স্বপ্নের কাছাকাছি : ২

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

এরকম ভাবেই আমার আঁকার দিন কাটতে লাগলো। আমি প্রায় প্রতি রবিবারই এখানে সেখানে প্রতিযোগিতায় যাই, আর ওই ছেলেদের আঁকা দেখি। ওরকম করতে করতে জানতে পারলাম ওরা নির্মলদার কাছে আঁকা শেখে। এমন যিনি মানুষ, তাঁকে তো দেখতে হবে। আমি ব্যাগ্র হয়ে পরলাম, কে এই নির্মলদা! আমার সুযোগ জুটলো একদিন এরকমই একটা প্রতিযোগিতায়। ওনার ছাত্রছাত্রীরা বলাবলি করছিল, আজ নির্মলদা আসবেন। আর আমিও তো ওদের কাছাকাছি বসতাম। প্রতিযোগিতা সাধারণত হতো কোনো একটা ক্লাবের মাঠে। সেখানে রোববার সকাল আটটায় যেতে বলা হতো। প্রতিযোগিতা শুরু হত প্রায় ন’টায়, ঢিলেঢালাভাবে নাম ডাকতে ডাকতে। সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হতো কি করতে হবে। মাঠে একটা বড়ো ত্রিপল পাতা থাকতো। মাঠের বাইরে বাঁশ দিয়ে বানানো রেলিং। সেখানে সব অভিভাবকরা উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আঁকা শুরু হবার আগেই ফার্স্ট প্রাইজ ঘোষণা হয়ে গেছে এমন একটা মুখ নিয়ে সব মা বাবা। আমার ভাগ্য খুব ভালো যে আমার মা বা বাবা জীবনে কখনো এইরকম প্রতিযোগিতায় যায়নি। আমিও স্বস্তি পেয়েছি। তো সেদিন, প্রতিযোগিতা শুরু হতেই আমি একটা ছেলেকে বলছি, ‘এই নির্মলদা কখন আসবেন রে?’ সে ওনার কাছে আঁকা শিখতো। তার নাম তমাল। কয়েকটা প্রতিযোগিতায় যাওয়ার পর তার সাথে আমার একটু চেনা হয়ে গেছিলো। সে প্রায় নীরব মুখে এঁকে চলেছে। তাকে বার দুয়েক জিজ্ঞেস করার পর মুখ না তুলেই বললো, ‘আসবেন কোনো একটা সময়ে।’ আমি ওকে বললাম, ‘আলাপ করিয়ে দিবি?’ ও কিছু বললো না। কিছু পরে, অভিভাবকদের মধ্যে থেকেই একটা ছোট্টো শোরগোল উঠলো, এই তো নির্মলদা এসেছেন, এই তো।

তো শেষমেশ আমি ওনাকে দেখলাম। ছয়ফুট লম্বা, রোগা, শ্যামবর্ণ, মুখে চাপদাড়ি, আকাশী-নীল পাঞ্জাবি, সাদা চোস্ত, আঙুলে একটা রিং ঝকঝক করছে, আর একটা গগলস্। নির্মল মুখার্জী। ও হ্যাঁ, হাতে সিগারেট। আমি ওনাকে দেখলাম। দেখে আমার কিশোর মন আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল। আমি দূর থেকে ওনাকে দেখতেই লাগলাম। সেদিন আর ভালো করে আঁকতেই পারলাম না। আর হ্যাঁ, সেই তমালের থেকে ওনার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে নিলাম। আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে গেলে প্রায় কুড়ি মিনিট লাগবে। ওখানে ভ্যানিস কালীতলা বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে।

বাড়ি এসে বললাম জ্যেঠুকে। ‘আমি অন্য জায়গায় আঁকা শিখবো।’ জ্যেঠু বললো, ‘কোথায়?’ আমি বললাম, ‘সবাই নির্মলদার কাছে আঁকা শিখে ফার্স্ট সেকেণ্ড হয়, আমিও শিখবো।’ জ্যেঠু কিন্তু আর কোনো প্রশ্ন করলো না। তুই হয়তো অবাক হবি, আমি বাবা মা থাকতে জ্যেঠুকে বললাম কেন। তাহলে বলি, বাবা আমার পড়াশোনাটাই দেখতো শুধু। বাকি এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি সব জ্যেঠুর তত্ত্বাবধানে হতো। তো, জ্যেঠু আর আমি সেই রোববারই বিকেলের দিকে বেরোলাম নির্মলদার বাড়ি যাবো বলে।

এদিকে একটা চাপা উত্তেজনা আমার মধ্যে কাজ করছে। কতরকম ভাবছি। উনি আমায় নেবেন না। উনি এখন বাড়িতে নেই। উনি আমার আঁকা দেখতে চাইবেন। যতো সব উদ্ভট চিন্তা করতে করতে আমি আর জ্যেঠু এগোচ্ছি। আমি তখন ক্লাস ফাইভ। এমন কিছু বড়োও না। আবার মনে মনে ছোটোও নই।

তো লোককে জিজ্ঞেস করতে করতে আমি যেখানে এসে দাঁড়ালাম, আমার চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে গেল!! চারপাশে সব দারুন দারুন বাড়ি, আর তার মাঝে একটা একতলা প্রায় মাটির বাড়ি। বাড়ির গা দিয়ে একটা নারকোল গাছ উঠেছে। বাইরে নীল রঙের একটা গ্রিল। একটা ছোট্টো বোর্ড-এ লেখা আছে ‘প্ল্যান্টিং আর্ট সেন্টার’। ছাদের বদলে টালি। একটা দাড়িওয়ালা বুড়ো লোক গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় বেশ কয়েকটা সাইকেল। এই বাড়ি ওনার? উনি আর্টিস্ট? আমার যেন কেমন একটু লাগতে লাগলো। পোষাক দেখে তো সকালে মনে হলো না! ঠিক জায়গায় এলাম তো? এইসব ভাবছি। আর আামার জ্যেঠু ততক্ষণে জিজ্ঞেস করে ফেলেছে ওই বুড়ো কে, ‘এটা কি নির্মল মুখার্জীর বাড়ি?

বুড়ো ভদ্রলোক এবার ভেতরে একটা ডাক দিলেন। কি নাম ধরে সেটা আজ আমার মনে নেই, বুড়ো-টুড়ো কিছু একটা হবে। কিছু পড়েই নির্মলদা বেরিয়ে এলেন। আমার যেন ভগবানকে দেখার অবস্থা। ওই ছোটোবেলার কথা ভাবলে আজও ভালো লাগে। কেমন দুমদাম অবাক হতাম। নির্মলদা বেড়িয়ে আসতে জ্যেঠু বললেন, ‘আমি শিবপুর ট্রাম ডিপোর কাছ থেকে আসছি। এ আমার ভাইপো, আপনার কাছে আঁকা শিখতে চায়।’ শুনে উনি আমার দিকে এক মুহুর্ত তাকালেন, তারপর বললেন, ‘আয়’…। আয়, আয়, আয়, আয় … ওই একটা ডাক আমার সব ভাবনা দূর করে দিলো। আয়। এসো বা আসুন বললেন না, বললেন, আয়। আমি তো প্রায় হুরমুড় করে ঢুকে পড়ি ঘরে।

একটা নীল রঙের ঘর। মাটি মাটি গন্ধ। ওপরটা চালা। একটা ফ্যান বনবন্ করে ঘুরছে। কয়েকটা বড় বড় দাদা-দিদি বসে বসে একটা সত্যিকার খুলি দেখে আঁকছে। স্টিল লাইফ। আমি ওদের আঁকা দেখে পাগল হয়ে গেলাম। আলেখ্য তো এদের ধারে কাছে আসবে না! ঠিক যেন বিদেশী বই দেখছি। আমি চারিদিকে তাকালাম। ওই ঘর দিয়ে আর একটা ঘর, ভেতরে যাওয়া যায়। মানে ভেতরে আর একটা ঘর আছে। সেটা সেই মুহুর্তে আমার কাছে অজানাই রইল। উনি বেশ গম্ভীর স্বরে আমাকে বললেন, ‘বোস্’।

বোস্ মানে মাটিতে। কোনো শতরঞ্চি বা মাদুরও পাতা নেই। লাল মেঝে। পাখা আর টিউব। আমি আমার ঝোলা নিয়ে ভাইভা দেওয়ার মতো বসলাম। আমি এক দেওয়ালে পিঠ দিয়ে, উনি উল্টো দিকের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে। ওনার দুটো পা আমার দিকে করা। একটা পাঞ্জাবি, সাদা প্যান্ট। সেই একই মূর্তি। আমাকে বললেন, ‘সকালে আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়েছিলি কেন?’ আমি তো থ্। উনি আমাকে দেখেছেন! একটা পুটকি ছেলে ওনার দিকে চেয়ে আছে। আমি আবার আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তারপর সত্যি কথাটাই বললাম। ‘আমি লোভে পড়ে এসেছি’। ওনার কোনো ভাবান্তর হলো না। উনি একটা সিগারেট ধরালেন।

আমি তড়িঘড়ি করে আমার আঁকা বের করতে গেলাম। উনি বললেন, ‘থাক থাক’। তারপর একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে আমাকে বলতে শুরু করলেন, ‘দ্যাখ, এটা আমার ভাত-বৃত্তি (এখনো ওই শব্দটা আমার কানে বাজে, ভাত-বৃত্তি)। আমি এখানে রোজ আঁকা শেখাই। তবে তুই তো স্কুলে পড়িস। তোর বোধহয় শনি বা রোববার আসতে পারলে ভালো হবে।’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, রোববার, রোববার’। তখন উনি বললেন, ‘দ্যাখ, আমার এখানে আঁকা শেখার একটা নিয়ম আছে। আমি কিন্তু মারধোর করি। বল্।’ এই বল্-টা আমায় নয়, পাশের একটা দাদাকে। সে তখন মুচকি হেসে চুপ করে গেল। উনি বললেন, ‘আমি কিন্তু কান ধরে ওঠবোশ করাই, আঁকা না করে আনলে বাইরে বের করে দিই। আঁকা নিয়ে ছেলেখেলা আমি বরদাস্ত করি না। তুই ভেবে আসিস।

আমি তো তখন পাগল। আমি বললাম, ‘না না, আমি আসবই’। আমি জীবনে কখনো মার খাইনি। আর আমি কিননা বলছি, মারলেও আসব। হয়তো মনে মনে একটা বোধ হচ্ছিল যে আমি মার খেতেই পারিনা। অথবা, মারলেও, প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট প্রাইজ আমার চাই। কি মনে হচ্ছিল, তা এখন বলা সম্ভব নয়।

তো, উনি আমাকে বললেন, ‘একটা ফর্ম দিচ্ছি, সেটা ভরে দে।’ আমি দেখলাম। দুটো ফর্ম। একটা ফর্ম-এ আমার নাম, বাবার নাম, স্কুল, বয়স এইসব লেখার জায়গা। অন্যটায় রঙের নাম। ওই রঙের নামের লিস্ট দেখিয়ে আমাকে বললেন, ‘এই রঙগুলোর নাম জানিস? আমি তো সজোরে বলে দিলাম, ‘হ্যাঁ’। উনি বললেন, ‘বল তো’। সত্যিরে, আমি গড়গড় করে সব বলে দিলাম — মানে, ক্রিমসন রেড, ভার্মিলিয়ন রেড, প্রুসিয়ান ব্লু, কোবাল্ট ব্লু, ভিরিডিয়ান গ্রীন, ক্রোম গ্রীন এইরকম। উনি খুশি হয়ে গেলেন, খুব খুশি। একটা ক্লাস ফোর-ফাইভের ছেলে সবকটা রঙের নাম বলে দিয়েছে।

তারপর উনি আমায় বললেন, ‘রোববার আমার দুটো ব্যাচ। একটা দুপুরে, একটা বিকেলে। দুপুরেরটায় একটু বড়রা আসে। আর তোর মতো ছেলেমেয়েরা বিকেলে। যদি একবছর আঁকার পর দেখি ভালো উন্নতি হয়েছে, তাহলে, দুপুরের ব্যাচ-এ সিফ্ট করা হবে। ঠিক আছে?’ আর আমি!! সে সব শুনে, তক্ষুনি নিজেকে দুপুরের ব্যাচ-এ সিফ্ট করে নিয়েছি, বড়দের সাথে আমিও আঁকছি।

কিন্তু একটা খটকা লেগে গেল। দুপুরের ব্যাচ, আবার বিকেলের ব্যাচ! মাত্র দুটো ব্যাচ। আলেখ্যতে তো সকাল আটটা থেকে ন’টা একটা ব্যাচ, ন’টা থেকে দশটা, দশটা থেকে এগারোটা, এগারোটা থেকে বারোটা, বারোটা থেকে একটা, মানে পাঁচটা ব্যাচ সকালেই হয়ে যেতো। আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম, বিকেলের ব্যাচটা কটা থেকে শুরু? উনি যা বললেন, তাতে আমার মাথাটা ঘুরে গেল।

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s