেই আমি তিন বছর থেকে আঁকা শিখে প্রায় সাত বছরের মাথায় দুম করে ছেড়ে দিলাম, এটায় উনি আহত। উনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ চলে গেলেন। আমারও খারাপ লাগায় মন ভরে গেল।

পরের রবিবার নির্মলদা আমাকে বললেন, ‘আজ তোদের পাড়ার ওদিকে যাবো। তুই আমার সাথেই চলে যাবি।’ আঁকা শেষ করে ওনার সাইকেলের রডে আমাকে নিয়ে উনি বেরোলেন, আমার বেশ একটা গর্ব গর্ব হচ্ছে। আমি বললাম, ‘চলুন না আমাদের বাড়ি।’ সাইকেল চালাতে চালাতেই বললেন, ‘আচ্ছা চল্। পাঁচ মিনিট বসবো।’ আমি তো বাড়িতে ঢুকেই চিৎকার করে বলছি, ‘দ্যাখো, নির্মলদা এসেছেন।’ আমি সাধারণত চিৎকার করি না। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে চিৎকার করাতে বাধ্য করলো। বাবা বলল, ‘আসুন আসুন।’ আমি জ্যেঠুর ঘরে নিয়ে বসালাম। জ্যেঠুর ঘরে তখন তাসের আড্ডা বসতো। সেখানেই নির্মলদা বসলেন। এখন ভাবি আর হাসি পায়। কত সাদামাটা মন ছিল আমার। অনেকেই বলবে, আঁকার স্যার এসেছে, অতো চিল্লানোর কি আছে? আছে আছে ভাই, আছে। আমার যে কি ভালো লাগছে, তা যদি বোঝাতে পারতাম। নির্মলদা প্রায় আধাঘন্টা বসলেন, চা-বিস্কুট খেলেন, মিস্টিও খেলেন। তারপর সবার সঙ্গে গল্প করে চলে গেলেন। সে দিনটা আমি ভুলব না। বাড়িতে বললেন, ‘আপনাদের ছেলে ভালোই করছে।’

কিছুদিন পর থেকেই একটা বিভ্রাট শুরু হতে লাগল। আমরা বসে আছি, নির্মলদা নেই। আসছেন, কিন্তু একটু দেরি করে। বিশুদা আমাদের ছোটোদের ব্যাচে আঁকা শেখাচ্ছেন। আর বড়োদের ব্যাচ অভিভাবকহীন। দেরিতে আসছেন, বিধ্বস্ত। কী যে হয়েছে ওনার কে জানে। ছোটোদের অতো ঔৎসুক্য নেই। বড়োরা ফিসফিস করে। রুদ্রদা, অয়নদাকে বলছে, ‘স্যারের বউটা পাঁজির পাঝাড়া।’ বউ? আমিতো ওভারহিয়ার করেছি। স্যারের বউ? স্যার বিয়ে করেছেন? কই, বাড়িতে তো দেখিনা? অয়নদা ওদের তুলনায় একটু ছোটো। ওকে জিজ্ঞেস করতে ও একটু চুপ করে স্বগতোক্তির মতো বলল, ‘হ্যাঁ রে, স্যার বড়োলোকের মেয়েকে বিয়ে করেছেন। বনিবনা হয় না বাড়ির সাথে। তাই অন্য একটা বাড়িতে বউ আর মেয়ে থাকে।’ মেয়ে? আমি তো আরো আশ্চর্য! মেয়ে আছে? অয়নদা বলছে, ‘বউ এখানে আসে না। স্যার ওই ভাড়াবাড়িতে যায়। এই তো একটু দূরে থাকে।’ আমি তো আশ্চর্য। বড়োরা সব জানে! আমি প্রায় দেড় বছর আঁকা শিখেও জানিনা। যাই হোক, নির্মলদার অবস্থা ভেবে আমার কষ্ট হতে লাগল। একে টাকা পয়সার সমস্যা, তায় বউ বড়োলোকের মেয়ে, বাবা মা প্রায় অথর্ব, বোনের বিয়ে হয়নি, নিজের ছোটো মেয়ে। উফ্, কী অসহায় অবস্থার মধ্যে দিয়ে উনি চালিয়ে যাচ্ছেন।

তারপর কেন জানিনা, আমার স্বপ্নের দুনিয়া বাস্তবের একটা বাড়ি খেয়ে একটু নেতিয়ে গেল। তাবে আঁকার উৎসাহ কমল না। আমি এইট-এ উঠলাম। ভালো ভালো ছবির বই দেখছি, কত কায়দা শিখছি। কিন্তু এবার আমি নিজেই অসুবিধার মধ্যে পড়ে গেলাম।

আমি আর কন্টিনিউ করতে পারছি না। তিন বছর ধরে শিখছি এখানে। কতকিছু শেখার বাকি আছে। কিন্তু কোথা থেকে এক অস্থির মন আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। একবার গান গাইছি, একবার ছবি আঁকছি, কখনো উদাস হয়ে যাচ্ছি, কিছুই ভালো লাগছে না, নানান রকম খেলা চলছে মনের মধ্যে, যেগুলো আদৌ কোনো সুফল দিচ্ছে না আমায়। বাড়িতে তখন ভয়াবহ অবস্থা। আর্থিক ও সামাজিক, সব স্তরেই বিভীষিকা। সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। কত রকম অসম্মান, অবমাননা চলছে। ওই তেরো চৌদ্দ বছর বয়সে এসব দেখে আমার মন বিষিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একথা কেউ ভাবছে না। বাবা ভাবতে পারলেও, সেই মুহুর্তে ওনার মন ও বুদ্ধি একসাথে কাজ করছে না। মা চুড়ান্ত অবহেলিত। বাইরের মানুষজন খুব সহজে বুঝে যাচ্ছে এদের পরিবারে নানান ফাটল আছে। সুযোগসন্ধানীরা সেই ফাটল ব্যবহার করছে। আমি, ছোট্টো একটা মানুষ, রাতের পর রাত ডাইরি লিখছি। ওইরকম ভয়াবহ পরিবেশ অতিক্রম করে জীবনযুদ্ধে নামা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। তাই নির্মলদা আমার জীবন থেকে ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাচ্ছেন। এতো উচ্ছাস, এতো আবেগ, সব সাফ হয়ে যাচ্ছে ধুয়ে মুছে। আমি ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি কোনো এক অজানা কুয়োর মধ্যে, যেখানে শুধুই অন্ধকার। প্রত্যেকদিন আমার ভোর হচ্ছে বাস্তবের লাঠির আঘাতে। আমি আপ্রাণ চাইছি সহজ সরল হয়ে থাকতে, পারছি না। কোনো আনন্দ নেই আমার জীবনে।

তিন-চার মাস টাকা বাকি পড়ে গেছে নির্মলদার কাছে। যাচ্ছি কোনোমতে ওনার কাছে। টেনে টেনে। বলছি, ‘নির্মলদা, সামনের মাসে সব একসাথে দিয়ে দেব।’ একসাথে আশি-একশ টাকার বিলাসিতা আমার তখন নেই। রেফারেন্স বই নেই বলে, বইয়ের দোকানের হারুদা নতুন বই খবরের কাগজের মলাট দিয়ে আমাকে দেয়, বলে, ‘তুই লিখে টিখে আমায় দিয়ে যাস্।’ কোনটা প্রাধান্য দেবো? পড়াশোনা না আঁকা? আমার দারিদ্র্য আমাকে বেত মেরে মেরে বুঝিয়ে দিয়েছে, ‘তোর বাবা মা-কে যেমন হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে সমাজের কাছে, তুইও কি তাই চাস?’ একদিকে আমার প্যাশন, অন্যদিকে বাস্তব। আমি বাস্তবটাই বেছে নিলাম। ছেড়ে দিলাম আঁকার স্কুল। আমার সাধের ছবি, প্রণম্য নির্মলদা সবের উপর জোর করে করে ধুলোবালি ছড়িয়ে দিলাম। ‘প্ল্যান্টিং আর্ট সেন্টার’ আমার কাছে বন্ধ হয়ে গেল।

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.