রঙের পরিচয়

রঙ নিয়ে তথ্যানুসন্ধানে নেমেছেন মৃণাল নন্দী। নতুন ভাবে রঙকে চেনার জন্য। রঙের ইতিকথার এটি দ্বিতীয় কাহিনী।

Rang Head

রঙের সঙ্গে মানুষের প্রথম পরিচয় হয় সেই কোন আদিম যুগে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়ার গুহাতে প্রথম ছবি আঁকে মানুষ। অন্তত এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটাকেই প্রামাণ্য হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। সেই প্রথম রঙ ব্যবহার করতে শিখল মানুষ। এরপর বিভিন্ন দেশের নানা গুহার গায়ে ছবি দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছে সে মনের আনন্দে।

কিন্তু রঙ হিসাবে কি ব্যবহার করেছে সে? প্রথম দিকে রঙ ছিল কাঠকয়লা, নানা রঙের গুঁড়ো পাথর, আকরিক গুঁড়ো এবং হাড়গোড় ইত্যাদি। এসব উপাদানগুলো গুঁড়ো হিসাবেই ব্যবহার করতে শিখেছিল সে। কিন্তু মজার কথা, গুহার গায়ে আঁকার কাজে সেগুলো যতটা ব্যবহার হত, তারচেয়ে বেশি ব্যবহার হত গায়ে এবং মুখে লাগিয়ে নিজেকে রঙীন করার কাজে। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া কিছু প্রাগৈতিহাসিক নমুনা থেকে এর প্রমাণ মিলেছে।

প্রথম দিকের গুহাচিত্রে মূলত ব্যবহার হত দুটি রঙ — লাল এবং কালো। লাল রঙ তৈরি হতো লৌহ আকরিক হেমাটাইট দিয়ে, আর কালো রঙ পাওয়া যেত কাঠ কয়লার গুঁড়ো বা ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড যৌগ থেকে। এছাড়া জিঙ্ক অক্সাইড ব্যবহার করত সাদা রঙ হিসাবে। পরে যখন মানুষ আরো কিছু রঙ ব্যবহার করতে শিখল তখন আরো একটু বৈচিত্র্য এলো তার আঁকিবুকিতে। শিখল হলুদ ও বাদামির ব্যবহার।painting tools

নিজের আঙুলই ছিল মানুষের প্রথম তুলি। রঙের গুঁড়ো নিজের আঙুলে নিয়েই তুলির মতো করে তারা ছবিতে রঙ লাগাতো। কখনো বা মসজাতীয় বা ঘাসজাতীয় কিছু দিয়ে একটা ব্রাসের মতো কিছু বানিয়ে নিয়ে তাই দিয়েই রঙ লাগাতো সে। এরপর ফাঁপা হাড়ের টুকরো বা ফাঁপা বাঁশের টুকরোতে রঙ ভরে ফুঁ দিয়ে রঙ লাগাতে শিখল মানুষ। এভাবে ফুঁ দিয়ে রঙ লাগিয়ে নিজেদের হাতের ছাপ এঁকে রাখতো পাথরের গায়ে।

রঙগুলো গুঁড়ো পাউডার হিসাবে প্রাথমিকভাবে পেত সে। সেগুলো যাতে গুহার গায়ে এঁটে থাকে, টিঁকে থাকে সময়কে হার মানিয়ে সেজন্য গুঁড়ো পাউডারের মতো রঙের সঙ্গে মেশাতো গুহার খনিজ জল, চর্বি, রক্ত ইত্যাদি। সবসময়ে যে সে সফল হতো তা কিন্তু নয়। বারবার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে করতে একটু একটু করে সফলতার রাস্তায় এগোলো মানুষ।

একটু একটু করে বিবর্তন ঘটলো মানুষের। সভ্যতাও এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে। ছবি আঁকার কাজে ব্যবহার করা রঙেও বদল ঘটল একটু একটু করে। বদল ঘটল ব্যবহারের ধরণেও। গুহার দেওয়াল ছেড়ে মানুষ ছবি আঁকলো তার তৈরি করা পাত্রে, তা সে পাথরের হোক বা মাটির। রঙীন করলো তাকে। ছবি আঁকলো কাঠের গায়ে। রঙ লাগালো তাতেও। এরপর কাগজ এলো, এলো ছবি আঁকার জন্য ক্যানভাস। আর বদল ঘটল রঙেও। গুঁড়ো রঙের ব্যবহার গেল কমে।ancient chinese pottery

এভাবেই এল জলরঙ। তারপর তেলরঙ, প্যাস্টেল। আর এখন অ্যাক্রিলিক এসে একটু একটু করে জয় করে নিয়েছে সকলের মন। কম্পিউটার এসে গিয়ে আবার ডিজিটাল রঙের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। সরাসরি কম্পিউটারেই রঙ তৈরি করে ব্যবহার হচ্ছে এবং সাধারণ রঙ বা পিগমেন্ট-এর প্রয়োজনই পড়ছে না যতক্ষণ না সেগুলোকে কোনোভাবে প্রিন্ট নেওয়া হচ্ছে।

এত কিছুর পরেও নানা ধরণের, নানা রকমের রঙের নিজস্ব প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী গুরুত্ব কমেনা একটুও। অ্যাক্রিলিকের জনপ্রিয়তাতেও একটু গুরুত্ব কমেনি প্যাস্টেলের বা জলরঙ-তেলরঙের। নিজের নিজের ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই প্রয়োজনীয়তা একই রকম থেকে গেছে। কাগজের গায়ে যে রঙে আঁচড় কাটা যাবে সেই রঙে কি দেওয়াল বা গুহার গায়ে কোনো দাগ পড়বে? মাধ্যম ও রঙের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানেই তো গড়ে ওঠে শিল্প। তৈরি হয় ছবি।

 

চিত্র পরিচয় : ১। প্রাচীন তুলি; ২। প্রাচীন পাত্র।

Advertisements
This entry was posted in Colour, Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to রঙের পরিচয়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.