প্যাস্টেল

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি একাদশ কাহিনী।

Rang Head

ছোটোবেলায় আমরা ছবি আঁকতে শুরু করলে সবার আগে যে রঙ-মাধ্যমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে সেটা প্যাস্টেল। ছোটো ছোটো কাঠির মতো রঙের নানান শেড একটা প্যাকেটে। ছবিতে রঙ দেবার আগেই মন কেড়ে নেয় প্যাস্টেল রঙের প্যাকেট। কিন্তু কি এই প্যাস্টেল?Pastel Box প্যাস্টেল শব্দটি এসেছে মধ্যযুগীয় ল্যাটিন শব্দ pastellum থেকে যার অর্থ নীল গাছের পেস্ট বা আঠা। নীল গাছ মানে সেই গাছটিই যেখান থেকে গুঁড়ো নীল পাওয়া যেত। চাষ হতো আমাদের বাংলায়। পরবর্তীকালে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় পেস্ট বা আঠালো চটচটে পদার্থ। ফরাসী শব্দ প্যাস্টেল প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৬৬২ সালে। প্যাস্টেল রঙ বলতে বোঝায় রঙের গুঁড়োকে আঠালো চটচটে কোনো পদার্থর সঙ্গে মিশিয়ে তাকে ব্যবহার উপযোগীভাবে একটি কাঠির মতো বা পেনসিলের মতো রূপ দেওয়া। এই পেনসিলের মতো দেখতে রঙগুলোই প্যাস্টেল হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

রঙের মাধ্যম হিসাবে প্যাস্টেল পরিচিত হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে। জন্মস্থান ইতালি। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি প্যাস্টেল মাধ্যমের উল্লেখ করেছেন, এবং তিনি ফরাসি শিল্পী জাঁ প্যারেলের কাছে থেকে এই মাধ্যম সম্পর্কে জানতে পারেন যখন শিল্পী প্যারেল ১৪৯৯ সালে মিলান শহরে আসেন। আর প্যাস্টেল মাধ্যমে প্রথম বিশেষজ্ঞ শিল্পীও ছিলেন জাতিতে ফরাসি — জোসেফ ভিভিয়েন। প্রথমদিকে প্যাস্টেল রঙ সীমাবদ্ধ ছিল কালো, সাদা, লাল এই তিনটি রঙে। প্যাস্টেলে রঙের বৈচিত্র্য আনেন যোহান আলেকজান্ডার থিয়েল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পোর্ট্রেট আঁকিয়েদের মধ্যে প্যাস্টেল জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে পরিচিত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দী প্যাস্টেল রঙের স্বর্ণযুগ বলা যায়। এইসময় ‘গুয়াশ’ পদ্ধতির সঙ্গে প্যাস্টেল মিশিয়ে একটি মিশ্র-মাধ্যমে আঁকা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে এডগার দেগা-র নাম না বললে প্যাস্টেলের গল্প অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। দেগা প্যাস্টেলকে একটি অন্য মাত্রা দান করেন। ১৮৮৫ সালের পরে প্যাস্টেলই তাঁর অন্যতম মাধ্যম হিসাবে উঠে আসে। আর এই সময়কালের মধ্যেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ছবি La Toilette এঁকে ফেলেন যেখানে এক মহিলাকে চুল আঁচড়ানো অবস্থায় দেখা যায়।La Toilette Edgar Degas ছবিটি বর্তমানে মস্কোর পুশকিন মিউজিয়ামে রয়েছে। আমাদের দেশে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্যাস্টেল রঙে বেশ কিছু পরীক্ষামূলক কাজ করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিক থেকে একটু একটু করে প্যাস্টেল রঙ তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। শিল্পীরা তখন প্যাস্টেল ছেড়ে অন্য মাধ্যমের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।

প্যাস্টেলগুলোকে তাদের আঠালো চটচটে পদার্থ ও রঙের গুঁড়োর আনুপাতিক পার্থক্যের উপর নির্ভর করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্যাস্টেল তৈরী হয় গঁদ বা বাবলার আঠাকে রঙের গুঁড়োর ধারক হিসাবে ব্যবহার করে। এই কাজে বিংশ শতাব্দীতে গঁদ বা বাবলার আঠার বদলে মিথাইল সেলুলোজ ব্যবহার হতে থাকে। এই প্যাস্টেল আবার তিন ধরণের। নরম প্যাস্টেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্যাস্টেল, এতে রঙের গুঁড়ো থাকে অত্যন্ত বেশি পরিমানে, কিন্তু আঠালো পদার্থ থাকে অনেক কম। ফলে এই প্যাস্টেলে রঙ হয় অত্যন্ত উজ্জ্বল। কিন্তু এই ধরণের প্যাস্টেলে ছবি আঁকার সময় গুঁড়ো পাওয়া যায় অত্যন্ত বেশি, আঠালো পদার্থ খুব বেশি না থাকার ফলে। ফলে এই ধরণের প্যাস্টেলে আঁকা ছবি সংরক্ষণ করার জন্য বিশেষ যত্ন নিতে হয়। আর একধরণের প্যাস্টেল পাওয়া যায় — প্যান প্যাস্টেল। জলরঙ যেমন ছোটো ছোটো কেকের মতো করে পাওয়া যায় তেমনই অনেকটা। এই প্যাস্টেল বিশেষ ধরণের নরম স্পঞ্জ দিয়ে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু কোনো তরল পদার্থ প্রয়োজন হয়না। একবিংশ শতাব্দীর আবিষ্কার এই প্যাস্টেল। তৃতীয় আর একধরণের শুকনো প্যাস্টেল হলো শক্ত প্যাস্টেল। এতে রঙের গুঁড়ো থাকে কম, কিন্তু আঠালো চটচটে পদার্থ থাকে অনেক বেশি। ফলে রঙের ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। এই ধরণের প্যাস্টেলে ছবির সূক্ষ্ণ কাজগুলি অনেক শুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয়, কারণ প্যাস্টেল রঙটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই শক্ত হয়। কিন্তু এই ধরণের প্যাস্টেলে রঙের উজ্জ্বলতা অনেকটাই কম থাকে। নরম প্যাস্টেলের চেয়ে এই প্যাস্টেলে রঙের বিভিন্নতাও অনেকটাই কম।

উপাদানগত বিভিন্নতার উপর নির্ভর করেও তিন ধরণের প্যাস্টেল রঙ পাওয়া সম্ভব। তেল-প্যাস্টেল, মোম-প্যাস্টেল ও জলে দ্রাব্য প্যাস্টেল। নাম থেকেই এই প্যাস্টেলগুলোর উপাদানগত পার্থক্য বোঝা যায়। তেল-প্যাস্টেলে ধারক হিসাবে তৈলাক্ত পদার্থ ব্যবহারের ফলে এই রঙে ছবি আঁকার পরে তাতে তেলরঙের কিছু ধর্ম লক্ষ্য করা যায়। আবার মোম প্যাস্টেলে প্যারাফিন জাতীয় বস্তুকে ধারক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এই প্যাস্টেলে চটচটে ভাব বেশি থাকে। আর জলে দ্রাব্য প্যাস্টেলে পলি ইথিলিন গ্লাইকলের মতো কিছু উপাদান থাকে যেগুলি জলে দ্রাব্য। এই উপাদান এই রঙে একটি বিশেষ ধর্ম যোগ করে। জলের ‘ওয়াশ পদ্ধতি’-র নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে এই রঙে আঁকা ছবিতে স্বচ্ছতা ধর্ম আনা সম্ভব। ফলে ছবির মধ্যে জলরঙের কিছু ধর্মও লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু প্যাস্টেল রঙের মধ্যে গুঁড়ো ভাব বেশি থাকায় প্যাস্টেলের আঁকাকে রক্ষা করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। সঠিক পদ্ধতিতে রক্ষা করা না হলে প্যাস্টেলের আঁকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। রঙের গুঁড়ো ঝড়ে গিয়ে এই আঁকা নষ্ট হয়, কিছু রঙ আবার আলোর সংস্পর্শে এসে তাদের রঙের গাম্ভীর্য পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে এই আঁকাকে রক্ষা করতে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।

প্যাস্টেল মাধ্যমটি নিয়ে শিল্পীদের মধ্যে একটি বিতর্ক এখনও রয়েই গেছে, যে প্যাস্টেল কাকে বলা হবে। এ ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম প্যাস্টেল সোসাইটি যে সংজ্ঞা দিয়েছে তাতে তারা যদিও ‘শুকনো মাধ্যমের’ উপরেই জোর দিয়েছে, তবুও বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। অবশ্য এই বিতর্কের কারণে আমাদের প্যাস্টেল রঙ ব্যবহার করে ছবি আঁকতে তো কোনো অসুবিধা নেই। হাজার হোক ছবির দুনিয়ায় হাতেখড়িতো প্যাস্টেলেই হয়। ছোটোবেলার সেই রঙবেরঙের রঙের পেনসিল!

কখনো কখনো নস্টালজিয়ার আর এক নামও কি প্যাস্টেল হয়ে যায়?

 

 

চিত্র পরিচিতি : ১। প্যাস্টেল বাক্স   ২। এডগার দেগার ছবি La Toilette

This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

3 Responses to প্যাস্টেল

  1. Tuhin বলেছেন:

    শেষ লাইনে মাস্টার টাচ !!

  2. পিংব্যাকঃ ছবি আঁকা শিল্পীমনের পরিচায়ক। মন খুলে আঁকুন…তা-ই সুন্দর করে আঁকুন। – ArtDeem

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.