স্বপ্নের কাছাকাছি : ৫

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

অন্ধকারে চমকে ওঠারই কথা। কে? দেখি বাবা। হয়ত রাতে কোনো কারণে উঠেছিল টয়লেট যাওয়ার জন্য। দালানের জানালা দিয়ে দেখেছে ঘরে আলো জ্বলছে। অতো বিধ্বস্ত অবস্থাতেও ওনার খেয়াল আছে ছেলেটা আজ ছবি আঁকা শিখে এসেছে প্রথম।

মনের এক সমুদ্র জল নিয়ে খেলা করতে করতে আমি ঘুমোবার চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম আসেনা কিছুতেই। এমনি ভাবেই হয় ভোর। সোমবার। আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। আমার চারদিকটা ছবিময় হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে দেওয়াল থেকে, বিছানা থেকে, মাটি থেকে, খাবার থেকে, সব জায়গা থেকে এই বুঝি রঙ গড়িয়ে পড়লো, আর আমি জল নিয়ে সেসব রঙ দিয়ে আলপনা বুনে চলেছি। পুরোটাই যেন মতিভ্রম।

ছবি নিয়ে আমার পাগলপনা শুরু হল এবার। স্কুল যাচ্ছি, ফিরছি, সব পড়াও করছি, খাচ্ছি, কিন্তু মন ছবির দিকে। উফ্, রোববার আসতে এত দেরি কেন? ভাবতে ভাবতেই আমি খাতা ভরিয়ে ফেলেছি। কত কিছু। সবই স্কেচ, পেনসিল দিয়ে, পেন দিয়ে।

আবার এল রোববার।

 

আমার তখন মন বসে গেছে প্ল্যান্টিং আর্ট সেন্টার-এ। শুক্রবার থেকেই ভাবনার তোড়জোড় শুরু হয়। আর শনিবার হলেই বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়। কখন রোববার বিকেল চারটে বাজবে। এখন আর কাউকে দিয়ে আসতে হয় না। আমি নিজে চলে যাই। গিয়ে একটু অপেক্ষা করতে হয়, আধ ঘন্টা মতো। তারপর আমার ব্যাচের ছেলেমেয়েরা আসে। কিন্তু ওদের সাথে আঁকতে আমার একটুও ভালো লাগেনা। বরং আগের ব্যাচটা আমায় টানে। তাই কিছু আগে চলে গিয়ে ওদের ছবি দেখি। প্রথম দু-একদিন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নির্মলদা আমার আগ্রহ দেখে আমাকে ভেতরে বসার অনুমতি দিয়েছেন। আমি ওদের জলরঙ দেখি, ওদের তুলি চালানো আমায় মুগ্ধ করে। অনেকের সাথে আমার ভালো আলাপ হয়ে গেছে। রুদ্রদা, অয়নদা, বিটুদি, টুম্পাদি, কমলদা, বিশুদা, রবিদা, এরকম অনেকে। মন দিয়ে লক্ষ্য করলে ওদের ধাঁচা গুলো বোঝা যায়। রুদ্র ও অয়নদা জলরঙ করতে খুব ভালোবাসে। টুম্পা ও বিটুদি পেনসিল স্কেচ। কমলদাটা একটু পাকা আছে। সে ক্যাঁটকেটে লাল রঙ দিয়ে মোনোক্রোম করতে ভালোবাসে। তা লাল ভালোবাসিস বাস না, কিন্তু ওই ক্রিমসন রেড দিয়ে মোনোক্রোম করার কি আছে বাপু? একটু তো স্কারলেট বা অকার মেশাতে পারিস, যাতে চোখে কম লাগে? এইজন্য সে বকুনিও কম খায় না। নির্মলদা একদিন আমার সামনেই তাকে ভয়ানক বকলেন। সে আবার একটু গাঁত-ও ছিল। মুখটা গোমরা করে রাগ দেখিয়ে সে উঠে গেল, বাইরে গিয়ে ঝং ঝং আওয়াজ করতে করতে সাইকেলটা নিয়ে জোরে বেরিয়ে গেল। নির্মলদা বলল, ‘ব্যাটার বহুত পাখনা হয়েছে।’ এসব আমার সামনেই হচ্ছে। আমিও দেখছি, উপভোগ করছি।

আর একটা কথা বলি। নির্মলদা কোনোদিন আমাদের ব্যাচ-এ কোনো ছবির বই বের করত না। হয়ত আমরা বুঝবো না, তাই। কিন্তু ওদের ব্যাচ-এ দারুন দারুন সব বিদেশি বই বের করতো। সিরিজের নামটা এখন একেবারে ভুলে গেছি। প্রত্যেকটা বইয়ের দাম চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা, ১৯৮৫ সালে। আমাদের তুলনায় বেশ বেশি। কিন্তু আমি অবাক হয়ে যেতাম ঐসব বই দেখে। কোনোটায় শুধু বেড়াল আঁকা, কোনোটায় শুধুই নানারকম গাছ, কোনোটায় জলরঙ কিভাবে করতে হয়, কোনোটা আবার অ্যানাটমি ও ন্যুড স্টাডি। ন্যুড স্টাডি দেখে আমার কৈশোরজনিত কোনো লালা ঝরতো না। বরং বিভিন্ন পস্চারের জন্য হাড় কিভাবে কাজ করে সেগুলো শিখতাম। কেউ হাসলে তার চোখ ছোটো হয়ে যায়, হাতের মুঠো কিভাবে আঁকতে হয়, কেউ দৌড়ালে তার স্কেলিটন্ কেমন হয়, কোনো মেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে হাড়ের মুভমেন্ট কেমন হয়, মুখের মধ্যে কান, চোখ, ঠোঁট এগুলোর অনুপাত কিভাবে হয় এসব দেখতে আমার বেশ লাগতো। তার চেয়েও বেশি, একটা বইতে দেখেছিলাম পারস্পেক্টিভ ড্রয়িং — ওয়ান পয়েন্ট টু পয়েন্ট। কোন জায়গা থেকে দেখলে কেমন দেখায়। এখন বুঝতে পারি, আর্কিটেকচারে ঢুকে আমার অন্য বন্ধুদের পারস্পেক্টিভ বুঝতে ও শিখতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হতো, সেখানে আমি হাসতে হাসতে অবলীলায় পারস্পেক্টিভ নামিয়ে দিতাম। একদিকে অঙ্কের প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যদিকে অঙ্কণের প্রতি ভালোবাসা — এই দুটোই আমার আর্কিটেকচার গাছের বীজ অনেক অনেক আগেই পুঁতে দিয়েছিল মনের মাটিতে।

আমার ব্যাচ একদিন শেষ হয়েছে। নির্মলদা বাইরে সিগারেট খাচ্ছে, আর একজনের গলা শুনতে পেলাম। চেনা চেনা লাগলো গলাটা।

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.