অ্যাক্রিলিক

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি দ্বাদশ কাহিনী।

 Rang Head

অ্যাক্রিলিক। বর্তমানের চিত্রশিল্পীদের কাছে এই মাধ্যম যেন সব পেয়েছির এক দেশের মতো। আধুনিক এক সিন্থেটিক রঙ এই অ্যাক্রিলিক যা অ্যাক্রিলিক অ্যাসিড থেকে উদ্ভূত হওয়া কৃত্রিম রজন থেকে তৈরি হয়।

১৯৩৪ সাল সেটা। প্রথম ব্যবহারযোগ্য অ্যাক্রিলিক রজন তৈরি করা সম্ভব হল। আর এ থেকে তৈরি প্রথম সিন্থেটিক রঙ ব্যবহার হল ১৯৪০ সালে, আমেরিকায়। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অ্যাক্রিলিক রঙের ব্যবহার শুরু হল ১৯৫০-এর দশকের পর। প্রথম দিকে বাড়িঘরের দেওয়াল রঙ করার কাজেই শুধুমাত্র এই রঙকে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিধি বাড়লো এই মাধ্যমের, এবং শিল্পীদের ব্যবহার-উপযোগী অ্যাক্রিলিক চিত্রশিল্পীদের সাহায্য করলো এই রঙ ব্যবহারে। ১৯৬০-এর পর থেকে শিল্পীদের কাছে জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলো অ্যাক্রিলিক রঙের।

এই রঙের সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হল এতে জলরঙ ও তেলরঙ দুটোরই গুনাগুন বর্তমান। ফলে অ্যাক্রিলিক রঙ ব্যবহারে যে শিল্প সৃষ্টি হয় তাতে একই সঙ্গে জলরঙ ও তেলরঙের প্রভাব তৈরি করা যায়। এই রঙ জলে সহজেই গুলে যায়, শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি, কিন্তু শুকিয়ে যাওয়ার পরে এই রঙের মধ্যে জলনিরোধী শক্তি লক্ষ্য করা যায়। যদিও তারপরেও শিল্পীরা সৃষ্টিকর্মকে জলনিরোধক করার জন্য বেশকিছু পদ্ধতি অনুসরণ করেন। অ্যাক্রিলিক রঙ দিয়ে ছবিতে যেমন মসৃণ চকচকে প্রভাব আনা যায়, তেমনই খসখসে ভাবও আনা সম্ভব। একই রঙের এমন দুইরকম ধর্ম শিল্পীদের সামনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রচুর সম্ভাবনা ও রাস্তা খুলে দিয়েছে এই মাধ্যম। অ্যাক্রিলিক রঙের আর একটি বড়ো সুবিধা হলো দেওয়াল, ক্যানভাস কাপড়, কাঠ, ধাতু বা কাগজ যে কোনো ধরণের সহায়ক মাধ্যমে এই রঙ ব্যবহার করা সম্ভব।

অ্যাক্রিলিক রঙের সঙ্গে সঙ্গে গ্র্যাটেজ পদ্ধতির বহুল ব্যবহার শুরু হলো। গ্র্যাটেজ একটি পরাবাস্তববাদী পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রঙকে ছবিতে ব্যবহার করার পর কোনো তীক্ষ্ণ বস্তু দিয়ে চেঁছে তুলে ফেলে রঙের তীব্রতা পাল্টে ফেলা হয়। অ্যাক্রিলিক রঙের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়লো, কারণ এই রঙকে খুব সহজেই চেঁছে কোনো জায়গা থেকে তুলে ফেলা যায়। অবশ্য সেটা করা সম্ভব রঙ শুকিয়ে যাওয়ার আগে। রঙ শুকিয়ে গেলে আর তাকে তোলা সম্ভব নয়।

এই রঙ একদম নতুন মাধ্যম হিসাবে শিল্পীদের কাছে এসেছে। ফলে কালজয়ী কোনো ছবি শিল্পীদের কাছে থেকে এখনও সেই অর্থে পাওয়া যায়নি। তবে বেশকিছু ভালো কাজ এই মাধ্যমে শিল্পীরা করছেন। SANATAN DINDA-BODHAN OIL ON CANVAS51X66INCH 2006বর্তমানের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত শিল্পীই অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে কাজ করছেন। তবু তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য শিল্পী সনাতন দিন্দার কাজ। বাঙালী শিল্পী পরিতোষ সেন অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন।

রঙের ইতিহাসে অ্যাক্রিলিক রঙ নবতম সংযোজন হওয়ায় এই মাধ্যমকে নিয়ে আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এই রঙ নিয়ে একটা কথাই বলা যায়, মানুষ প্রকৃতির কাছে থেকে যে রঙ পেয়েছিল সেই গুহা-মানবের যুগে সেখান থেকে সম্পূর্ণরূপে কারখানার রঙে রূপান্তর শেষ হলো এই অ্যাক্রিলিকে এসে। রাসায়নিকভাবে তৈরি এই রঙ আর প্রথম দিকের সেই গিরিমাটির রঙের তফাৎ বহু যোজনে এসে পৌঁছে গেছে।

তবুও, শেষ পর্যন্ত ‘পরিবর্তনই ধ্রুবক’। আরো নতুন কোনো পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষায় থাকি আমরা।

 

চিত্র পরিচিতি : শিল্পী সনাতন দিন্দার আঁকা ‘বোধন’।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to অ্যাক্রিলিক

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s