প্রকৃতির রঙ ও কারখানার রঙ

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি পঞ্চম কাহিনী।

Rang Head

রঙ মূলত ব্যবহার হয় ছবি আঁকার কাজে। এর বাইরেও রঙের বহু বহু ব্যবহার আছে, কিন্তু চিত্রকলা আর রঙ একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

কিন্তু রঙের উৎসটা ঠিক কি রকম? প্রাচীনকালে প্রকৃতিই ছিল একমাত্র উৎস। আকরিকচূর্ণ, কাঠকয়লার গুঁড়ো, রঙীন মাটি — এগুলোই ছিল মানুষের কাছে রঙের প্রাথমিক এবং একমাত্র উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা বেড়েছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে যে রঙ পাওয়া যায় তা দিয়ে আর যাইহোক মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। কারণ, মানুষের চাহিদারই শেষ নেই কোনো। তাই কারখানায় রঙ তৈরী হতে লাগলো। একই সঙ্গে বিবর্তন ঘটতে শুরু করল রঙের দুনিয়ায়।

কিন্তু মানুষতো প্রকৃতিরই একটি অংশ। সে কি করে প্রকৃতিকে অস্বীকার করে? তাই প্রকৃতির দেওয়া রঙেরও প্রয়োজন মানুষের জীবনে থেকেই গেল। আজও কৃত্রিমতার যুগে, কারখানার যুগে মানুষ ব্যবহার করে চলেছে প্রাকৃতিক রঙ। আজও ভারতে যে কলমকারি চিত্রশৈলী প্রচলিত আছে তাতে সম্পূর্ণভাবেই প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়। কালো রঙ তৈরি করা হয় লৌহচূর্ণ, আখের গুড়, খেজুর গুড় ইত্যাদি জলে গুলে দশ-বারোদিন ধরে পচিয়ে। কখনো তেঁতুলের কাণ্ড ও কয়লা মিশিয়ে তা দিয়ে কালো রঙ তৈরি করা হয়। এই রঙ স্থায়ী করার জন্য ব্যবহার করা হয় যে উপাদান সেটিও প্রাকৃতিক; মাইরোবালান ফুল ও কুঁড়ি। এছাড়া কলমকারিতে ব্যবহারের জন্য যে হলুদ ব্যবহার হয় তা তৈরি হয় মাইরোবালান ফুল ও অ্যালাম গুঁড়ো করে জলে ফুটিয়ে। নীল রঙ পাওয়া যায় তুঁত থেকে। লাল ও গোলাপী রঙ পাওয়া যায় চাতালাকোড়ি মূল থেকে।Banglar Potchitra

আমাদের বাংলার যে পটচিত্র তাতেও তো প্রাকৃতিক রঙই একমাত্র আশা-ভরসা। বাংলার দরিদ্র পটশিল্পীরা তাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও তাদের আশেপাশে সহজলভ্য গাছপালা থেকেই তৈরি করে নেয় তাদের রঙ। শিউলি ফুল ও পাতা, জবা ফুলের পাপড়ি, কাঁচা হলুদ — এসবও পটুয়াদের রঙের উপাদান হয়ে ধরা দেয়।

প্রাকৃতিক রঙের একটি মূল বৈশিষ্ট্য এটি সম্পূর্ণ রাসায়নিক প্রভাবমুক্ত। সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির বিভিন্ন সাধারণ উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়ার ফলে এই রঙ পরিবেশে কোনোরকম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না।

প্রাকৃতিক রঙের মধ্যে ধাতব উপাদান বলতে প্রধানত ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট, তামা, সীসা, পারদ, জিঙ্ক, লাপিস লাজুলি ইত্যাদি। ক্যাডমিয়াম ইয়েলো, ক্যাডমিয়াম রেড, ক্রোম ইয়েলো, কোবাল্ট ব্লু, হান পার্পল, ইজিপ্সিয়ান ব্লু, রেড লেড, জিঙ্ক হোয়াইট, আল্ট্রামেরিন, টার্কি রেড — আরো কত হাজারো রঙ আছে যেগুলোর মূল উপাদান ধাতু বা ধাতুর আকরিক।

সপ্তদশ শতাব্দীর শিল্পীদের কাছে প্রাকৃতিক রঙই ছিল একমাত্র উপাদান। এই রঙের ব্যবহৃত উপাদানগুলিই কখনও কখনও প্রাচীন শিল্পীর হারিয়ে যাওয়া ছবির পরিচয় জানতে এখনও আমাদের সাহায্য করে। বিজ্ঞানের উন্নত রেডিও কার্বন ডেটিং ছাড়াও রঙের উপাদানই কোথাও কোথাও একমাত্র পরিচয়-সহায়ক হয়ে ওঠে।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় সেই বিখ্যাত প্রতারকের কথা। হান ভাঁ মীগেরেঁ। চিত্রশিল্পী হিসাবে খ্যাতি না পেয়ে তিনি বেছে নেন প্রতারণার রাস্তা। তিনি ভেরমিয়েরের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের ছবির ধারা নকল করে তিনি ছবি আঁকতে শুরু করেন এবং নিজের আঁকা ছবিকে ভেরমিয়েরের আঁকা ছবি বলে প্রচার শুরু করেন। Fake Vermeerএকের পর এক নকল ভেরমিয়ের আসতে থাকে বাজারে, কিন্তু সেগুলি কোনোওভাবেই বিশেষজ্ঞদের নজরেও ধরা পড়েনা। ধরা না পড়ার কারণ যতটা ছিল তাঁর আঁকার দক্ষতা, ঠিক ততটাই ছবির উপাদানগুলির প্রতি মীগেরেঁর সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা। তিনি নিজে সেই রঙগুলি ঠিক সেইভাবেই তৈরি করতেন যেগুলি ভেরমিয়েরের সময়ে ব্যবহার হতো। আসলে, ছবিকে যদি রাসায়নিক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাহলেও যেন এই নকল ধরা না পড়ে সে জন্য রঙের উপাদানগুলির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হয়েছিল তাকে। তার জন্যই দক্ষিণ ফ্রান্সের রোকেব্রুন শহরের ‘প্রিমেভেরা’ নামের একটি বাড়িতে ছয় বছর স্বেচ্ছা-নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দিনের পর দিন তৈরি করেছেন সেই রঙ যে রঙ দিয়ে ভেরমিয়ের, দিহু, ফ্রান্স হাল্জ সৃষ্টি করতেন তাদের শিল্পকর্ম। আর সেই রঙ ব্যবহার করে এঁকে গিয়েছেন একের পর এক নকল ছবি — ‘ক্রাইস্ট অ্যাট ইম্মায়ুস’ বা ‘অ্যাডাল্টারেস’। মীগেরেঁ নিজে রঙ বানালেন কিভাবে? ভার্মিলিয়ান এলো সিনবার বা মারকিউরিক সালফাইড থেকে। বার্ন্ট সিয়েনা বানানোর জন্য হাইড্রেটেড ফেরিক অক্সাইড আর ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড মিহি করে গুঁড়ো করে নিয়ে সমান ওজনে মিশিয়ে তাতে প্রয়োজন মতো মেশানো হল বিশুদ্ধ পলিমাটি। গাঢ় নীল রঙের জন্য ইন্ডিগো বা নীল, যা আমাদের দেশে নীলকর চাষীরা চাষ করত। আর হাল্কা নীল হলো গুঁড়ো লাপিস লাজুলি। শুধু এগুলো পেলেই হবে না। ঠিক মতো রঙ তৈরি করতে মাসের পর মাস লেগে যেত। মীগেরেঁ এই সাধনা করে গিয়েছেন ছয় বছর ধরে। তৈরি করেছেন সপ্তদশ শতাব্দীর ছবি এই উনবিংশ শতাব্দীতে বসে।

প্রকৃতি যখন মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না তখন মানুষের হাতে এসে পৌঁছালো কারখানার রঙ। কারখানাতে তৈরি হওয়া রঙ মানুষের হাতে সুযোগ এনে দিলো অনেক বেশি। প্যাস্টেল, ক্রেয়ন, অ্যাক্রিলিক — নানা উপাদানের সমাহার এলো মানুষের কাছে। তেলরঙ বা জলরঙও তৈরি হতে শুরু হলো কারখানায়। আর বিভিন্ন উপাদানকে মিশিয়ে ব্যবহারের ঠিক আগে রঙ তৈরি করার ঝামেলা থাকলো না। তৈরি উপাদানকে শুধুমাত্র জলে অথবা তেলের মতো কোনো ধারকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হলো। কখনও কখনও এই মিশিয়ে নেওয়ারও কোনো প্রয়োজন থাকলো না। সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়ে উঠল। চিত্রকলাই শুধু নয়, এর ফলে সামগ্রিকভাবেই মানব সমাজ উপকৃত হল। কিভাবে? বাড়ির দেওয়াল রঙ করতে গেলে আগে যেভাবে বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা আলাদাভাবে ব্যবহার করা হতো এখন সে প্রয়োজন মিটলো। রঙকে সরাসরি দেওয়ালে ব্যবহার করা সম্ভব হলো।

তবে রাসায়নিক রঙগুলোরও কিছু প্রভাবতো থেকেই যায়। প্রকৃতির উপর এই রঙগুলোর প্রভাব কোনোভাবেই ভালো নয়, প্রায় সবটাই ক্ষতিকর। যদিও ক্ষতির বহরটা নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের উপর। ছবি আঁকার কাজে যদি ব্যবহার হয় এই রঙ, তবে এই রঙের ক্ষতির কোনো প্রভাবই পড়বে না মানুষের জীবনে। কিন্তু যদি খাদ্য উপাদানে ভেজাল হিসাবে কোনোভাবে এই রঙ মেশানো হয়, যেভাবে সব্জিকে তাজা দেখানোর জন্য তাকে রাঙিয়ে নেওয়া হয় — তবে তার প্রভাব হবে মানুষের জীবনে অপরিসীম।

আসলে ব্যবহারের উপরেই যে কোনো বস্তুর ভাল-খারাপ নির্ভর করে। ব্যবহারকারীই কোনো বস্তুর ভাল বা খারাপ নির্ধারণ করেন। রঙেরও!

 চিত্র পরিচয় : ১। বাংলার পটচিত্র; ২। নকল ভেরমিয়ের

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to প্রকৃতির রঙ ও কারখানার রঙ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s