স্বপ্নের কাছাকাছি : ৬

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

নির্মলদা একদিন বিকেলে একগোছা ফর্ম এনে বললেন, ‘সামনের রোববার সকালে প্রতিযোগিতা আছে। বিশ্ব কল্যাণ সংঘ। ফর্মটা ফিল্ আপ করে দে। এন্ট্রি ফি দুই টাকা। সবাই এখানে চলে আসবি, আমরা একসাথে যাব।’ আমরা ফর্ম ফিল্ আপ করলাম। আর বলতে দ্বিধা নেই, খুব আনন্দ হলো আমার, আমি ফার্স্ট হলাম। ওটা আমার দ্বিতীয় গুরুদক্ষিণা। তবে ফার্স্ট সেকেন্ড হলে নির্মলদার কিছুই যায় আসতো না। বরং কিছু না হতে পারলে উনি একটু মনোক্ষুণ্ণ হতেন। আমার মনে হয়েছে, সব ভালোর মধ্যে এটাই ওনার একটা সমস্যা ছিল। বড্ড বেশি পজিশন, নাম, যশ আঁকড়াতে চাইতেন।

এইভাবে চলছে, চলছে। উনি কতকিছু টেকনিক শেখাচ্ছেন। আমাদের বলছেন, ‘তোরা পুরোনো খবরের কাগজের উপর সিক্স বি পেনসিল দিয়ে নানান ধরণের লাইন আঁকতে থাকবি, বিভিন্ন দিকে, যাতে হাত সেট্ হয়, হাতের আড় ভাঙে। যতক্ষণ না কাগজটা ছিঁড়ে যায়, করতে থাক। তারপর হাতের বিভিন্ন জয়েন্ট দেখিয়ে শেখাচ্ছেন কিভাবে পেনসিল ধরতে হয়, পেনসিল কাটতে হয়। সে এক অদ্ভুত জিনিস। স্কেচ করার সময় উনি পেনসিলের মুখ থেকে প্রায় তিন ইঞ্চি দূরে একটা রাবার ব্যন্ড আটকে দিতেন আর বলতেন, ‘এর ভেতরে যেন আঙুল না যায়।’ প্রথম প্রথম সবারই অস্বস্তি হতো। উনি কয়েকটা ছেলেকে বেদম পিটিয়ে দিতেন। আমি বুঝতাম, স্কেচের সময় উনি চান না হাতের ওপর প্রেসার বাড়ুক। আমার অভ্যাস হয়ে গেল বিভিন্ন রকম ভাবে পেনসিল ধরতে। আর পেনসিল কাটা? ওটাও একটা দারুন কায়দা। ধীরে ধীরে ওটাও রপ্ত করে নিয়েছি। হাতে এইচ পেনসিল দেখলে উনি ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। ‘উজবুক কোথাকার।’

কিন্তু যাই হোক, একটা ব্যাপারে আমার একটু খারাপ লাগা থেকেই যাচ্ছে। উনি কিছুতেই আমাকে একদিনও বড়োদের গ্রুপে ডাকছেন না। আমিতো আপ্রাণ চেষ্টা করছি। কতরকম টেকনিকে ড্রয়িং করছি। আমার সহপাঠিরা বলছে ভালো। কিন্তু ওনার মুখে রা নেই কোনো। ভালোও বলেন না, মন্দও বলেন না। তবে আমার বাবার সাথে ওনার ভালো আলাপ হয়ে গেছে। বাবা ইদানিং মাঝে মাঝে রাতে আমায় নিতে আসে। সেই ফাঁকে একটু সিগারেট দেওয়া নেওয়া হয়। দু-চার কথা হয়। বাবাই ওনাকে মাইনে দেন। আর আমি ঝোলা নিয়ে এঁকেই যাই। আর ভাবি, উনি বড়োদের গ্রুপে ডাকবেন।

অপেক্ষা করতে করতে আমি বিরক্ত। একদিন যাবার পথে ওনাকে বলেই ফেললাম, ‘নির্মলদা, আমি দুপুর দুটোয় আসতে চাই। বাড়িতেও তো কোনো কাজ নেই। বারোটা একটার মধ্যে খাওয়া হয়ে যায়। আমি অতক্ষণ কি করবো?’ উনি আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে। বললেন, ‘ঠিক আছে আয় সামনের দিন।’ আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। আমার লোভ, আমি বই দেখবো। পরের সপ্তাহেই আমার অভিষেক হলো বড়োদের ব্যাচে। আর আমি প্রথম একটা ফুলদানির স্টিল লাইফ করার সুযোগ পেলাম। দেখলাম, বিটুদি অসম্ভব ভালো ও দ্রুতগামী। বাকিরা ওর কাছে স্পিড-এ পাত্তাই পাচ্ছে না। নির্মলদা ওই দুপুর দুটোর সময় এক কাপ চা নিয়ে বসেছেন। হাসছেন, মস্করা করছেন। বিটুদির পিছনে লাগছেন, ‘কি রে বিটু, তোর তো ফুল ফুটলো না।’ বিটু ইলেভেন টুয়েলভ্-এ পড়তো। কপট রাগ দেখিয়ে সে বলছে, ‘কি যা-তা কথা আপনার।’ উনি নিজের মুখেই আলতু-ফালতু জোক্ বলছেন ওদের। কিন্তু একটু আদিরসাত্মক। আর তার মধ্যেই দ্রুতহাতে চলছে স্টিল লাইফ। আর ওনার বাজপাখির চোখ সবার ছবির দিকে। অয়নদা একটু চুপচাপ। রুদ্রদাও। কিন্তু ওরা দুজনে ফিসফাস করে। রুদ্রদা বয়সে একটু বড়ো। টেন-এ পড়ে, অয়নদা নাইন-এ। আর আমি সিক্স-এ। ওই সময়ে ক্লাস দিয়ে বয়স মাপা হতো। রবিদা মোটা, খালি ঘামে। নির্মলদা বলছেন, ‘কি রে রবি, তোর তো জলই লাগে না। গায়ে তুলিটা বুলিয়ে নিলেই তো হলো।’ রবিও মস্তান মস্তান গলায়, ‘কি যে বলেন না আপনি, গায়ে বুলিয়ে নিলেই হলো!’ নির্মলদা হাসছেন, ‘কত রঙ হয়ে যাবে তোর গায়ে, বল্ রবি।’ রবি ঘামছে, হাত ভিজে যাচ্ছে, ছবি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কমলদা একটু সখি সখি টাইপের। সে মেয়েদের মতো বসে, কিরকম করে যেন। লাল টি-শার্ট পড়ে আসে। কালো প্যান্ট। পা দুটো সরু সরু। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। অতি ফরসা। ওকে চট্ করে দেখলে জেন্ডার বোঝা যায় না। আর নির্মলদাও যা-তা বলেন। এই প্রথম বুঝলাম, ওই ব্যাচটা নির্মলদার একটা শ্বাস ফেলার জায়গা। বসে থাকেন, নিজের মতো আঁকেন, গল্প করেন, টেকনিক বলেন, আর ওনার বোন বা মা এসে মাঝে মাঝে একটা বিচ্ছিরি ছোট্টো কাপে চা দিয়ে যায়। বোনের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, কিন্তু ফ্রক পড়ে থাকে, নাকে নাকছাবি। কি অস্বস্তিকর দেখতে লাগে কি বলবো। মায়ের মাথাটা একটুও সাদা বা কালো নয়। পুরোটাই লাল। ধ্যাবড়া করে সিঁদুর পড়েন। চা দিয়ে পাশের ঘরে চলে যান। মাঝে মাঝে বাবা মা বোনের ঝগড়া কানে আসে। খুব খারাপ ভাষায় ওনারা ঝগড়া করেন। নির্মলদা নির্বিকার। কাকে যে বলে এগুলো বুঝতাম না। পরে শুনেছি, বুঝেছি সব। ওগুলো নির্মলদাকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে মারেন। আমি অবাক হয়ে যাই। আমার কৈশোর জীবনে ধীরে ধীরে স্বপ্নগুলো কঠিন বাস্তবের আকারধারণ করতে থাকে। কিন্তু আমি এঁকেই যাই।

আরো একটা আনন্দের খবর আছে আমার। আমি এখন আঁকার প্রতিযোগিতায় প্রথম দ্বিতীয় হই। পুরস্কার পাই। কোথাও শিল্ড, কোথাও সার্টিফিকেট, এইসব। আর আরো একটা খবর। আমি প্রতি রোববার এখন দুপুর দুটোয় আঁকা শিখতে যাই, আটটা অব্দি থাকি। ছয় ঘন্টা! আমার জীবন সার্থক হয়ে গেছে। আর বুঝি নির্মলদা আর্থিক চাপে জর্জরিত। কিন্তু আমারো ওনাকে চল্লিশ টাকা দেবার ক্ষমতা নেই। মনের দুঃখে আমি কুড়ি টাকা দিই, ও আফশোস করি, ইস্ আমি যদি রোজগার করতাম, আমি চল্লিশ টাকা দিতাম।

রাত আটটা বাজলে ফুরফুরে হাওয়ার মধ্যে আলো অন্ধকারে রাস্তায় হেঁটে আমি বাড়ি ফিরছি একদিন। আমি একা থাকলে আনমনে গান গাই। সেইরকম ভাবে গান গাইতে গাইতে ফিরে বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছি, দেখি বুলুদা।

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.