আমার ছবিকথা — ৮

আমার কথা : ছবির কথা

চিত্রশিল্পী ইন্দিরা হালদার-এর জন্ম ১৯৬৯, থাকেন কোন্নগর।  মূলত স্বশিক্ষিত শিল্পী হলেও কিছুদিন তালিম পেয়েছিলেন কার্তিক পাইনের কাছে।  শিল্পী ইন্দিরা-র কলমে তাঁর নিজের ছবিকথা।

 

হঠাৎ করে কিছু হয় কি? হয় না। সব বর্তমানের পিছনেই থাকে অতীতের কারুকাজ। সব ভবিষ্যৎ-ই জন্ম নেয় বর্তমানের প্রেক্ষাপটে। হয়তো এ সত্য সবসময় প্রাকৃতিক নিয়মের ক্ষেত্রে খাটে না, হয়তো বা ব্যত্যয় হয় মানুষের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো, তবু এটাই সাধারণ সত্য।

সব কিছুর ব্যাখ্যা ও কারণ অনুসন্ধান সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। যেমন, কেন ভোরের আলো ফোটার মুহুর্তে আমার হৃদয়-মন সেই কোন্ ছোটবেলা থেকে স্বর্গীয় আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতো তা আমি কি করেই বা বোঝাবো সেই সাথীদের যারা ভোর হতেই হয়তো দেখেনি কোনদিন। কি করে বোঝাবো গোধূলির সেই বিষাদ, কালবৈশাখীর সেই উন্মাদনা, আষাঢ় শ্রাবণে মেঘেদের উচ্ছ্বাস। এই অনাবিল আনন্দকেই বারে বারে ধরতে চেয়েছি রং তুলিতে। সেই ছোটবেলা থেকেই রং-তুলি কখন অজান্তে আমার একান্ত আপনার জন হয়ে উঠেছিল টের পাইনি। বেশি কথা বলতে পারতাম না — তাই আমার সব কথা উজাড় করে দিতে চাইতাম কাগজে রঙের পসরা সাজিয়ে। কিন্তু সত্যি বলতে কি শিল্পী হব ভাবিনি। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে ও সংস্কৃতিতে এ ভাবনার অঙ্কুরোদ্গম বিপ্রতীপ পরিস্থিতির মধ্যেই তৈরি হয়। অনুকূল পরিস্থিতি সাধারণভাবে থাকে না। তবু হয়তো মনের কোনায় খুব সংগোপনে গোপন কোন ইচ্ছে অন্ধকার কোনায় জড়সড় হয়ে বসেছিল।

হঠাৎ দমকা বাতাসের মতো ইচ্ছেপূরণের ঘোড়াকে ছুটিয়েছিলাম বিয়ের এক বছর পর। চাকরি ছেড়ে দিলাম। রং-তুলিকে আঁকড়ে ধরলাম যেমন করে শিশু তার মাকে আঁকড়ে ধরে, শিল্পী শিল্পকে। ছবি আঁকতে শুরু করলাম। প্রশংসা পেলেও আমার মন ভরে না। কিছুদিন পরপরই মনে হতে থাকে কিছুই হচ্ছে না। আরো ভাল কাজ করতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবো কিনা জানিনা কিন্তু ইচ্ছেপূরণের ঘোড়াকে তো ছুটিয়েছিলাম! Exaggerated Expressions, Acrylic on Canvas, 24x36 inchesলক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য যে দূরন্ত গতির প্রয়োজন, যে ত্বরণের প্রয়োজন তা না হয়ে এখন মন্দনের পথে চলেছি। কারণ — অদ্ভুত দুটো মূল অসুখ — SLE (Systemic Lupus Erithrometosus) ও APLA (Anti Phosphoric Lupus Anticoagulant) তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমার পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়েছে। ওদের সাঙ্গপাঙ্গদের সংখ্যাও কম নয়। থেমে কিন্তু যাই নি। প্রতিদিনের যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে ধীরে হলেও চলেছি। কারণ আমাকে চলতে হবেই। এই চলাটাই আমার বেঁচে থাকার ওষুধগুলোর মধ্যে প্রধানতম। অন্ততঃ কিছু হয়ে ওঠা ছবিকে আমায় রেখে যেতে হবে এই দৃঢ় সংকল্প করেছি।

এবার আসি ছবির কথায়। কি ধরণের ছবি আঁকি আমি? প্রথমে শুরু করেছিলাম ফর্ম ভাঙা-গড়ার খেলা। কোথাও কোথাও মিশে যেত ফ্যান্টাসি। অদ্ভুত সরল ফর্ম-এ ধরা দিয়েছে পশু-পাখি-মানুষ-প্রকৃতি, এবং সেই ফর্মগুলি স্বতন্ত্র বলেই স্বীকার করেছেন তথাকথিত শিল্পীমহল ও সমালোচকেরা। এদের নিয়েই দিন কাটছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন মনে হল আচ্ছা এ ফর্ম ভাঙার খেলা তো বহু শিল্পী (এমনকি বিভিন্ন লোকশিল্পীরাও) বহু বছর ধরে করে আসছেন। তাঁরা তাঁদের সমসাময়িক সমাজজীবন, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মীয় প্রচার ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার কথা এইসব ছবির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। আমার সময়ের সমাজের যে সমস্যা তা আমার বিভিন্ন ছবির মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সমস্যার সমাধান নিয়ে কোনো বক্তব্য কি আমি আমার ছবির মধ্য দিয়ে দিতে পেরেছি? মনে হয়েছে — না, দিতে পারিনি। অনেকে হয়তো বলবেন ছবির মূল বক্তব্য হওয়া উচিত দর্শককে নির্মল আনন্দ দেওয়া। আমারও তাই মত। কিন্তু তার পরেও একটা ‘কিন্তু’ থেকে থেকে খচ্ খচ্ করছে। শিল্পী হিসেবে কি আমার কোনো দায় থাকে না নির্মল আনন্দ দেওয়ার সাথে সাথে আনন্দকে আরও গভীর করে তোলার। এমন কিছু বার্তা যা সমাজের গভীর কোনো সমস্যার সমাধান বহন করবে।Naked Shame before Witty Wildly Dressed, Acrylic on Canvas, 24 in X 36 in

তাই আমার ছবিতে কিছু পরিবর্তন এল। আগের ফর্ম থেকে অল্প একটু সরে ছবির রঙ, ব্যাকগ্রাউন্ডের রঙ চাপানোর পদ্ধতির কিছু কিছু পরিবর্তন করতে হল। আগে একটা ফিগার দিয়ে বহু ছবি করেছি, কিন্তু এখন অনেক মানুষের সমাহার। অর্থাৎ, আমরা যখন কোনো কমন ইস্যুতে এক জায়গায় হই সেই বিশেষ মুহুর্তের ছবি। শুধু কমন ইস্যু নয়, কমন ইন্টারেস্টও হতে পারে। তবেই আমাদের মধ্যে কনভারসেশন হয় ও আমরা একে অপরকে বুঝতে পারি, মতামত আদান-প্রদান করতে পারি। শুরু হল সিরিজ — ‘When we are uncovered’। এখন সমাজ চলছে উন্মুক্ত শরীরের দিকে, যা সহজেই করা যায়। আমি বলছি উন্মুক্ত শরীর নয়, উন্মুক্ত মন-চিন্তা-ভাবনা-চেতনা-জ্ঞান।Cheerfull Delight, Acrylic on Canvas, 14x14 inch তবেই সমাজের অগ্রগতি, তবেই সম্পর্কের মধ্যে স্বচ্ছতা তৈরি হবে যা কিনা যে কোন সমস্যার সমাধান করবে সহজেই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে শুরু করে সরকারের পলিসি সবেতেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন যা আমাদের অনেক ছোট-বড় সমস্যা কমিয়ে দেবে। আমি ছবিগুলিতে কিছু সমান্তরাল অনুভূমিক লাইন বা শেড ব্যবহার করেছি ব্যাকগ্রাউন্ডে। এগুলি ফিগার গুলির মধ্য দিয়ে চলে গেছে খুব হাল্কাভাবে। একটা কমন রেখা যখন সমস্ত ফিগার-এর মধ্য দিয়ে গিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিশে থাকে তখন তা একটা কমন ইন্টারেস্ট বা ইস্যুকে ইঙ্গিত করছে। এমন একাধিক কমন ইন্টারেস্ট-এর জন্য একাধিক লাইন।

ফিগারের আকৃতি এমনভাবে করা হয়েছে তাতে তারা না পুরুষ, না নারী, না নপুংসক। এমন একটা মানসিক অবস্থা প্রয়োজনে সে পুরুষাকার, আবার প্রয়োজনে সে নারীর মতন কোমল। এরা কোনো হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান বা নারী-পুরুষ বা বর্ণবৈষম্যের প্রতিরূপ নয়। সমস্ত স্বত্ত্বা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক অবয়ব।

বাস্তবে এর অস্তিত্ব অসম্ভব এমন নয়। শারীরিকভাবে তারা যাইহোক না কেন, মানসিকভাবে তারা এমন সবকিছুর মিশ্রণ যে বাহ্যিক প্রকাশে তা ধরা পরে। যেমন — যিশুখ্রিস্ট, শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন, স্বয়ং শিব, শ্রীচৈতন্য, গৌতম বুদ্ধ, শ্রীরামকৃষ্ণ, কবির, গুরু নানক, জোয়ান অফ্ আর্ক, রোজা লুক্সেমবার্গ, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, রবীন্দ্রনাথ এমনকি শচীন তেন্ডুলকরও।

ভারতীয় কিছু দেবতা বা পৌরাণিক গল্পের নায়ক যাদেরকে কেউ কখনো দেখেনি অথচ তাদের যে বর্ণনা বা বহুদিন থেকে চলে আসা শিল্পীদের কল্পনায় আঁকা ছবিগুলি দেখলেই বোঝা যায় তাদের মধ্যে নারী-পুরুষের চরিত্রের মিশ্রণ ঘটেছে। কৃষ্ণ বা শিবের ছবিতে কখনো কখনো যে ফেমিনিন টাচ্ দেখা যায় তা ব্রহ্মা, বিষ্ণু বা অন্য কোনো দেবতাদের মধ্যে দেখা যায় না। রামের ছবিতেও যে মিশ্রণ থাকে তা লক্ষ্মণ, ভরত বা শত্রুঘ্ন-র মধ্যে থাকে না। অর্জুন তো মহাভারতে অনেকটা সময় মহিলা হয়েই কাটিয়েছেন।

আমার ছবির ফর্মে এই বিশেষ ধরণের চরিত্রের মিশ্রণ ঘটাতে চেয়েছি। এঁরা প্রত্যেকেই পুরুষ ও মহিলাকে আলাদা করে দেখেননি, মানুষকে মানুষ হিসেবেই সমান সম্মানের অধিকারে বসিয়েছেন। (এর অর্থ এটা নয় যে যাদের মধ্যে এমন মিশ্রণ ঘটেনি তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে তারা ভেদাভেদ না করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেননি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এই বিশেষ ধরণের মানুষদের দেখে বা অনুভব করে আমার ছবির ফর্মকে বের করে এনেছি মাত্র।) যিশু নারী-পুরুষকে সম্মান মর্যাদা দিয়েছিলেন। দ্য ভিঞ্চি তারই প্রকাশ ঘটাতে বোধহয় এঁকেছিলেন ‘মোনালিসা’ যাতে পুরুষ-মহিলা মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে। যদিও এ নিয়ে বহু তর্ক বিতর্ক হয়েছে, হচ্ছে এবং হবেও।Deep in Conversation, Acrylic on Paper, 20 in X 25 in

যদিও আমি কিন্তু নিজেকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-র সঙ্গে একেবারেই তুলনা করছি না। আমার ঠাকুর ঘর অন্যদের থেকে একটু আলাদা। সেখানে যাঁরা স্থান পেয়েছেন তাঁরা হলেন আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, লিওনার্দো, মাইকেল এঞ্জেলো, ভ্যান গঘ, পাবলো পিকাসো, শেক্সপীয়র, গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, মাদাম কুরি, তলস্তয়, কার্ল মার্কস, ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা এবং আরো কেউ।

যাইহোক, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখার মধ্য দিয়েই বোধহয় নারী নির্যাতন ও সমাজের আরো কিছু অবক্ষয় হয়তো কমবে। আরো অনেক অনেক না লেখা কথা ছবিতে রয়েছে। আমি শুধু ধরিয়ে দিলাম, বাকিটা রইলো দর্শকের জন্য। কেউ একজন বলেছিলেন, ‘একটা ছবি হাজার হাজার কথার সমাহার’। আজ উপলব্ধি করি সত্যিই তাই।

অবশেষে বলি, আমি সবকিছুকে ছাপিয়ে ছবিকে ছবি করে তোলার চেষ্টা করেছি, করছি এবং আরো অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো আমার বক্তব্য ও ছবিকে মিলে-মিশে এক ‘মন্তাজে’ পরিণত করার জন্য। সর্বোপরি, ছবিগুলোতে রয়েছে — ব্যক্তিগত নয়, একটা সঙ্ঘবদ্ধ আনন্দ, দুঃখ, ভয়, লাঞ্ছনা, আতঙ্ক, জয় প্রভৃতির এক্সপ্রেশন। আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে একসাথে কোনকিছুকে উপলব্ধি করা, একে অপরকে বোঝা, একে অপরকে ভালবাসা এবং দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনবোধকে আরো উন্নত করা।

জানিনা, আরো কত পথ চলতে হবে আরো পরিণত ছবি করতে!!

Under Blanket of Fear Guessed, Acrylic on Paper, 10 x 14 inch

  • ছবিগুলি লেখিকার নিজের আঁকা

 

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

1 Response to আমার ছবিকথা — ৮

  1. siddhartha বলেছেন:

    DARUN LAGLO APNAR CHABI,KATHA O VABNA!!! ANEK SUBECHHA RAILO. SIDDHARTHA PATRA. KANTHI, PURBA MEDINIPUR.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s