রঙের গুহা

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি তৃতীয় কাহিনী।

Rang Head

কতকাল আগে মানুষের সঙ্গে রঙের পরিচয় হয়েছে। সেই নমুনা প্রাগৈতিহাসিক মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে গুহার গায়ে। সেই গুহাচিত্রগুলির দিকে তাকালে আমরা প্রাচীন সেই রঙের স্পর্শ কিছুটা হলেও পাব। প্রাচীন তো বলছি, কিন্তু কত আগের সেসব ছবি?

প্রথম গুহাচিত্র, যেখানে জীবজন্তুর দেখা পাওয়া যায় সে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার বছর আগেকার। পাওয়া গেছে ইন্দোনেশিয়ায়। আর প্রাচীন যে অবয়বচিত্র পাওয়া যায় সেটাও প্রায় ত্রিশ থেকে বত্রিশ হাজার বছরের পুরোনো যেটা ফ্রান্সে পাওয়া গেছে। কিন্তু এর চেয়েও প্রাচীন চিত্র পাওয়া গেছে স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়ার এল-ক্যাস্টিলো গুহায় প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগের। আমাদের দেশেও আছে এমন প্রাচীন গুহাচিত্র। ভীমবেটকা গুহার আঁকাগুলি আজ থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার বছরের পুরোনো।Art of Neanderthals

তবে এমন একটি দুটি নয়। গোটা পৃথিবী জুড়ে এমন অসংখ্য গুহা পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ফ্রান্স এবং স্পেনেই এখনও পর্যন্ত তিনশ চল্লিশটির কাছাকাছি প্রাচীন গুহা আবিষ্কার হয়েছে যেখানে প্রাচীন চিত্রাবলী পাওয়া গেছে। গোটা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে এমন গুহাচিত্রাবলী। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রাকেন্সবার্গ পার্কের উদাহরণটি মাত্র তিন হাজার বছরের পুরোনো হলেও এখানকার চিত্রাবলীতে ধর্মীয় বিশ্বাসের ছবি ফুটে উঠেছে। এখানে জীবজন্তুর পাশাপাশি বেশকিছু মানবদেহের আকৃতিও দেখা যায়। আবার নামিবিয়ার অ্যাপোলো ১১ গুহাচিত্রটির সময়কাল প্রায় ২৩,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আবার সোমালিয়ার সোমালিল্যান্ড এলাকায় ৫০০০ বছরের পুরোনো কিছু গুহাচিত্র পাওয়া গেছে যেখানে বন্য জীবজন্তুদের সাথে সহাবস্থান করছে বেশকিছু গবাদি পশু। আবার সোমালিয়ার উত্তরের কিছু গুহাতে আবিষ্কার হয়েছে বেশকিছু গুহাচিত্র যেখানে বর্ণিত হয়েছে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার শিকারির শিকার ধরার গল্প। আবার আরো একটু উত্তরে আলজেরিয়া। সেখানে ১৯৩৩ সালে প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল ছবির সেই গুহাগুলি যেখানে এখনও পর্যন্ত প্রায় পনেরো হাজার ছবি আবিষ্কার হয়েছে। এটি এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করেছে। এখানে যেসব ছবিগুলি আছে তাতে ঐ অঞ্চলের জীবজন্তুর স্থানান্তর, আবহাওয়া বা জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানব বসবাসের ধরণের পরিবর্তনের একটি সুন্দর ধারণা পাওয়া যায়।

অন্যদিকে লিবিয়ার সীমান্তের কাছে দক্ষিণ-পশ্চিম ইজিপ্টের সাঁতারু গুহা এবং বন্যজন্তুদের গুহা আবিস্কার হয়েছে যেগুলি প্রায় দশহাজার বছর আগের বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাঁতারু গুহা নামকরণ হয়েছে কারণ এই গুহার পাথরের দেওয়ালে সাঁতারু মানুষের ছবি আঁকা আছে। আর বন্যজন্তুদের গুহা মানে তার দেওয়াল ভর্তি শুধু বন্যজন্তুর ছবি।

আফ্রিকার বাইরে অস্ট্রেলিয়ার কাকাডুতে, উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা-বারবারাতে, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলে বা এশিয়া মহাদেশের থাইল্যান্ড, মালেয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার কোথায় পাওয়া যায়নি প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র! এর মধ্যে ব্রাজিলের কাপিভারা জাতীয় উদ্যান তৈরি করা হয়েছে সেখানে পাওয়া প্রাচীন গুহাচিত্রগুলিকে রক্ষা করার জন্য। এই এলাকাটি ১৯৯১ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষিত হয়েছে।

কিন্তু আমাদের জানা-চেনা বিখ্যাত দুটি গুহাচিত্রকে আলাদাভাবে বলতেই হয়। একটি আলতামিরা গুহাচিত্র, অন্যটি ভীমবেটকা গুহাচিত্র। আলতামিরা স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়ায় অবস্থিত।AltamiraBison 2 এই গুহাটি প্যালিওলিথিক যুগের একটি উদাহরন। প্যালিওলিথিক বা প্রাচীন প্রস্তর যুগ আজ থেকে প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগের, যখন মানুষ সবে কাঠ এবং হাড়ের অস্ত্রশস্ত্র ছেড়ে পাথরের তৈরী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতে শিখেছে। ১৮৭৯ সালে প্রথম বর্তমান বিশ্বের নজরে আসে এই গুহার আঁকা ছবিগুলি। কিন্তু সে সময় বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়। সবাই মনে করে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সেই বোধ ছিলনা যাতে সে কোনো শিল্পকলাচর্চা করতে পারে, ছবি আঁকতে পারে। ১৯০২ সালে যখন প্রথম এই গুহার সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল তারপর থেকে মানুষের ধারণা পাল্টাতে থাকে প্রাগৈতিহাসিক এই গুহাগুলি সম্পর্কে। গুহাটির আবিষ্কর্তা একজন শখের পুরাতাত্ত্বিক মার্সেলিনো সতুলা এবং তার আট বছরের মেয়ে মারিয়া। এই আবিষ্কারও হয়েছে একদম হঠাৎই। আসলে স্থানীয় জনগনের কাছে গুহাগুলি পরিচিতই ছিল, কিন্তু ছবিগুলির অস্তিত্ব ছিল অজানা। ১৮৬৮ সালে মডেস্টো পেরেস নামের এক শিকারী এই গুহাগুলির দিকে আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরে ১৮৭৫ সাল থেকে শখের পুরাতাত্ত্বিক মার্সেলিনো নিয়মিত এই গুহাগুলিতে অভিযান চালান। তিনিও গুহাচিত্রগুলির অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি। এরপর একদিন তার আট বছরের মেয়ে মারিয়াকে বেড়াতে বেড়াতে সেই গুহাগুলিতে নিয়ে গেলেন। গুহার ছাদের দিকে তাকিয়ে মারিয়া অবাক। বাবাকে ডেকে দেখায় সেখানে বাইসনের ছবি আঁকা রয়েছে। দেখে বাবাও অবাক। সেই প্রথম নজরে আসে আলতামিরার বাইসন। সেটা ১৮৭৯ সাল।

আলতামিরার গুহাটি প্রায় তিনশ মিটার লম্বা এবং দুই থেকে ছয় মিটার উচ্চতা। কিন্তু প্রায় তেরো হাজার বছর আগের কোনো ভূমিধ্বস গুহার প্রধান প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। ভিতরে বন্দি হয়ে থাকে মানুষের প্রথম দিকের সৃষ্ট শিল্পকলা। এই শিল্পকলার শিল্পী কাঠকয়লা এবং হেমাটাইট আকরিক ব্যবহার করেছেন এই ছবিগুলি আঁকার কাজে। যদিও একটি লালচে রঙের বাইসনকেই আলতামিরার গুহাচিত্র হিসাবে আমাদের কাছে মূলত তুলে ধরা হয়, কিন্তু সে শুধু একটি নমুনা। এই গুহার অসংখ্য ছবির মধ্যে বাইসনের দল যেমন আছে তেমনই আছে দুটি ঘোড়া, একটি বড় হরিণ এবং একটি বন্য শূকর।

অন্য গুহা ভীমবেটকা। সেটি আমাদের ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের রাইসেন জেলায় অবস্থিত।Bhimbetka 1 ভূপাল থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এই এলাকাটি, বিন্ধ্য পর্বতমালার অংশ। ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলি প্রায় ত্রিশ হাজার বছর প্রাচীন। এই গুহাচিত্রগুলি সেই আমলের নৃত্যশিল্পের প্রমাণ। ২০০৩ সালে এটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসাবে ঘোষিত হয়েছে।

ভীমবেটকা মানে ভীমের বসার জায়গা। ‘ভীম’ এবং ‘বৈঠক’ শব্দদুটি মিলে ভীমবেটকা। ১৮৮৮ সালের ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক তথ্যে এই এলাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক বিষ্ণু শ্রীধর ওয়াকাঙ্কার ভূপাল থেকে ট্রেনে ঐ এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করেন পাথরের সেই গঠন যেটা তিনি স্পেন এবং ফ্রান্সে দেখেছিলেন। তাঁর সন্দেহ হয় এবং পরে তিনি একটি দল নিয়ে এসে ঐ এলাকায় খোঁজ শুরু করেন। ১৯৫৭ সালে সবার সামনে উঠে আসে ভীমবেটকার গুহাচিত্রগুলি।

গুহাচিত্রগুলিতে কি আছে? একটি গুহাচিত্রে দেখা যায় মানুষের শিকারের দৃশ্য, কোনোটাতে অশ্বারোহী আবার কোনোটাতে নৃত্যরত মানবগোষ্ঠী। একটি গুহা, যেটিকে ‘চিড়িয়াখানা’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে সেখানে আছে হাতি, বাইসন, হরিণ ইত্যাদি। আবার আর একটিতে আছে একটি ময়ূর, হরিণ, সাপ এবং সূর্য। অন্য একটি ছবিতে দুটি হাতি আছে যাদের শুঁড়দুটি অলঙ্কৃত। শিকারদৃশ্যগুলিতে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার হয়েছে তীর-ধনুক, ঢাল-তলোয়ার।

গুহাচিত্রগুলি শুধু যে শিল্পকলার প্রাথমিক পরিচয় দেয় তাই নয়। সভ্যতার বিবর্তন বুঝতে গেলেও এই গুহাচিত্রগুলি অপরিহার্য। মানব সভ্যতাকে জানার জন্য ছবির চেয়ে সহজ ও ভালো মাধ্যম আর কিছু নেই। আর গুহাচিত্রগুলি মানুষের সভ্যতার জন্মলগ্নের সেই পরিচয়ই বহন করে চলে।

 

চিত্র পরিচিতি : ১। নিয়ানডারথালদের আঁকা গুহাচিত্র; ২। আলতামিরার গুহাচিত্র; ৩। ভীমবেটকার গুহাচিত্র

This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

2 Responses to রঙের গুহা

  1. Abhishek Bagchi বলেছেন:

    Khub valo
    But Arukto slow explain koris

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.