রঙের প্রতীক

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি চতুর্দশ কাহিনী।

 Rang Head

মানুষের জীবনে রঙের প্রভাব ও রঙের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বসে সে ভাবনার কোনো শেষ পাইনি আমি। শুধু পেয়েছি আমাদের জীবনকে রঙীন থেকে আরো রঙীন করে তোলার উপায়। ছবি দেখা, ছবি থেকে আনন্দ পাওয়া, রঙের সঙ্গে ছবির যে সম্পর্ক সেই সম্পর্ককে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া।

কিন্তু শুধু কি তাই। ছবির বাইরেও তো রঙ নানাভাবে আমাদের প্রভাবিত করে চলেছে। নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ, ভোরের লাল আকাশ — এক-একটা প্রকৃতির প্রভাব আমাদের মনোজগতে এক-এক রকম। কালো মেঘ দেখলে মন যেমন বিষন্ন হয়ে ওঠে তেমনই পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ দেখলেই আনন্দে মন নেচে ওঠে। পুজোর গন্ধ যেন নাকে এসে লাগে।

এটুকুইতো নয়। এর বাইরে আরো নানা ক্ষেত্রে রঙ আমাদের জীবনকে জড়িয়ে রেখেছে।traffic light যেমন ট্রাফিক সংকেতের কথাই ভাবা যাক। লাল দেখলে বিপদ বুঝে দাঁড়াতে হবে, হলুদ মানে সতর্ক হয়ে চলতে হবে আর সবুজ মানে নিশ্চিন্তে ‘এগিয়ে যাও’। এই বিধি তো গোটা পৃথিবী জুড়েই মান্য। কিন্তু প্রশ্নকি করেছি নিজেকে যে, লালরঙেই কেন থামতে বলা হয়?

এমন প্রতিটি রঙ নিয়েই প্রশ্ন ও উত্তরের খেলা খেলা যায়। যেমন লালরঙের ক্ষেত্রেই : এই রঙ বিপদের চিহ্ন হিসাবে গোটা পৃথিবীতেই স্বীকৃত। বিপদ ও লাল যেন সমার্থক হয়ে উঠেছে। ট্রাফিক সিগন্যালেও সেই সূত্রেই লালরঙ মানে ‘থামুন ও দেখুন কোনো বিপদ আছে কিনা’। এটা যেমন একই সঙ্গে রঙের মানসিক প্রভাব। লালরঙ দেখলেই বুকটা ধক্ করে ওঠে, রক্তপাতের কথা মনে হয়। তাই বিপদের কথা মনে আসে। কিন্তু ট্রাফিকে এর আর একটা বিজ্ঞানও আছে। লালরঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোগুলোর চেয়ে সবচেয়ে ছোট। ফলে লালরঙ অনেক দূর থেকে খালি চোখে দেখা যায়। থামতে বলা মানে অনেক দূর থেকেই কোনো গাড়িকে নির্দেশ পাঠানো যাতে সে প্রস্তুতি নিতে পারে থামার জন্য। একইভাবে হলুদরঙও অনেক দূর থেকে দেখা যায়, এমন কি ঘন কুয়াশাতেও হলুদরঙ দেখতে পাওয়া সম্ভব। যে কারনে হলুদকে সতর্ক হয়ে চলার চিহ্ন হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। আর এই একই কারনে হলুদরঙের আলোকে ‘ফগ্ লাইট’ হিসাবে ব্যবহার করা হয় যাতে কুয়াশাতে পরিষ্কারভাবে রাস্তা দেখা সম্ভব হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লালরঙ যেমন বিপদের চিহ্ন তেমনই লালরঙ প্রেমেরও প্রতীক। বিপদ ও প্রেম কি হাত ধরাধরি করে আসে? নাকি প্রেম বিপদবাহী? কে জানে?

একইভাবে নীলরঙ সম্পর্কেও একথা বলা যায়। নীলরঙ যেমন প্রেমের প্রতীক তেমনই নীলরঙ মৃত্যুরও প্রতীক। লাল ও নীল যেন একই ইঙ্গিতবাহী। তবে এখানেই কি একটা রঙ ফুরিয়ে যায়, না যেতে পারে? নীল রঙ একই সঙ্গে শান্তি, স্নিগ্ধতা, শীতলতা, একতা, সত্য — এসবেরও প্রতীক বইকি।

আমাদের পতাকার রঙ নিয়ে যখন ছোটোদের বলা হয় তখন গেরুয়া, সাদা ও সবুজ এই তিনটে রঙ উঠে আসে আলোচনায়। শেখানো হয় গেরুয়া ত্যাগের প্রতীক, সাদা শান্তির প্রতীক এবং সবুজ যৌবনের প্রতীক। এর বাইরেও রঙগুলির আরও অনেক অর্থ লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেটা নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক অবস্থানের ওপরে। যেমন সাদা শান্তির প্রতীক তো বটেই, একই সঙ্গে সেটি মৃত্যুর প্রতীকও হয়, আবার শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয়ের প্রতীকও হতে পারে সাদা। সবুজও যেমন যৌবনের প্রতীক হওয়ার সাথে সাথে পরশ্রীকাতরতা ও ঈর্ষার প্রতীকও হতে পারে।

একইভাবে কালো যেমন খারাপ, বিপদ, রহস্যময়তা, শয়তানির প্রতীক হয় তেমনই শক্তি, সম্পদ, যৌনতার প্রতীকও হয়ে ওঠে কালো। সময়, সমাজব্যবস্থা ও রঙের কালানুক্রমিক ব্যবহার — এগুলোর উপরেই গড়ে উঠেছে সেই রঙের প্রতীকি ব্যবহারের তাৎপর্য।

যেমন, বেলজিয়াম ও সার্বিয়া এই দুটি দেশেরই জাতীয় রঙ লাল। দুটি দেশেরই জাতীয় পতাকায় লাল একটি বিশেষ অর্থবহন করে। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই বিদ্রোহ বা বিপ্লবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। উল্টো দিকে চিনের ও পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার জাতীয় পতাকায় লালরঙ ব্যবহৃত হয় বা হত মূলত বিপ্লবের চিহ্ন হিসাবেই। লালরঙ বিপ্লবের চিহ্ন থেকে ক্রমে ক্রমে সমাজতান্ত্রিক চিহ্ন হিসাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছে কোনো কোনো দেশে।

এভাবেই কোনো কোনো রঙ বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হয়ে ওঠে। ঠিক এভাবেই জ্যোতিষবিদ্যার সঙ্গে রঙকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। জ্যোতিষের বারোটি রাশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে বারোটি আলাদা আলাদা রঙে। এই চিহ্নিতকরণের যে লক্ষ্যণীয় বিষয় সেটি হলো দুটি রঙের মিশ্রণকে আলাদা ভাবে গুরুত্ব দেওয়া। যেমন মেষকে অর্পণ করা হয়েছে লালরঙ, মিথুনকে কমলা, আর মেষ ও মিথুনের মধ্যবর্তী রাশি বৃষকে অর্পণ করা হয়েছে লাল মিশ্রিত কমলা। একইভাবে কর্কট, সিংহ ও কন্যাকে অর্পিত রঙ কমলা মিশ্রিত হলুদ, হলুদ এবং হলুদ মিশ্রিত সবুজ। তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন এই ছটি রাশির জন্য নির্ধারিত রঙ হল যথাক্রমে সবুজ, টার্কুইজ, নীল, আকাশি, বাদামী এবং বাদামী মিশ্রিত লাল।

এমনই নানা বৈচিত্র্যময় অবস্থান রঙ নিয়ে সারা দুনিয়াতেই। যেমন আমাদের রামধনুতে সাতটি রঙের বৈচিত্র্য, কিন্তু চৈনিক রামধনুতে মাত্র পাঁচটি রঙ — লাল, হলুদ, সবুজ, নীল ও বেগুনী। আকাশী ও কমলা রঙদুটি এখানে অদৃশ্য।

রঙ আমাদের মানসিক পরিবর্তনের জন্য কিভাবে কাজ করে? আমাদের চোখে কিছু রঙ খুব উগ্র ও কিছু রঙ খুব শান্ত হিসাবে ধরা পড়ে। শান্ত রঙের সান্নিধ্যে থাকলে আমাদের মেজাজও শান্ত থাকে। কিন্তু যদি বেশ কিছুক্ষণ উগ্র রঙের সান্নিধ্যে থাকা যায় তাহলে মেজাজ এমনিতেই গরম হয়ে যেতে বাধ্য। রঙের প্রভাবেই এটা হয়।

কে.এফ.সি. বা ম্যাকডোনাল্ডে খেতে ঢোকার আগে কি কেউ প্রশ্ন করেছি কেন তাদের লোগো থেকে শুরু করে স্টোরের দোকান, রেস্টুরেন্টের দেওয়াল লাল রঙে রাঙানো হয়? আসলে মানসিকভাবে লালরঙের সঙ্গে ক্ষুধার সম্পর্ক বিদ্যমান। লালরঙের সান্নিধ্যে খুব বেশিক্ষণ থাকলে ক্ষুধার পরিমান বৃদ্ধি করে আমাদের বিল সামান্য হলেও যাতে বাড়ে সেদিকেই ঐ স্টোরমালিকদের লক্ষ্য। আসলে এখানেও রঙকে ব্যবহার করে মানুষের বিশেষ প্রবৃত্তিকে বাড়িয়ে তোলাই মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন কোম্পানীর লোগোর রঙকে তার প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে প্রত্যেকটি কোম্পানীই রঙের সঙ্গে মানুষের আবেগ-অনুভূতির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়।

রঙ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন শিল্পীর নাম না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আলোচনা।Old_guitarist_chicago Blue Period পাবলো পিকাসো। তাঁর ব্লু পিরিয়ড, ও রোজ্ পিরিয়ড সম্পর্কে বলতেই হয়। ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সাল, এই সময়কালে পিকাসো যে মোনোক্রোম বা একরঙা ছবি এঁকেছিলেন নীলরঙকে প্রাধান্য দিয়ে সেটিই ব্লু পিরিয়ড হিসাবে পরিচিত। নীলকে প্রাধান্য দিয়ে সবুজ ব্যবহার করে এই ছবিগুলিতে মূলত মন-খারাপের ইঙ্গিত। বিষন্নতার আভাষ আসে মূলত নীল রঙের জন্যই। এই বিষন্নতা আসলে শিল্পীর মানসিক প্রকাশ। উল্টোদিকে ১৯০৪ থেকে ১৯০৬ এই সময়কালের ছবিগুলি ঠিক উল্টো। এই সময়কাল রোজ্ পিরিয়ড নামে খ্যাত কারণ তার ছবিতে গোলাপী রঙের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। রোজ্ পিরিয়ডের ছবিগুলি তুলনায় অনেকবেশি প্রাণবন্ত, বিষন্নতার আভাষ থাকলেও তা প্রাধান্য পায়নি কোথাও। গোলাপীরঙ ঢেকে দিয়েছে সমস্ত বিষন্নতা।

বিষন্নতা বোঝাতে আমরা সাধারণত ধূসরকে ব্যবহার করি। ধূসর আর বিষন্নতা যেন পরস্পরের সঙ্গে হাতধরাধরি করে হেঁটে চলে। কিন্তু নীল দিয়েও যে বিষন্নতা বোঝানো যায় তার প্রমাণ পিকাসোর ব্লু পিরিয়ডের ছবিগুলি। উল্টো দিকে ধূসর সবসময় কিন্তু বিষন্নতাকে প্রকাশ করে না। কোনো একটি উজ্জ্বল রঙের সঙ্গে ধূসরের ব্যবহারে উজ্জ্বল রঙের তীব্রতা হ্রাস পায়। শীতলতা নিয়ে আসে উজ্জ্বল রঙের পাশে। কিছুটা প্রাণবন্তও মনে হয় তাকে।Pablo_Picasso,_1905,_Acrobate_et_jeune_Arlequin_(Acrobat_and_Young_Harlequin),_oil_on_canvas,_191.1_x_108.6_cm,_The_Barnes_Foundation,_Philadelphia (Rose)

আসলে একটা রঙের তাৎপর্য বোঝার জন্য যেমন সেই রঙকে বুঝতে হবে তেমনই তার পারিপার্শ্বিক অবস্থানটাও বিচার বিবেচনা করে দেখতে হবে। প্রতীক হিসাবে রঙের নানারকম ব্যাখ্যা হতেই পারে। রঙের অবস্থানটাইতো বৈচিত্র্যপূর্ণ। তেমনই বৈচিত্র্যপূর্ণ তার ব্যাখ্যা।

কোনো রঙ যদি এই বৈচিত্র্যের কানাকড়িও মানুষের জীবনে আনতে পারে …।

 

চিত্র পরিচিতি : ট্রাফিক লাইটের ছবিটি বাদ দিয়ে বাকি ছবি দুটি পাবলো পিকাসোর আঁকা ব্লু পিরিয়ড ও পিঙ্ক পিরিয়ডের ছবি।

This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.