মাটির রঙ

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি সপ্তম কাহিনী।

Rang Head

মানুষ কিভাবে ছবি আঁকতে শিখেছিল তা আজ আর জানার উপায় নেই। কেনই বা মানুষ ছবি আঁকতো সেটাও আজ আর সঠিক ভাবে জানার উপায় নেই। আমরা আন্দাজ করতে পারি একের পর এক কারণ, কল্পনা করতে পারি। কিন্তু সেই কল্পনা বা আন্দাজ যে সঠিক তা বলার মতো কাউকেই পাওয়া যাবে না। মানুষ কি অবসর সময় কাটানোর জন্য ছবি আঁকা শুরু করেছিল? নাকি নিজের মনের ভাব প্রকাশের একটা মাধ্যম ছিল? নাকি কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাকে খুশি করার বাসনায় মানুষের ছবি আঁকার সূত্রপাত? প্রশ্নগুলোর কোনো সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে না একথা সত্যি, কিন্তু এটাও সত্যি যে মানুষ ছবি আঁকতে শুরু করেছিল বলেই রঙের একটা নতুন দুনিয়া আমাদের সামনে খুলে গিয়েছিল। আবার আজকের দিনে দাঁড়িয়েও আমরা ছবির সাহায্যে সেই আমলের কিছু খণ্ডচিত্র সহজেই পেয়ে যাই।

প্রথম দিকে হাতের কাছে যা পেয়েছিল তাই দিয়েই মানুষ ছবি আঁকতে ও রঙ করতে শুরু করেছিল। সেই সময়টার একটা কাল্পনিক ছবি আমাদের মনে মনে ভেবে নিতেই পারি। সেই প্রথম শিল্পী গুহার গায়ে তার একটা ছবি আঁকবে। হাতের কাছে কিছুই নেই। সামনে পড়ে আছে গতরাতের পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কিছু কাঠ। গুহার মুখে জ্বালানো ছিল আগুন, বন্য জন্তুদের ভয় দেখানো আর শীতের ঠান্ডাকে প্রতিরোধ করার জন্য। সেই পোড়া কাঠের একটা টুকরো তুলে নিয়ে সেই আদিম শিল্পী গুহার গায়ে একটা দাগ কাটলো। তার আঁচড়ের রেখা দেখে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। দু-চারটে আরো দাগ কাটলো সে। এরপর এঁকেই ফেলল তার প্রথম ছবি। দিন দুয়েক আগে শিকারে গিয়ে সে একটা বাইসনকে মেরেছিল। সেটাই হল তার প্রথম ছবির বিষয়। মারার আগে বড্ড মন খারাপ করছিল তার। কিন্তু না মেরেও উপায় ছিল না। না মারলে বাইসনটাই তাকে মেরে ফেলত হয়ত। কিন্তু আঁকার পর তার মন খারাপতো কমল না! বরং বেড়ে গেল। বাইসনটার গায়ের যে রঙ, সেটা কিছুতেই আনতে পারলো না সে। হাতে শুধু কালো রঙ, কাঠকয়লার টুকরোটার। অন্য কোনো রঙের ব্যবহারই তো সে জানে না। খুঁজতে শুরু করলো সে চারিদিকে। নতুন কিছু খোঁজার আগ্রহ, নাকি শিল্পীর অতৃপ্তি, কে জানে! পেয়েও গেল সে। একটু গিরিমাটি। ঘসতে শুরু করলো সে বাইসনের ছবিটার গায়ে। লালচে একটা আভা এলো বাইসনের গায়ে। ছবিটাও কেমন যেন পাল্টে গেল। যেন তার শরীরের ক্ষমতা ও তেজ কিছুটা হলেও প্রকাশ পেল ছবিটাতে।

কিন্তু দিন দুয়েক বাদেই শিল্পীর আবার মন খারাপ। ছবিটা আবছা হয়ে গেছে গুহার গায়ে। আসলে কাঠকয়লাই হোক বা গিরিমাটি, সবটাই তো গুঁড়ো গুঁড়ো। ঝরে ঝরে পড়ে গেছে গুহার গা থেকে। তখন তারই আর এক গুহাবাসীর পরামর্শে ছবিটার গায়ে আবার একটু গিরিমাটি ঘসে দিয়ে ছবিটার গায়ে একটু চর্বি ঘসে দিল। রঙ একটু আবছা হয়ে গেল বটে, কিন্তু ছবিটা এবার যেন আগের থেকে একটু বেশিদিন টিঁকে গেল।AltamiraBison

এভাবেই একটু একটু করে শিখতে শুরু করলো সেই শিল্পী। নিজের ইচ্ছা মতো এবং কখনো কখনো কারো পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলো সে। বিভিন্ন পাথরের গুঁড়ো দিয়ে ছবি আঁকতে থাকলো। আর সেই ছবি যাতে স্থায়ী হয় সে জন্য কখনো তাতে চর্বি, কখনো রক্ত, কখনো মূত্র আবার কখনো ডিমের কুসুম বা গাছের রস মেশাতে লাগলো। কোনোটাতে ছবিটা একই থাকলো, কোনোটাতে ছবি নষ্ট হলো আবার কোনোটাতে স্থায়ী হলো ছবি।

সেই যে শুরু। আজও চলছে সেই ট্র্যাডিশন। রঙ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কলমকারি, পট, মণ্ডন শৈলী, আলপনা — এগুলোতে আজও সেই প্রাচীনকালের প্রথম শিল্পীর ছায়াই যেন দেখা যায়। মাটি, পাথরের গুঁড়ো, আকরিক গুঁড়ো — এসব প্রাকৃতিক উপাদান দিয়েই চললো ছবি আঁকা। কিছু অস্থায়ী, আবার বেশির ভাগটাই স্থায়ী। ছবিকে স্থায়ী করার জন্য রঙের এমন গুঁড়ো উপাদানগুলো দিয়ে ছবি আঁকার পর ছবির গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হতো কিছু আঠালো, চটচটে পদার্থ।

পরে মানুষ ভাবলো, ছবি আঁকার পরে ঐ আঠালো, চটচটে যেটা লাগানো হচ্ছে সেটা তো ছবি আঁকার আগেই লাগানো যায়। তখন ঐ গুঁড়ো রঙকে সে ঐ আঠালো বস্তুটির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করলো। ঐ আঠালো বস্তুটি বেশিরভাগ সময়েই হতো চর্বি বা ডিমের কুসুম। কখনো কখনো গাছের কোনো রস।Prehistoric Colour (Ochre Sienna Umber)

কিন্তু এসব সেই সময়ের কথা যখন মানব সভ্যতাই সেই অর্থে শুরু হয়নি। মানুষ গুহায় বাস করতো। যাযাবর জীবন যাপন করতো সে। শিকারই ছিল তার একমাত্র জীবনধারণ পদ্ধতি। ভাষা বলতে কিছুই ছিল না। আর তাই জানার কোনোও উপায় নেই সেই প্রথম শিল্পীর নাম। জানার উপায় নেই সে কেন আঁকতে শুরু করেছিল এমন ছবি। কিসের তাড়নাতেই বা সে রঙের ব্যবহার করতে শুরু করেছিল?

কিন্তু চাকা আবিষ্কার যেমন সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল কয়েক যোজন, তেমনই ছবি আঁকতে শুরু করা ও রঙের ব্যবহার সংস্কৃতিকে এগিয়ে দিয়েছিল কয়েক ক্রোশ। আর দেওয়ালের গায়ে আঁকার পদ্ধতি পাল্টাতে পাল্টাতে, রঙ লাগানোর পদ্ধতি পাল্টাতে পাল্টাতে নতুন এক মাধ্যমের জন্ম নিল। টেম্পেরা। সেটাও পরিবর্তিত হয়ে হলো ফ্রেসকো।

কিন্তু সে অন্য আর এক গল্প।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to মাটির রঙ

  1. tuhin বলেছেন:

    tomar kalom kintu dibyi cholchhe…!!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s