আমার ছবিকথা — ৪

আমার ছবিকথা অথবা কৈফিয়ৎ

আমার ছবিকথা বিভাগে এবার ছবির সঙ্গে সঙ্গে এই ব্লগ নিয়ে বকবক্ করছেন মৃণাল নন্দী

আমি কোনোদিন ছবির জগতের লোক ছিলাম না, বা এখনও নই। তা সত্ত্বেও উদ্ভাসের নামে একটা ব্লগ-সাইট কেমন করে আমার সফর সঙ্গী হলো প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

আসলে ছবি আঁকতে না জানলেও বা ছবি নিয়ে টেকনিক্যাল কোনো জ্ঞান না থাকলেও ছবি দেখতে আমার ভালো লাগে ছোটো থেকেই। সহজপাঠের ছবি কোনো কিছু না ভাবিয়েই মনের গহনে ঢুকে যায় কোনো ছোটোবেলা থেকে। তখন জানতামই না নন্দলাল বসুর নাম। জানতামই না লিনোকাট কাকে বলে।E

এরপর বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একসময় কেমন করে যেন ‘উদ্ভাস’ নামের এক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। ছবির সঙ্গে একটু একটু করে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ছবি দেখার চোখ একটু যেন পাল্টে যায়। জড়িয়ে পড়ি বেশকিছু এমন কাজে যাকে বুদ্ধিমানেরা বলেন ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’। ‘চিত্র উৎসব’, স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ছবি নিয়ে তৈরী তথ্যচিত্র দেখানোর বন্দোবস্ত করা, আর্ট ওয়ার্কশপ — এমনই নানারকমের কাজ কারবার।

এমনই এক সময়ে ইন্টারনেটে বিভিন্ন বাঙালী চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে জানতে চেয়ে গুগল সার্চ করে দেখি খুব বেশি তথ্য সেখান থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। বিদেশি কম-বিখ্যাত শিল্পীদের সম্পর্কে যেটুকু তথ্য আছে তার চেয়েও বহু অংশে কম তথ্য আছে বাঙালী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীদের সম্পর্কে। কম-বিখ্যাত বাঙালী শিল্পীদের সম্পর্কে তবে আর কি থাকতে পারে? মনে মনে গালাগাল দিলাম আমাদের জাতিটাকে। আমাদের নিজেদের প্রতি এত অবহেলা কেন?

এরপর ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে বসে দেখি, দোষ তো আমাদেরই। আমাদের নিজেদের সম্পর্কে কৌতুহল তো আমাদেরই সবচেয়ে কম। নিজেদের আমরা নিজেরাই তো চিনি না। শচিন তেন্ডুলকরের রেকর্ড আমার চারপাশের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের সকলেরই প্রায় মুখস্থ, কিন্তু যামিনী রায়ের পাঁচটা ছবির নাম বলতে বললে তখন তারা তোতলাতে শুরু করে। কেন? আমাদের চারিদিকে — চায়ের দোকানে, বাজারে, রাস্তায়, বাসে-ট্রেনে — সবকিছু নিয়েই আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় রাজনীতি থাকে, থাকে অর্থনীতি, দেশ বিদেশের দরকারী বে-দরকারী বিষয়, ক্রিকেট, ফুটবল, নারীবাদ, সিনেমা — কোনো কিছুই প্রায় বাদ দেবার নেই সেখানে। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় যে খবর উঠে আসে তা নিয়ে তর্ক-তুফান চলতেই থাকে। অন্দরমহলে চলে টিভি সিরিয়াল নিয়ে আলোচনা। কিন্তু কোথাও তো শিল্পকলা নেই, নেই চিত্রশিল্প বা শিল্পীদের কথা, নেই ভাস্কর্য!Jamini Roy

আমরা কি সত্যিই এসব নিয়ে সচেতন? আমি কতটুকু করতে পারি? সত্যিই কি কিছু করতে পারবো? এমন সাপ-ব্যাঙ ভাবতে ভাবতেই নিজের নামে একটা ব্লগ-সাইট শুরু করি কিছু না ভেবেই।nandimrinal.wordpress.com। তখনও সেটা কোনো রূপ পায়নি। সাইট তৈরী বা তাকে চালানোর মতো কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান সেই অর্থে আমার নেই বললেই চলে। এরপর একদিন উদ্ভাসের আড্ডায় ব্লগ-সাইটের কথাটা বললাম। কিন্তু তাতে দেখাবার বা দেবার মতো কোনো কিছুই নেই। আমি তো আর অমিতাভ বচ্চনের মতো কেউ নই, যে নিজেকে নিয়ে যা লিখব তাই লোকে পড়বে! তবে এই ব্লগে আমি ডায়রি লিখতে পারি শিল্পকলা নিয়ে যেখানে শিল্পকলা নিয়ে তথ্য থাকবে, মূলত থাকবে উদ্ভাস গোষ্ঠীর কথা। কিন্তু তা-ও কতটুকু? শিল্পকলা নিয়ে আমার যা জ্ঞান তা তো তুচ্ছ বললেও অনেক কম বলা হয়।

এরই মধ্যে এগিয়ে এলো উদ্ভাসের কৃষ্ণজিৎদা। ব্লগের তথ্যাবলী নিয়ে অভাব দূর করতে গোটা উদ্ভাস গোষ্ঠী সামিল হয়ে গেল আমার পাশে। আমিও ইন্টারনেট ঘেঁটে ঘেঁটে ব্লগকে কিভাবে আরো আকর্ষনীয় করা যায় তার হদিস শুরু করলাম। আস্তে আস্তে ব্লগটি প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়েবসাইটের কাছাকাছি চেহারা নিয়ে ফেলল।

কিন্তু এই মুহূর্তে একটি প্রশ্ন আমাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে। এই ব্লগের সাহায্যে হয়তো বা ইন্টারনেটে আমরা কিছু তথ্য জমা করতে পারছি বাংলার শিল্পকলা, বিশেষত চিত্রশিল্প নিয়ে। কিন্তু এতে সত্যিই কি কিছু যায় আসে? কিসের জন্য হচ্ছে এসব? আমরা নিজেরাই যদি সচেতন না থাকি তবে কারা আর এসব নিয়ে চর্চা করবে?

এরই মধ্যে আশার আলো দেখতে পাই, যখন দেখি বহুদিন পর বাংলা পড়তে পেয়ে জনৈক প্রবাসী বাঙালী আহ্লাদিত হয়ে ওঠেন। অথবা আমার বহুদিনের পরিচিত ছেলেটিকে লিখতে বললে সে এমন লেখা ব্লগে প্রকাশের জন্য দেয় যা থেকে আমি নিজেই সমৃদ্ধ হই, নতুন করে চিনতে পারি আমার বহু পরিচিত সেই বন্ধুকে। আশায় উদ্বেলিত হয়ে উঠি যখন দেখি আমাদের এই ব্লগ কোনো প্রবীণকে নতুন করে ভাবার এবং বাঁচার রসদ দেয়, কিংবা কোনো কিশোর আনন্দে আটখানা হয়ে ফোন করে বসে তার বন্ধুকে এবং ছবি নিয়ে বেশ একটা দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে দেয়!

এসবই জানতে পারি, কেননা এগুলো আমার চারপাশে হচ্ছে। কিন্তু যেটুকু আমি জানতে পারছিনা, সেই বাকি পৃথিবীটা? সেটা তো অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে আমার সামনে পড়ে আছে। আশা হারানোর মতো তবে কোনো কিছুই হয়নি এখনো। ভাগ্যিস।

Advertisements
This entry was posted in Cultural journey and tagged , . Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.