নৈতিক কাক এবং জয়নুল আবেদিন

দেবকুমার সোম এবার জয়নুল জন্মশতবর্ষে কলম ধরেছেন জয়নুলের ‘কাক’ নিয়ে। নতুনভাবে দেখা জয়নুলের কাকচরিত্র।

 কাক

‘‘গ্রামপথে পদচিহ্ন নেই। গোঠে গরু

নেই কোনো, রাখাল উধাও, রুক্ষ সরু

আল খাঁ খাঁ, পথপার্শ্বে বৃক্ষেরা নির্বাক

নগ্ন রৌদ্র চতুর্দিকে, স্পন্দমান কাক, শুধু কাক’’

 

05কাক  কবিতাটি শামসুর রহমান লিখেছিলেন ১৯৭১ সালে। আর এই কবিতাটির অনুষঙ্গে জয়নুল আবেদিন এঁকেছিলেন দৃঢ়-তির্যক কাক চিত্রটি। একাত্তর সালে পরিণত বয়সে যখন তিনি শিল্পাচার্য হিসেবে নন্দিত, তখনই কবিবন্ধুর প্ররোচনায় তিনি প্রথম কাকচরিত্র আঁকলেন, তা নয়। তারও ঢের আগে, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে কলকাতার ফুটপাতে আধমরাদের ছবি আঁকবার প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে কাকেদের। আবেদিনের কাকেদের। সত্যি বলতে নাগরিক নৈস্বর্গ চিত্রিত করতে গিয়ে তাঁর ছবিতে কাক এসেছে। একক। যুগল। কখনও বা ঝাঁক বেঁধে। অথচ গূঢ় সত্য এই, শিল্পাচার্য কাক পাখিটিকে অপছন্দই করতেন আজীবন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই পাখিকে নিয়ে নিন্দামন্দের উল্লেখ রয়েছে তাঁর নিকটজনের স্মৃতিলেখায়। যে পাখিটি তাঁর দৃষ্টিতে বাস্তবিক অপন্দের ছিল, তাকেই এমন অনুপুঙ্খ চিত্রণ কেন করেছিলেন তিনি?

এই বৈপরীত্যের অনুসন্ধানের আগে আমার মনের মধ্যে যে জিজ্ঞাসা উঁকি দিচ্ছে, তা একবার খোলসা করে নিই। জয়নুল কেবল আন্তর্জাতিক খ্যাতবান চিত্রকর নন, একজন প্রতিষ্ঠানও বটে। অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলালের মতোই তিনি বাঙালির চিত্রসাধনার গুরুজি। তাই জন্মশতবর্ষ ছুঁয়ে থাকা সময়ে হঠাৎ আমি আর সবকিছু ছেড়ে কেন তাঁর কাকচরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললাম? আমি দেখতে পাচ্ছি জয়নুল সম্পর্কে আমি যা জানি তা তথ্য হিসেবে তামাদি। ধার করা সে-সব তথ্যে শিল্পী সম্পর্কে একটা নিবন্ধ খাড়া করা যায় বটে, তবে তাতে ধার থাকে না বিশেষ। ফলে কাক সংক্রান্ত একটি আপাত নিরীহ আলোচনা করলে সেটা হয়ত খানিক স্বকীয় ও ধারাল হতে পারে। তবে এই একটি মাত্র কারণে নয়, জয়নুলের কাক চিত্রণ সম্পর্কে কিছু বলতে চেয়ে আমি নিশ্চিত একটি প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে চাইছি। ফলে একে প্রশ্ন না বলে প্রসঙ্গ বলাই সুপযুক্ত। প্রসঙ্গটিকে এক বাক্যে বললে শিরোনাম দিতে হয় শুভাশুভর নৈতিকতার প্রেক্ষাপটে জয়নুল আবেদিন। আরও ছোট করে নিলে; আবেদিন যেমন বিস্তর কাক এঁকে গেছেন, কাক আঁকায় শুভাপ্রসন্নও তেমনই দড় এক শিল্পী।

চিত্রকলায় কাক যখন বিবিধ প্রেক্ষাপটে একক চরিত্র হিসেবে উপস্থিত থাকে, তখন সে একাকীত্বের সমার্থক। গৃহস্থ জীবনের রকমারি অনুষঙ্গে নিঃসঙ্গতার রূপ পায় কালো, অসুন্দর এই নাগরিক পাখি। তেতাল্লিশের মানুষ-সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে ফুটপাতে মৃতপ্রায় মানুষের ছবিতে জয়নুলের একক কাক আসন্ন মৃত্যুর নিঃসঙ্গতাকে ধরতে চেয়েছে। এ-সব ছবিতে কাককে প্রায় বসে থাকতে দেখি। যে যেন যমদূত। যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। জয়নুল যখন এভাবে কাক আঁকছেন, তখন কাক তাঁর দৃষ্টিতে অতি অপ্রিয় এক চরিত্র। ফলে সে কাক যথেষ্ট কালো, বেয়াড়া। সস্তার প্যাকিং কাগজে ভুষোকালির রঙ মোটা ব্রাশে টেনে জয়নুল যেন তখনকার ব্রিটিশ প্রশাসনকে প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছিলেন। তাই অপন্দের পাখি চরিত্রগতভাবে তাঁর তখনকার ছবিতে মৃত্যুর মতো ক্রূর। অবিবেচক।

জয়নুলের ছবি প্রায় বাস্তবধর্মী। এমনকী তাঁর বাংলা আর্ট ফর্মও সম্পূর্ণ বিমূর্ত নয়। তবে শ্রমজীবনকে নিবিষ্ট মনে অধ্যায়নের ফলে তাঁর ছবি বাস্তবধর্মী হয়েও কর্কশ। প্রবল গতিময়। আর শ্লোগান মুখর।Zainul_Painting একক কাক চিত্রণেও তেমনই। তবে যখন তিনি যুগলের ছবি এঁকেছেন, তখন ছবিতে কাক মূখ্য চরিত্র। সেখানে তাই নিবিড়তা, প্রেমময় দাম্পত্য, কিংবা বন্ধুসঙ্গ ফুটিয়ে তোলা শিল্পীর উদ্দেশ্য। জয়নুল তাঁর সমগ্র জীবনে যত কাক এঁকেছেন, সে-সব প্রথানুগামী। বিভিন্ন মুড, বিভিন্ন শেড ব্যবহার করে কাকচরিত্র তিনি এঁকে গেছেন জীবনভর। অর্থাৎ আবেদিন তাঁর যাবতীয় বিমুগ্ধতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন কাক চিত্রণে।

কিন্তু কেন এই বিক্ষোভ? কেন তিনি বিক্ষুব্ধ? না কি এসব কিস্যু নয়। আমার মাথা গরমের বহিঃপ্রকাশ? আপনি হয়ত বলবেন : মশাই, অ্যাতো মাথা গরমের কী আছে? তবে আমাকে উত্তরের জন্য প্রসঙ্গ থেকে ক্ষণিক বিচ্যুত হতে হয়। আমার চিত্রশিল্পী বন্ধু কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত বছরভর আক্ষেপ করে গেলেন জয়নুলের জন্মশতবর্ষ চলছে অথচ কোথাও কোন উদযোগ চোখে পড়ছে না। আমরা কি ভুলে গেছি তাঁকে? এই ‘আমরা’ বলতে আমার বন্ধু মূলত চিত্রশিল্পী এবং বুদ্ধিজীবী মহলের কথাই বলেছেন। আবেদিন, যিনি এক্কেবারে নিম্মবর্গীয় মানুষের লড়াইকে তাঁর চিত্রভাবনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন, যার ছবি বাংলাদেশের পঞ্চাশ টাকার নোটে, স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত (কৃষকের হালচাষ), সেই মানুষটির জন্মশতবর্ষ নিয়ে কেন কথা হবে? এখনকার বাঙালি শিল্পীরা (উভয় বঙ্গের) স্টুডিও, বিদেশি খদ্দের, এমনকী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের ক্রীতদাস। তাঁরা শহরের বড়লোক পাড়ার পার্ক সাজাবেন, দেশনেতা কিংবা সিনেমা আর্টিস্ট, ক্রিকেট খেলোয়াড়ের ছবি কিংবা মোমের মূর্তি বানাবেন। দুগ্গোপুজোর প্যাণ্ডেলের থিম বানাবেন। এবং আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ডুবে মরবেন। শিল্পীজীবনে বহুবার তাঁরাও হয়ত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো কাকের ছবি আঁকবেন। একক। যুগল। ঝাঁকবাঁধা। কিন্তু কলজে ফুটো করে জয়নুল হয়ে ওঠা তাঁদের কম্ম নয়।   ফলে, আমার বন্ধু কৃষ্ণজিৎ যতই আক্ষেপ করুন, এই অসময়ে জয়নুল আবেদিনের জীবনবোধ অনুচ্চারিত থেকে যাবে।

আসলে এত ভনিতা করে যে কথাটা আমি বলতে চাইছিলাম তা এই, বাংলা প্রবাদ বলে : কাক, কাকের মাংস খায় না। কিন্তু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবর্ষে আমার উপলব্ধি এই, আজকাল যারা কাকের ছবি আঁকেন, তাঁরা সেই বিরল প্রজাতির ‘কাক’। যারা কাক হয়েও স্বগোত্রীয় কাকের মাংস খেতে অপছন্দ করেন না।

  •  ছবিগুলি শিল্পাচার্য  জয়নুল আবেদিনের।
Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

2 Responses to নৈতিক কাক এবং জয়নুল আবেদিন

  1. Sandhini Rai Chaudhuri বলেছেন:

    Kak er bislesan jemon avinab temn e jugopojogi hoyechhe.Lekhatir janya sadhubad janai.

  2. Tuhin Subhra বলেছেন:

    banglar mahamanyo seisab “kaak” jodi ei lekhati porten,tahole kichhuta holeo kaaker kalimamukto howar sujog thakto….
    …. dhonyobad Debkumarbabuke

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.