জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-সিরিজ

জন্মশতবর্ষে জয়নুলকে বারেবারে ফিরে দেখা বছরভর। এবারে শিল্পী কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত চোখ রাখছেন জয়নুল আবেদিনের আঁকা বিখ্যাত দুর্ভিক্ষ সিরিজের উপরে।

১৯৪৩ সালে আমাদের দেশে যখন মন্বন্তর এল তখন জয়নুল আবেদিন উনত্রিশ বছরের এক প্রাণবন্ত শিল্পী। ইতিমধ্যেই তাঁর কাজের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তথাকথিত শিল্পপ্রেমী নন যাঁরা, তাঁরাও তখন জয়নুলের কাজের সঙ্গে সুপরিচিত। মানুষ ও প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করে জয়নুল তাঁর কাজকে ছাত্রজীবন থেকেই জনমুখী করে তুলেছিলেন। ক্রমশই তিনি খুঁজে নিচ্ছিলেন নিজস্ব আঙ্গিক, যে আঙ্গিক বিদ্যুতের ফলার মতো ঝলসে উঠছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তর পর্বে একগুচ্ছ মর্মস্পর্শী ছবির মধ্যে দিয়ে।

পরাধীন ভারত তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুর্বিপাকে পড়ে একেবারে মুমুর্ষু অবস্থায়।Zainul_Painting চল্লিশের দশকের প্রথমে, ব্রিটিশ সরকার ও তার সঙ্গী এদেশেরই কিছু সুযোগসন্ধানী স্বার্থপর মানুষের চক্রান্তে বাংলার কয়েক কোটি মানুষ অনাহার ও অর্ধাহারের কবলে পড়ে। দেশজুড়ে দেখা যায় চরম খাদ্যসংকট। নিরন্ন মানুষের শবদেহে ভরে ওঠে গ্রামশহরের রাস্তাঘাট। এইসময় জয়নুল আবেদিন থাকতেন কলকাতার ১৪ নম্বর সাকসি রোডের একটি বাড়িতে। তাঁর তখন কাজ ছিল সারাদিন ধরে কলকাতার পথে ঘুরে ঘুরে খাদ্যহীনবস্ত্রহীন মানুষের দুর্দশার ছবি এঁকে বেড়ানো। এইভাবে শতশত স্কেচ করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে নির্বাচিত বারোটি স্কেচ নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন অবিস্মরণীয় একটি অ্যালবাম, যার নাম ছিল ‘ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’। এই অ্যালবামটি গ্রন্থণা করেছিলেন ইলা সেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অ্যালবামটি অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করে। বুভুক্ষু মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণা শিল্পীর তুলিতে কী হৃদয়বিদারক রূপ পরিগ্রহ করতে পারে তার জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল জয়নুলের সেই চিত্রমালা। তার আগে এদেশের কেউ ভাবতেও পারেননি যে এইভাবে একজন শিল্পী ছবি আঁকতে পারেন। মৃত মায়ের বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা শিশু, স্ত্রীর শবদেহের পাশে আর্তনাদরত স্বামী, ডাস্টবিনে খাবারের খোঁজে উন্মত্ত মানুষ ও কুকুর, মৃত মানুষের চোখ ঠুকরে খাচ্ছে এক দঙ্গল কাক — এইসব দুঃসহ দৃশ্যও যে ছবি হয়ে উঠতে পারে, আর তার প্রকাশভঙ্গিও যে এতটাই তীব্র হতে পারে জয়নুলের ছবির আগে তার কোনও নিদর্শন এদেশ দেখেনি। যদিও একথা উল্লেখ্য যে সেই সময় তাঁর পাশাপাশি চিত্তপ্রসাদের মতো কতিপয় শিল্পী অসাধারণ কিছু ছবি এঁকেছিলেন একই বিষয়ে। তবু জয়নুল আবেদিনের কাজ ছিল স্বভাবস্বতন্ত্র।zainulabedin তেলরঙের চ্যাপ্টা ব্রাশ শুধুমাত্র কালো কালিতে ডুবিয়ে জয়নুল যে সমস্ত রেখাচিত্রের জন্ম দিয়েছিলেন বাস্তবিকই সেগুলি ছিল অতুলনীয় এবং অবিশ্বাস্য। রেখার মধ্যে দিয়ে কান্না ও ক্রোধের এমন ধারাবাহিক প্রকাশ আজ অবধি দুর্লভ।

ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’ অ্যালবামটির জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সরকার সেটিকে বাজেয়াপ্ত করে। সংকলনটিকে দর্শকের সামনে থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন শিল্পী ও প্রকাশক। কিন্তু ততদিনে অগুনতি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে ছবিগুলি। আজও সেই চিত্রমালা দুর্ভিক্ষের স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন হয়ে চিত্রপ্রেমীদের মনের কোনে রয়ে গেছে। একজন শিল্পীর পক্ষে এ বড় কম সম্মানের কথা নয়। আজও যখন এই দেশ কিংবা এই পৃথিবীর কোনও প্রান্তে অনাহারে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে তখন জয়নুলের ‘ডার্কেনিং ডেজ অফ বেঙ্গল’এর রেখাগুলি সজারুর কাঁটার মতো তীক্ষ্ম হয়ে আমাদেরকে বিদ্ধ করে।zainulabedin000 আমরা রক্তাক্ত হই, নিজেদের খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে লজ্জাবনত হতে শিখি।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

1 Response to জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-সিরিজ

  1. swapan banerjee বলেছেন:

    Khub bhalo lagl o Krishnajit er lekha. Shilpir chokhe shilpi r udvas….

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.