চিত্তপ্রসাদের ‘ভালোবাসা’

শিল্পী চিত্তপ্রসাদের ছাপচিত্র ‘ভালোবাসা’ নিয়ে শিল্পী কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত-র আলোচনা।

01

বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর রদাঁর অমর সৃষ্টি ‘দ্য কিস’-এর খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। নানা দেশের অগুনতি মানুষ রদাঁর এই শিল্পকর্মটি দেখে চোখ সার্থক করেছেন। মানুষের প্রেমময় মুহুর্তের চূড়ান্ত অবস্থাকে পাথরে প্রস্ফুটিত করেছিলেন তিনি আজ থেকে অনেক বছর আগে, ১৮৮৮ সালে। শিল্পীর জীবদ্দশাতেই এই ভাস্কর্য যে পরিমাণ খ্যাতি ও বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছে তার তুলনায় নিতান্তই অপাংক্তেয় একটি ছবি নিয়ে দুকথা বলতে চাই আজ। ‘লাভ’ নামে এই ছবিটির রচয়িতা হলেন চিত্তপ্রসাদ। ভালোবাসার ছবি হলেও এটি আসলে লিনোকাট মাধ্যমে আঁকা একটি সাদাকালো ছবি। ভালোবাসার ছবিরও এমন রঙহীন প্রকাশ, এমন সার্থক আত্মঘোষণা এর আগে কখনও কি দেখেছি আমরা? মনে তো পড়ে না।

আত্মবিস্মৃত দুই নরনারী পরম আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে চুম্বনরত — এই হল ছবির বিষয়। বিষয় হিসাবে এমন ছবি হয়তো খুব দুর্লভ নয়, কিন্তু এমন অকপট বলিষ্ঠ চুম্বন পাশ্চাত্যের চিত্রকলাতেও কি খুব বেশি দেখা গেছে? প্রেমোন্মাদ নারীপুরুষ যখন মিলিত হয়, যখন সর্বস্ব ভুলে তারা একে অপরের মধ্যে লীন হয়ে যেতে যেতে নির্মাণ করে অলৌকিক এক ভাবজগতের, সেই মুহুর্তকে, ঠিক সেই ক্ষণটুকুকে শাশ্বত করে রাখতে পারেন যিনি তিনি তো সামান্য শিল্পী নন। কারণ প্রত্যক্ষদর্শনে আলিঙ্গনাবদ্ধ নারীপুরুষকে স্টাডি করা সম্ভব নয় কিছুতেই। সেক্ষেত্রে মডেলের যৌথতায় কৃত্রিমতা ছাড়া আর কিছু প্রকাশ পাবে না কোনওভাবেই। আর নিজস্ব অভিজ্ঞতাকালে এমন দৃশ্য মানুষ কখনও দেখতে পায় না নিজের চোখে। সেই পরমমুহুর্তে সে তো তখন আবেগের আতিশয্যে নিজেকেও ভুলে থাকে। আমরা জানি চিত্তপ্রসাদ অবিবাহিত ছিলেন, এমনকি উল্লেখযোগ্য কোনও ভালোবাসাও আসেনি তাঁর জীবনে। ‘তারা’ নাম্নী এক নারীকে তিনি ভালোবাসলেও সাক্ষ্যপ্রমাণাদি বলে জানা যায় যে সেই নারীকে তেমন করে কখনও কাছে পাননি তিনি। তাহলে তিনি কীভাবে আঁকলেন এমন সবল আলিঙ্গন, এমন আকুতি ভরা সমর্পণ? রেখার মধ্যে কেমন করে বুনে দিতে পারলেন তিনি প্রবল আগুনের উত্তাপ? অথচ সেই আগুনের প্রতাপে কোথাও ঘটেনি মাধুর্য্যের এতটুকু ঘাটতি। এ ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলে সমুদ্রের উচ্ছ্বাসও যেন থমকে যায়, স্তিমিত হয় উন্মাদ আগ্নেয়গিরি। যেন প্রবলতার পাঠ জানে শুধু এই দুজন, আর কেউ নয়, সমগ্র চরাচর শিক্ষার্থী তাদের কাছে। এই অনিঃশেষ আলিঙ্গন, এই অনন্ত নির্ভরতা আসলে এক স্বপ্নলোক, যার জন্য লোভাতুর হয়ে থাকে স্বয়ং স্বর্গও। তার তো জানা নেই পার্থিব এই তীব্রতাকে কীভাবে মন্থন করে আনেন মর্ত্যের শিল্পী। স্বর্গ শুধু সুধাকে চেনে, পৃথিবীর গরলের বুকে অমৃতের নাম সে কীভাবে লিখবে? সে ক্ষমতা শুধু চিত্তপ্রসাদের মতো শিল্পীর।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

2 Responses to চিত্তপ্রসাদের ‘ভালোবাসা’

  1. tuhin বলেছেন:

    porlam….mugdho holam….jemon hoyei thaki…

  2. pradip datta বলেছেন:

    Krishnajiter chokh die dekhlam “Bhalbasa”…………or balistho lekhonite Chittoprasader chhobi aro sahoj sarol o sundar hoye dhora dilo amar chokhe.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.