রঙের শ্রেণীবিভাগ

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি ষষ্ঠ কাহিনী।

Rang Head

মানুষের দুনিয়াতো বর্ণবৈষম্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু রঙের দুনিয়াও এমন বর্ণবৈষম্যের শিকার? একই রকমের না হলেও সেখানেও রয়েছে বর্ণবিভাগ। যদিও সেই বর্ণময় শ্রেণীবিভাগে কোনো রঙই তার নিজস্বতা হারায়নি, বা গুরুত্ব কমেনি কারোরই।

রঙের দুনিয়ায় তিনটি মৌলিক রঙ। কিন্তু কেন তিনটি রঙই মৌলিক, তার বেশি বা কম নয়? মানুষের চোখে যে দুই ধরণের আলোক-সংবেদী কোষ থাকে — রড ও কোণ কোষ, তার মধ্যে কোণ কোষগুলি আমাদের মস্তিষ্কে রঙের অনুভূতি তৈরি করে। এই কোণ কোষগুলি তিন ধরণের। এই তিনধরণের কোণ কোষ তিনটি রঙের ধারণা মস্তিষ্কে ঠিকঠাকভাবে তৈরি করতে পারে। আসলে কোণ কোষগুলি আলোর রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী সংবেদন তৈরি করে। স্বল্প দৈর্ঘ্যের, মধ্য দৈর্ঘ্যের ও দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক তরঙ্গের রঙ আলাদা আলাদা হয় এবং তারা আলাদা আলাদা ধরণের কোণ কোষের উপর সংবেদন তৈরি করে। তিনটি রঙের অনুভূতির কারণে মানুষ মৌলিকভাবে তিনটি রঙকেই চিনতে পারে। এই কারণে মানুষ তথা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের কাছে তিনটি রঙই মৌলিক রঙ হিসাবে উঠে আসে। মানুষের এই ধর্মটিকে ট্রাইক্রোমাসি বলে। তবে মাছ এবং পাখিদের ক্ষেত্রে চার ধরণের কোণ কোষ থাকার ফলে তারা চারটি রঙকে, বা বলা ভালো কখনো কখনো অতিবেগুনী রঙকেও আলাদা করতে পারে। তাদের এই ধর্মটি টেট্রাক্রোমাসি হিসাবে পরিচিত।eye

আমাদের ক্ষেত্রে এই ট্রাইক্রোমাসি ধর্ম কিভাবে কাজ করে? যে তিন ধরণের কোণ কোষ আছে মানুষের তাতে স্বল্প দৈর্ঘ্যের আলোক সংবেদী কোণ কোষটি ভালোভাবে সাড়া দেয় বর্ণালীর নীল রঙের ক্ষেত্রে; একইভাবে মধ্য দৈর্ঘ্যের আলোক সংবেদী কোণ কোষটি ভালোভাবে সাড়া দেয় সবুজ এবং দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের আলোক সংবেদী কোণ কোষটি হলুদাভ সবুজ রঙের ক্ষেত্রে।

প্রাচীনকাল থেকেই লাল, হলুদ এবং নীল এই তিনটি রঙকে মৌলিক রঙ হিসাবে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। আসলে লাল, হলুদ এবং নীল এই তিনটি রঙ দিয়ে ব্যবহার্য সমস্ত রঙই তৈরি করে নেওয়া যায়। কিন্তু অন্য কোনো রঙ মিশিয়ে এই তিনটি রঙ পাওয়া সম্ভব নয়। দুটি মৌলিক রঙ সমান অনুপাতে মিশে যে রঙ তৈরি হয় সেই গৌন রঙও তিনটি। লাল ও হলুদ মিশে কমলা; লাল ও নীল মিশে পার্পল; এবং নীল ও হলুদ মিশে তৈরি হয় সবুজ। এরপরের শ্রেণীতে বা তৃতীয় শ্রেণীতে কিছু রঙকে রাখা হয়, একটি মৌলিক রঙ এবং একটি গৌণ রঙকে সমান অনুপাতে মিশিয়ে যে রঙগুলি পাওয়া যায় তাদের। এমন রঙের সংখ্যা ছয়। হলুদাভ-বাদামি, সিঁদুরে রঙ, ম্যাজেন্টা, বাদামি ইত্যাদি এই শ্রেণীভুক্ত। ১৬৬৬ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটনের প্রিজম ও আলোর পরীক্ষার পর লাল, হলুদ এবং নীল এই তিনটি রঙ বিধিসম্মতভাবে মৌলিক রঙ হিসাবে গৃহীত হয়েছে। এমনকি এই তিনটি রঙ সমস্ত রঙকে সঠিকভাবে মিশতে সাহায্য করতে পারেনা তার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মৌলিক রঙ হিসাবে এই তিনটি রঙ তাদের স্থান অটুট রেখেছে আজও।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারণাও পাল্টায়। এক্ষেত্রেও তাই। রঙের সঙ্গে বস্তুর সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনই যে আলো এবং চোখের সম্পর্ক আছে সেটা মেনে নেওয়া হয়েছে আগেই। এটা জানা হয়ে গেছে যে চোখে আলো যে অনুভূতি তৈরি করে সেখান থেকেই আমরা রঙের হদিস পাই। এই মতবাদেরই সহায়ক হয়ে প্রাথমিক রঙ হিসাবে উঠে এসেছে লাল, সবুজ এবং নীল। মানুষের ট্রাইক্রোমাসি ধর্মেরই ব্যবহারিক রূপ হিসাবে এই প্রাথমিক রঙগুলি এসেছে। এই প্রাথমিক রঙগুলি টিভি, কম্পিউটারের মত ইলেকট্রনিক্স বস্তুতে রঙ ফুটিয়ে তুলতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া এগুলি মুদ্রণ সহায়ক হয়ে উঠেছে অচিরেই। কিন্তু মুদ্রণ জগতের সহায়ক হতে আর এক শ্রেণীভুক্ত প্রাথমিক রঙ পাওয়া যায় : সায়ান, ম্যাজেন্টা এবং হলুদ, আর এই তিনটি রঙের সাথে ব্যবহৃত হয় কালো। চার রঙের ছাপার জগতে এই সায়ান, ম্যাজেন্টা, হলুদ এবং কালো — এই চারটি রঙেরই প্রাধান্য।Colour set 1

রঙ মিশে রঙ তৈরির এই মজা আঁকার জগতে সেই কোন আদ্দিকাল থেকেই চলে আসছে। এই রঙের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে নতুন রঙ তৈরির খেলাতে রঙগুলির অনুপাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুটি রঙকে মিশিয়ে একাধিক রঙ বানানো যায় শুধু তাদের আনুপাতিক পরিমানে কমবেশি করে। যেমন লাল ও নীলকে সমান অনুপাতে মেশালে পার্পল রঙ পাওয়া যায়, কিন্তু যদি সেখানে লালের ভাগ কমিয়ে নীল রঙের অনুপাত বাড়িয়ে দেওয়া হয় তবে বেগুনী রঙ পাওয়া যাবে। আবার কোনো একটা বিশেষ রঙেই যদি একটু সাদা মিশিয়ে দেওয়া যায় তবে সেই বিশেষ রঙটারই একটা হাল্কা রঙ পাওয়া যাবে। উল্টোদিকে, ঐ রঙে খুব সামান্য কালো মেশালে সেই বিশেষ রঙটার একটা অন্য শেড্ পাওয়া যাবে।

এই রঙগুলিকে শিল্পীরা দুটি শ্রেণীতে ভাগ করে ফেলেছেন। উষ্ণ রঙ ও শীতল রঙ। নাম দিয়েই এই রঙগুলির পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায়। আসলে রঙের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীকে এই শ্রেণীবিন্যাসে ফেলা যায়। কমলা, লাল, হলুদ এবং এই রঙগুলিকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে যে রঙগুলি পাওয়া যায় সেগুলিকে উষ্ণ রঙের শ্রেণীতে ফেলা হয়। উষ্ণ রঙগুলি আসলে মানসিকভাবে আমাদের আরামদায়ক উষ্ণতার এক বাতাবরণ তৈরি করে দেয়। একইভাবে শীতল রঙের শ্রেণীতে যে রঙগুলি পড়ে, যেমন নীল, সবুজ, হাল্কা পার্পল এবং এগুলির মিশ্রণে তৈরি রঙ — এগুলি আমাদের মানসিকভাবে শীতলতার বাতাবরণ তৈরিতে সাহায্য করে। সেই অর্থে এই শ্রেণীবিভাগ রঙের মানসিক প্রভাবের উপর নির্ভরশীল।

রঙ নিয়ে এত যে তত্ত্বকথা তার জনক খুঁজতে গিয়ে সেই লোকটির নাম বেরিয়ে আসে যে লোকটি এরোপ্লেন আবিষ্কারের বহু আগে তার ছবি এঁকে ফেলেছিলেন — লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। সঙ্গে অবশ্য আর একজনের নামও আসে, দার্শনিক লিওন বাতিস্তা আলবার্তি। আর এসব সেই চতুর্দশ শতাব্দীর কথা, নিউটনের আলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বহু আগে। রঙ নিয়ে গবেষণা কে আর করবে, চিত্রশিল্পী ছাড়া। আর ইমপ্রেশনিস্টরাতো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়ে গেছেন রঙের দুনিয়ায়। রঙকে কতরকমভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, রঙ ও আলো-ছায়ার খেলা — এসবইতো পৃথিবী শিখল ইমপ্রেশনিস্ট-শিল্পীদের কাছ থেকে।

চিত্রশিল্পীরাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো রঙ-বিজ্ঞানী।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s