স্বপ্নের কাছাকাছি : ৪

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

ল্যান্ডস্কেপটা উনি দেখছেন। মন দিয়ে। আমি দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছি কি বলেন। মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ তুলে আমাকে বললেন, ‘কাঁচা ভিরিডিয়ান মেরে দিয়েছিস?’ আমি তো থতমত। হ্যাঁ না হ্যাঁ না করছি, কি বলতে চাইছে বুঝছি না। উনি বললেন, ‘কাঁচা ভিরিডিয়ান সরাসরি কখনো দিবি না, একটু ইয়েলো অকার মিশিয়ে দিবি, নইলে, ক্যাঁটকেটে হয়ে যায়। শোন’ — বলে মভ গ্রীন, মুজ্ গ্রীন, সী গ্রীন — কতরকমের গ্রীন হয় সেগুলো বোঝালেন। আর একটা চৌকো বাক্স থেকে বড় বড় টিউব বের করে সব দেখালেন। আমি ওই বড় বড় টিউব দেখে লোভে লালায়িত হয়ে গেছি তখন। আগে তো দেখিনি। উনি সব কটা গ্রীন একটু একটু নিয়ে প্যালেটে ফেলে রঙ গুলো বোঝাতে লাগলেন। লেমন ইয়েলোর সাথে ক্রোম গ্রীন দিলে কি হয়। গাছে একদিকে আমি শিখেছিলাম হলুদ দিতে, অন্যদিকে গ্রীন। কী রকম যেন নুন-মরিচ টাইপ লাগতো। উনি ধীরে ধীরে আমার খাতার পাতায় তুলির আঁচড় টানতে লাগলেন। আর সবুজের হাজার একটা শেড তৈরি করতে লাগলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

জ্যেঠু ঠিক সময়ে নিতে এসে দেখি হাসছে। আমি তো খুশি খুশি মুখ করে আছি। জ্যেঠু আমার মন পড়তে পারতো খুব। আমি রেডি হয়ে ‘নির্মলদা আসছি’ বললাম। আমার মনে ধ্বণিত হতে লাগলো, ‘নির্মলদা আসছি’। এতদিন যেটার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলাম, সেটা আমি পেয়েছি। আর ওনাকে দাদা বলার সুযোগও পেয়েছি। আমি আর জ্যেঠু ফিরছি। জ্যেঠু অবশ্য আঁকা-টাকা তেমন বুঝতেন না। অন্তত উনি বোঝেন কিনা সেটা আমি কোনোদিন বুঝিনি। রাস্তা অন্ধকার, কোথাও লাইট জ্বলছে, দোকানপাট আস্তে আস্তে উঠে পড়ছে। আমি আর জ্যেঠু হেঁটে হেঁটে ফিরছি। আমার কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। আমি খুশিতে চুরমার হয়ে যাচ্ছি। আমার মাথায় শুধু সবুজ আর সবুজ …।

ভাবছি, কি কি শিখলাম আজ? এক তো কলম না তুলে কিভাবে পেন দিয়ে স্কেচ করতে হয় (আজও আমি স্কেচ প্রিয়)। আর সবুজের সমারোহ কিভাবে করতে হয়। বার বার ভাবছি, এবার আমার হাত আমার হৃদয়ের কথা শুনবে তো? আলেখ্যর সব বন্ধুদের বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ওরে তোরা আমার সাথে শিখবি আয়, আয়, আয়, এমনটা পাবি না।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি ফিরলাম বাড়ি। ঠাকুমা বলল, ‘হলো’? মা বলল, ‘কেমন শেখান রে?’ বাবা কিছু বলল না। কারণ বাবা তখন বিধ্বস্ত। নিজের কাজের জায়গা নিয়ে। নানান ঝঞ্ঝাট, রোববারেও ছুটি মিলত না।

সেই রোববারটাও তেমনি একটা দিন ছিল। উত্তাল ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের পর বাবা বাড়িতে ফিরেছিল। আর ওই জামা কাপড় পড়েই বিছানায় শুয়েছিল চোখের ওপর হাত রেখে। আমি কি বলব, কিছুই বলতে পারছিলাম না। শুধু বললাম, ‘আমি আজ নির্মলদার কাছে প্রথম আঁকলাম। তুমি আঁকাটা পরে দেখো। এখন রেস্ট নাও।’ বাবা কিছুই বলল না। মাথাও তুলল না। আমি ঘর থেকে চলে এলাম। একদিকে সাংসারিক পরিস্থিতি ভয়ানক, অন্যদিকে আমার আঁকার ইচ্ছে, দুটোই একসাথে গঙ্গা যমুনা স্রোতের মতো মিশতে লাগলো। গঙ্গার ঘোলা জল আর যমুনার কালো জল। এই দুই স্রোতের মিলনে আমি শুদ্ধ হতে লাগলাম।

রাতে খাওয়া হল। আমার একটা টেবিল ল্যাম্প ছিল। সেটা জ্যেঠু কিনে দিয়েছিল। টেবিল ল্যাম্পের আলো আমার কাছে একটা স্বপ্নের মতো ছিল। কালো একটা ঢাকনার মধ্যে থেকে গলানো সোনার মতো হলুদ আলো বের হয়ে আসছে। ঠিক যেইখানে আমি চাইছি, ঠিক সেইখানে সে পড়ছে। সারা ঘর অন্ধকার। সেই টেবিল ল্যাম্প জ্বাললাম। আমি বরাবর ঠাকুমার কাছে শুতাম। ঠাকুমা বিছানায় শুয়ে পড়লো। আমি ঘন লাল মেঝেতে বসলাম টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে। ল্যাম্পটা কিছুটা খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিলাম। আর আমার খাতাটা খুললাম। ওই বাউলের পাতাটা। দেখতেই থাকলাম। শুধু বাউল। আমার হাতের লেখা বেশ ভালো ছিল ওই বয়সে। আমি নিজেও বল পেন-এ লিখতে পছন্দ করতাম না। নিব্ পেন-এ লিখতাম। তবে সেটা ছিল নীল কালির। হঠাৎ করে আমার সেই খয়েরি রঙের নিব্ পেনটা খুব ভালো লাগতে শুরু করল। পেনটা অজস্রবার আমি হাতে ধরেছি। রোজ সকাল বিকেল লিখি। কালি শুষে নিয়ে হাতের তর্জনী মধ্যমায় ভরে যায়। কিন্তু ওই একই পেন নিয়ে অবাক হওয়া আমার প্রথম। যেন একটা নিষ্পাপ শিশু আমার হাতে। প্রেমময় ঈশ্বর আমার হাতে। এবার আমি পেনসিল ছাড়াই ওই কলমটা দিয়ে সাদা পাতায় রেখা টানা শুরু করলাম। ঠিক নির্মলদার কায়দায়। পেনের নিব্ যেন কাগজ না ছাড়ে, এইভাবে।

রাত তখন দশটা বেজে গেছে। ১৯৮৫ সালের রাত দশটা মানে অনেক। টিভি নেই, রেডিও নেই, কি লোভে মানুষ বসে থাকবে? তাই সাড়ে নটায় খাওয়া আর দশটার মধ্যে বিছানায়। আমি কিন্তু হলুদ আলোর শঙ্কুর মধ্যে বসে বসে নীল কালি বুলিয়ে যাচ্ছি। একটা কুড়েঘর, পিছনে কলাগাছ, নারকেল গাছ, কুড়েঘরটা বেশ একটা উঁচু মতন জায়গায় বসে আছে, দরজার সামনে থেকে একটা রাস্তা নিচের দিকে নেমে এসেছে, একটা ছোটো পুকুরের পাশ দিয়ে রাস্তাটা চলে এসেছে। পুকুরে ওই কুড়ে আর গাছের ছায়া দেখা যাচ্ছে। আমি এঁকেই চলেছি। আমার মনে তখন একতারা বেজে চলেছে। সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। আমার তর্জনী ও মধ্যমা নীলে নীলময়। আর আমার সাদা পাতায় অদ্ভুত এক মায়া তৈরি হয়ে চলেছে। সেই অদৃশ্য সুর ছবি মিশে এক অনির্বচনীয় আনন্দ। হুঁশবিহীন আমি থামছি। যখন থামলাম, আমার ছবি শেষ হয়েছে। আমার সাথে মায়ায় জড়িয়ে গেছে সেই ছবি। আমরা কেউ আর আলাদা নই। গুরুর উদ্দেশ্যে তাঁর অনুপস্থিতিতে আমার প্রথম গুরুদক্ষিণা।

হঠাৎ, পিছনের জানালা দিয়ে একটা বাক্য, ‘বাহ্, ভালো হয়েছে।’

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s