রঙের বিজ্ঞান

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি চতুর্থ কাহিনী।

Rang Head

রঙ কি? রাঙিয়ে দেওয়ার উপাদান, নাকি আমাদের চোখ, নাকি আলো — কোনটা দায়ী কোনো জিনিসকে রঙচঙে দেখার জন্য? কেন আমরা কোনো জিনিসকে রঙীন দেখি?

রঙের এই খেলা জানতে গেলে আগে রঙের বিজ্ঞানটাকে ভালো করে জেনে নিতে হবে। কেন আমরা কোনো বস্তুকে লাল, নীল, কালো বা সাদা দেখি? এটা সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানের ব্যাপার। এই রঙ দেখার সঙ্গে বেশ কিছু ব্যাপার একটার সঙ্গে একটা জড়িয়ে আছে। আলো, বস্তুটি নিজে, আমাদের চোখ সবটা মিলে ঠিক হয় আমরা বস্তুটিকে কি রঙের দেখব। এরমধ্যে কোনো একটা যদি গণ্ডগোল করে তবে আর বস্তুটিকে সেই রঙে দেখা যাবে না। যেমন, আলো না থাকলে যে কোনো বস্তুকেই সাধারণত ধূসর দেখায়। আবার অতিরিক্ত আলোতে বস্তুটির রঙ যেন জ্বলে যায়। একই ভাবে বস্তুটির ধর্ম ঠিক করে দেয় সে কোন রঙের দেখাবে। কিন্তু তারপরেও থাকে আমাদের চোখ। তা নইলে রঙ-কানা শব্দটাই তো হত না। অনেকে ঠিকঠাক রঙটাই চিনতে পারে না। সবুজকে দেখে নীল!

তবে এই তিনটি — আলো, বস্তু এবং চোখ যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলেও বা রঙকে ঠিক কিভাবে আমরা দেখি? সেটা জানতে গেলে আলো, বস্তু এবং চোখ — এই তিনটের সম্পর্কেই কিছু মূল জিনিস জেনে নিতে হবে।

আলো আসলে কিছু তরঙ্গের মিশ্রণ। প্রতিটি তরঙ্গের রঙ আলাদা আলাদা।Rainbow বহু বছর আগে নিউটন প্রমাণ করেছেন আলো আসলে সাতটি রঙের সমষ্টি। বলা ভালো, আলোর সাতটি রঙকে আমাদের চোখ দেখতে পায়। সাতটি রঙ এক হয়ে সাদা হয়ে আলো আমাদের চোখে ধরা দেয়। সেটাই দৃশ্যমান আলো। এই আলোই কোনো বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে সেই বস্তুকে দেখতে সাহায্য করে। আর ঠিক সেই কারণেই অন্ধকারে, একদম নিকষ কালো অন্ধকারে আমরা কোনো বস্তুকে দেখতে পাইনা। আলোর মধ্যে যে সাতটি রঙ থাকে সেগুলিই আমরা বর্ষাকালে রামধনুতে দেখি — বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। মনে রাখার জন্য এই সাতরঙের নাম হয়েছে ‘বেনীআসহকলা’। আমরা খালি চোখে এই সাতটি রঙই দেখতে পাই। আবার এই সাতরঙের মিশ্রণে যে রঙগুলো হয় সেগুলোও আমরা দেখতে পাই।

কোনো বস্তুর কি রঙ দেখাবে সেটা বস্তুর একটি বিশেষ ধর্মের উপর নির্ভর করে। প্রতিটি বস্তুর একটি বিশেষ ধর্ম আছে। বস্তুর উপর আলো পড়ে যখন সেটা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে তখন সেই বস্তুটি আলোর তরঙ্গ-মিশ্রণের থেকে বেশ কিছু বা প্রায় সব তরঙ্গই শোষণ করে নিতে পারে। কখনও কখনও আবার শোষণ না করে সমস্ত রঙের তরঙ্গগুলিকেই প্রতিফলিত করে দিতে পারে। বস্তু থেকে প্রতিফলিত ঐ আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে। আমরা তখন সেই বস্তুটিকে দেখতে পাই।

কিন্তু বস্তুটিকে কি রঙে দেখব? সেটা ঠিক হয়ে যায় বস্তুটির উপর আলো পড়ার সময়েই। আলো পড়লে বস্তুটি বেশ কিছু রঙের তরঙ্গকে শোষণ করে নিয়ে একটি বা মিশ্রিত কিছু তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে। বোঝার সুবিধার জন্য ধরে নিই বস্তুটির রঙ লাল। তার মানে বস্তুটি লাল রঙের তরঙ্গটি বাদ দিয়ে বাকি তরঙ্গগুলিকে শোষণ করে নেয়। লাল তরঙ্গের আলোক রশ্মিটি প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। আমরা সেই বস্তুটিকে লাল দেখি। আবার সবুজ বস্তু থেকে সবুজ তরঙ্গটি প্রতিফলিত হয়, বাকি সব রঙের তরঙ্গগুলি বস্তুটিতে শোষিত হয়ে যায়।

কিন্তু নানা ধরণের সবুজ! গাঢ় সবুজ, হাল্কা সবুজ, কলাপাতি সবুজ। আসলে সেই বস্তুগুলি থেকে সবুজ তরঙ্গের সঙ্গে হলুদ রঙের তরঙ্গও প্রতিফলিত হয়। কখনও কখনও রঙের তরঙ্গগুলির মাপও পাল্টে যায় একটু একটু।

আর কোনো বস্তু যখন কোনো তরঙ্গকেই প্রতিফলিত করে না, সবটাই শোষণ করে নেয় তখন? তখন আমরা সেই বস্তুটিকে কালো দেখি। উল্টোদিকে যদি কোনো বস্তু আলোর সবটাই প্রতিফলিত করে দেয়, একটুও শোষণ করতে না পারে তখন আমরা সেই বস্তুটিকে সাদা দেখি। সাদা অর্থাৎ সব রঙগুলোকেই একসঙ্গে দেখা। আর কালো মানে আসলে কোনো রঙের অনুভূতিই তৈরি হল না। তাই বিজ্ঞানের ভাষায় কালো আসলে কোনো রঙই নয়। এখানে আর একটা কথা বলা দরকার, কোনো লাল রঙের বস্তুকে যদি নীল আলোতে রাখা হয় তখন সেই বস্তুটি ঐ নীল রঙকে শোষণ করে নেবে। কিন্তু প্রতিফলিত করার জন্য কোনো লাল তরঙ্গ সেখানে থাকবে না। ফলে আমাদের চোখে কোনো রঙের অনুভূতি তৈরি হবে না। আমরা ঐ লাল বস্তুটিকে কালো দেখব।

যেমন রঙের আলোক তরঙ্গ আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় আমরা বস্তকে তেমন রঙের দেখি। কিন্তু আমাদের চোখ রঙকে কেমন করে চিনতে পারে? আমাদের চোখে রেটিনা বলে একটি অংশ আছে। এই রেটিনাতে দুই ধরণের আলোক-সংবেদী কোষ থাকে — রড কোষ এবং কোণ কোষ। রড কোষ বস্তুকে বুঝতে সাহায্য করে এবং শুধুমাত্র কালো, সাদা এবং ধূসর রঙের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কোণ কোষগুলি রঙের অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। এই কোণ কোষগুলির জন্যই আমরা ঐ প্রতিফলিত আলোকরশ্মি থেকে বস্তুর রঙ সম্পর্কে ধারণা পাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই কোণ কোষগুলি অল্প আলোয় কাজ করতে পারে না, যথেষ্ট আলোর প্রয়োজন হয়। আর ঠিক এই কারণেই আমরা সন্ধ্যে বা রাতের অন্ধকারে কোনো বস্তুর রঙ দেখতে পাই না। রড কোষ যে অনুভূতি দেয়, অর্থাৎ সাদা, কালো এবং ধূসর সেটাই আমরা রাতের বেলা বস্তুর রঙ হিসাবে দেখতে পাই।

যাদের চোখের কোণ কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারা অবশ্য সব রঙকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। দুটি রঙের পার্থক্য তাদের কাছে ধরা দেয় না। তখনই তাদের কপালে জোটে রঙকানা-র দুর্নাম। অবশ্য রঙের পার্থক্য ঠিক করতে না পারার আরো বহু কারণ আছে, শুধু মাত্র কোণ কোষের ক্ষতি হওয়া নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গবাদি পশুদের চোখের গঠন এবং তাদের চোখে উপস্থিত কোণ কোষের জন্য গবাদি পশুদের লাল রঙের অনুভূতি হয় না। লাল ঘেষা যে কোনো রঙই, যেমন কমলা, কোনো অনুভূতি তৈরি করে না তাদের মস্তিষ্কে। ফলে তারা লাল-ঘেষা রঙ দেখতেই পায়না। রঙ আসলে একটি অনুভূতি।

মানুষের চোখের কোণ কোষগুলি তিন ধরণের। নীল, সবুজ এবং লাল এই তিনটি ভাগে তাদের ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু আসলে কোণ কোষগুলি স্বল্প দৈর্ঘ্যের, মধ্য দৈর্ঘ্যের এবং দীর্ঘ তরঙ্গগুলি আলাদা আলাদাভাবে ধরতে পারে। আর তাদের জন্যই আমাদের মস্তিষ্ক রঙের ধারণা পায়। সাদা আলোতে সাতটি মাত্র রঙ থাকলেও মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় দশ লক্ষ রঙের পার্থক্য করতে পারে। আসলে নানা রঙের তরঙ্গগুলির যে সামান্য আনুপাতিক পার্থক্য রেটিনার কোণ কোষগুলিতে সূক্ষ্ম অনুভূতি তৈরি করে মানুষের মস্তিষ্ক সেই সামান্য পার্থক্যও বুঝতে পারে।

আমরা কোনো বস্তুতে রঙ করতে গিয়ে আদপে সেই বস্তুর গায়ে এমন কিছু প্রলেপ লাগাই যাতে বস্তুটি সেই রঙটিকে প্রতিফলিত করে বাকি রঙগুলিকে শোষণ করে নিতে পারে। এভাবেই ছবি আঁকার পর যখন সেই ছবিতে রঙ লাগাই তখন সেই প্রক্রিয়াটিই করি। আলোর উপরে বা আমাদের চোখের উপরে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বস্তুটির উপরে আমরা আসলে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ আনতে পারি। সেভাবেই আমাদের চারপাশ রঙিন করে তুলি আমাদের ইচ্ছামতো।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s