জলরঙ

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি দশম কাহিনী।

Rang Head

ছোটবেলায় জলরঙের সঙ্গে পরিচয়তো হয়েছিল ছবি আঁকার ক্লাসে। কিন্তু তখন খেয়াল না করলেও এখন জানি জলরঙ কিনতে পাওয়া যায় দুইরকম ধরণের। টিনের ছোটো ছোটো টিউবে ভরা থাকে রঙগুলো এমন একটা প্যাকেট। আবার একটা বাক্সে ছোটো ছোটো খোপে নানা রকম রঙগুলো সাজানো থাকে ছোটো ছোটো কেকের মতো। এমন দুই ধরণের প্যাকেজিঙ কিন্তু তেলরঙের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়না। এই ছোটো ছোটো কেকের মতো প্যাকিংটা ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসেছে আর শিল্পীদের কাছে জনপ্রিয়ও হয়েছে — বিশেষত প্রকৃতি-শিল্পীদের কাছে।

জলরঙ বহু প্রাচীন হলেও তেমনভাবে জনপ্রিয় কিন্তু ছিলনা। নবজাগরণের সময়ে জলরঙের জনপ্রিয়তা আবার ফিরে আসে। কিন্তু জলরঙের গুরুত্ব বিশেষত ছিল ম্যাপ প্রস্তুতকারী, মিলিটারি অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার, জরিপ-আমিনদের কাছে। তৎকালীন সময়ে ক্যামেরাতো ছিলনা।   তেলরঙের ছবি শুকোতে দেরি হতো, তাছাড়া তেলরঙে জলে-জঙ্গলে তেমনভাবে কাজও করা যেতনা। আবার জলরঙে কাগজে ছবি আঁকা যেত। এমনসব ব্যবহারিক কারণেই জলরঙের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

আর এর ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি বেশকিছু দুর্দান্ত ছবি, যেগুলির শৈল্পিক গুরুত্বের চেয়ে ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।  কোম্পানি পেন্টিং-এর প্রয়োজনে কলকাতা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের ছবি জলরঙে কাগজবন্দী করেছিলেন তৎকালীন শিল্পী টিলি কেটল, স্যার চার্লস ডয়লি, টমাস হিকি বা জেমস বেইলি ফ্রেসারের মতো শিল্পীরা।

জলরঙকে জনপ্রিয় ও স্বাধীন এক শিল্পমাধ্যম হিসাবে তুলে ধরতে যে তিনজন শিল্পীর নাম আগে আসে তাদের একজন পল স্যান্ডবি — তাকে ‘ইংরেজ জলরঙের জনক’ নামে অভিহিত করা হয়। আর অন্যজন যোশেফ টার্নার, যিনি জলরঙে আঁকা ছবিকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছেন। তার আঁকা কয়েকশো ঐতিহাসিক, পৌরাণিক ও ভৌগোলিক ছবি মাধ্যম হিসাবে জলরঙকে অন্য মাত্রা দান করেছে।

জলরঙের প্রধান উপাদান হিসাবে চার ধরণের জিনিস প্রয়োজন হয়। রঙের গুঁড়ো, বাবলা আঠার মতো আঠালো পদার্থ যা রঙকে ধরে রাখবে, গ্লিসারিন বা মধুর মতো চটচটে পদার্থ যা রঙের সান্দ্রতা ও টেকসই হওয়ার ক্ষমতা বাড়াবে এবং প্রয়োজন দ্রাবক, যা উপরের জিনিসগুলোকে গুলে দিতে সাহায্য করবে। দ্রাবক সমস্ত উপাদানকে গুলে দিলেও আঁকার শেষে বাষ্পীভবনের ফলে শুকিয়ে যাবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জলরঙে দ্রাবক হিসাবে একমাত্র জলই ব্যবহার করা হয়। আর এজন্যই এই পদ্ধতিতে যে রঙ ব্যবহার করা হয় তাকে জলরঙ বলে।

আমাদের দেশে, বা বলা ভালো ইংরেজ ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে জলরঙের যে পদ্ধতি প্রচলিত আছে তার বাইরেও বেশকিছু পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এমনই একটি পদ্ধতি ‘ওয়াশ পদ্ধতি’। কাগজে জলরঙে ছবি আঁকার পর শুকিয়ে গেলে সেই ছবিকে জলে চুবিয়ে তুলে নেওয়া হয়। এতে ছবির বাড়তি রঙগুলো চলে যায়। এরপর শুকিয়ে গেলে সেই ছবিতে আবার রঙ লাগানো হয়। তারপর আবার শুকোনোর পর সেই ছবিকে দ্বিতীয়বার জলে চুবিয়ে তুলে নেওয়া হয়। এমনভাবে বেশ কয়েকবার করা হয়। জাপান ও চিনের শিল্পীরা এই পদ্ধতিতে ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পদ্ধতিতে বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন বটে, তবে আমাদের দেশে এমন চল খুব বেশি নেই বললেই চলে।2013GK1351

আর একরকমভাবে জলরঙে ‘ওয়াশ’ করা হয়। ছবি আঁকার পর শুকিয়ে গেলে জলে ভেজানো তুলি দিয়ে ছবিকে মোছা হয় এরপর তাতে আবার রঙ লাগানো হয়। এভাবে বারে বারে এই পদ্ধতি করা হয়। তবে এই দুই ধরণের ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে ছবি আঁকার জন্য যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন।

জলরঙের আর একটি পরিবর্তিত রূপ শিল্পীদের মধ্যে প্রচলিত — গুয়াশ। এই পদ্ধতিতে রঙের মধ্যে চকের গুঁড়ো জাতীয় কিছু অস্বচ্ছ জিনিস মেশানো হয়। ফলে জলরঙের স্বাভাবিক যে ধর্ম, স্বচ্ছতা, তার পরিবর্তে অস্বচ্ছ ও পুরু রঙ হয়ে যায়। ফলে জলরঙের মধ্যে তেলরঙের কিছু ধর্ম পাওয়া যায়। ‘ফিনিশিং’ ভালো হয়। কিন্তু দ্রাবক হিসাবে জল ব্যবহৃত হওয়ায় রঙ শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি।

জলরঙের ব্যবহারিক কিছু সুবিধা ও অসুবিধার কথা আলাদা করে বলতেই হয়। স্বচ্ছতার কারণে জলরঙে গাঢ় রঙকে হাল্কা রঙ দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়, এজন্য সবচেয়ে হাল্কা রঙ দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে গাঢ় রঙ ব্যবহার করা হয়। আবার জলরঙে ব্যবহারিক কোনো ভুল হলে তা সংশোধন করা সম্ভব, রঙকে ভিজিয়ে ব্লটিং করে তুলে নেওয়া সম্ভব, এবং তারপর নতুন করে রঙ লাগিয়ে সংশোধন করা সম্ভব। কিন্তু কাগজের সাদা রঙে কোনো রঙ একবার লাগিয়ে ফেললে তাকে হাল্কা করা গেলেও একেবারে তুলে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু জলরঙ শুকিয়ে গেলেও তার ঔজ্জ্বল্য একইভাবে বজায় থাকে। আর একটি বড়ো ব্যাপার হলো তেলরঙের মতো বিষাক্ত বা ক্ষতিকর প্রভাব জলরঙে প্রায় নেই বললেই চলে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলরঙেও এসেছে বৈচিত্র্য। জলরঙের পেনসিল বর্তমানে শিল্পীদের হাতে আর একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যম তুলে দিয়েছে, যেখানে তুলি ছাড়াও কাগজে জলরঙ ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে অলঙ্করণের কাজে জলরঙের পেনসিল খুবই সাহায্যকারী। এর বাইরেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছেই জলরঙকে নিয়ে। স্প্রে করে, স্পঞ্জ দিয়ে বা কাঠি দিয়ে জলরঙ ব্যবহার করে নানাভাবে চলছে পরীক্ষা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলেই তো রঙ সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুঁড়ো থেকে আজকের টিউব-পেন্ট এ পরিণত হয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার রাস্তায় ‘এক্সপেরিমেন্ট’-ই তো পথ প্রদর্শক।

 

 

চিত্র পরিচয় : ১। জেমস্ বেইলি ফ্রেসারের আঁকা কলকাতার টাউন হল ২। শিল্পী কৌস্তুভ গুহ-র টার্নারের মুখচ্ছবি ৩। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ওয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা ছবি।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to জলরঙ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s