আমার ছবিকথা — ৭

ছবি নিয়ে এবার ব্যক্তিগত আলাপচারী বহরমপুর গার্লস কলেজ-এর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা সন্ধিনী রায় চৌধুরী

বাঙালি মাত্রেই কবি ও রোমান্টিক এমন একটা ধারণা সুধীসমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু শৈশবে আমি যখন সেই অর্থে বাঙালি হয়ে উঠিনি তখন থেকেই যেন চিত্রদর্শনে আমার মনে রোমান্টিসিজমের প্রভাব পড়েছিল। রোমান্টিসিজমের মূলে কল্পনাবিলাসের অবস্থান আর সেজন্যই বোধকরি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শকুন্তলা, ক্ষীরের পুতুল, বুড়ো আংলার মত বই-এর লেখা, আঁকা ও তার বৈঠকী মেজাজ আর হাবভাব আমার শিশুমনে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল। আমাদের ছেলেবেলায় জন্মদিনে বাড়ীতে কোন উৎসবের আয়োজন না করা হলেও ছোটদের হাতে রঙীন কাগজের প্যাকেটে মুড়ে দু-একটি বই উপহার দেওয়া হতো। কী বই এবং কার লেখা সে বিষয়ে থাকতো অদম্য কৌতুহল। সেইরকমই এক জন্মদিনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়েই হয়ে উঠলাম অবনীন্দ্র-অনুরাগী।

অবনীন্দ্রনাথের ছবির সঙ্গে আমার দীর্ঘকালীন পরিচিতির সুবাদে জেনেছি যে অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ একত্রে ছবি এঁকেছেন, নন্দলাল বসু ও যামিনীরায় আর্ট স্কুলের সহপাঠি ছিলেন। তথাপি অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে নন্দলাল ও তাঁর ছাত্র শিল্পীদের সমীকরণ প্রথাই যেন সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। গগনেন্দ্রনাথের জ্যামিতি-নির্ভর শৈলী ও আলোছায়ার কৌণিক বিস্তার আর যামিনী রায়ের স্বদেশিয়ানার একনিষ্ঠ প্রয়োগ ও লোকশিল্প আধারিত শৈলিতে দেখার প্রবণতাটা আশ্চর্যরকম বেশি। অন্তর্মগ্ন শিল্পী গণেশ পাইনের ছবিতে এই চার শিল্পীর চতুর্মুখী শিল্পপথের সঙ্গম অনুভব করা যায়। আমার বহরমপুরের বাড়ীর ড্রইংরুমের দেওয়ালে শ্রী পাইনের আঁকা সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি টাঙানো আছে আর কলকাতার ফ্ল্যাটে পাশ্চাত্য অনেক শিল্পীর আঁকা ছবির মধ্যে রেমব্রেন্টের ছবির সঙ্গে ‘ভেনাসের জন্ম’ চিত্রটিও শোভা পাচ্ছে।P_1

অবন-যামিনীর জগৎ থেকে পশ্চিমের জ্যামিতিক ভাষায়, কিংবা অপরিচিত প্রায়ান্ধকারে — সর্বত্রই গণেশের তুলি অপরূপ। গণেশ পাইন বেঙ্গল স্কুলের নবতম জ্যামিতিক বিস্ময়। শিল্পী যেন প্রথমাবধি যামিনী রায়ের চোখ আঁকার ভঙ্গি আত্মস্থ করেছেন। দুটি বিপরীতমুখী বৃত্তচাপ রেখার সহাবস্থানে আঁকা পদ্মকোরকের মত চোখে সুখ-দুঃখ, ভয় বা বরাভয়ের ভাব ইচ্ছেমত ফুটিয়ে তুলেছেন।

আমি ছবির জগতের কেউ নই, কিন্তু জীবন ও শিল্প সংক্রান্ত আমার যাবতীয় স্মৃতি, স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা সবই সংশ্লেষিত হয়েছে আমার মনের গভীর থেকে আসা বিশেষ একটা অনুভূতি ও বোধ থেকে। এই নান্দনিক দর্শন আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া, কারণ তাঁর গৃহসজ্জার সৌন্দর্যচেতনা ও যে কোন শিল্প নিয়ে চর্চার সহজাত যে দক্ষপ্রবণতা ছিল সেটা উত্তরাধিকার সূত্রে আমার মধ্যে সহজে সঞ্চারিত হয়েছে। ফুল, লতা-পাতা, তারা-আকাশ এসব অতি তুচ্ছ সাধারণ দৃশ্যর প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা ও অনুভবের মেশামেশিতে জীবন যে কেমন ধন্য ও অব্যক্ত আনন্দে পূর্ণ হতে পারে এ আমার বেড়ে ওঠার সময়কার যাপনের পরম্পরায় প্রাপ্ত নিজস্ব সম্পদ।

আমার পড়ার ঘরের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের আঁকা মা ও শিশুর অরিজিনাল ছবিটি যেমন বড় করে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো আছে তেমনি আবার বুকসেল্ফ-এর বইগুলির ফাঁকে মায়াবী পটুয়া তরুণ শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তর তৈরী নববর্ষের শুভেচ্ছা-বার্তা বাহক লক্ষ্মী ও সরস্বতীর পটচিত্র আঁকা দুটি কার্ড সুন্দর করে সাজানো আছে। যে কোন ছবি যা দেখলে মনটা উদার স্নিগ্ধতায় প্রসন্ন হয়ে ওঠে তা ল্যাণ্ডস্কেপ কিংবা পোর্ট্রেট যাইই হোক্ না কেন আমার ভালো লাগে। শিল্পী রামকিঙ্কর, বিকাশ ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী, মকবুল ফিদা হুসেন, প্রকাশ কর্মকার এঁদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন ছবি আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে, তাই আলাদা করে কোন্ শিল্পী প্রিয় তা চিহ্নিত করতে পারছি না।P_2

চিত্রশিল্পের শিল্পিত অনুসন্ধান করার প্রশিক্ষিত অন্তর্দৃষ্টি আমার নেই তবু সম্পাদকের অনুরোধে কখনও শানু লাহিড়ির ‘স্মৃতির কোলাজ’ অথবা কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের ‘চিত্রশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ’ বইটিতে সংকলিত চিত্রাবলির মেধাবী অন্বেষণ করে সমালোচনামূলক লেখা আমাকে লিখতে হয়েছে। এমন কী ২০০৯-এর মার্চের শেষে কলকাতায় ‘ফটোগ্রাফার্স গ্যালারি’-তে আয়োজিত কৃষ্ণজিতের একক প্রদর্শনী ‘তুলিকথা’ (সং অফ দি কালারস্)-এর শিল্পবৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে সামগ্রিক মূল্যায়ণ করে আমার অশিক্ষিত পটুত্ব নিয়েই লিখতে হয়েছে ‘ঝড়’ পত্রিকায়। এত কথা বলার কারণ একটাই এই যে, আমার ক্ষেত্রে ছবি দেখে ব্যক্তিগত ভালোলাগার অনুভূতিটাই শেষ কথা — ছবির অর্থ খোঁজা নয়। আর্ট সম্পর্কিত বই পড়তে ভালোবাসি। আমার সংগ্রহে থাকা প্রিয় বই-এর নাম : “1001 Paintings you must see before you die” যে বইটির General Editor : Stephen Farthing এবং Preface : Geoff Dyer। পরিশেষ বলি, এত কথার পরেও বাংলার সমাজ চিত্রকলা বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন কিনা আর আর্ট নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন আছে কি না — এ দুটি প্রশ্নের উত্তরে নেতিবাচক মনোভাবই পোষণ করছি।

  • ছবি দুটি শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত-র আঁকা।
Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

4 Responses to আমার ছবিকথা — ৭

  1. Probal Sanatani বলেছেন:

    I liked the writeup Chabi katha by Sandhini Ray Choudhury.

  2. partha dasgupta বলেছেন:

    darun, bhari antorik lekhata. Amar chobi dhonno holo pasapasi Aban babu der nam uchharito hobar jonno.aro likhun, amra aro anka ankir prosroy pabo. dhonnobad.
    Partha Dasgupta.

  3. Sandhini Rai Chaudhuri বলেছেন:

    I am thankful to you as you appreciated my writing. Keep connection with Udvas.
    With Love
    Sandhini Ray Chaudhari

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s