স্বপ্নের কাছাকাছি : ৩

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

আমি ওনার উত্তর শুনে ছিটকে গেলাম। উনি বললেন, ‘আমাদের এখানে কিন্তু তিন ঘন্টা করে ক্লাস হয়।’ তিন ঘ-অ-ন-টা? আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার মনের মধ্যে নানান রঙের ঘন্টা বাজছিল। আলেখ্যতে একঘন্টা আঁকা শিখে আমার মন ভরতো না। বসতে বসতেই যেন সময় শেষ হয়ে যেত। আমি চাঁদ পেলাম। খুব খুশি হয়ে বললাম, ‘আপনি যতক্ষণ শেখাবেন আমি ততক্ষণ শিখবো।’ তখন উনি বললেন, ‘ঠিক আছে। সামনের সপ্তাহ থেকে বিকেল পাঁচটায় এসো। পাঁচটা থেকে আটটা। আর বড়দের দুটো থেকে পাঁচটা।

আমার ওখান থেকে একটুও উঠতে ইচ্ছে করছিল না। উনি তখন জ্যেঠুকে একটু হ্রস্ব স্বরে বললেন, ‘আমার মাইনে মাসে কুড়ি টাকা।’ আলেখ্যতে নিত পনেরো টাকা। জ্যেঠু বললো, ‘ঠিক আছে। আমি এসে দিয়ে যাব।’ জ্যেঠু আমাকে বলল, ‘চলো’। আর আমার মন পড়ে আছে স্টিল লাইফের দিকে। আশ্চর্য সুন্দর সব ছবি। একটা খুলি আঁকছে। কিন্তু কি অপূর্ব। আমার মনে হচ্ছে, আমার আর্ট কলেজে পড়া উচিৎ।

জ্যেঠু বুঝলো আমি বসতে চাইছি। আমাকে বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি কিছুক্ষণ থাকো, আমি আসছি। নির্মলবাবু, আপনার আপত্তি নেই তো, ও এখানে থাকলে?’ তখন মনে হয় সাড়ে চারটে বাজে। জ্যেঠু উঠে গেল কোথাও একটা। হয়তো আমাকে একটু শ্বাস ফেলার অবকাশ দিতে। আমি একমনে দেখছিলাম।

আমি এবার আঁকা ছাড়াও ঘরের দিকে তাকাই। দেওয়ালে কয়েকটা বড়ো ছবি ঝুলছে। জলরঙ। ওনার আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। একটা ভোরের সূর্য, একটা রাস্তা, জঙ্গল মতো, লাইট পোস্ট, দু-একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে, একটা দুটো মুরগি, ছাগল … খুব আধো স্বরে আঁকা। কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাচ্ছে না। আমি আঁকাটার দিকে অপলকে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হল, আমি কি অমন আঁকতে পারি না? পারি, পারি, পারি। আমিও পারবো। নির্মলদা আমাকে কিছুই বললেন না, উঠে গেলেন।

এবার আমি একটু মুক্ত হয়ে পাশের একজন দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদা, তোমার নাম কি?’ সে মুখ না তুলে বলল, ‘রুদ্র, তোর?’ আমিও বললাম। আমি এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। আর সে অবজ্ঞাভরে উত্তর দিতে লাগল। বাকি ছেলেমেয়েরাও নিজেদের মধ্যে হাসি-মস্করা করছে। ওদের কথা শুনছি। আমাকে কেউ দলে নিচ্ছে না। আমার সম্পর্কে কোনো আলোচনাও করছে না। শুধু আঁকতে আঁকতে এ ওর পিছনে লাগছে। কথায় কথায় ওরা বলছিল, সামনের রোববার ব্রিজের ধারে, ব্রিজের ধারে। কি রে বাবা। ব্রিজের ধারে কেন যাবে? আরো কিছুক্ষণ মন দিয়ে শোনার পর বুঝলাম, নির্মলদা ওদের দল বেঁধে বাইরে নিয়ে যান ল্যান্ডস্কেপ আঁকা শেখানোর জন্য। আমার যে সেসব শুনে নিজেকে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কেন যে এখানে আগে আসিনি!

সাত পাঁচ ভাবছি। শুনি বাইরে জ্যেঠুর গলা।

জ্যেঠু ঠিক কি বলছে সেটা শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু কথাটা নির্মলদার সাথেই বলছে। তারপরই দরজা খুলে নির্মলদা ঘরে ঢুকলেন। আমাকে বললেন, ‘তোর জ্যেঠু তোকে আটটার সময় নিতে আসবে। তুই আজ থেকেই শুরু করে দে।’

আমার তখন আনন্দে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। লাফাতে ইচ্ছে করছিল। চ্যাঁচাতে ইচ্ছে করছিল। কোনোটাই করতে পারলাম না। একটা খাতা এনেছিলাম, সেটা খুললাম। নতুন খাতা। নির্মলদা বললেন, ‘আমায় দে’।

আমি খাতা এগিয়ে দিতেই উনি নিজের পকেট থেকে একটা নিব্ পেন তুললেন। দেখলাম, সোনালি রঙের নিব্। বডিটা কালো। ঝকঝক করছে। যেন রাজার কলম। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। উনি ওই পেনটা আমার খাতায় ঠেকালেন, একটুও তুললেন না। অত্যন্ত দ্রুততায় একটা ফিগার এঁকে ফেললেন। আমি দেখলাম। বাউল। আমার আবার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল।

আমায় বললেন, ‘যা খুশি আঁক।’ আমি বললাম, ‘খুলিটা আঁকবো?’ উত্তর এলো, ‘না। অন্য কিছু।’ আমি তখন একটা ল্যান্ডস্কেপ আঁকতে শুরু করলাম। ছোটোবেলায় আমি আঁকতে শুরু করলে আমার বাহ্যজ্ঞান থাকত না। তাই হলো, আঁকতেই থাকছিলাম। অবশ্য আমার হাত আর কত ভালো হবে! আমি আলেখ্যতে যা শিখেছিলাম সেটাই আঁকছিলাম। ততক্ষণে পাঁচটা বেজে গেছে। বড় ছেলে মেয়েরা উঠে পড়েছে। সবাই ‘নির্মলদা আসছি’ বলে বেরিয়ে যাচ্ছে। আর সাথে সাথে ছোটোদের ব্যাচ, মানে আমাদের ব্যাচের ছেলেমেয়েরা ঢুকছে। কাউকেই চিনি না। এরকম পাঁচ-সাতজন ঢোকার পর একটা মেয়ে ঢুকলো। সে ঢুকেই আমাকে বলল, ‘কি রে তুই?’ আমিও অবাক হয়ে বললাম, ‘তুই?’ তার নাম রঞ্জনা। সে আমাকে বলল, ‘তুই আজ ভর্তি হলি? আমি আগের রোববার ভর্তি হয়েছি।’ ভালোই হল। একজন চেনা পাওয়া গেল।

ছোটো থেকে কো-এডুকেশন স্কুলে পড়ার দরুন আমার ছেলে মেয়ে বিভেদ কম। তাই বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো জেন্ডার আমি মানি না। যার আমার সাথে খাপ খায় সেই বন্ধু।

সবাই বসে গেল, সবাই খাতা বার করছে, আমিও এঁকে যাচ্ছি। জলরঙ করব বলে উঠেছি। একজন বলে দিলো কোথায় কল আছে জল পাওয়া যাবে। জলের ছোট্টো বাটিটা নিয়ে উঠে বাইরে বেরোতে নির্মলদার বাড়িটা ভালো করে দেখতে পেলাম। একেবারে শতচ্ছিন্ন, হতদরিদ্র অবস্থা। ভেতরে আর একটা ঘরে কয়েকজন সিনেমা দেখছে। তখন রোববার বিকেলে বাংলা না হিন্দী কিছু একটা সিনেমা হতো। আমি সেই ঘরের সামনে রাখা একটা ড্রাম থেকে জল নিয়ে এসে আবার আঁকতে শুরু করলাম।

তার পনেরো কুড়ি মিনিট পর নির্মলদা আবার ঢুকলেন। একটা ছেলেকে বললেন, ‘নরেন, তোর বাড়ির কাজ হয়েছে?’ সে বলল, ‘হয়নি’। নির্মলদা বললেন, ‘উঠে দাঁড়া’। সে উঠল না। ভয়ানক একটা গলা করে এবার উনি বললেন,‘উ-ঠে-দাঁ-ড়া’। নরেন ভয়ে ভয়ে উঠলো। উনি বললেন, ‘কান ধর’। সে কান ধরল। বললেন, ‘ওঠ-বস কর কুড়িটা।’ আমার তো হাত পা শুকিয়ে গেছে ততক্ষণে। আঁকাও প্রায় শেষ। একটা ল্যান্ডস্কেপ এঁকেছি। ওই মাঠ-ঘাট গোছের কিছু একটা। কয়েকটা লোক। একটুও ভালো হয়নি সেটা। বিদঘুটে লাগছিল। কি আশ্চর্য, আমার মন যা চাইছে আমার হাত সেটা করতেই পারছে না! লজ্জায় আমি বেগুনি হয়ে যাচ্ছিলাম। ওদিকে নরেন ওঠ-বস করছে। কেউ কেউ দেখছে। নির্মলদা বললেন, ‘তোর বাবাকে ডেকে দিবি। কথা বলব। তোকে এখানে আসতে হবে না।’

আমাকেও যদি বলে, তোর বাবাকে ডেকে দিবি। আসতে হবে না তোকে। আমি তো সেদিন বাড়িই ফিরবো না! এবার উনি আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘এঁকেছিস?’ আমি ওই আধা ভেজা খাতাটা সাবধানে এগিয়ে দিলাম। উনি সেটা দেখতে লাগলেন।

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s