স্বপ্নের কাছাকাছি : ১

এ এক আশ্চর্য স্বপ্নকথা, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব মিলেমিশে যায়। ছুঁয়ে যায় সকলের মন, কিন্তু ছোঁয়া যায় না স্বপ্ন। নস্ট্রালজিয়ায় ভারাক্রান্ত সৌমেন মিত্র-র কলম।

Nirmal 01আঁকা শেখানো মানেই যে একটা ‘মাছ ধরছে, দূরে আকাশ, কালো বর্ডার’ সিনারি নয় সেটা আঁকার শিক্ষকরা না বুঝলে কে বুঝবে বল্ তো?

এই প্রসঙ্গে আমার আঁকা শেখার কথা তোকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার যখন বয়স তিন, তখন আমার জ্যেঠু হাত ধরে পাড়ার আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলো। একটা পুরোনো বাড়ি, স্যাঁতসেঁতে ঘর, আট-দশজন দাদা দিদি বসে বসে আঁকছে, কাগজ প্যাস্টেল রঙতুলির সেই আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ আমি এখনো পাই। প্রথম দিন আমি একটা বেড়াল এঁকেছিলাম। ভেবেছিলাম বেড়াল আঁকছি, কিন্তু লাইন-এর এমন দশা যে ওটা হাবিজাবি ছাড়া কিছু ছিল না। দুজন দিদিমনি ছিলেন। একজন বললেন, ‘বাহ্, বেশ হয়েছে। পরের দিন আমরা ফলের ঝোড়া আঁকবো। তুমি বাড়িতে, বাজারে ভালো করে সব ফল দেখবে।’ তো যাইহোক, সেই আঁকা স্কুলের নাম ছিল ‘আলেখ্য’। খুব সুন্দর নাম। আমার একটা ঝোলা ব্যাগ ছিল। সেখানে কাগজ, পেনসিল, রঙ, রাবার সব থাকতো। আমি আঁকতে খুব ভালোবাসতাম। এই স্কুলটায় আমি ক্লাস থ্রি অবধি শিখেছি। তখন কিন্তু পুরোনো বাড়িতে আঁকা শেখানো হতোনা। একটা নতুন বাড়ির ম্যাজেনাইন ফ্লোরে শেখানো হতো। বেশ লাগতো। ম্যাজেনাইন ফ্লোরের উচ্চতা কম হয়। সেখানে বেশ একটা আরামদায়ক অনুভূতি আসতো। অনেকে আঁকতে যেতো সেখানে। ওখানেই প্রথম জলরঙ শিখেছি আমি। টিউব কালার … দিদিমণিরা যা শেখাতেন তাই শিখতাম। সেই সময়ে মনে পড়ে একজনকে চাইনিজ ইঙ্ক দিয়ে আঁকতে দেখেছিলাম। ব্যাস, অমনি আমার লোভ হয়েছিলো আমিও আঁকবো। চাইনিজ ইঙ্ক কেনা হলো, কলম কেনা হলো, তার সাথে কয়েকটা নিব্। কি ভালো যে লাগতো কালো কালি দিয়ে স্কেচ করতে। ক্লাস টু বা থ্রি-তে আমি তখন অন্যদের তুলনায় ভালো আঁকতে শিখেছি। সবাই প্রশংসাও করছে। আর আমি কেবল স্কেচ আঁকছি …।

আমাদের এখানে খুব বসে আঁকো প্রতিযোগিতার চল ছিল। সময়টা বলছি ১৯৮২-৮৫। আমি আলেখ্যতে আঁকা শিখছি, আর সেখানকার বুলুদা আমাদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠাচ্ছে। আমি খুবই ছোটো বলে আমাদের বিভাগ ‘ক’। সেখানে যেমন খুশি আঁকো। মাস্টারমশাই ও দিদিমণিরা যেমন শিখিয়েছেন, ছেলেমেয়েরা ঠিক তেমন তেমন এঁকে দিচ্ছে। একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখতাম, যারা যে ছবিই আঁকছে, তার বাইরে একটা করে কালো বর্ডার দিচ্ছে এটা আমার ভালো লাগতো না। আর আমার জীবনের প্রথম ছবি আঁকা প্রতিযোগিতার ছবিটা নিজের মত অনুযায়ী এঁকেছিলাম। এঁকে কিছু হয়নি, দিদিমণি সামান্য বিরক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আমি খুশি হয়েছিলাম একটা কথা ভেবেই যে আমি ‘নিজের খুশি মতো আঁকো’ ব্যাপারটার মর্যাদা রাখতে পেরেছি। কিন্তু জানিস, ক্লাস থ্রি থেকে ওই স্কুলটার ওপর আমার একটা অনিহা আসতে থাকে। সেটা একদিকে যেমন ‘পুশ ফ্যাক্টর’, অন্যদিকে একটা ‘পুল ফ্যাক্টর’ কাজ করছিল।

‘পুশ ফ্যাক্টর’টা ছিল এই যে, আমি কিছুই শিখছিলাম না। বরং বেশ বিরক্তি আসছিল। আর ‘পুল ফ্যাক্টর’টা ছিল এই যে, আমি যেখানে আঁকার প্রতিযোগিতায় যেতাম, সেখানে সেখানে কোনো একটা আঁকার স্কুল থেকে এসে ছেলেমেয়েরা সব প্রাইজ জিতে নিয়ে যেত। আমি তাজ্জব হয়ে যেতাম ওদের আঁকা দেখে। কি ছোটো কি বড়ো, সবাই এতো সুন্দর আঁকে। ওদের মুখ দেখে মনে হতো ওরা যেন আঁকতে আঁকতে স্বর্গসুখ ভোগ করছে। আমার ব্যাগ্র চোখ বার বার সেই ছেলেমেয়েদের আঁকার দিকে চলে যেত। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে দেখতাম ওরা কিভাবে আঁকছে। একজনকে তো দেখেছিলাম, পেনসিল দিয়ে হাল্কা একটা এঁকে নেবার পরে আর্ট পেপার সোজা নিয়ে গিয়ে টিউবওয়েল-এর তলায় ধরতে। অর্থাৎ সে ছোকরা আর্ট পেপারটা স্নান করিয়ে দিলো। আমিতো তাজ্জব হয়ে গেলাম, এ কি রে বাবা! তারপরেই দৌড়ে এসে ছেলেটা সামান্য জল ঝরিয়ে বিভিন্ন রঙ ডিপ্ করে করে ছড়িয়ে দিতে লাগলো, লাল, নীল, হলুদ, খয়েরি … নানারকম। তারপর কাগজটা একদিকে হেলিয়ে দিয়েই অনেকটা রঙ গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। আমি আবার তাজ্জব বনে গেলাম। সে একটা অস্বাভাবিক সুন্দর গোধুলির দৃশ্য এঁকে ফেলেছে!

(ক্রমশঃ)

অলঙ্করণ : সৌমেন মিত্র ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.