তেলরঙ

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি নবম কাহিনী।

Rang Head

তেলরঙ আজও আমরা ব্যবহার করি ছোটবেলায় ছবি আঁকা শিখতে গিয়ে। পেনসিলের ব্যবহার শেখার পর প্যাস্টেল, আর তারপর জল অথবা তেলরঙ দিয়ে ছবি আঁকা শেখা আর তারপর লেখাপড়ার চাপ অথবা পরীক্ষার অজুহাতে ছবি আঁকার দুনিয়া থেকে পালানো। এভাবেই কিছুদিনের জন্য তেলরঙের সঙ্গে পরিচয়। টিনের ছোটো ছোটো টিউবে ভরা থাকে এই রঙগুলো। কিন্তু প্রথম থেকেইতো আর টিউবে এমনভাবে কারখানায় ভরে দেয়নি কেউ। প্রথমদিকে তেলরঙ ব্যবহার হতো সরাসরি তৈরি করেই, ঠিক যেভাবে টেম্পেরাতে ডিমের কুসুমের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে ব্যবহার করা হতো। একইভাবে রঙের গুঁড়োর সঙ্গে তেল মিশিয়ে তাকে ব্যবহার করা হতো ছবি আঁকার কাজে। কিন্তু এইভাবে তেলরঙ বিশেষ ব্যবহার করা হতো না কারণ তেলরঙ শুকোতে সময় লাগে অত্যন্ত বেশি, ফলে একটি ছবি আঁকতে এত বেশি সময় লাগতো যে সেটাই তেলরঙ অব্যবহারের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ অলঙ্করণের জন্য ইউরোপে দ্বাদশ শতাব্দীতে তেলরঙের ব্যবহার শুরু হলেও শিল্পীদের কাছে এই মাধ্যম জনপ্রিয়তা পায় ষোড়শ শতাব্দীতে। কিন্তু আসলে তেলরঙের ব্যবহার আরও প্রাচীন। ২০০৮ সালে আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় বেশকিছু তেলরঙের ছবির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে যেগুলো প্রায় ৬৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের রচনা। এই রঙে ব্যবহার করা হয়েছিল আখরোট ও পোস্তবীজের তেল।

যদিও আখরোট ও পোস্তবীজের তেল নয়, তেলরঙের জন্য জনপ্রিয় তৈলাক্ত উপাদান হলো তিসি বা মসনের তেল। আসলে তৈলাক্ত উপাদানের উপরে তেলরঙের বেশকিছু ধর্ম নির্ভর করে। রঙের গুঁড়ো কতটা দ্রবীভূত হবে, রঙ ব্যবহারের পর কত দ্রুততার সঙ্গে শুকিয়ে যাবে, রঙের উজ্জ্বলতা কতটা হবে — এমন অনেক কিছুর ওপরেই নির্ভর করে কোন তেলের সঙ্গে রঙের গুঁড়োকে মেশানো হবে। আর এখানেই প্রধান তৈলাক্ত উপাদান হিসাবে উঠে আসে তিসির তেল। এছাড়া আখরোট, পোস্তবীজ, সূর্যমুখী, তারপিন প্রভৃতি তেলকে ব্যবহার করা হতো কারণ হলুদের মতো হাল্কা রঙগুলি এই তেলে ভালো মিশে যায় এবং তিসির তেলের চেয়ে দ্রুত শুকিয়ে যায়। কিন্তু এই তেলগুলি ব্যবহারে যে রঙ পাওয়া যেত তার ঔজ্বল্য তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

তেলরঙ শুকোতে দেরি হয়। এটা শিল্পীদের কাছে একটা অপছন্দের ব্যাপার ছিল ছবি শেষ করতে অনেক সময় লাগে বলে। তুলনায় ফ্রেসকো ও টেম্পেরাতে ছবি তাড়াতাড়ি শেষ হয়, আসলে শেষ করতে হয়, কারণ তা না হলে রঙ শুকিয়ে যায়। কিন্তু ফ্রেসকো ও টেম্পেরাতে যদি কোনো ভুল সংশোধন করতে হয় তবে তা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এখানেই শিল্পীরা তেলরঙের সুবিধার কথা বুঝতে পারলেন। তবে সবচেয়ে বড়ো সুবিধা এই যে, তেলরঙে আঁকা ছবি জলে নষ্ট হয়না। আর্দ্র আবহাওয়া তেলরঙে আঁকা ছবির কোনো ক্ষতি করতে পারেনা। এইসব সুবিধার কারণে ধীরে ধীরে শিল্পীদের কাছে এই রঙ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করল। তবে তা একদিনে মোটেও হয়নি। প্রথম দিকে তেলরঙ কাঠের প্যানেল রঙ করতে কাজে লাগানো হতো। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দীর পরে, যখন ক্যানভাস কাপড় জনপ্রিয় হয়ে উঠল তখনই ক্যানভাসের দোসর হয়ে তেলরঙও তার জনপ্রিয়তার রাস্তা দেখতে শুরু করলো।

এই ক্যানভাস জিনিসটা ঠিক কি? ক্যানভাস আসলে পাট বা শনের তৈরি মোটা কাপড়। এই পাট বা শনের কাপড়ের উপরে রঙ দিয়ে ছবি আঁকার আগে সেই কাপড়টিকে উপযুক্ত করে তৈরি করতে হয়। একটি কাঠামোতে ক্যানভাসটি ভালো করে আটকে তার গায়ে একটি প্রলেপ লাগানো হয়। সাধারণত এই প্রলেপ হিসাবে প্রাণিজ আঠা লাগানো হয়। তারপর তার উপরে লেড হোয়াইটের একটি প্রলেপ লাগানো হয়, কখনও বা আঠা ও চকখড়ির মিশ্রণ দিয়ে এই শেষ প্রলেপটি দেওয়া হয়। কাঠের প্যানেল, কাগজ, মেসোনাইট বোর্ড, কার্ডবোর্ড — এমন নানা সামগ্রী ব্যবহৃত হলেও ক্যানভাস সেই যে জনপ্রিয়তা লাভ করল সেই পঞ্চদশ শতাব্দীতে এখনও ভাটা পড়েনি তার জনপ্রিয়তায়। বরং তুলনায় সস্তা হওয়ার কারণে ছবি আঁকার প্রেক্ষাপট হিসাবে ক্যানভাস কাপড়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে বলি, কাঠের প্যানেলে তেলরঙেই আঁকা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ছবি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা, লোমবার্ডি পপলার কাঠের প্যানেলে আঁকা হয়েছিল এটি।monalisa

যাই হোক, তেলরঙের জনপ্রিয়তার পিছনে একজনের নাম না করলেই নয়। পঞ্চদশ শতকের নেদারল্যান্ডের শিল্পী ইয়ান ভান আইক। তিনি তেলরঙকে এত সুদক্ষভাবে ব্যবহার করলেন যে তাকে তেলরঙের আবিষ্কর্তা বলা হতে লাগল। যদিও ৬৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আঁকা তেলরঙের উদাহরণ আবিষ্কৃত হয়েছে তা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে তিনি তেলরঙের এতটাই উন্নতি করেন যে তার কাছ থেকেই পরবর্তী শিল্পীরা তেলরঙ ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ইয়ান ভান আইকের দাদা হিউবার্ট ভান আইকও তেলরঙের ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন।

তেলরঙ শুকোতে দেরি হয় একথা তো বারবারই বলা হচ্ছে। কিন্তু কি কারনে বা কতটা দেরি হয়? টেম্পেরা যেখানে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টার মধ্যে শুকিয়ে যায় সেখানে তেলরঙের ছবি শুকোতে সাধারণত তিন থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগে। রঙের পরিমান ও তেলের মাত্রা অনুযায়ী এই সময় ছয় মাস থেকে এক বছরও হতে পারে। আসলে টেম্পেরা শুকিয়ে যায় বাষ্পীভবনের দ্বারা, কিন্তু তেলরঙ শুকোয় জারন প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। ফলে রঙ ও তেলের উপর এই সময়কাল নির্ভর করে। অবশ্য অনেকে মনে করেন একটি ছবির তেলরঙ সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে উঠতে ষাট থেকে আশি বছর সময় লাগে।

প্রথম দিকে শূকরের মূত্রথলিতে গুঁড়ো রঙ রেখে তাতে কাঁচের সিরিঞ্জ দিয়ে তেল মেশানো হতো। এই পদ্ধতি পাল্টে দিলেন লন্ডনের শিল্পী জন গোফে র‍্যান্ড। তিনি আবিষ্কার করলেন রঙের টিউব। তেলরঙকে তৈরি করে ছোটো ছোটো টিউবে ভরে ব্যবহার করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে আমেরিকার পেটেন্ট অফিস থেকে তিনি পেটেন্ট নিলেন ১৮৪১ সালে। তার এই আবিষ্কার ছবি আঁকার জগতটাকেই পাল্টে ফেলল। আগে প্রতিটা রঙকে ব্যবহারের আগে তেলের সঙ্গে সঠিক অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি করে নিতে হতো।Oil Colour Tube 1 কিন্তু রঙের টিউব আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রয়োজনীয়তা কমে গেল। এখন রঙকে আগে থেকে তৈরি করে টিনের টিউবে ভরে শিল্পীর হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলো এবং ছিপি এঁটে ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ সম্ভব হলো। এই আবিষ্কার যে ছবি আঁকার দুনিয়াকে কিভাবে পাল্টে দিল তা একটা উক্তি থেকেই বোঝা যাবে। চিত্রশিল্পী পিয়ের আগস্তা রেনোয়াঁ এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘টিউবের রঙ ছাড়া ইমপ্রেশনিজম্ বলে কিছু থাকতই না’।

সত্যিই তাই। ইমপ্রেশনিজম্ মানেই তো রঙের খেলা। প্রকৃতির নিজস্ব রঙকে ক্যানভাসে আঁকা। ক্লদ মনে, সেজান, পিসারো আর রেনোয়াঁ নিজে — এদের বাদ দিয়ে চিত্রকলার ইতিহাসই তো হয়না। আর এই ইতিহাসেই নাম আসে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, পল গগ্যাঁর মতো ইমপ্রেশনিস্ট পরবর্তী শিল্পীদের।Renoir Self Portrait আর সেখানে তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে টিউবে তৈরি তেলরঙ। ঘরের চার দেওয়ালের বাইরে প্রকৃতির রঙকে ধরতে শিল্পীকে সুযোগ করে দিয়েছে তো এই আবিষ্কার। আর তার ফলেই ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা ও তাদের অনুগামীরা তুলিতে ধরতে পেরেছেন প্রকৃতির রঙকে ক্যানভাসের গণ্ডির মধ্যে।

প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কি শিল্প হয়?

 

 

চিত্র পরিচিতি : ১। মোনালিসা ২। রঙের টিউব ৩। রেনোয়াঁর আত্মপ্রতিকৃতি।

This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

3 Responses to তেলরঙ

  1. পিংব্যাকঃ ছবি আঁকা শিল্পীমনের পরিচায়ক। মন খুলে আঁকুন…তা-ই সুন্দর করে আঁকুন। – ArtDeem

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.