টেম্পেরা ও ফ্রেসকো

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি অষ্টম কাহিনী।

Rang Head

চিত্রকলার দুনিয়ায় টেম্পেরা শব্দটি খুব পরিচিত। একইভাবে পরিচিত ফ্রেসকো কথাটাও। কিন্তু এই শব্দদুটি ঠিক কি বোঝায়? শব্দদুটি আসলে রঙের ব্যবহার কৌশল বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগে রঙকে টেকসই করার জন্য অনেক রকম পদ্ধতি ব্যবহার করা হত। টেম্পেরা ও ফ্রেসকো সেই প্রাচীনতম পদ্ধতিরই পরিবর্তিত রূপ।

গুঁড়ো রঙকে ব্যবহার করার সময় জলে গুলে নেওয়া হয়। সেই জল-রঙে ছবি আঁকা হতো দেওয়ালে। কিন্তু দেওয়াল শুকনো থাকলে রঙ ধরবে কি করে? তাই ছবি আঁকার ঠিক আগে দেওয়ালে প্লাস্টার করে নেওয়া হতো। তারপর সেই ভেজা প্লাস্টারে আঁকা হতো ছবি। এই ছবিকেই বলা হয় ফ্রেসকো। ফ্রেস্ মানে সদ্য করা, বা নতুন। ফ্রেসকো মানে সদ্য প্লাস্টার করা ভেজা দেওয়ালে জল-রঙ দিয়ে আঁকা ছবি। এই ফ্রেসকো আঁকতে গেলে সময়সীমা মেনে ছবি আঁকতে হয়। কারণ, প্লাস্টার ভেজা থাকতে থাকতেই তাতে রঙ দিয়ে ছবি আঁকা যাবে। কিন্তু যদি প্লাস্টার শুকিয়ে যায় তবে সেখানে আর রঙ ধরানো যাবেনা।fresco

টেম্পেরা অবশ্য এমন সময়সীমা দেয়না শিল্পীকে। কারণ, এখানে ভিজে প্লাস্টারের ব্যপারটাই থাকেনা। রঙের গুঁড়োর সঙ্গে আঠা, গঁদ, ফলের বিচির কষ বা ডিম মিশিয়ে সেই রঙ দিয়ে দেওয়ালের শুকনো প্লাস্টারে, তামার পাতে বা কাঠে ছবি আঁকাকেই বলা হয় টেম্পেরা। মোটা কাগজেও টেম্পেরা আঁকা যায়। টেম্পেরা মানে আসলে নানা রকম জিনিস মিশিয়ে ছবি আঁকা। টেম্পেরা ছবিগুলি বহুদিন একইরকমভাবে থেকে যায়। যেমন প্রথম শতাব্দীর আঁকা টেম্পেরা এখনও দেখা যায় অবিকৃতভাবে। প্রথম সেই শিল্পী যে গুহার গায়ে ছবি এঁকেছিল তার দেখানো রাস্তাতেই এই টেম্পেরা আঁকা শুরু হয়।

টেম্পেরার রঙকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সাধারণত তার সঙ্গে মেশানো হয় ডিম। এছাড়া আঠা, মধু, জল বা দুধও মেশানোর প্রথা চালু আছে। কিন্তু রঙের সঙ্গে ডিম মিশিয়ে যে টেম্পেরা আঁকা হয় তাতে রঙের স্থায়ীত্ব অনেক বেশি হয়।   রঙ ও ডিমকে নানা পদ্ধতিতে মেশানো হয়। কখনও ডিমের কুসুম ও ভিনিগার সমান অনুপাতে মিশিয়ে তাতে রঙের গুঁড়ো মেশানো হয়। কখনও এক অংশ ডিমের কুসুমের সঙ্গে দুই অংশ মদ মিশিয়ে তার সঙ্গে গুঁড়ো রঙ মেশানো হয়। কিন্তু টেম্পেরার রঙের ক্ষেত্রে একটা অসুবিধা থেকেই যায়। ডিমের কুসুম বাতাসের সংস্পর্শে খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। তখন তার সঙ্গে জল মিশিয়ে তাকে আবার তরল করতে হয়। আবার খুব বেশি তরল হয়ে গেলে তাতে ডিমের কুসুম মিশিয়ে আবার সেই রঙের আঠালো ভাব ঠিকঠাক রাখতে হয়। যেসব রঙের গুঁড়ো মেশানো হয় এই টেম্পেরার জন্য তার মধ্যে কিছু বিষাক্ত রঙও রয়েছে। যেমন সিনাবারের মধ্যে থাকে পারদ, অরপিমেন্ট এর মধ্যে থাকে আর্সেনিক আবার লেড হোয়াইটের মধ্যে থাকে সীসা। তাই এই রঙগুলি ব্যবহারের সময় যথেষ্ট সাবধানতা ব্যবহার করা হয়। যাই হোক, ডিমের কুসুমে রঙ মিশিয়ে এই টেম্পেরা আঁকার পদ্ধতি একটু একটু করে হারাতে থাকে তার গতিস্রোত। কিন্তু প্রায় চারশ বছরের নির্লিপ্তি কাটিয়ে বিংশ শতাব্দীতে আবার কিছু ইউরোপিয়ান শিল্পীর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাঙালি শিল্পী যামিনী রায় এবং গণেশ পাইন তাঁদের অনেক বিখ্যাত ছবি টেম্পেরায় এঁকেছেন। এছাড়া বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টিস্ট-এর শিল্পীরা তাদের প্রাথমিক মাধ্যম হিসাবে টেম্পেরাকেই বেছে নিয়েছিলেন। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অসিত কুমার হালদার, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, কালিপদ ঘোষাল এই টেম্পেরাকে আলাদা উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন।tempera by jamini roy

আবার ফিরে আসি ফ্রেসকোর কথায়। ভেজা প্লাস্টারে জল-রঙ দিয়ে আঁকা ছবি। প্লাস্টার শুকিয়ে গেলে সেই রঙ আর ওঠে না। প্লাস্টার ও ছবি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে নেয় একে অপরকে। প্লাস্টারের শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতার জন্য বড়ো ফ্রেসকোকে ছোটো ছোটো অংশে ভেঙে আঁকা হয়। যেটুকু অংশকে শুকিয়ে যাওয়ার আগে এঁকে শেষ করা যাবে শুধু সেই অংশটুকুই ভেজা প্লাস্টার রাখা হয়। সেই অংশটুকু আঁকা শেষ হলে তারপর আবার আর একটু অংশকে ভেজানো হয়। আর যদি ছবি শেষ হওয়ার আগে প্লাস্টার শুকিয়ে যায়, তবে সেই প্লাস্টারকে তুলে ফেলতে হয়। অথবা টেম্পেরা পদ্ধতিতে সেই শুকনো প্লাস্টারে ছবিটিকে শেষ করা হয়। ফ্রেসকোতে কোনো ভুল হলেও তাকে সংশোধন করার জন্য এমন শুকনো প্লাস্টারের ওপর টেম্পেরা দ্বারা সংশোধন করা যায়। এই কাজকে বলা হয় ফ্রেসকো সেকো।

ভারতের বাঘ গুহাচিত্রগুলি বা অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রগুলি ফ্রেসকোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রাচীন এই ফ্রেসকোচিত্রগুলি আজও একইভাবে আমাদের চোখের আরাম দিয়ে চলেছে। রোমের ভাটিকান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলের দেওয়ালের ছবিগুলি ফ্রেসকোর আর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এমন উদাহরণের বোধহয় কোনো শেষ নেই। মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, বতিচেল্লি, পেরুজিনো, রুশোলিনি — শিল্পীর কোনো শেষ নেই ফ্রেসকো ছবির ক্ষেত্রে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত ছবি দা লাস্ট সাপারও এমন একটি উদাহরণ। যদিও এই লাস্ট সাপার ছবিটি ফ্রেসকো না বলে প্লাস্টারের ওপর টেম্পেরা বলা যুক্তিযুক্ত হবে। আমাদের শান্তিনিকেতনের চিন ভবনে শিল্পী বিনোদবিহারীর ফ্রেসকোচিত্রটি আর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

ফ্রেসকো ও টেম্পেরা রঙের ব্যবহারের রকমফের। কিন্তু এই দুয়ের মধ্যে মূলগত পার্থক্যটা ঠিক কি? ফ্রেসকো অবশ্যই দেওয়ালের গায়ে আঁকা হবে। ভেজা প্লাস্টারে রঙের প্রলেপ। কিন্তু টেম্পেরা শুকনো প্লাস্টারে, কাঠের প্যানেলে, তামার পাতে, এমনকি মোটা কাগজেও আঁকা যেতে পারে। টেম্পেরা দেওয়ালেও হতে পারে। তবে তা অবশ্যই শুকনো প্লাস্টারে হবে। টেম্পেরার ক্ষেত্রে রঙের সঙ্গে ধারক হিসাবে আঠালো কোনো পদার্থ অবশ্যই মেশাতে হবে।DSC05706

ফ্রেসকো এবং টেম্পেরার সবচেয়ে বড় শত্রু আবহাওয়ার জলীয়বাষ্প। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় দেওয়ালের প্লাস্টার নষ্ট হয়ে গেলেই ফ্রেসকো নষ্ট হয়ে যাবে। একইভাবে টেম্পেরাতে জলীয়বাষ্প রঙের স্থায়ীত্ব নষ্ট করে দেয়। শতাব্দী প্রাচীন ভেনিস শহর বিখ্যাত তাদের দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা ফ্রেসকোগুলোর জন্য। শহরটি তার হ্রদ ও উপহ্রদের জন্যও বিখ্যাত। কিন্তু এই জলীয় পরিবেশ শহরের ফ্রেসকোগুলির জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে কখনও কখনও। যদিও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকে এই ফ্রেসকোগুলিকে রক্ষা করার নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বহু প্রাচীন ফ্রেসকোচিত্রগুলি এভাবেই ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেও যে আনন্দ আছে তা সৃষ্টির আনন্দের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

আর এই আনন্দের জন্য প্রয়োজন শিল্পের প্রতি ভালোবাসা। আসলে ভালোবাসা ও আনন্দ তো একই মুদ্রার দুই পিঠ!

চিত্র পরিচয় : ১। সিস্টিন চ্যাপেলের দেওয়ালে ফ্রেসকো ২। যামিনী রায়ের টেম্পেরা ৩। অজন্তার গুহাচিত্র।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s