আমার ছবিকথা — ১০

ছোটবেলার ছবি আঁকার অভিজ্ঞতা। মনোজগতের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক। ছবির নেশা গড়ে ওঠা। কল্পনার স্বপ্ন-উড়ান। এসব নিয়েই এবারে লিখছেন অম্লান দত্ত

 

খুব ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আর দশজনের মতো আমিও ছবি আঁকার স্কুলে গিয়েছিলাম। ছবি আঁকার সেই ক্লাস হতো আমার বাড়ির ঠিক পিছনেই আর একটা গলির ভিতরে। ছবি আঁকার স্কুলের সেই স্যার পাড়ার পরিচিত দাদা। তখন যে বাড়িতে আমার বাস ছিল সেই বাড়ির বয়স তখনই আশি ছাড়িয়েছে। তার নোনাধরা দেওয়ালে বা সিলিং-এ বৃষ্টির জলের আঁকা চিত্র-বিচিত্র ছবি তখন থেকেই আমাকে রূপকথার জগতে টেনে নিত। সেখানে মা-বড়মার বলা রূপকথার চরিত্ররা কী অদ্ভুত কাণ্ড ঘটাত তা ভাবলে এখনও অবাক হয়ে যাই। সেই অদ্ভুত মায়াবী জগতের আকর্ষণ কোনওক্রমে পার হয়ে পৌঁছে যেতাম আঁকার ক্লাসে। সেখানে আমার মাথায় ভিড় করে থাকা কল্পনার বিচিত্র সব ছবিগুলো খাতায় নেমে আসত স্বচ্ছন্দে — পেন্সিল আর মোম রং-এর ওপর ভর করে। সেই কল্পনার রাজ্যে অবাধ বিচরণ করার সময় বাস্তবতার বোধ হারানো আমার মন আকাশটাকে করে দিত সবুজ, গাছগুলোকে হলদে আর ঘাসের মাঠকে কমলা। কিন্তু আমার কল্পনার পাখি ডানা মেলে বাস্তবতার গণ্ডি পেরিয়ে মুক্ত উড়ান দিলেও আঁকার স্যার বাস্তবতার বাইরে পা ফেলতে নারাজ। তাই সেইসব ছবি পরিত্যক্ত হত অচিরেই, স্যারের নির্দেশে। ফলে সেখানেই প্রতিভার পতন ও মৃত্যু।

‘ছোটবেলা’ থেকে কাট্ টু ‘ক্লাস সেভেন’। এবার আরও বড় একটা আঁকার স্কুল। সেখানে রীতিমতো হাতমকশো করতে হত লাইন-ড্রয়িং-এ। না, কোনো স্বাধীন, ইচ্ছেমতো, আশেপাশের জীবন থেকে বেছে নেওয়া কাউকে নয়, বরং একগোছা স্তূপীকৃত আঁকা জিনিসকেই আবার আঁকতে হত। হয়তো এটাই Great Master-এর ছবির পুনর্নবীকরণ (Copying the Great Master) যার মাধ্যমে আমরা শিখতে পারব আঁকার ক্ল্যাসিকাল ঘরানা। কিন্তু সেই অবিরত অনুকরণ বা ‘নকল’ আর ফুরোত না। আমারও ব্যস্ততা বেড়ে যেত কীভাবে এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সেই প্রচেষ্টায়। এটা ঠিকই আমরা সকলেই খুব দক্ষ নকলনবিশ হয়ে উঠেছিলাম; কিন্তু কল্পনার জগতে মুক্ত উড়ান? সে তো বহু আগেই রূদ্ধ হয়ে গিয়েছিল আঁকার স্কুলের কঠোর নিয়মের বাঁধনে। ভ্যান গঘ-সম ক্ল্যাসিকাল রীতিকে অমান্য করার দুঃসাহস না থাকায় জীবন বিজ্ঞানের প্র্যাকটিকাল খাতায় ‘ভালো ছবি’ আঁকাতেই আমার আঁকিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রাপ্তি বলে মেনে নিয়েছিলাম। মাধ্যমিক পরীক্ষার ভালো ছবি আঁকাই যে আমার ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের আঁকা শেখার মূল লক্ষ্য তা জানতে পারলাম আশেপাশের কাকু-জেঠুদের কাছ থেকে। মনে মনে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। যাক্! তাহলে এই কারণেই এতসব কড়াকড়ি এবং চোখ রাঙানি। অতএব, মাধ্যমিক পেরোলেই মুক্তি। মুক্তি অবশ্য মাধ্যমিক নয়, উচ্চমাধ্যমিকের জীবন বিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল খাতা জমা দেওয়ার পর আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু সে বেশিদিন থাকেনি আমার কাছে।John_Constable_The_Hay_Wain

স্নাতকস্তরে ইংরেজি সাহিত্য সাম্মানিক হিসেবে পড়ার সময় আবার ছবি দেখার শুরু। না, এবার ছবি আঁকার কোন দুরুহ প্রচেষ্টা নয়; বরং ছবি ‘দেখা’ হয়ে উঠল আমার অন্যতম নেশা। প্রথমে ইংরেজি সাহিত্যে রোম্যান্টিক আন্দোলন এবং সেই সূত্রে টার্নার, কনস্টেবল সহ অন্যান্যদের ছবি দেখা। তারপর হঠাৎ দেখা ভ্যান গঘের সাথে। ভ্যান গঘের আঁকা ছবি যখন প্রথম দেখি, তখন মনে হয় — ‘‘এ মা! লোকটা সব কিছুই বাঁকাভাবে এঁকেছে কেন? এ তো ভুল!’’ আমাদের আঁকার স্যার হলে নিশ্চয়ই ভ্যান গঘকে এটা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতেন! কিন্তু এই ‘ভুল’ছবি আস্তে আস্তে আমার সমস্ত সত্ত্বা অধিকার করে নিল। ‘দ্যা স্টারি নাইট’ ছবিতে মহাবিশ্বের বিশাল ও ব্যাপ্ত সৃষ্টিরহস্য যেন উপস্থিত। তাঁর আঁকা ছবির মধ্যে কখন যে নিজেই হারিয়ে যেতাম তা বুঝে উঠতে পারতাম না। আবার ‘ক্রো-স অ্যাট দ্যা হুইটফিল্ড’ ছবিতে গমের ক্ষেতের ওপর দিয়ে পাখিদের উড়ে যাওয়া — এ যেন আঁকা কোন ছবি নয়, বরং বাস্তব ঘটতে থাকা সন্ধ্যার অপূর্ব এক চিরপরিচিত দৃশ্য যা কখনো ফুরোয় না। এছাড়া সাধারণ মানুষের যাতায়াতের দৃশ্য, রাত্রিবেলায় ক্যাফের দৃশ্য — এসব টুকরো টুকরো পরিচিত কিন্তু অচেনা জগৎ ফ্যান গঘ আমাকে চেনালেন তাঁর ছবির মাধ্যমে। ‘সাধারণ’ যে কিভাবে ‘মহৎ’ ও ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠতে পারে তা বোঝা যায় ভ্যান গঘের তুলির টানে। এর সঙ্গে বিকাশ ভট্টাচার্য, মকবুল ফিদা হুসেন, গণেশ পাইন, রবীন মণ্ডল সহ অবন ঠাকুর, গগন ঠাকুর আমার চোখের সামনে নতুন নতুন দরজা ও জানালা খুলে দিতে থাকলেন। চেনা পৃথিবীই আমার কাছে অচেনা, অদ্ভুত অপরূপ রূপে ধরা দিতে থাকল। কল্পনার যে বিস্তার এতদিন রুদ্ধ ছিল, তার বাঁধ যেন ভাঙল। গগ্যাঁ, সেজান, মুঙ্ক, পিকাসোর ছবিতে যেন আমারই কল্পনার স্বাধীন উড়ান! এইসব ছবিতে ব্রাশের টান, পেন্সিলের রেখা আমার মনে যে সব ঢেউ সৃষ্টি করে যায় তার প্রভাব চিরস্থায়ী। এর সাথে সাথে আমার নিজের মনের ক্যানভাসেও আমি ছবি আঁকতে থাকি ইচ্ছে মতো। সেইসব ছবি কখনও সকালে ট্রেনে করে স্কুলে যাওয়ার সময় দেখা দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেতের ছবি, কখনও বা বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় শান্ত-সমাহিত আকাশের ছবি, কখনও বা ঘন কালো মেঘ দিগন্তে গাছপালার ওপরে ঝুঁকে থাকার ছবি। ‘দিগন্তে কার কালো আঁখি’। আবার ঘন বর্ষায় চারিদিকে নেমে আসা মুষলধারে বৃষ্টির রেখায় অবিরত ধারাপাতের ছবি। ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে’। সব মিলিয়ে এখন আমার ছবির জগৎ এক ‘সব পেয়েছির আসর’।vincent-van-gogh-paintings-from-arles-1

আফশোস এটাই যে এই সব পেয়েছির আসরে ছোটবেলায় খুব সহজে যাওয়ার পথ জানা থাকলেও প্রথাগত রীতিনীতির বাধা সেই পথ বন্ধ করে রেখেছিল। এখনও যারা ছোট তাদের অবস্থা যেন ‘ডাকঘর’-এর অমলের মতো। তার মনের মধ্যে যে সব অসংখ্য ছবি সে আঁকে বাস্তবে তার রূপায়ণ কখনও ঘটে না। সে বন্দী সিলেবাস আর পরীক্ষার বদ্ধ ঘরে। সেখান থেকে তার মুক্তি কবে সেটাই আসল প্রশ্ন।

 

  • চিত্র পরিচিতি : প্রথম ছবিটি কনস্টেবল-এর আঁকা নিসর্গ চিত্র : দ্যা হে ওয়েন, দ্বিতীয় ছবিটি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ-এর আঁকা রাতের পানশালা।
Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s